* সমিতি ও সংগঠনে প্রভাব বিস্তার
* ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ও প্রভাবের অভিযোগ
* প্রশাসনিক ক্ষমতা অপব্যবহারের অভিযোগ
* প্রকল্পের অনিয়ম ও বিলম্ব
৫ আগস্ট স্বৈরশাসকের পতনের পর দেশের বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠানে প্রশাসনিক অস্থিরতা দেখা দেয়। সেই ধারাবাহিকতায় মৃত্তিকা সম্পদ উন্নয়ন ইনস্টিটিউট (এসআরডিআই) GI (SRDI) মহাপরিচালকের পদ নিয়ে নানা বিতর্ক ও অভিযোগ উত্থাপিত হয়েছে। অভিযোগ উঠেছে, তৎকালীন মহাপরিচালক জালাল উদ্দিনকে সন্ত্রাসী কায়দায় মব তৈরি করে দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়। প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা (PSO) মো. ফারুক হোসেনের নেতৃত্বে এবং কিছু বহিরাগতদের সহযোগিতায় তাকে পদত্যাগে বাধ্য করা হয়।
এরপর ১৩ নভেম্বর ২০২৪ তারিখে কৃষি মন্ত্রণালয়ের প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে ড. সামিয়া সুলতানা নতুন মহাপরিচালক হিসেবে দায়িত্ব নেন। কিন্তু দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই তার বিরুদ্ধে ক্ষমতার অপব্যবহার, প্রকল্পের অনিয়ম এবং ঘনিষ্ঠ কর্মকর্তাদের দিয়ে পদ দখলের অভিযোগ উঠছে।
অভিযোগকারীরা বলছেন, ড. সামিয়া সুলতানা সাবেক কৃষি সচিব এবং বর্তমান পলাতক কর্মকর্তা ওয়াহিদা আক্তারের ঘনিষ্ঠ বান্ধবী। সেই সূত্রে তিনি অন্তর্র্বতীকালীন সরকারের দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে SRDI-তে একক আধিপত্য বিস্তার করছেন।
তথ্যসূত্রে জানা গেছে, দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই তিনি একাধিক গুরুত্বপূর্ণ পদ নিজের দখলে বা ঘনিষ্ঠ কর্মকর্তাদের নিয়ন্ত্রণে রেখেছেন। এর মধ্যে রয়েছে:
১. মুখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা (PSO)
২. “CCBS” প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক
৩. ফিল্ড সার্ভিসেস উইংয়ের পরিচালক
৪. মৃত্তিকা সম্পদ উন্নয়ন ইনস্টিটিউটের বিসিএস সমিতির সেক্রেটারি
৫. AFACIএর অর্থায়নে পরিচালিত Development of National Soil Map and National Soil Information System of Bangladesh প্রকল্পের সহ-গবেষণা পরিচালক (co-project investigator)
৬. Soil Science Society of Bangladesh (SSSB)-এর প্রেসিডেন্ট, যা নির্বাচনের মাধ্যমে নয় বরং ক্ষমতার প্রভাব খাটিয়ে ‘সিলেকশন’-এর মাধ্যমে গ্রহণ করা হয়েছে।
আইন অনুযায়ী মৃত্তিকার কোন কর্মকর্তাকে প্রশাসনিক ও আর্থিক ক্ষমতা প্রদানের এখতিয়ার কৃষি মন্ত্রণালয়ের সচিবের। কিন্তু অভিযোগ রয়েছে, ড. সামিয়া সুলতানা দায়িত্ব গ্রহণের পরই তার ঘনিষ্ঠ PSO মো. ফারুক হোসেনকে পূর্ববর্তী কর্মস্থল পাবনার আয়ন-ব্যায়ন (DDO) ক্ষমতায় বহাল করেন।
এই ক্ষমতা পাওয়ার পর ফারুক হোসেন প্রতিষ্ঠানের অভিজ্ঞ ও সৎ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে হয়রানিমূলক বদলি শুরু করেন। এতে প্রতিষ্ঠানজুড়ে অসন্তোষ তৈরি হয়। এ বিষয়ে কৃষি মন্ত্রণালয় থেকে ২৬ নভেম্বর ২০২৪ তারিখে একটি কারণ দর্শানো নোটিশও মহাপরিচালক সামিয়া সুলতানার কাছে পাঠানো হয়েছে। নোটিশে স্বাক্ষর করেন মন্ত্রণালয়ের উপসচিব দেবীচন্দ্র।
তদন্ত সাপেক্ষে জানা গেছে, ড. সামিয়া সুলতানা ১ জানুয়ারি ২০২০ থেকে শুরু হওয়া ভবন নির্মাণ ও সক্ষমতা বৃদ্ধি (CCBS) প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক হিসেবে রয়েছেন। অভিযোগকারীরা বলছেন, মহাপরিচালকের পদে থেকে একইসাথে প্রকল্প পরিচালক থাকা অনৈতিক।
প্রকল্পটি জানুয়ারি ২০২০ থেকে জুন ২০২৪-এর মধ্যে শেষ হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু ২০২৫ সালের আগস্ট মাসেও প্রকল্প শেষ হয়নি। বিলম্বের কারণে এর কার্যকারিতা ও বাজেট ব্যবহারে প্রশ্ন উঠেছে।
অভিযোগ রয়েছে, মহাপরিচালক সামিয়া সুলতানা BARC-এর চেয়ারম্যান ড. শেখ মো. বখতিয়ারসহ প্রভাবশালী মহলের সহায়তায় SSSBতে নির্বাচন ছাড়াই প্রেসিডেন্টের পদ গ্রহণ করেছেন। একইভাবে বিসিএস সমিতিতেও ঘনিষ্ঠ কর্মকর্তাদের মাধ্যমে পদ নিয়ন্ত্রণে রেখেছেন।
এতে মৃত্তিকা ইনস্টিটিউটের ভেতরে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্টরা দাবি করছেন।
ফারুক হোসেনকে ঘিরে বিতর্ক : মহাপরিচালকের ঘনিষ্ঠ সহযোগী হিসেবে পরিচিত PSO মো. ফারুক হোসেনের বিরুদ্ধেও একাধিক অভিযোগ উঠেছে।
প্রথমত, তিনি অফিসিয়াল মিটিং এবং অনুষ্ঠানে নিজেকে “ডক্টর” পরিচয় দিয়ে থাকেন, অথচ তার কোনো ডক্টরেট ডিগ্রি নেই বলে অভিযোগ। অফিসিয়াল ব্যানার ও বার্ষিক প্রতিবেদনে তার নামের আগে “ড.” লেখা হয়। ২০২৩-২৪ সালের ফাইনাল বার্ষিক প্রতিবেদনে তিনি নিজ হাতে “ড. মো. ফারুক হোসেন, PSO” লিখেছেন।
দ্বিতীয়ত, নওগাঁ জেলায় তার নিজ এলাকায় ৮ বিঘা সরকারি জমি জোরপূর্বক দখলের অভিযোগ রয়েছে। এছাড়া প্রশ্ন উঠেছে—একজন পিএসও পদমর্যাদার কর্মকর্তা হয়েও কিভাবে রাজশাহী শহরে কৃষিবিদ টাওয়ার নির্মাণ করেছেন।
এসব ঘটনায় জনমনে নানা প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
এসব অভিযোগের পর SRDI-এর ভেতরে-বাইরে কর্মকর্তাদের মধ্যে তীব্র অসন্তোষ বিরাজ করছে। অনেকে বলছেন, প্রশাসনিক ও আর্থিক ক্ষমতার অপব্যবহার করে প্রতিষ্ঠানটি এখন ব্যক্তিগত আধিপত্যের জায়গায় পরিণত হয়েছে।
তাদের মতে, একজন মহাপরিচালক একইসাথে একাধিক প্রকল্প পরিচালক, সমিতির নেতা এবং সংগঠনের প্রেসিডেন্ট হতে পারেন না। এতে স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও কর্মপরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, ড. সামিয়া সুলতানা এবং মো. ফারুক হোসেনের বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগগুলো নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে যাচাই করা প্রয়োজন। বিশেষ করে প্রকল্প বিলম্ব, আর্থিক ক্ষমতার অপব্যবহার, জমি দখল ও ভুয়া পরিচয় ব্যবহার সংক্রান্ত অভিযোগের বিষয়ে স্বচ্ছ তদন্ত জরুরি হয়ে পড়েছে।
মৃত্তিকা সম্পদ উন্নয়ন ইনস্টিটিউট দেশের কৃষি খাতে গুরুত্বপূর্ণ গবেষণা প্রতিষ্ঠান। এখানকার কর্মকর্তাদের সততা, যোগ্যতা এবং সুষ্ঠু প্রশাসন কৃষি গবেষণা ও মাটির উন্নয়নে অপরিহার্য। কিন্তু সাম্প্রতিক অভিযোগগুলো প্রতিষ্ঠানটির ভাবমূর্তিকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে।
জনমনে এখন একটাই প্রশ্ন—এসব অভিযোগ কি কেবল ক্ষমতার দ্বন্দ্ব, নাকি সত্যিকার অর্থে অনিয়ম ও দুর্নীতির প্রতিফলন? কৃষি মন্ত্রণালয় ও সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ যদি দ্রুত তদন্তে এগিয়ে না আসে, তবে একটি গুরুত্বপূর্ণ গবেষণা প্রতিষ্ঠান আস্থা হারাবে এবং ক্ষতিগ্রস্ত হবে দেশের কৃষি উন্নয়ন কার্যক্রম।
নিজস্ব প্রতিবেদক 























