রংপুর কালেক্টরেট স্কুল অ্যান্ড কলেজে ২০২৪ সালের ২১ আগস্ট ছাত্র জনতা ও বহিরাগতদের নেতৃত্বে মব আন্দোলনের ঘটনা ঘটে। আন্দোলনের মুখে প্রিন্সিপাল মন্জুয়ারা পারভিনকে জোরপূর্বক পদত্যাগে বাধ্য করা হয়। পরদিনই তাকে সাময়িক বরখাস্ত করে বেতন বন্ধ করে দেওয়া হয়। এ ঘটনায় শিক্ষা মন্ত্রণালয় গভীর দুঃখ প্রকাশ করলেও একাধিক চিঠি পাঠানোর পরও কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি।
অবৈধভাবে ভারপ্রাপ্ত দায়িত্বে আলিউল করিম প্রামানিক:
প্রিন্সিপালের পদত্যাগের পর নিয়ম না মেনে আলিউল করিম প্রামানিককে ভারপ্রাপ্ত প্রিন্সিপাল করা হয়। অভিযোগ রয়েছে, ছাত্র সমন্বয়করা কতিপয় শিক্ষকের উস্কানিতে কাগজপত্র প্রস্তুত করে তড়িঘড়ি করে প্রিন্সিপালের স্বাক্ষর আদায় করে ওনার যায়গায় তাকে বসান। প্রায় দুই মাস তিনি অবৈধভাবে দায়িত্ব পালন করেন। প্রথমে তিনি দাবি করেছিলেন, প্রিন্সিপাল তাকে লিখিত দায়িত্ব দিয়ে গেছেন। তবে বৈধতা প্রসঙ্গে জানতে চাইলে স্বীকার করেন, নিয়ম অনুযায়ী গভর্নিং বডির সাধারণ সভার রেজুলেশনের মাধ্যমেই ভারপ্রাপ্ত দায়িত্ব দেওয়ার নিয়ম। এতে মব সৃষ্টির ঘটনায় তার সম্পৃক্ততার বিষয়টি স্পষ্ট হয়। পরে বিভিন্ন সময় ধাপে ধাপে ৪ জন প্রশাসনিক কর্মকর্তা বদলিজনিত কারণে, বর্তমানে এডিসি শিক্ষা রমিজ আলমকে বৈধভাবে ভারপ্রাপ্ত হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হয়।
সব শেষে আলিউল করিম বলেন, “২১ আগস্ট ২০২৪-এ যেভাবে প্রিন্সিপালকে অপসারণ করা হয়েছে, সত্যি বলতে এটা উচিত হয়নি। তার প্রতি সম্মানটা বজায় রাখা উচিত ছিল।”
৫ই আগস্ট ২০২৪-এর পর সারা দেশের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের গভর্নিং বডি ভেঙে দিয়ে ডিসি ও ইউএনও মহোদয়কে সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হয়। সেই ধারাবাহিকতায় কালেক্টরেট স্কুল অ্যান্ড কলেজের গভর্নিং বডির সভাপতি ছিলেন জেলা প্রশাসক মহোদয়।
প্রিন্সিপালের বিরুদ্ধে অভিযোগ ও দ্বৈত বেতন প্রসঙ্গ:
ছাত্র জনতা প্রিন্সিপালের বিরুদ্ধে দুর্নীতি, ক্ষমতার অপব্যবহার ও দ্বৈত বেতন ভোগের অভিযোগ তোলে। এছাড়া তাকে রাজনৈতিকভাবে আওয়ামী লীগপন্থী ও ফ্যাসিস্ট সরকারের দোষর হিসেবেও আখ্যা দেওয়া হয়।
তবে মন্জুয়ারা পারভিন অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, তিনি যদি দুর্নীতি বা ক্ষমতার অপব্যবহার করে থাকেন, কোন ব্যক্তির মুখের কথায় নয় সুনির্দৃষ্ট প্রমাণ দিলে তিনি স্বেচ্ছায় পদত্যাগ করবেন। দ্বৈত বেতনের প্রসঙ্গে তিনি বিস্তারিত ব্যাখ্যা দেন।
২৫/০২/২০১৩ তারিখে সাধারণ সভায় প্রাইমারির দায়িত্ব পালনের জন্য ৮,০০০ টাকা সম্মানি নির্ধারণ করা হয়।
০৪/০৫/২০১৭ তারিখে সাধারণ সভার ৮ নং আলোচ্যসূচি মোতাবেক আরও ৪,০০০ টাকা বৃদ্ধি করে মোট ১২,০০০ টাকা করা হয়।
০৩/১০/২০১৮ তারিখে সাধারণ সভার ১ নং আলোচ্যসূচি “গ” মোতাবেক আরও ৫,০০০ টাকা বৃদ্ধি করে মোট ১৭,০০০ টাকা নির্ধারণ করা হয়।
১৬/০১/২০১৯ তারিখে সাধারণ সভার আলোচ্যসূচি এবং ২৮/০৫/২০১৯ তারিখের ৯ নং আলোচ্যসূচি অনুযায়ী মোট ১৮,৫২২ টাকা বেতন স্কেলের সাথে যুক্ত করে ৪৬,৬৫০ টাকার স্কেল ধরে চূড়ান্ত করা হয়।
তিনি দাবি করেন, এসব সিদ্ধান্ত গভর্নিং বডির সাধারণ সভার রেজুলেশনের মাধ্যমে বৈধভাবে গৃহীত হয়েছিল।
গভর্নিং বডির সাবেক সদস্য ভি আইপি শাহাদাত হোসেন বলেন, দ্বৈত বেতন আসলে গভর্নিং বডির সিদ্ধান্তক্রমেই হয়েছে। কারণ একই ব্যক্তি যখন স্কুল ও কলেজ উভয় দায়িত্ব পালন করে, তখন সম্মানির বিষয়টিও সেভাবেই নির্ধারণ করা হয়েছিল। স্কুলের প্রসঙ্গে তিনি আরো বলেন শিক্ষকদের মাঝে গ্রুপিং এর কারণেই তিনি ওই প্রতিষ্ঠান থেকে নিজেকে সরে নিয়েছেন।
ভুয়া নিয়োগের অভিযোগে শিক্ষক আলতাফ হোসেন:
প্রতিষ্ঠানটির কৃষি শিক্ষক আলতাফ হোসেনের নিয়োগ নিয়েও দীর্ঘদিন বিতর্ক চলছে। ২০০১ সালে এসএসসি তৃতীয় বিভাগ নিয়ে তিনি শিক্ষকতা শুরু করেন। শর্ত ছিল পাঁচ বছরের মধ্যে কৃষি ডিপ্লোমা অর্জন করতে হবে। কিন্তু তিনি ১৫ বছর পর তা সম্পন্ন করেন।
২০০৬ সালে তাকে বরখাস্ত করা হলেও ২০০৭ সালে শর্তসাপেক্ষে পুনর্বহাল করা হয় যা আইন পরিপন্থী ছিল। তবে শিক্ষা বোর্ড ও হাইকোর্ট একাধিক রায়ে তার নিয়োগকে অবৈধ ঘোষণা করেছে। ২০২১ সালের তিন সদস্যবিশিষ্ট কমিটিও একই সিদ্ধান্তে পৌঁছেছে। তবুও আলতাফ হোসেন পুনর্বহাল ও বকেয়া বেতন আদায়ের চেষ্টা চালাচ্ছেন কতিপয় অসাধু কর্মকর্তার জোগ সাজেসে।
সভাপতির বক্তব্যে নতুন বিতর্ক:
গভর্নিং বডির সভাপতি এ প্রসঙ্গে বলেন, শর্তসাপেক্ষ নিয়োগ বাংলাদেশে বৈধ নয়। তার নিয়োগ প্রক্রিয়া অবৈধ হলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
প্রিন্সিপাল প্রসঙ্গে সভাপতি বলেন, তিনি ক্ষমতার অপব্যবহার করতেন। তার স্বামী উপসচিব ও ভাই ডিসি হওয়ায় তিনি প্রভাব খাটাতেন। তবে দুর্নীতি দমন কমিশনের তদন্ত চলমান থাকায় কাউকে আগেভাগেই দুর্নীতিবাজ বলা সমীচীন নয়।
বেতন বন্ধের ঘটনা:
প্রিন্সিপালকে সাসপেন্ড করার পর নিয়ম অনুযায়ী হাফ বেতন দেওয়ার কথা থাকলেও আগস্টের পর থেকে তার বেতন বন্ধ রয়েছে। সভাপতি জানান, তিনি বিষয়টি জানতেন না। তবে সত্য হলে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
ফলে রংপুর কালেক্টরেট স্কুল অ্যান্ড কলেজে অবৈধ ভারপ্রাপ্ত দায়িত্ব, ভুয়া শিক্ষক নিয়োগ এবং প্রশাসনিক সিদ্ধান্তহীনতার কারণে ধীরে ধীরে জটিলতা বাড়ছে। এতে শিক্ষক-শিক্ষার্থী ও অভিভাবক মহলে ক্ষোভ ও অনিশ্চয়তা বিরাজ করছে।
স্টাফ রিপোর্টার 






















