ঢাকা ০৯:৫২ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ১১ অগাস্ট ২০২৬, ২৭ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম ::
ভাগ্নি-জামাই-ভাগিনা’দের দাপটে সক্রিয় আওয়ামী দুর্নীতিবাজরা দক্ষিণ আফ্রিকায় পরিত্যক্ত খনিতে ঢুকে ১৪ জনের মৃত্যু আউটসোর্সিং ঠিকাদার প্রথা বাতিল না হলে শ্রমিকদের অধিকার নিশ্চিত হবে না: শিমুল বিশ্বাস মির্জাপুরে নবাগত ইউএনও হিসেবে জহিরুল আলমের যোগদান ৩ জন বিশিষ্ট শিক্ষাবিদকে পবিপ্রবি’র রিজেন্ট বোর্ডের সদস্য মনোনয়ন দিলেন চ্যান্সেলর আদিতমারীতে সার আইন লঙ্ঘনে ২ ব্যবসায়ীকে জরিমানা ৫ মাদরাসায় শতভাগ ফেল করায় সিসিটিভিকে দায়ী করলেন অধ্যক্ষ কম্ব্যাট পাইলট হয়ে দেশ ও জাতির সেবা করতে চায় জুয়ারিয়া ১৮ আগস্ট থেকে কুমিল্লায় মাদকের বিরুদ্ধে কঠোর অভিযান, ‘কাউকে ছাড় নয়’ ধামরাইয়ে রাইস মিল ও ৩ মিষ্টির দোকানকে ৮০ হাজার টাকা জরিমানা
স্বাস্থ্যখাতে আত্মীয়তার সিন্ডিকেট

ভাগ্নি-জামাই-ভাগিনা’দের দাপটে সক্রিয় আওয়ামী দুর্নীতিবাজরা

সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন বকুল স্বাস্থ্যমন্ত্রীর দায়িত্ব পাওয়ার পর পরই বলেছিলেন, এখন থেকে ডাক্তাররা রোগীদের পেছনে দৌড়াবে। তাঁর ওই ঘোষণা তাৎক্ষণিকভাবে চমক সৃষ্টি করলেও বাস্তবে এর কোনো প্রতিফলন তিনি দেখাতে পারেননি। কতটা বাস্তবায়ন করতে পেরেছেন এর জবাব তাঁর নিজের কাছেই নেই। দায়িত্ব গ্রহণের পাঁচ মাস পূর্তির পরে গত মাসের শেষের দিকে মন্ত্রী সাখাওয়াত হোসেনকে এর অগ্রগতি বিষয়ে প্রশ্ন করা হয়েছিল। কিন্তু তিনি কোনোই জবাব দিতে পারেননি। বরং উল্টো বেমালুম বলে ফেললেন, এটা অনেক পুরনো কথা!

আদতে স্বাস্থ্যখাতে পরিবর্তনের কোনো ছোঁয়া লাগেনি। এর কোনো চেষ্টাও তিনি করেননি। কিছু সারপ্রাইজ ভিজিটের মাধ্যমে চমক লাগানো কথাবার্তা বলে নিজের ব্যর্থতা ও সিন্ডিকেটের অপকর্ম ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করছেন মাত্র। এতে দেশের বা জনগণের বা সরকারেরও কোনো উপকার হচ্ছে না। স্বাস্থ্যখাতে পরিবর্তন বা উন্নতি আনতে হলে প্রতিটি স্তরে জবাবদিহীতার সিস্টেম প্রতিষ্ঠা বা প্রবর্তন করতে হবে। অতীতের দুর্নীতি ও দুর্নীতিবাজদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে। কিন্তু এসবের কোনো কিছুতেই হাত দেওয়া হয়নি। স্বাস্থ্যখাতের প্রতিটি রন্দ্রে রন্দ্রে আওয়ামী দুর্নীতির ছোঁয়া বিদ্যমান। আওয়ামী দুর্নীতিবাজরা বহাল তবিয়তে। তাদের বিরুদ্ধে কোনোই ব্যবস্থা নেয়া হয়নি। এ ব্যাপারে কোনো উদ্যোগও নেই। মন্ত্রী নিজেই বলেছেন, অতীতের হাজার হাজার কোটি টাকার দুর্নীতির বিরুদ্ধে তিনি কোনোই ব্যবস্থা নেবেন না, ব্যবস্থা নিতে রাজি নন। এ রকমের সময়ও তাঁর হাতে নেই।

তবে অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়কেন্দ্রিক নতুন সিন্ডিকেটের সঙ্গে মন্ত্রীর সংশ্লিষ্টতার তথ্য। ‘ভাগ্নি জামাই-ভাগিনা’ নামে গড়ে উঠা নতুন শক্তিশালী এই সিন্ডিকেটের মাত্রাতিরিক্ত অবৈধ প্রভাবের কারণেই মূলত: স্বাস্থ্যখাতের উন্নতি বা পরিবর্তন এখন অধরা। মন্ত্রীর আপন ভাগ্নি জামাই যুগ্মসচিব মুস্তাফিজুর রহমান এবং মুখ্যসচিবের কথিত ভাগিনা, সিএমএসডির পরিচালক মোহাম্মদ শফিউর রহমানের নেতৃত্বে এ সিন্ডিকেটটি গড়ে উঠেছে, যা সম্পর্কে তথ্য তুলে ধরা হয়েছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের উপরের দিকের দু’চারটি পদ ছাড়া অধিকাংশ পদে এখন পর্যন্ত আওয়ামী দুর্নীতিবাজরা সবাই বহাল-তবিয়তেই রয়েছেন। অবাক ব্যাপার হলো, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের আওয়ামী আমলের কুখ্যাত উপপরিচালক ডা. পরিমল ও ডা. শামসুজ্জামান সেলিমের চেয়ারে কোনো আচড় লাগেনি এই আমলেও। অন্য উপপরিচালক, সহকারী পরিচালক পদগুলোতেও পুরনো দুর্নীতিবাজ প্রায় সবাই বহাল রয়েছেন। অধিদপ্তরের বাইরের স্বাস্থ্যখাতের প্রায় সবগুলো প্রতিষ্ঠানেরই একই চিত্র। এমনকি নতুন যাদের প্রাইজ পোস্টিং দেওয়া হচ্ছে এরাও অধিকাংশই আওয়ামী দুর্নীতিবাজ বলে চিহ্নিত। এবং কেউ কেউ ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের বিরুদ্ধে মাঠে-ময়দানে সরাসরি ভূমিকা রেখেছেন বলেও প্রমাণাদি রয়েছে। সর্বশেষ গত ৩০ জুলাই জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউটে এ রকমেরই একজন অধ্যাপকের পদায়ন হয়েছে। যা নিয়ে আলোচনা-সমালোচনা চলছে। গত ১৭ বছরের পতিত আওয়ামী সরকারের অন্যতম সুবিধাভোগী, স্বাচিপের সক্রিয় কর্মী হিসেবে পরিচিত এবং দুনীতির দায়ে অভিযুক্ত অধ্যাপক ডা. মো. মোরশেদ আলমকে সম্প্রতি জাতীয় কিডনি হাসপাতাল থেকে বগুড়ায় শহীদ জিয়াউর রহমান কলেজে শাস্তিমূলক বদলি করা হয়েছিল। মোরশেদ আলমের ওই বদলিটি হয় গত ২২ জুন, ২০২৬। কিন্তু গত ৩০ জুলাই মন্ত্রণালয়ের দুর্নীতিবাজ সিন্ডিকেট মোটা অংকের অর্থের বিনিময়ে সেই বদলির আদেশ বাতিল করে তাকে রাজধানীর জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালে পদায়ন দিয়েছে।

আওয়ামী দুর্নীতিবাজ ঠিকাদার এমদাদ ও ঢালীর দৌরাত্ম্য
সারাদেশের হাসপাতালগুলোর এমএসআর সামগ্রী কেনাকাটাকে কেন্দ্র করে নতুন করে যেসব সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্য বেড়েছে তারমধ্যে অন্যতম হলেন মনিরুজ্জামান ঢালী, এমদাদ হোসেনসহ বেশ কয়েকজন। এদের প্রত্যেকেরই নামে-বেনামে একাধিক প্রতিষ্ঠান রয়েছে। এবং এরা সবাই আওয়ামী আমলের দুর্নীতিবাজ ঠিকাদার। মনিরুজ্জামান ঢালীর মালিকানাধীন এ পর্যন্ত ৮টি প্রতিষ্ঠানের নাম পাওয়া গেছে। এগুলো হলো ঢালী সাপ্লাই লিমিটেড, ঢালী করপোরেশন, আফাসি ফার্মা, ফরচুন মেডিকেল সিস্টেমস লিমিটেড, ওয়ার্ল্ড সার্জিকেল, আনিসা করপোরেশন, স্মার্ট মেডিকেল রিক্যুইজিট অ্যান্ড ফার্মা এবং ঈগন ইন্টারন্যাশনাল লিমিটেড। টেন্ডার জালিয়াতি ও ম্যানিপুলেশনের ক্ষেত্রে সবগুলো একত্রে ব্যবহার করা হয়। অভিযোগ রয়েছে, এই ঠিকাদার চক্রের সদস্যরা সরকারি হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগসাজশ করে টেন্ডারে পিই’র পাসওয়ার্ড নিজের কাছে নেন। এতে পুরো টেন্ডারটি তার নিয়ন্ত্রণে চলে যায়। অন্য কারো কাজ পাওয়ার সুযোগ থাকে না। অন্য দরদাতা ভালো দরপ্রস্তাব দাখিল করলেও তাদের টেন্ডার বাতিল হয়ে যায়।
জানা গেছে, দুর্নীতির দায়ে মনিরুজ্জামান ঢালীর মালিকানাধীন ঢালী কর্পোরেশন ইতিপূর্বে দুই বছরের জন্য কালো তালিকাভুক্ত হয়েছিল। তবুও ৫ আগস্ট, ২০২৪ ফ্যাসিবাদের বিদায়ের পর এই মনিরুজ্জামান ঢালী জয়পুরহাট সদর হাসপাতাল, ভোলা সদর হাসপাতাল, রাজবাড়ী সদর হাসপাতাল এবং জামালপুর সদর হাসপাতালে তার লুটতরাজ কায়েম করেন। এই অনিয়মের সঙ্গে জড়িত আছেন উল্লেখিত প্রতিষ্ঠানগুলোর তত্ত্বাবধায়ক, হিসাবরক্ষক ও স্টোরকিপার। রাজবাড়ী সদর হাসপাতালের ২০২৫-২০২৬ অর্থবছরের এমএসআর মালামাল ক্রয়ের দরপত্র বিশ্লেষণে বেরিয়ে এসেছে এক আশ্চর্য কৌশল। দরপত্র দাখিলের সময় ঢালী সিন্ডিকেটের ৫টি লাইসেন্সই দরপত্র দাখিল করে এবং দেখা যায়, এমএসআর ননি ডিসিএল মেডিসিনে সিরিয়ালি সর্বনিম্ন দরদাতা হয় ঢালী সিন্ডিকেটের ওই ৫টি প্রতিষ্ঠানই। এই জালিয়াতির মূল কৌশল হলো একটি অভিনব প্রক্রিয়া। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ শিডিউলে কিছু অস্বাভাবিক আইটেম রাখে যা সাধারণত ক্রয় করা হয় না। ঢালী সিন্ডিকেটকে এই আইটেমগুলোর বিষয়ে আগেই জানিয়ে দেওয়া হয়। তখন এই সিন্ডিকেট সেই অস্বাভাবিক আইটেমগুলোতে দর দাখিল করে না বা শূন্য দর দাখিল করে। এই দর দাখিল না করার মাধ্যমেই তারা কাগজে-কলমে সর্বনিম্ন দরদাতা হিসেবে বিবেচিত হয়। কিন্তু এই প্রক্রিয়াটি পিপিআর ২০০৬ এবং পিপিএ ২০০৮ আইনের সম্পূর্ণ লঙ্ঘন।

আরেক আওয়ামী দুর্নীতিবাজ ঠিকাদার এমদাদ হোসেনের তিনটি প্রতিষ্ঠানের নাম পাওয়া গেছে। এগুলো হলো, মেসার্স তাহসিন এন্টারপ্রাইজ, দি প্রফেশনাল বিজনেস বিল্ডার্স এবং এএইচএস প্রেসটিজ ট্রেড। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে নেত্রকোনা জেলা হাসপাতালের এমএসআর সামগ্রী ক্রয়ের টেন্ডারে এমদাদ হোসেনের এই প্রতিষ্ঠানই অংশ নিয়েছে। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের সঙ্গে এমদাদ হোসেনের আগে থেকেই বোঝাপড়া ছিল। আর তাই অন্য কারো কাজ পাওয়ার সুযোগ ছিল না। শুধু নেত্রকোনাই নয়, মাগুরা, পটুয়াখালী, মেহেরপুর, নড়াইল প্রভৃতি অনেক জেলা হাসপাতালেরই টেন্ডার কাজ বাগিয়ে নিয়েছেন আওয়ামী ঠিকাদার এমদাদ হোসেন। আওয়ামী লীগ আমলে শেরে বাংলা নগর এলাকার ত্রাস ছিলেন মহব্বত আলী। বর্তমানে তিনি ভারতে পলাতক। এই তাহসিন এন্টারপ্রাইজের মূল মালিক মহব্বত আলী। মহব্বত আলীই মূলতঃ ভারতে বসে তার সহযোগী এমদাদ হোসেনের মাধ্যমে ঠিকাদারি কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন। মন্ত্রণালয়ের সিন্ডিকেটের সঙ্গে মনিরুজ্জামান ঢালী এবং এমদাদ হোসেনদের যোগাযোগ আছে। মন্ত্রণালয়কে দিয়েই এরা হাসপাতালগুলোর কর্তৃপক্ষের ওপর প্রভাব বিস্তার করছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

Tag :

আপনার মতামত লিখুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল ও অন্যান্য তথ্য সঞ্চয় করে রাখুন

আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

ভাগ্নি-জামাই-ভাগিনা’দের দাপটে সক্রিয় আওয়ামী দুর্নীতিবাজরা

স্বাস্থ্যখাতে আত্মীয়তার সিন্ডিকেট

ভাগ্নি-জামাই-ভাগিনা’দের দাপটে সক্রিয় আওয়ামী দুর্নীতিবাজরা

আপডেট সময় ০৯:৪৫:২৭ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ১১ অগাস্ট ২০২৬

সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন বকুল স্বাস্থ্যমন্ত্রীর দায়িত্ব পাওয়ার পর পরই বলেছিলেন, এখন থেকে ডাক্তাররা রোগীদের পেছনে দৌড়াবে। তাঁর ওই ঘোষণা তাৎক্ষণিকভাবে চমক সৃষ্টি করলেও বাস্তবে এর কোনো প্রতিফলন তিনি দেখাতে পারেননি। কতটা বাস্তবায়ন করতে পেরেছেন এর জবাব তাঁর নিজের কাছেই নেই। দায়িত্ব গ্রহণের পাঁচ মাস পূর্তির পরে গত মাসের শেষের দিকে মন্ত্রী সাখাওয়াত হোসেনকে এর অগ্রগতি বিষয়ে প্রশ্ন করা হয়েছিল। কিন্তু তিনি কোনোই জবাব দিতে পারেননি। বরং উল্টো বেমালুম বলে ফেললেন, এটা অনেক পুরনো কথা!

আদতে স্বাস্থ্যখাতে পরিবর্তনের কোনো ছোঁয়া লাগেনি। এর কোনো চেষ্টাও তিনি করেননি। কিছু সারপ্রাইজ ভিজিটের মাধ্যমে চমক লাগানো কথাবার্তা বলে নিজের ব্যর্থতা ও সিন্ডিকেটের অপকর্ম ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করছেন মাত্র। এতে দেশের বা জনগণের বা সরকারেরও কোনো উপকার হচ্ছে না। স্বাস্থ্যখাতে পরিবর্তন বা উন্নতি আনতে হলে প্রতিটি স্তরে জবাবদিহীতার সিস্টেম প্রতিষ্ঠা বা প্রবর্তন করতে হবে। অতীতের দুর্নীতি ও দুর্নীতিবাজদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে। কিন্তু এসবের কোনো কিছুতেই হাত দেওয়া হয়নি। স্বাস্থ্যখাতের প্রতিটি রন্দ্রে রন্দ্রে আওয়ামী দুর্নীতির ছোঁয়া বিদ্যমান। আওয়ামী দুর্নীতিবাজরা বহাল তবিয়তে। তাদের বিরুদ্ধে কোনোই ব্যবস্থা নেয়া হয়নি। এ ব্যাপারে কোনো উদ্যোগও নেই। মন্ত্রী নিজেই বলেছেন, অতীতের হাজার হাজার কোটি টাকার দুর্নীতির বিরুদ্ধে তিনি কোনোই ব্যবস্থা নেবেন না, ব্যবস্থা নিতে রাজি নন। এ রকমের সময়ও তাঁর হাতে নেই।

তবে অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়কেন্দ্রিক নতুন সিন্ডিকেটের সঙ্গে মন্ত্রীর সংশ্লিষ্টতার তথ্য। ‘ভাগ্নি জামাই-ভাগিনা’ নামে গড়ে উঠা নতুন শক্তিশালী এই সিন্ডিকেটের মাত্রাতিরিক্ত অবৈধ প্রভাবের কারণেই মূলত: স্বাস্থ্যখাতের উন্নতি বা পরিবর্তন এখন অধরা। মন্ত্রীর আপন ভাগ্নি জামাই যুগ্মসচিব মুস্তাফিজুর রহমান এবং মুখ্যসচিবের কথিত ভাগিনা, সিএমএসডির পরিচালক মোহাম্মদ শফিউর রহমানের নেতৃত্বে এ সিন্ডিকেটটি গড়ে উঠেছে, যা সম্পর্কে তথ্য তুলে ধরা হয়েছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের উপরের দিকের দু’চারটি পদ ছাড়া অধিকাংশ পদে এখন পর্যন্ত আওয়ামী দুর্নীতিবাজরা সবাই বহাল-তবিয়তেই রয়েছেন। অবাক ব্যাপার হলো, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের আওয়ামী আমলের কুখ্যাত উপপরিচালক ডা. পরিমল ও ডা. শামসুজ্জামান সেলিমের চেয়ারে কোনো আচড় লাগেনি এই আমলেও। অন্য উপপরিচালক, সহকারী পরিচালক পদগুলোতেও পুরনো দুর্নীতিবাজ প্রায় সবাই বহাল রয়েছেন। অধিদপ্তরের বাইরের স্বাস্থ্যখাতের প্রায় সবগুলো প্রতিষ্ঠানেরই একই চিত্র। এমনকি নতুন যাদের প্রাইজ পোস্টিং দেওয়া হচ্ছে এরাও অধিকাংশই আওয়ামী দুর্নীতিবাজ বলে চিহ্নিত। এবং কেউ কেউ ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের বিরুদ্ধে মাঠে-ময়দানে সরাসরি ভূমিকা রেখেছেন বলেও প্রমাণাদি রয়েছে। সর্বশেষ গত ৩০ জুলাই জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউটে এ রকমেরই একজন অধ্যাপকের পদায়ন হয়েছে। যা নিয়ে আলোচনা-সমালোচনা চলছে। গত ১৭ বছরের পতিত আওয়ামী সরকারের অন্যতম সুবিধাভোগী, স্বাচিপের সক্রিয় কর্মী হিসেবে পরিচিত এবং দুনীতির দায়ে অভিযুক্ত অধ্যাপক ডা. মো. মোরশেদ আলমকে সম্প্রতি জাতীয় কিডনি হাসপাতাল থেকে বগুড়ায় শহীদ জিয়াউর রহমান কলেজে শাস্তিমূলক বদলি করা হয়েছিল। মোরশেদ আলমের ওই বদলিটি হয় গত ২২ জুন, ২০২৬। কিন্তু গত ৩০ জুলাই মন্ত্রণালয়ের দুর্নীতিবাজ সিন্ডিকেট মোটা অংকের অর্থের বিনিময়ে সেই বদলির আদেশ বাতিল করে তাকে রাজধানীর জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালে পদায়ন দিয়েছে।

আওয়ামী দুর্নীতিবাজ ঠিকাদার এমদাদ ও ঢালীর দৌরাত্ম্য
সারাদেশের হাসপাতালগুলোর এমএসআর সামগ্রী কেনাকাটাকে কেন্দ্র করে নতুন করে যেসব সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্য বেড়েছে তারমধ্যে অন্যতম হলেন মনিরুজ্জামান ঢালী, এমদাদ হোসেনসহ বেশ কয়েকজন। এদের প্রত্যেকেরই নামে-বেনামে একাধিক প্রতিষ্ঠান রয়েছে। এবং এরা সবাই আওয়ামী আমলের দুর্নীতিবাজ ঠিকাদার। মনিরুজ্জামান ঢালীর মালিকানাধীন এ পর্যন্ত ৮টি প্রতিষ্ঠানের নাম পাওয়া গেছে। এগুলো হলো ঢালী সাপ্লাই লিমিটেড, ঢালী করপোরেশন, আফাসি ফার্মা, ফরচুন মেডিকেল সিস্টেমস লিমিটেড, ওয়ার্ল্ড সার্জিকেল, আনিসা করপোরেশন, স্মার্ট মেডিকেল রিক্যুইজিট অ্যান্ড ফার্মা এবং ঈগন ইন্টারন্যাশনাল লিমিটেড। টেন্ডার জালিয়াতি ও ম্যানিপুলেশনের ক্ষেত্রে সবগুলো একত্রে ব্যবহার করা হয়। অভিযোগ রয়েছে, এই ঠিকাদার চক্রের সদস্যরা সরকারি হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগসাজশ করে টেন্ডারে পিই’র পাসওয়ার্ড নিজের কাছে নেন। এতে পুরো টেন্ডারটি তার নিয়ন্ত্রণে চলে যায়। অন্য কারো কাজ পাওয়ার সুযোগ থাকে না। অন্য দরদাতা ভালো দরপ্রস্তাব দাখিল করলেও তাদের টেন্ডার বাতিল হয়ে যায়।
জানা গেছে, দুর্নীতির দায়ে মনিরুজ্জামান ঢালীর মালিকানাধীন ঢালী কর্পোরেশন ইতিপূর্বে দুই বছরের জন্য কালো তালিকাভুক্ত হয়েছিল। তবুও ৫ আগস্ট, ২০২৪ ফ্যাসিবাদের বিদায়ের পর এই মনিরুজ্জামান ঢালী জয়পুরহাট সদর হাসপাতাল, ভোলা সদর হাসপাতাল, রাজবাড়ী সদর হাসপাতাল এবং জামালপুর সদর হাসপাতালে তার লুটতরাজ কায়েম করেন। এই অনিয়মের সঙ্গে জড়িত আছেন উল্লেখিত প্রতিষ্ঠানগুলোর তত্ত্বাবধায়ক, হিসাবরক্ষক ও স্টোরকিপার। রাজবাড়ী সদর হাসপাতালের ২০২৫-২০২৬ অর্থবছরের এমএসআর মালামাল ক্রয়ের দরপত্র বিশ্লেষণে বেরিয়ে এসেছে এক আশ্চর্য কৌশল। দরপত্র দাখিলের সময় ঢালী সিন্ডিকেটের ৫টি লাইসেন্সই দরপত্র দাখিল করে এবং দেখা যায়, এমএসআর ননি ডিসিএল মেডিসিনে সিরিয়ালি সর্বনিম্ন দরদাতা হয় ঢালী সিন্ডিকেটের ওই ৫টি প্রতিষ্ঠানই। এই জালিয়াতির মূল কৌশল হলো একটি অভিনব প্রক্রিয়া। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ শিডিউলে কিছু অস্বাভাবিক আইটেম রাখে যা সাধারণত ক্রয় করা হয় না। ঢালী সিন্ডিকেটকে এই আইটেমগুলোর বিষয়ে আগেই জানিয়ে দেওয়া হয়। তখন এই সিন্ডিকেট সেই অস্বাভাবিক আইটেমগুলোতে দর দাখিল করে না বা শূন্য দর দাখিল করে। এই দর দাখিল না করার মাধ্যমেই তারা কাগজে-কলমে সর্বনিম্ন দরদাতা হিসেবে বিবেচিত হয়। কিন্তু এই প্রক্রিয়াটি পিপিআর ২০০৬ এবং পিপিএ ২০০৮ আইনের সম্পূর্ণ লঙ্ঘন।

আরেক আওয়ামী দুর্নীতিবাজ ঠিকাদার এমদাদ হোসেনের তিনটি প্রতিষ্ঠানের নাম পাওয়া গেছে। এগুলো হলো, মেসার্স তাহসিন এন্টারপ্রাইজ, দি প্রফেশনাল বিজনেস বিল্ডার্স এবং এএইচএস প্রেসটিজ ট্রেড। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে নেত্রকোনা জেলা হাসপাতালের এমএসআর সামগ্রী ক্রয়ের টেন্ডারে এমদাদ হোসেনের এই প্রতিষ্ঠানই অংশ নিয়েছে। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের সঙ্গে এমদাদ হোসেনের আগে থেকেই বোঝাপড়া ছিল। আর তাই অন্য কারো কাজ পাওয়ার সুযোগ ছিল না। শুধু নেত্রকোনাই নয়, মাগুরা, পটুয়াখালী, মেহেরপুর, নড়াইল প্রভৃতি অনেক জেলা হাসপাতালেরই টেন্ডার কাজ বাগিয়ে নিয়েছেন আওয়ামী ঠিকাদার এমদাদ হোসেন। আওয়ামী লীগ আমলে শেরে বাংলা নগর এলাকার ত্রাস ছিলেন মহব্বত আলী। বর্তমানে তিনি ভারতে পলাতক। এই তাহসিন এন্টারপ্রাইজের মূল মালিক মহব্বত আলী। মহব্বত আলীই মূলতঃ ভারতে বসে তার সহযোগী এমদাদ হোসেনের মাধ্যমে ঠিকাদারি কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন। মন্ত্রণালয়ের সিন্ডিকেটের সঙ্গে মনিরুজ্জামান ঢালী এবং এমদাদ হোসেনদের যোগাযোগ আছে। মন্ত্রণালয়কে দিয়েই এরা হাসপাতালগুলোর কর্তৃপক্ষের ওপর প্রভাব বিস্তার করছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।