ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের প্রশাসনিক কর্মকর্তা মো. কাউসার আহমেদ-সাধারণ একটি চাকরির পদে যোগদান করেও মাত্র দেড় দশকের ব্যবধানে যেভাবে ক্ষমতার দাপটে অপ্রতিরোধ্য হয়ে উঠেছেন, তা আজ ব্রাহ্মণবাড়িয়ার মানুষের কাছে এক ‘অলিখিত বাস্তবতা’। দপ্তরি বাবার ঘরে জন্ম নেওয়া এই ব্যক্তি অফিস সহকারী হিসেবে কর্মজীবন শুরু করলেও সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ‘অদৃশ্য শক্তি’ ও ক্ষমতাসীন ডিসিদের আশীর্বাদে প্রশাসনের মূল নিয়ন্ত্রণ নিজের হাতে কুক্ষিগত করে নেন।
তাঁর বিরুদ্ধে দুর্নীতি, অবৈধ সম্পদ অর্জন, নিয়োগ বাণিজ্য, বদলি বাণিজ্য, এমনকি নির্বাচনী প্রার্থীদের কাছ থেকে ঘুষ নেওয়ার মতো গুরুতর অভিযোগ রয়েছে। তবু এখনো পর্যন্ত কোনো দৃশ্যমান প্রশাসনিক ব্যবস্থা না নেওয়ায় প্রশ্ন উঠছে—কাউসারের পেছনে কোন শক্তি কাজ করছে?
অনুসন্ধানে দেখা গেছে, মো. কাউসারের চাকরিজীবন শুরু হয়েছিল একজন সাধারণ অফিস সহকারী হিসেবে। কিন্তু গত ১৬ বছরের ব্যবধানে তিনি প্রশাসনিক কর্মকর্তা হয়ে ওঠেন। স্থানীয়দের ভাষায়, তাঁর পদোন্নতির এই যাত্রা ছিল ‘অস্বাভাবিক দ্রুত’। ক্ষমতাসীন ডিসিদের সঙ্গে ব্যক্তিগত সম্পর্ক ও তোষামোদকে হাতিয়ার করে তিনি একের পর এক পদোন্নতি পেয়েছেন।
কর্মচারীদের মধ্যে অনেকে অভিযোগ করেন, অফিসে প্রকৃত প্রশাসনিক দায়িত্বের চেয়ে বেশি কাজই চলে ‘কাউসার-কেন্দ্রিক’। ডিসির বদলি হলেও কাউসার রয়ে যান, এবং নতুন ডিসিকে ঘিরে ধরে নিজের প্রভাব প্রতিষ্ঠা করেন। ধীরে ধীরে তিনি হয়ে ওঠেন জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের এক অঘোষিত নিয়ন্ত্রক।
কাউসারের বিরুদ্ধে সবচেয়ে আলোচিত অভিযোগ হলো-আত্মীয়-স্বজনকে সরকারি চাকরিতে ঢুকিয়ে দেওয়া। তাঁর ভাই, বোন, বোনজামাতা, ভাগ্নেুভাগ্নি—প্রায় সবাই কোনো না কোনোভাবে সরকারি চাকরিতে প্রবেশ করেছেন। এমনকি তাঁর বাসার কাজের লোক পর্যন্ত সরকারি চাকরি পেয়েছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। কেবল ২০২২ সালের নিয়োগেই সাতজন আত্মীয় চাকরিতে ঢোকে, যা নিয়ে তখন ব্যাপক আলোচনা হয়।
স্থানীয় এক সূত্র জানায়, নিয়োগ পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস থেকে শুরু করে মৌখিক পরীক্ষায় নম্বর বাড়ানো পর্যন্ত সবকিছুতেই কাউসারের প্রত্যক্ষ প্রভাব থাকত। যাঁরা আত্মীয় নন, তাঁদের কাছ থেকে মোটা অঙ্কের ঘুষ নিয়ে নিয়োগ দেওয়া হতো।
ব্রাহ্মণবাড়িয়া ডিসি অফিসে দীর্ঘদিন ধরে প্রায় ১২ জন ক্যাজুয়েল কর্মী বেতন ছাড়াই কাজ করে যাচ্ছিলেন। প্রত্যাশা ছিল, একদিন তাঁরা স্থায়ী হবেন। কিন্তু অভিযোগ রয়েছে, কাউসারের প্রভাবে তাঁদের স্থায়ী নিয়োগ আটকে যায়। পরে ঘুষের বিনিময়ে বহিরাগতদের মধ্যে সেই পদ ভাগ করে দেওয়া হয়।
এই বঞ্চিতদের মধ্যে কয়েকজন নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, “আমরা বছরের পর বছর কোনো বেতন ছাড়া কাজ করেছি এই আশায় যে একদিন স্থায়ী হবো। কিন্তু শেষ পর্যন্ত আমাদের পদ বিক্রি করে দেওয়া হলো। টাকা দিতে না পারায় আমরা চাকরি হারালাম।”
কেবল চাকরির ক্ষেত্রেই নয়, বরং স্থানীয় নির্বাচনের সময় বিভিন্ন প্রার্থীকে প্রশাসনিক সুবিধা পাইয়ে দেওয়ার বিনিময়ে ঘুষ নেওয়ার অভিযোগও রয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে। সূত্র বলছে, কিছু চেয়ারম্যান প্রার্থী ও জনপ্রতিনিধি কাউসারের কাছে গিয়ে বিভিন্ন ‘সহযোগিতা’ নিয়েছেন। যদিও এ বিষয়ে কেউ প্রকাশ্যে মুখ খুলতে রাজি হননি।
সবচেয়ে আলোচনায় এসেছে তাঁর অবৈধ সম্পদের হিসাব। একজন সাধারণ সরকারি কর্মকর্তার পক্ষে এ ধরনের সম্পদের মালিক হওয়া স্বাভাবিক নয়।
অনুসন্ধানে পাওয়া সম্পদগুলোর তালিকা: ব্রাহ্মণবাড়িয়া শহরের দাতিয়ারার বন্ধন টাওয়ারে আধুনিক ফ্ল্যাট ু আনুমানিক মূল্য ৫৫ লাখ টাকা। শেখ হাসিনা সড়কে ৮ শতাংশ জমি ু মূল্য প্রায় ৭০ লাখ টাকা। স্টেডিয়ামের পশ্চিম পাশে নির্মাণাধীন ভবনে আরেকটি বিলাসবহুল ফ্ল্যাট ু আনুমানিক ৮৫ লাখ টাকা। যাদুঘর মৌজায় ৮ শতাংশ খালি জমি ু বাজারমূল্য প্রায় ১ কোটি টাকা। ডিসি প্রজেক্টে নিজের প্রভাব খাটিয়ে বরাদ্দ নেওয়া ৮ শতাংশ প্লট ু আনুমানিক ১ কোটি টাকা। নিজ জেলা কুমিল্লায় ভাই সোলায়মানের সঙ্গে যৌথভাবে নির্মিত তিনতলা ভবন ু ব্যয় প্রায় আড়াই কোটি টাকা। স্ত্রী নাজমার কাছে রয়েছে প্রায় ৫০ ভরি স্বর্ণালংকার। এ ছাড়া স্থানীয় সূত্র বলছে, তিনি বিভিন্ন নামে একাধিক ব্যাংক অ্যাকাউন্টে মোটা অঙ্কের অর্থ লেনদেন করেন। আবার জমি ও ফ্ল্যাটের কিছু অংশ আত্মীয়ুস্বজনের নামে রেজিস্ট্রি করা হয়েছে।
ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সাধারণ মানুষ এ ঘটনায় ক্ষুব্ধ। তাঁদের মতে, প্রশাসনের একজন মধ্যপদস্থ কর্মকর্তা যদি এভাবে সম্পদশালী হয়ে ওঠেন, তবে এর দায় কেবল তাঁর নয়, বরং প্রশাসনিক ব্যবস্থারও।
এক ব্যবসায়ী ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “ডিসি অফিসে গেলে বোঝা যায়, ডিসি যত বড় কর্মকর্তা হোক, আসল ক্ষমতা কাউসারের হাতে। কে কোন কাজে ছাড়পত্র পাবে, কাকে ডেকে পাঠানো হবে—সব নির্ধারণ করেন তিনি।”
এত গুরুতর অভিযোগের পরও এখনো কোনো প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিবের কাছে গত ১২ মে এবং চট্টগ্রাম বিভাগীয় কমিশনারের কাছে গত ১১ আগস্ট তাঁর বিরুদ্ধে লিখিত অভিযোগ জমা পড়ে। কিন্তু এর পরও কোনো তদন্ত শুরু হয়নি।
সংবাদ শিরোনাম ::
দুর্নীতি, নিয়োগ বাণিজ্য ও অবৈধ সম্পদের পাহাড়
ব্রাহ্মণবাড়িয়া ডিসি অফিসের কর্মকর্তা কাউসারের দাপট
-
নিজস্ব প্রতিবেদক - আপডেট সময় ১১:৫২:৫১ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৫
- ৮০৬ বার পড়া হয়েছে
Tag :
জনপ্রিয় সংবাদ




















