রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম বাংলাদেশ বেতার আজ নানা সংকট, অস্বচ্ছতা ও দুর্নীতির কারণে কঠিন প্রশ্নবিদ্ধ অবস্থায় দাঁড়িয়ে আছে। যে প্রতিষ্ঠান মুক্তিযুদ্ধের সময় স্বাধীনতার পক্ষে ইতিহাস রচনা করেছিল, জাতির চেতনা জাগিয়েছে এবং সংস্কৃতি-অভ্যাসের কেন্দ্রবিন্দু ছিল, সেই প্রতিষ্ঠান আজ সিন্ডিকেটের দাপটে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে গেছে। বর্তমান মহাপরিচালক (ডিজি) এ এস.এম. জাহিদকে ঘিরে একের পর এক অভিযোগ, দুর্নীতি, অমানবিক বদলি, ক্ষমতার অপব্যবহার এবং ফ্যাসিবাদী সিন্ডিকেটের প্রভাব নিয়ে দেশব্যাপী সমালোচনার ঝড় বইছে।
জাতীয় দৈনিক, অনলাইন নিউজ পোর্টাল এবং অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে বারবার এই অভিযোগ উঠে আসলেও সরকারের সংশ্লিষ্ট মহল রহস্যজনকভাবে নীরব। প্রশ্ন উঠছে—দুর্নীতির বিরুদ্ধে সরকারের ঘোষিত শূন্য সহনশীলতার নীতি কি তবে কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ থেকে যাচ্ছে? নাকি রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমই আজ দুর্নীতির কাছে জিম্মি হয়ে পড়েছে?
বাংলাদেশ বেতারের মহাপরিচালক জাহিদের বিরুদ্ধে গত কয়েক বছরে যে অভিযোগগুলো এসেছে, তার তালিকা বিস্তৃত এবং ভয়াবহ। এগুলো কেবল আর্থিক দুর্নীতি নয়, বরং নৈতিকতা, প্রশাসনিক স্বচ্ছতা এবং মানবিক মূল্যবোধকেও প্রশ্নবিদ্ধ করেছে।
বেতার ভবনের সামনের মূল্যবান ব্রোঞ্জের মুর্যাল হঠাৎ ভেঙে ফেলার ঘটনা দেশব্যাপী সমালোচনা তৈরি করে। ঠিকাদারের বকেয়া ১৯ কোটি টাকার হিসাবে ব্যাপক গরমিল ধরা পড়ে। অভিযোগ উঠেছে, প্রকল্পের অর্থ বরাদ্দ ও বাস্তবায়নের মধ্যে সুস্পষ্ট অসঙ্গতি থাকলেও কেউই এর দায় স্বীকার করেননি।
“দুর্নীতির কারিগর” আখ্যা : বেতারের অভ্যন্তরে দীর্ঘদিন ধরে প্রকল্প বাস্তবায়নে গরমিল, অর্থ আত্মসাৎ, আর্থিক অনিয়ম এবং প্রভাবশালীদের সুবিধা দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। এসব কারণে মহাপরিচালককে দুর্নীতির কারিগর হিসেবে আখ্যায়িত করা হচ্ছে।
লুকোচুরির রাজনীতি : বঙ্গবন্ধুর ম্যুরাল ইস্যুতে প্রকল্পের অর্থ ব্যয়ের বিষয়ে বারবার প্রশ্ন উঠলেও বিষয়টি আড়াল করার চেষ্টা করা হয়। এতে দেখা যায়, বরাদ্দকৃত অর্থের সঙ্গে বাস্তবায়নের কোনো মিল নেই, অথচ কর্তৃপক্ষ দায় এড়িয়ে গেছে।
অমানবিক বদলির অভিযোগ : এক নারী কর্মকর্তা যখন মাতৃত্বকালীন ছুটির জন্য আবেদন করেছিলেন, তখন তাকে হঠাৎ রাঙামাটিতে বদলি করা হয়। এই ধরনের অমানবিক বদলির ঘটনা শুধু মানবাধিকার লঙ্ঘন নয়, কর্মক্ষেত্রে নারীদের নিরাপত্তা ও মর্যাদাকে ভয়াবহভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে।
ফ্যাসিবাদী সিন্ডিকেটের দাপট : গত ১০ বছর ধরে ডিজির ছত্রছায়ায় একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট বেতারকে নিয়ন্ত্রণ করছে বলে অভিযোগ উঠেছে। এই সিন্ডিকেট প্রভাবশালী উপস্থাপক-উপস্থাপিকাদের সুযোগ দিচ্ছে, অথচ ভিন্ন মত পোষণকারীরা বা সৎ কর্মকর্তারা হেনস্তার শিকার হচ্ছেন।
সিন্ডিকেটের কৌশল : বাংলাদেশ বেতারের ভেতরে এই সিন্ডিকেট কেবল অনুষ্ঠান পরিচালনা বা প্রোগ্রাম উপস্থাপনার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। তাদের নিয়ন্ত্রণ প্রসারিত হয়েছে নিয়োগ, পদোন্নতি, বদলি, এবং অর্থনৈতিক লেনদেনের প্রতিটি ক্ষেত্রে।
উপস্থাপনার সুযোগ: নিয়ম ভেঙে নির্দিষ্ট উপস্থাপকদের ক্রমাগত প্রচার দেওয়া হচ্ছে।
বদলির রাজনীতি : যেসব কর্মকর্তা সিন্ডিকেটের স্বার্থে কাজ করতে রাজি নন, তাদের অপ্রত্যাশিত জায়গায় বদলি করা হচ্ছে।
অর্থনৈতিক সুবিধা : প্রকল্প অনুমোদন, ক্রয়-বিক্রয় এবং বিজ্ঞাপন বণ্টনে গোপনে ভাগাভাগির অভিযোগ উঠেছে।
এমনকি অভিযোগ আছে, এই সিন্ডিকেট বেতারের ভেতরে একটি “দ্বৈত সরকার” গঠন করেছে, যেখানে নীতিগত সিদ্ধান্ত ডিজি একা নেন না; বরং সিন্ডিকেট সদস্যরা ভাগ বসিয়ে নেয়।
সরকারের নীরবতা ও প্রশ্নবিদ্ধ ভূমিকা : তথ্য মন্ত্রণালয়ে একাধিকবার লিখিত অভিযোগ জমা পড়েছে। সাংবাদিক, কর্মচারী, এমনকি বেতারের ভেতরের কিছু কর্মকর্তা মিলে অভিযোগ করেছেন। কিন্তু কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।
উল্টো অভিযোগ উঠেছে, ডিজি টাকা ও রাজনৈতিক প্রভাবের জোরে অনেক গণমাধ্যমকেও ম্যানেজ করেছেন। ফলে সংবাদগুলো প্রকাশ পেলেও প্রশাসনিক পদক্ষেপ শূন্য।
মিডিয়া বিশেষজ্ঞদের ভাষায়-“একজন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে যখন এত গুরুতর অভিযোগ ওঠে, তখন তাকে অন্তত সাময়িক বরখাস্ত করা উচিত। কিন্তু জাহিদের ক্ষেত্রে উল্টো চিত্র দেখা যাচ্ছে। সরকারের রহস্যজনক নীরবতা দুর্নীতিবাজদের আরও উৎসাহিত করছে।”
বেতার: ঐতিহ্যের প্রতীক থেকে অবক্ষয়ের পথে : বাংলাদেশ বেতার শুধু একটি প্রতিষ্ঠান নয়। এটি মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের সাক্ষী, জাতীয় ঐতিহ্যের প্রতীক এবং সাংস্কৃতিক চর্চার অন্যতম কেন্দ্র। স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রই মুক্তিকামী বাঙালির চেতনা জাগিয়েছিল। সেই বেতার যদি দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি ও ফ্যাসিবাদী সিন্ডিকেটের কবলে পড়ে, তবে সেটি কেবল একটি প্রতিষ্ঠানের সংকট নয়; এটি জাতির সাংস্কৃতিক আত্মপরিচয়ের জন্যও হুমকি।
গণমাধ্যম বিশ্লেষকরা মনে করেন, বেতারের সংকট পুরো জাতিকে নাড়া দেওয়া উচিত। কারণ এখানে রাষ্ট্রীয় সম্পদের অপচয় যেমন ঘটছে, তেমনি প্রজন্মের সাংস্কৃতিক ভিত্তি নষ্ট হচ্ছে।
এই প্রতিবেদনের অংশ হিসেবে ডিজি এস.এম. জাহিদের সাথে যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়। তাকে একাধিকবার ফোন দেওয়া হলেও তিনি কল রিসিভ করেননি। ফলে তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
বাংলাদেশ বেতারের বর্তমান সংকট এখন কেবল ভেতরের বিষয় নয়; এটি জাতির বিবেককে প্রশ্নবিদ্ধ করছে। সরকারের কাছে এখন পুরো জাতির একটাই প্রশ্ন সরকার কি সত্যিই দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ নেবে এবং বেতারের গৌরব ফিরিয়ে আনবে?
নাকি এই ঐতিহাসিক প্রতিষ্ঠানকে ক্ষমতা ও টাকার জোরে গড়ে ওঠা ফ্যাসিবাদী সিন্ডিকেটের কাছে জিম্মি করে রাখবে?
পরবর্তী প্রতিবেদনে উন্মোচিত হবে—কীভাবে ডিজির ঘনিষ্ঠ উপস্থাপক-উপস্থাপিকারা নিয়ম ভেঙে বিশেষ সুবিধা নিয়েছেন এবং কীভাবে বেতারের ভেতরে নৈতিকতার ভয়াবহ অবক্ষয় চলছে।
সংবাদ শিরোনাম ::
বাংলাদেশ বেতারে ফ্যাসিবাদী সিন্ডিকেটের দাপট
দুর্নীতির পাহাড় গড়েও বহাল তবিয়তে ডিজি জাহিদ
-
নিজস্ব প্রতিবেদক - আপডেট সময় ০৮:১০:০০ অপরাহ্ন, রবিবার, ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৫
- ৭৫৩ বার পড়া হয়েছে
Tag :
জনপ্রিয় সংবাদ




















