ঢাকা ০৪:৩৩ অপরাহ্ন, রবিবার, ২৬ এপ্রিল ২০২৬, ১৩ বৈশাখ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম ::

৫ কোটি টাকায় প্রধান প্রকৌশলীর চেয়ারে আউয়াল

জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের (পিডব্লিউডি) তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মো. আবদুল আউয়াল সম্প্রতি প্রধান প্রকৌশলীর (রুটিন দায়িত্ব) চেয়ারে বসানোর মাধ্যমে নতুনভাবে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে এসেছে। সরকারি নিয়োগ বিধিমালা অনুযায়ী, কর্মকর্তাদের সাধারণত নিজ জেলার বাইরে বদলি হওয়ার নিয়ম থাকা সত্ত্বেও আউয়াল দীর্ঘ সময় ধরে নিজের এলাকায় বহাল তবিয়তে ছিলেন। ক্ষমতার পালাবদল ও সরকারের পরিবর্তনের পরও তার প্রভাব কমেনি; বরং অর্ন্তর্বতী সরকারের আমলেও সচিব পর্যায়ের আশীর্বাদে তিনি আরও প্রভাবশালী হয়ে উঠেছেন।
পদোন্নতি ও জ্যেষ্ঠতা লঙ্ঘন : আউয়াল জ্যেষ্ঠতার তালিকায় চতুর্থ স্থানে থাকা সত্ত্বেও তিন সিনিয়র কর্মকর্তাকে পেছনে ফেলে প্রধান প্রকৌশলীর দায়িত্বে বসেছেন। সংশ্লিষ্ট সূত্র ও ভুক্তভোগী কর্মকর্তাদের অভিযোগ, এই পদটি দখলে নিতে প্রায় পাঁচ কোটি টাকার অবৈধ লেনদেন হয়েছে। এমনকি নিয়োগ প্রক্রিয়ায় বাধ্যতামূলক জাতীয় নিরাপত্তা গোয়েন্দা (এনএসআই) মূল্যায়ন প্রতিবেদন যাচাই করা হয়নি। সরকারি নিয়োগ বিধির স্পষ্ট লঙ্ঘন হলেও, বিষয়টি কোনো তদারকি বা শৃঙ্খলাপূর্ণ তদন্তের মুখ দেখেনি।
সরকারি কর্মকর্তা ও ভুক্তভোগীদের মতে, আউয়াল দীর্ঘদিন ধরে নিজের এলাকায় শক্তিশালী অবস্থান বজায় রেখে প্রশাসন ও রাজনীতির প্রভাবকে কাজে লাগিয়ে পদোন্নতির ক্ষেত্রে নিজের সুবিধা নিশ্চিত করেছেন।
স্থানীয় এমপি ও সিন্ডিকেটের প্রভাব : তদন্ত ও সূত্র অনুসারে, আউয়ালের প্রভাব বিস্তারে স্থানীয় এমপি এবং প্রভাবশালী রাজনৈতিক নেতাদের সমন্বয় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। নরসিংদী ও ময়মনসিংহে দায়িত্বকালীন সময়ে তিনি নির্বাহী প্রকৌশলী থেকে তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী পর্যন্ত পদায়ন নিশ্চিত করেছেন। এসময় টেন্ডার বাণিজ্য ও কমিশনের মাধ্যমে বিপুল অর্থ আত্মসাতের অভিযোগও রয়েছে। বিশেষ করে ওই সময়ের এমপি আব্দুস সাত্তারের প্রভাবে কোনো অনুসন্ধান শুরু হয়নি, যা প্রকল্পের স্বচ্ছতা ও নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থাকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে।
সিলেট বিভাগে সংক্ষেপে বদলি হলেও আউয়াল কৌশলে পুনরায় ময়মনসিংহে ফিরে আসেন এবং প্রায় পাঁচ বছর ধরে একই সার্কেলে আধিপত্য বিস্তার করে চলেছেন। সরকারি চাকরিতে এক স্টেশনে এমন দীর্ঘস্থায়ী অবস্থান বিরল হলেও, আউয়ালের ক্ষেত্রে এটি দীর্ঘসময় ধরে ধরা পড়েছে।
প্রশাসনিক সমর্থন ও অর্ন্তর্বতী সরকারের সময় : বর্তমান অর্ন্তর্বতী সরকারের আমলেও আউয়ালের ক্ষমতা কমেনি। অভিযোগ আছে, স্থানীয় সরকার বিভাগের সচিব রেজাউল মাকছুদ জাহেদীর সঙ্গে জেলা-প্রীতি ও সখ্যতার সুবাদে তিনি নতুন সিন্ডিকেট গড়ে তুলেছেন। এই প্রভাব ও সম্পর্ক কাজে লাগিয়ে তিনি জ্যেষ্ঠতা লঙ্ঘন করে প্রধান প্রকৌশলীর চেয়ারে বসতে সক্ষম হয়েছেন।
উপজেলা ও জেলা পর্যায়ের কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলাপচারিতায় জানা যায়, আউয়াল কর্তৃক গঠিত সিন্ডিকেটের মাধ্যমে সরকারি প্রকল্পের বিভিন্ন দফতরে নিয়ন্ত্রণ ও অর্থের বিনিময় কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। কর্মকর্তারা বলছেন, “এ ধরনের সিন্ডিকেট সরকার ও স্থানীয় প্রশাসনের মধ্যে অনিয়মের একটি বিশাল চক্র তৈরি করেছে। একজন কর্মকর্তার প্রভাব এতদূর বিস্তার করা মানে পুরো ব্যবস্থার শৃঙ্খলা ভেঙে দেওয়া।”
সম্পদ ও বেনামি ব্যবসা : আউয়ালের বিরুদ্ধে অভিযোগ আছে, তিনি নিজের কথিত ভাতিজাকে সামনে রেখে ঠিকাদারি ব্যবসা পরিচালনা করছেন। এই ব্যবসার মাধ্যমে সরকারি প্রকল্পের কোটি কোটি টাকা আত্মসাত করা হয়েছে। দেশে এবং বিদেশে নামে-বেনামে সম্পদের পাহাড় গড়ে তুলেছেন।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, আউয়ালের এই সম্পদ অর্জন শুধুমাত্র সরকারি প্রকল্পের মাধ্যমে নয়, বরং তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলীর দায়িত্বকালীন সময়ে বিভিন্ন নকশা ও টেন্ডার বাণিজ্যে প্রভাব প্রয়োগের মাধ্যমে হয়েছে। তারা বলছেন, “যদি এই ধরনের অনিয়ম ও দুর্নীতি নিয়মিত হয়, তবে সংস্থার নাম এবং জনস্বাস্থ্যের প্রকল্প দুটোই ক্ষতিগ্রস্ত হয়।”
অভ্যন্তরীণ অসন্তোষ ও প্রশাসনিক প্রতিক্রিয়া : জ্যেষ্ঠতা ও যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও তিন সিনিয়র কর্মকর্তাকে বঞ্চিত করে আউয়ালকে প্রধান প্রকৌশলীর দায়িত্ব দেওয়ায় অধিদপ্তরের অভ্যন্তরে চরম অসন্তোষ বিরাজ করছে। কর্মকর্তারা বলছেন, এনএসআই ক্লিয়ারেন্স ছাড়া এবং বিপুল অর্থের বিনিময়ে এই নিয়োগ প্রক্রিয়া প্রশাসনিক শৃঙ্খলার জন্য মারাত্মক হুমকি।
কর্মকর্তারা অভিযোগ করছেন, “এভাবে একজন বিতর্কিত ও দুর্নীতিগ্রস্ত কর্মকর্তাকে সংস্থার প্রধান পদে বসানো মানে প্রশাসনিক সংস্কার ও শৃঙ্খলার ওপর বড় আঘাত।” তারা আরও বলছেন, এই পদোন্নতি একদিকে যেমন দুর্নীতির জন্য উদাহরণ স্থাপন করছে, অন্যদিকে অন্য যোগ্য কর্মকর্তাদের জন্য হতাশার কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে।
বিশেষজ্ঞ ও সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য : সরকারি নিয়োগ ব্যবস্থার অভ্যন্তরে দীর্ঘদিন কাজ করা একজন বিশেষজ্ঞ বলছেন, “প্রকল্প বাস্তবায়ন ও সরকারি চাকরিতে এই ধরনের সিন্ডিকেটের প্রভাব স্থাপন হলে সংস্থার নীতি এবং জনস্বাস্থ্য প্রকল্পের লক্ষ্য উভয়ই বিপন্ন হয়। এনএসআই ক্লিয়ারেন্স ছাড়া পদোন্নতি দেওয়া মানে সরকারি নিয়োগ বিধির মৌলিক লঙ্ঘন।”
তাঁর মতে, প্রশাসনিক শৃঙ্খলা ঠিক রাখার জন্য স্বচ্ছতা ও নিয়মাবলী কঠোরভাবে প্রয়োগ করা প্রয়োজন। “যদি কেউ প্রভাব ও অর্থের মাধ্যমে পদোন্নতি পায়, তবে সেটি শুধু একজন কর্মকর্তার দুর্নীতিই নয়, পুরো সরকারি ব্যবস্থার উপর আস্থা কমিয়ে দেয়।”
বর্তমান পরিস্থিতি ও অনুসন্ধানী প্রচেষ্টা : অধিদপ্তরের সাধারণ কর্মচারীরা দাবি করেছেন, আউয়ালের বিরুদ্ধে যথাযথ তদন্ত ও ব্যবস্থা গ্রহণ করা প্রয়োজন। তারা বলছেন, “আমরা চাইছি সংস্থার শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে এবং দুর্নীতিমুক্ত প্রশাসন নিশ্চিত করতে সরকার সঠিক পদক্ষেপ নিক।”
স্থানীয় প্রশাসনিক সূত্র জানিয়েছে, আউয়ালের বিষয়টি নিয়ে উচ্চপর্যায়ের বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে। তবে এখনও কোনো আনুষ্ঠানিক তদন্ত বা ঘোষণা হয়নি। অনেক কর্মকর্তা মনে করছেন, তড়িৎ তদন্ত ও স্বচ্ছতা ছাড়া পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠবে।
স্থানীয় প্রশাসনের অভ্যন্তরে সিন্ডিকেটের প্রভাব : আউয়ালের দীর্ঘদিনের পদোন্নতি ও ক্ষমতার ভিত্তি ছিল স্থানীয় রাজনৈতিক নেতাদের সঙ্গে সমন্বয়। তিনি জেলা-প্রীতি ও স্বজনপ্রীতি কাজে লাগিয়ে বিভিন্ন প্রকল্পের টেন্ডার ও নিয়োগ প্রক্রিয়ায় প্রভাব বিস্তার করেছেন। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, “এটি শুধু একটি কর্মকর্তার ক্ষমতা নয়, বরং প্রশাসনের ভেতরে শক্তিশালী সিন্ডিকেটের প্রমাণ।”
এছাড়া জানা গেছে, আউয়াল ও তার সমর্থকরা সংস্থার গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পগুলোতে প্রভাবশালী ঠিকাদারদের নিয়োগ ও অর্থের বিনিময় নিয়ন্ত্রণ করেছেন। এর ফলে সরকারি প্রকল্পে স্বচ্ছতা কমে গেছে এবং কর্মকর্তা ও সাধারণ কর্মচারীদের মধ্যে অসন্তোষ বাড়ছে।
প্রকল্প ও অর্থের অস্বচ্ছতা : আউয়ালের সময়কালে বিভিন্ন সরকারি প্রকল্পের টেন্ডার ও বাস্তবায়ন প্রক্রিয়ায় অস্বচ্ছতা দেখা দিয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, এই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে কোটি কোটি টাকা আত্মসাত করা হয়েছে। কর্মকর্তারা বলছেন, এমন পরিস্থিতি সংস্থার নীতি ও জনস্বাস্থ্য প্রকল্পের কার্যকারিতা উভয়কেই হুমকির মুখে ফেলেছে।
পদোন্নতি ও শৃঙ্খলার জন্য দাবি : সংস্থার ভুক্তভোগী কর্মকর্তা ও সাধারণ কর্মচারীরা সরকারের কাছে দাবি জানিয়েছেন, আউয়ালের নিয়োগ প্রক্রিয়া তদারকি ও তদন্ত করা হোক। তারা বলছেন, “একজন বিতর্কিত ও দুর্নীতিগ্রস্ত কর্মকর্তাকে সংস্থার প্রধান পদে বসানো মানে প্রশাসনিক শৃঙ্খলা ভেঙে ফেলা।”
তাদের বক্তব্য, যথাযথ তদন্ত ও শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ না হলে সংস্থার কার্যক্রমে অনিয়ম ও দুর্নীতির জোয়ার বাড়বে। এছাড়া, অন্যান্য যোগ্য ও জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তারা হতাশা ও অনুশোচনার মুখে পড়বেন, যা সরকারি চাকরির নৈতিক ও প্রশাসনিক মানকে প্রভাবিত করবে।
জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মো. আবদুল আউয়ালের এই নিয়োগ কেবল একটি কর্মকর্তা বিষয়ক ঘটনা নয়, এটি প্রশাসনিক দুর্নীতি, সিন্ডিকেট এবং শৃঙ্খলা ভঙ্গের একটি বড় উদাহরণ। কর্মকর্তা ও সাধারণ কর্মচারীরা সরকারের কাছে স্বচ্ছ তদন্ত ও যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়ে আসছেন।
প্রকল্পের স্বচ্ছতা, কর্মকর্তাদের ন্যায্য অধিকার এবং প্রশাসনিক শৃঙ্খলা নিশ্চিত করা না হলে, এটি শুধু একটি সংস্থার সমস্যা নয়, বরং সমগ্র সরকারি প্রশাসনিক ব্যবস্থার জন্যও সংকট তৈরি করতে পারে।

Tag :

আপনার মতামত লিখুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল ও অন্যান্য তথ্য সঞ্চয় করে রাখুন

আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

কালবৈশাখীর আঘাতে ক্ষতবিক্ষত বালিয়াডাঙ্গী

৫ কোটি টাকায় প্রধান প্রকৌশলীর চেয়ারে আউয়াল

আপডেট সময় ০২:৩৪:৪৩ অপরাহ্ন, সোমবার, ২৪ নভেম্বর ২০২৫

জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের (পিডব্লিউডি) তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মো. আবদুল আউয়াল সম্প্রতি প্রধান প্রকৌশলীর (রুটিন দায়িত্ব) চেয়ারে বসানোর মাধ্যমে নতুনভাবে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে এসেছে। সরকারি নিয়োগ বিধিমালা অনুযায়ী, কর্মকর্তাদের সাধারণত নিজ জেলার বাইরে বদলি হওয়ার নিয়ম থাকা সত্ত্বেও আউয়াল দীর্ঘ সময় ধরে নিজের এলাকায় বহাল তবিয়তে ছিলেন। ক্ষমতার পালাবদল ও সরকারের পরিবর্তনের পরও তার প্রভাব কমেনি; বরং অর্ন্তর্বতী সরকারের আমলেও সচিব পর্যায়ের আশীর্বাদে তিনি আরও প্রভাবশালী হয়ে উঠেছেন।
পদোন্নতি ও জ্যেষ্ঠতা লঙ্ঘন : আউয়াল জ্যেষ্ঠতার তালিকায় চতুর্থ স্থানে থাকা সত্ত্বেও তিন সিনিয়র কর্মকর্তাকে পেছনে ফেলে প্রধান প্রকৌশলীর দায়িত্বে বসেছেন। সংশ্লিষ্ট সূত্র ও ভুক্তভোগী কর্মকর্তাদের অভিযোগ, এই পদটি দখলে নিতে প্রায় পাঁচ কোটি টাকার অবৈধ লেনদেন হয়েছে। এমনকি নিয়োগ প্রক্রিয়ায় বাধ্যতামূলক জাতীয় নিরাপত্তা গোয়েন্দা (এনএসআই) মূল্যায়ন প্রতিবেদন যাচাই করা হয়নি। সরকারি নিয়োগ বিধির স্পষ্ট লঙ্ঘন হলেও, বিষয়টি কোনো তদারকি বা শৃঙ্খলাপূর্ণ তদন্তের মুখ দেখেনি।
সরকারি কর্মকর্তা ও ভুক্তভোগীদের মতে, আউয়াল দীর্ঘদিন ধরে নিজের এলাকায় শক্তিশালী অবস্থান বজায় রেখে প্রশাসন ও রাজনীতির প্রভাবকে কাজে লাগিয়ে পদোন্নতির ক্ষেত্রে নিজের সুবিধা নিশ্চিত করেছেন।
স্থানীয় এমপি ও সিন্ডিকেটের প্রভাব : তদন্ত ও সূত্র অনুসারে, আউয়ালের প্রভাব বিস্তারে স্থানীয় এমপি এবং প্রভাবশালী রাজনৈতিক নেতাদের সমন্বয় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। নরসিংদী ও ময়মনসিংহে দায়িত্বকালীন সময়ে তিনি নির্বাহী প্রকৌশলী থেকে তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী পর্যন্ত পদায়ন নিশ্চিত করেছেন। এসময় টেন্ডার বাণিজ্য ও কমিশনের মাধ্যমে বিপুল অর্থ আত্মসাতের অভিযোগও রয়েছে। বিশেষ করে ওই সময়ের এমপি আব্দুস সাত্তারের প্রভাবে কোনো অনুসন্ধান শুরু হয়নি, যা প্রকল্পের স্বচ্ছতা ও নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থাকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে।
সিলেট বিভাগে সংক্ষেপে বদলি হলেও আউয়াল কৌশলে পুনরায় ময়মনসিংহে ফিরে আসেন এবং প্রায় পাঁচ বছর ধরে একই সার্কেলে আধিপত্য বিস্তার করে চলেছেন। সরকারি চাকরিতে এক স্টেশনে এমন দীর্ঘস্থায়ী অবস্থান বিরল হলেও, আউয়ালের ক্ষেত্রে এটি দীর্ঘসময় ধরে ধরা পড়েছে।
প্রশাসনিক সমর্থন ও অর্ন্তর্বতী সরকারের সময় : বর্তমান অর্ন্তর্বতী সরকারের আমলেও আউয়ালের ক্ষমতা কমেনি। অভিযোগ আছে, স্থানীয় সরকার বিভাগের সচিব রেজাউল মাকছুদ জাহেদীর সঙ্গে জেলা-প্রীতি ও সখ্যতার সুবাদে তিনি নতুন সিন্ডিকেট গড়ে তুলেছেন। এই প্রভাব ও সম্পর্ক কাজে লাগিয়ে তিনি জ্যেষ্ঠতা লঙ্ঘন করে প্রধান প্রকৌশলীর চেয়ারে বসতে সক্ষম হয়েছেন।
উপজেলা ও জেলা পর্যায়ের কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলাপচারিতায় জানা যায়, আউয়াল কর্তৃক গঠিত সিন্ডিকেটের মাধ্যমে সরকারি প্রকল্পের বিভিন্ন দফতরে নিয়ন্ত্রণ ও অর্থের বিনিময় কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। কর্মকর্তারা বলছেন, “এ ধরনের সিন্ডিকেট সরকার ও স্থানীয় প্রশাসনের মধ্যে অনিয়মের একটি বিশাল চক্র তৈরি করেছে। একজন কর্মকর্তার প্রভাব এতদূর বিস্তার করা মানে পুরো ব্যবস্থার শৃঙ্খলা ভেঙে দেওয়া।”
সম্পদ ও বেনামি ব্যবসা : আউয়ালের বিরুদ্ধে অভিযোগ আছে, তিনি নিজের কথিত ভাতিজাকে সামনে রেখে ঠিকাদারি ব্যবসা পরিচালনা করছেন। এই ব্যবসার মাধ্যমে সরকারি প্রকল্পের কোটি কোটি টাকা আত্মসাত করা হয়েছে। দেশে এবং বিদেশে নামে-বেনামে সম্পদের পাহাড় গড়ে তুলেছেন।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, আউয়ালের এই সম্পদ অর্জন শুধুমাত্র সরকারি প্রকল্পের মাধ্যমে নয়, বরং তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলীর দায়িত্বকালীন সময়ে বিভিন্ন নকশা ও টেন্ডার বাণিজ্যে প্রভাব প্রয়োগের মাধ্যমে হয়েছে। তারা বলছেন, “যদি এই ধরনের অনিয়ম ও দুর্নীতি নিয়মিত হয়, তবে সংস্থার নাম এবং জনস্বাস্থ্যের প্রকল্প দুটোই ক্ষতিগ্রস্ত হয়।”
অভ্যন্তরীণ অসন্তোষ ও প্রশাসনিক প্রতিক্রিয়া : জ্যেষ্ঠতা ও যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও তিন সিনিয়র কর্মকর্তাকে বঞ্চিত করে আউয়ালকে প্রধান প্রকৌশলীর দায়িত্ব দেওয়ায় অধিদপ্তরের অভ্যন্তরে চরম অসন্তোষ বিরাজ করছে। কর্মকর্তারা বলছেন, এনএসআই ক্লিয়ারেন্স ছাড়া এবং বিপুল অর্থের বিনিময়ে এই নিয়োগ প্রক্রিয়া প্রশাসনিক শৃঙ্খলার জন্য মারাত্মক হুমকি।
কর্মকর্তারা অভিযোগ করছেন, “এভাবে একজন বিতর্কিত ও দুর্নীতিগ্রস্ত কর্মকর্তাকে সংস্থার প্রধান পদে বসানো মানে প্রশাসনিক সংস্কার ও শৃঙ্খলার ওপর বড় আঘাত।” তারা আরও বলছেন, এই পদোন্নতি একদিকে যেমন দুর্নীতির জন্য উদাহরণ স্থাপন করছে, অন্যদিকে অন্য যোগ্য কর্মকর্তাদের জন্য হতাশার কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে।
বিশেষজ্ঞ ও সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য : সরকারি নিয়োগ ব্যবস্থার অভ্যন্তরে দীর্ঘদিন কাজ করা একজন বিশেষজ্ঞ বলছেন, “প্রকল্প বাস্তবায়ন ও সরকারি চাকরিতে এই ধরনের সিন্ডিকেটের প্রভাব স্থাপন হলে সংস্থার নীতি এবং জনস্বাস্থ্য প্রকল্পের লক্ষ্য উভয়ই বিপন্ন হয়। এনএসআই ক্লিয়ারেন্স ছাড়া পদোন্নতি দেওয়া মানে সরকারি নিয়োগ বিধির মৌলিক লঙ্ঘন।”
তাঁর মতে, প্রশাসনিক শৃঙ্খলা ঠিক রাখার জন্য স্বচ্ছতা ও নিয়মাবলী কঠোরভাবে প্রয়োগ করা প্রয়োজন। “যদি কেউ প্রভাব ও অর্থের মাধ্যমে পদোন্নতি পায়, তবে সেটি শুধু একজন কর্মকর্তার দুর্নীতিই নয়, পুরো সরকারি ব্যবস্থার উপর আস্থা কমিয়ে দেয়।”
বর্তমান পরিস্থিতি ও অনুসন্ধানী প্রচেষ্টা : অধিদপ্তরের সাধারণ কর্মচারীরা দাবি করেছেন, আউয়ালের বিরুদ্ধে যথাযথ তদন্ত ও ব্যবস্থা গ্রহণ করা প্রয়োজন। তারা বলছেন, “আমরা চাইছি সংস্থার শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে এবং দুর্নীতিমুক্ত প্রশাসন নিশ্চিত করতে সরকার সঠিক পদক্ষেপ নিক।”
স্থানীয় প্রশাসনিক সূত্র জানিয়েছে, আউয়ালের বিষয়টি নিয়ে উচ্চপর্যায়ের বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে। তবে এখনও কোনো আনুষ্ঠানিক তদন্ত বা ঘোষণা হয়নি। অনেক কর্মকর্তা মনে করছেন, তড়িৎ তদন্ত ও স্বচ্ছতা ছাড়া পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠবে।
স্থানীয় প্রশাসনের অভ্যন্তরে সিন্ডিকেটের প্রভাব : আউয়ালের দীর্ঘদিনের পদোন্নতি ও ক্ষমতার ভিত্তি ছিল স্থানীয় রাজনৈতিক নেতাদের সঙ্গে সমন্বয়। তিনি জেলা-প্রীতি ও স্বজনপ্রীতি কাজে লাগিয়ে বিভিন্ন প্রকল্পের টেন্ডার ও নিয়োগ প্রক্রিয়ায় প্রভাব বিস্তার করেছেন। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, “এটি শুধু একটি কর্মকর্তার ক্ষমতা নয়, বরং প্রশাসনের ভেতরে শক্তিশালী সিন্ডিকেটের প্রমাণ।”
এছাড়া জানা গেছে, আউয়াল ও তার সমর্থকরা সংস্থার গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পগুলোতে প্রভাবশালী ঠিকাদারদের নিয়োগ ও অর্থের বিনিময় নিয়ন্ত্রণ করেছেন। এর ফলে সরকারি প্রকল্পে স্বচ্ছতা কমে গেছে এবং কর্মকর্তা ও সাধারণ কর্মচারীদের মধ্যে অসন্তোষ বাড়ছে।
প্রকল্প ও অর্থের অস্বচ্ছতা : আউয়ালের সময়কালে বিভিন্ন সরকারি প্রকল্পের টেন্ডার ও বাস্তবায়ন প্রক্রিয়ায় অস্বচ্ছতা দেখা দিয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, এই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে কোটি কোটি টাকা আত্মসাত করা হয়েছে। কর্মকর্তারা বলছেন, এমন পরিস্থিতি সংস্থার নীতি ও জনস্বাস্থ্য প্রকল্পের কার্যকারিতা উভয়কেই হুমকির মুখে ফেলেছে।
পদোন্নতি ও শৃঙ্খলার জন্য দাবি : সংস্থার ভুক্তভোগী কর্মকর্তা ও সাধারণ কর্মচারীরা সরকারের কাছে দাবি জানিয়েছেন, আউয়ালের নিয়োগ প্রক্রিয়া তদারকি ও তদন্ত করা হোক। তারা বলছেন, “একজন বিতর্কিত ও দুর্নীতিগ্রস্ত কর্মকর্তাকে সংস্থার প্রধান পদে বসানো মানে প্রশাসনিক শৃঙ্খলা ভেঙে ফেলা।”
তাদের বক্তব্য, যথাযথ তদন্ত ও শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ না হলে সংস্থার কার্যক্রমে অনিয়ম ও দুর্নীতির জোয়ার বাড়বে। এছাড়া, অন্যান্য যোগ্য ও জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তারা হতাশা ও অনুশোচনার মুখে পড়বেন, যা সরকারি চাকরির নৈতিক ও প্রশাসনিক মানকে প্রভাবিত করবে।
জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মো. আবদুল আউয়ালের এই নিয়োগ কেবল একটি কর্মকর্তা বিষয়ক ঘটনা নয়, এটি প্রশাসনিক দুর্নীতি, সিন্ডিকেট এবং শৃঙ্খলা ভঙ্গের একটি বড় উদাহরণ। কর্মকর্তা ও সাধারণ কর্মচারীরা সরকারের কাছে স্বচ্ছ তদন্ত ও যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়ে আসছেন।
প্রকল্পের স্বচ্ছতা, কর্মকর্তাদের ন্যায্য অধিকার এবং প্রশাসনিক শৃঙ্খলা নিশ্চিত করা না হলে, এটি শুধু একটি সংস্থার সমস্যা নয়, বরং সমগ্র সরকারি প্রশাসনিক ব্যবস্থার জন্যও সংকট তৈরি করতে পারে।