দুর্নীতি, অনিয়ম, আর ক্ষমতার অপব্যবহারের এক চরম দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন কৃষিবিদ ইনস্টিটিউশন অব বাংলাদেশ (কেআইবি)-এর প্রশাসক লে. কর্নেল (অব.) মো. আবদুর রব খান। সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী মাত্র ৯০ দিনের জন্য প্রশাসকের দায়িত্ব পেলেও, তিনি এক বছরেরও বেশি সময় ধরে পদে বহাল রয়েছেন। সংগঠনের সদস্যদের অভিযোগ—এই সময়ের মধ্যে তিনি প্রতিষ্ঠানটিকে স্বজনপ্রীতি, আর্থিক অনিয়ম ও ক্ষমতার অপব্যবহারের অভয়ারণ্যে পরিণত করেছেন। কৃষিবিদদের পেশাজীবী সংগঠন কেআইবি দীর্ঘদিন ধরেই একটি জাতীয় মর্যাদাপূর্ণ প্রতিষ্ঠান হিসেবে পরিচিত। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে এই প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরে যা ঘটছে, তাতে ক্ষোভে ফুঁসছে সদস্যরা। ক্ষমতার দাপটে এবং প্রশাসনিক কৌশলে প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রম নিজের নিয়ন্ত্রণে রেখে একতরফাভাবে সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন আবদুর রব। অভিযোগ উঠেছে—চাকরি, অনুমোদন, প্রকল্প এবং এমনকি নির্বাচনী প্রক্রিয়াও টাকার বিনিময়ে পরিচালিত হচ্ছে।
অভিযোগের পাহাড় :
“টাকা দিলেই মেলে চাকরি” :
গতকাল মঙ্গলবার এক সংবাদ সম্মেলনে “এগ্রিকালচারিষ্ট অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (এ্যাব)” নামের সংগঠনটির নেতারা অভিযোগ করেন, আবদুর রব খান প্রশাসকের পদ ব্যবহার করে কেআইবিতে নিয়োগ, আর্থিক অনুমোদন ও প্রকল্প বিতরণে বড় ধরনের অনিয়ম করছেন। তারা বলেন, “এখন কেআইবি মানেই দুর্নীতি ও কমিশনের লেনদেন। টাকা দিলে চাকরি মেলে, না দিলে মেলে না।” সংগঠনের সদস্য সচিব শাহদাত হোসেন বিপ্লব বলেন, “প্রশাসক দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকে প্রতিষ্ঠানটির প্রশাসনিক কর্মকাণ্ডে কোনো স্বচ্ছতা বা জবাবদিহিতা নেই। সবকিছু চলছে ব্যক্তিগত প্রভাব ও রাজনৈতিক আনুগত্যের ভিত্তিতে।” তার ভাষায়, “এই প্রশাসক কেআইবিকে নিজের ব্যক্তিগত স্বার্থে ব্যবহার করছেন। আত্মীয়-স্বজন ও একটি ইসলামী রাজনৈতিক দলের অনুসারীদের বিভিন্ন পদে বসিয়ে দিচ্ছেন। এভাবে একটি পেশাজীবী সংগঠনকে রাজনৈতিকভাবে ব্যবহার করা হচ্ছে, যা সম্পূর্ণ বেআইনি।”
গঠনতন্ত্র লঙ্ঘন ও একতরফা নির্বাচন কমিশন গঠন :
অভিযোগের বড় অংশ জুড়ে রয়েছে নির্বাচন কমিশন গঠন ও তফসিল ঘোষণার বিষয়টি। এ্যাবের অভিযোগ—প্রশাসক আবদুর রব খান সদস্যদের সঙ্গে কোনো পরামর্শ ছাড়াই একতরফাভাবে নির্বাচন কমিশন গঠন করেছেন এবং জানুয়ারি মাসে নির্বাচন তফসিল ঘোষণা করেছেন। তারা দাবি করেন, এই তফসিল ঘোষণার মাধ্যমে মূলত একটি বিশেষ গোষ্ঠিকে সুবিধা দেওয়ার চেষ্টা করছেন প্রশাসক। শাহদাত হোসেন বিপ্লব বলেন, “আমরা কেআইবির সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও গণতান্ত্রিক নির্বাচন চাই। কিন্তু প্রশাসকের পদে থেকে তিনি যে নির্বাচন আয়োজন করছেন, তা কেবল তার নিজস্ব স্বার্থ রক্ষার প্রচেষ্টা।” কেআইবির বহু সিনিয়র সদস্য প্রশ্ন তুলেছেন—জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগ মুহূর্তে কেন জানুয়ারিতেই কেআইবির নির্বাচন ঘোষণা করা হলো? অনেকের ধারণা, রাজনৈতিক সুবিধা নেওয়ার জন্যই এই সময় নির্বাচন আয়োজন করা হচ্ছে।
আইনি বৈধতা নিয়েও প্রশ্ন :
২০২৫ সালের ২০ জানুয়ারি সমাজসেবা অধিদপ্তর থেকে লে. কর্নেল (অব.) মো. আবদুর রব খানকে ৯০ দিনের জন্য প্রশাসক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। শর্ত ছিল, এই সময়ের মধ্যেই কেআইবির গঠনতন্ত্র অনুযায়ী নির্বাচন সম্পন্ন করে নির্বাচিত কমিটির কাছে দায়িত্ব হস্তান্তর করতে হবে। কিন্তু নয় মাস পেরিয়ে গেলেও প্রশাসক দায়িত্ব ছাড়েননি। বরং মেয়াদোত্তীর্ণ অবস্থায় থেকেই বিভিন্ন সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন, যা আইনি দিক থেকেও প্রশ্নবিদ্ধ। সমাজসেবা অধিদপ্তরের একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “প্রশাসকের দায়িত্ব নির্দিষ্ট সময়ের জন্যই দেওয়া হয়েছিল। সেই সময় শেষ হলেও এখনো তিনি দায়িত্বে রয়েছেন, যা প্রশাসনিক শৃঙ্খলার পরিপন্থী।”
দুর্নীতির নানামুখী অভিযোগ :
কেআইবির আর্থিক হিসাব, নিয়োগ প্রক্রিয়া এবং প্রকল্প অনুমোদনে অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে একাধিকবার। সদস্যদের অভিযোগ—প্রশাসক দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে বিভিন্ন কর্মসূচি ও অনুষ্ঠান আয়োজনের নামে লাখ লাখ টাকা ব্যয় দেখানো হয়েছে, কিন্তু তার যথাযথ হিসাব পাওয়া যায়নি। কিছু সিনিয়র সদস্য বলেন, “প্রতিবারই তিনি হিসাব চাওয়ার পর কৌশলে সময়ক্ষেপণ করেন। এমনকি কিছু খরচের ভাউচারও জাল বলে সন্দেহ করা হচ্ছে।” অভিযোগ সূত্রে জানা যায়, কেআইবির ভবনের ভাড়ার আয়, সদস্য চাঁদা, দাতা সংস্থার অনুদানসহ মোট কয়েক কোটি টাকার আর্থিক লেনদেন হয় প্রতিবছর। কিন্তু প্রশাসক দায়িত্ব নেওয়ার পর সেই অর্থের একটি বড় অংশ অজানা খাতে স্থানান্তর হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
বিক্ষোভে উত্তাল কেআইবি প্রাঙ্গণ :
সম্প্রতি রাজধানীর খামারবাড়ি এলাকায় কেআইবি ভবনের সামনে শতাধিক কৃষিবিদ সদস্য বিক্ষোভ করেন। তারা প্রশাসক আবদুর রব খানের পদত্যাগ দাবি করে স্লোগান দেন এবং ঘোষণা দেন, “দুর্নীতিবাজ প্রশাসক হটাও, কেআইবি বাঁচাও।” বিক্ষোভে অংশ নেওয়া কৃষিবিদ ড. সেলিম মজুমদার বলেন, “কেআইবি আমাদের পেশার মর্যাদা রক্ষার প্রতীক ছিল। আজ এটি এক ব্যক্তির হাতে বন্দি হয়ে পড়েছে। প্রশাসক নিজের ক্ষমতা ব্যবহার করে যেভাবে সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন, তা একনায়কতন্ত্র ছাড়া কিছু নয়।” অন্য এক সদস্য বলেন, “আমরা প্রশাসক চাইনি, আমরা নির্বাচন চেয়েছিলাম। সমাজসেবা অধিদপ্তর সুষ্ঠু নির্বাচন করার জন্য প্রশাসক বসিয়েছিল, কিন্তু এখন সেই প্রশাসকই নির্বাচনের পথে বাধা।”
প্রশাসক লে. কর্নেল (অব.) মো. আবদুর রব খানের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলে তার মুঠোফোনে একাধিকবার কল দেওয়া হলেও তিনি রিসিভ করেননি। তবে তার ঘনিষ্ঠ সূত্রগুলো জানিয়েছে, “সব কার্যক্রমই প্রতিষ্ঠানের নিয়ম মেনে হয়েছে, এবং নির্বাচনের আয়োজন স্বচ্ছভাবে সম্পন্ন করার চেষ্টা চলছে।” একজন ঘনিষ্ঠ সহযোগী বলেন, “প্রশাসক চাইলে আরও আগে নির্বাচন দিতে পারতেন, কিন্তু সদস্য তালিকা ও গঠনতান্ত্রিক জটিলতার কারণে কিছুটা সময় লেগেছে। এখন নির্বাচন কমিশন গঠন করা হয়েছে নিয়ম অনুযায়ী।” তবে এই ব্যাখ্যা কেআইবির সদস্যদের ক্ষোভ প্রশমিত করতে পারেনি। বরং অনেকে মনে করছেন, এই বক্তব্য দিয়ে প্রশাসক সময়ক্ষেপণ করছেন এবং নির্বাচনের নামে প্রভাব বিস্তারের নতুন খেলা শুরু করেছেন।
দীর্ঘ ১৭ বছরের স্থবিরতা :
কেআইবির ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, প্রায় ১৭ বছর ধরে এই সংগঠনটি কার্যকর নির্বাচন ছাড়াই পরিচালিত হচ্ছে। বিগত সময়ে বিভিন্ন সরকারঘনিষ্ঠ নেতৃত্ব কৌশলে সংগঠনটি দখলে রাখে। এক সময় রাজনৈতিক অস্থিরতা ও দলীয় বিভাজনের কারণে কেআইবির কার্যক্রম প্রায় অচল হয়ে পড়ে। স্বৈরাচার পতনের পর সদস্যরা আশা করেছিলেন, সমাজসেবা অধিদপ্তরের হস্তক্ষেপে কেআইবিতে গণতন্ত্র ফিরবে। কিন্তু আবদুর রব খানের নিয়োগের পর সেই আশার আলো ম্লান হয়ে গেছে। একজন জ্যেষ্ঠ কৃষিবিদ বলেন, “আমরা ভেবেছিলাম, অন্তত এবার নির্বাচনের মাধ্যমে সদস্যদের মতামত প্রতিফলিত হবে। কিন্তু যা হচ্ছে তা উল্টো—একজন অবসরপ্রাপ্ত সামরিক কর্মকর্তার হাতে কেআইবি জিম্মি হয়ে পড়েছে।” কেআইবির সদস্যরা ইতোমধ্যে সমাজসেবা অধিদপ্তর এবং কৃষি মন্ত্রণালয়ের কাছে প্রশাসকের বিরুদ্ধে লিখিত অভিযোগ জমা দিয়েছেন। তারা দাবি করেছেন, দ্রুত একটি নিরপেক্ষ তদন্ত কমিটি গঠন করা হোক, যাতে আর্থিক অনিয়ম ও ক্ষমতার অপব্যবহারের বিষয়গুলো যাচাই করা যায়। এ্যাবের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, “আমরা চাই না প্রতিষ্ঠানটির ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত হোক। কিন্তু প্রশাসক যদি নিজের অবস্থান ব্যবহার করে কেআইবিকে দুর্নীতির আখড়ায় পরিণত করেন, তাহলে আমরা আন্দোলনে যেতে বাধ্য হবো।”
বিষয়টি শুধু একটি সংগঠনের নয়, এটি পেশাজীবী গণতন্ত্রের প্রশ্ন বলেও মনে করছেন অনেক বিশেষজ্ঞ। প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণের নামে যদি কোনো সংগঠনে স্বৈরাচারী কর্তৃত্ব কায়েম হয়, তবে সেটি গোটা পেশাজীবী সমাজের জন্যই উদ্বেগজনক। প্রখ্যাত প্রশাসন বিশ্লেষক ড. মাহমুদুল হাসান বলেন, “যখন প্রশাসনিক পদ সাময়িকভাবে দেওয়া হয়, সেটির উদ্দেশ্য থাকে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা, ক্ষমতা নয়। কিন্তু যদি সেই পদ ক্ষমতার উৎসে পরিণত হয়, তখন সেটি স্বচ্ছতা ও গণতন্ত্রের জন্য হুমকি।” তিনি আরও বলেন, “এ ধরনের ঘটনা সমাজসেবা অধিদপ্তরের তদারকির দুর্বলতাকেও স্পষ্ট করে। এখনই যদি কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া না হয়, ভবিষ্যতে এ ধরনের প্রতিষ্ঠানগুলো দুর্নীতির কেন্দ্র হয়ে উঠবে।”
প্রায় ৩৫ হাজার কৃষিবিদ সদস্যের এই জাতীয় সংগঠনটি আজ প্রশাসনিক জটিলতায় জর্জরিত। সদস্যরা আশঙ্কা করছেন, যদি দ্রুত স্বচ্ছ নির্বাচন না হয়, তবে সংগঠনের অস্তিত্বই হুমকির মুখে পড়বে। “আমরা প্রশাসকের নয়, নির্বাচিত কমিটির নেতৃত্ব চাই,”—বলেছেন এ্যাবের সভাপতি ড. কামরুল ইসলাম। তার মতে, “কেআইবি কেবল একটি প্রতিষ্ঠান নয়, এটি আমাদের পেশাগত মর্যাদা ও ঐক্যের প্রতীক। যদি এখানেও দুর্নীতি ও স্বজনপ্রীতির রাজত্ব চলে, তাহলে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কৃষিবিদদের কাছে কী বার্তা যাবে?” তিনি সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করে বলেন, “আমরা চাই সমাজসেবা অধিদপ্তর অবিলম্বে ব্যবস্থা নিক। প্রশাসককে দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দিয়ে নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধানে নির্বাচন আয়োজন করুক।” এদিকে কেআইবির ভবনপ্রাঙ্গণে প্রতিদিনই সদস্যদের সমাবেশে উঠছে একই স্লোগান- দুর্নীতিবাজ প্রশাসক হটাও, কেআইবি বাঁচাও!”
কেআইবির প্রশাসক লে. কর্নেল (অব.) মো. আবদুর রব খানের বিরুদ্ধে যে অভিযোগগুলো উঠেছে, তা শুধু একটি প্রতিষ্ঠানের নয়, বরং পেশাগত জবাবদিহিতার সংকটের প্রতিচ্ছবি। সমাজসেবা অধিদপ্তর যদি দ্রুত উদ্যোগ না নেয়, তাহলে দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পেশাজীবী সংগঠনটি আরও গভীর অনিশ্চয়তার দিকে যাবে। কৃষিবিদদের আশা অতীতের গ্লানি মুছে, কেআইবিতে আবার ফিরবে স্বচ্ছতা, গণতন্ত্র ও সদস্যদের আস্থা।
নিজস্ব প্রতিবেদক 



















