ঢাকা ০১:২০ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ২২ এপ্রিল ২০২৬, ৮ বৈশাখ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম ::
মাদারীপুরের রাজৈর এ অনুষ্ঠিতব্য এসএসসি ও সমমান পরীক্ষা -২০২৬ এর পরীক্ষা শুরু ডিপ্লোমা পাস করার ৩ বছর পূর্বেই সহকারী কৃষি শিক্ষক নিয়োগ পেয়েছে আবুল কালাম আজাদ গণপূর্তের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী সারোয়ার জাহানের বিরুদ্ধে দুদকে অভিযোগ বরিশালে কাস্টমস কর্মকর্তাকে ঘিরে গুরুতর অভিযোগ—ধর্ষণ ও পর্নোগ্রাফি মামলা, প্রত্যাহারে হুমকির দাবি এক মাসে দুইবার বাড়লো এলপিজির দাম, ১২ কেজি ১৯৪০ টাকা ২৪ ঘণ্টায় হাম সন্দেহে আরও ৪ শিশুর মৃত্যু সেই ভুয়া আজিজের সহযোগী ইউসুফ রিমান্ডে জ্বালানির সংকট নেই, অসাধু সিন্ডিকেটে পাম্পগুলোতে কৃত্রিম সংকট হচ্ছে তারাকান্দায় বিএনপির দুই গ্রুপের কর্মসূচি ঘিরে ১৪৪ ধারা জারি চলন্ত মোটরসাইকেল থেকে হঠাৎ ছিটকে পড়ে বাসচাপায় ঠিকাদার নিহত

কৃষি কর্মকর্তা বাছিরুল আলম হাতে জিম্মি লাখো দরিদ্র কৃষক

খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলার কৃষকরা যখন প্রাকৃতিক দুর্যোগসহ নানামুখী সংকট মোকাবিলায় লড়ছেন, তখন কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের জেলার সর্বোচ্চ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে লাগামহীন দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে। সরকারি বরাদ্দের প্রায় প্রতিটি খাতে নয়ছয় এবং অর্থ আত্মসাতের মাধ্যমে তিনি দুর্নীতির চাষাবাদে মজেছেন- এমনটাই বলছেন অধিদপ্তরের একাধিক কর্মকর্তা-কর্মচারী ও ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকরা।
২০২৪ সালের ১৭ এপ্রিল খাগড়াছড়ি কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক কিশোর কুমার মজুমদারের বদলির পর প্রভাবশালী আওয়ামী লীগ নেতা ও তৎকালীন জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান মংসুইপ্রু চৌধুরী অপুর আশীর্বাদপুষ্ট হয়ে ভারপ্রাপ্ত হিসেবে খাগড়াছড়ি কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালকের দায়িত্ব পান জেলা প্রশিক্ষণ কর্মকর্তা মোহাম্মদ বাছিরুল আলম। প্রশিক্ষণ কর্মকর্তা হয়েও উপপরিচালকের দায়িত্ব পালন করে চলেছেন এক বছরেরও বেশি সময় ধরে। দায়িত্ব পাওয়ার পর থেকেই একের পর এক প্রকল্পে অনিয়ম ও অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ জমতে থাকে প্রশিক্ষণ কর্মকর্তা থেকে হঠাৎ উপপরিচালক বনে যাওয়া বাছিরুল আলমের বিরুদ্ধে।

সবজি বীজ বিতরণে ৪৪ লাখ টাকা আত্মসাৎ

খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলা পরিষদের দায়িত্ব বিরত চেয়ারম্যান জিরুনা ত্রিপুরার সঙ্গে যোগসাজশে শীতকালীন সবজি বীজ বিতরণের নামে ৪৪ লাখ টাকা আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছে খাগড়াছড়ি কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের ভারপ্রাপ্ত উপপরিচালক মোহাম্মদ বাছিরুল আলমের বিরুদ্ধে। গত বছরের শেষ দিকে শীতকালীন সবজি উৎপাদনে সরকারি সহায়তার অংশ হিসেবে খাগড়াছড়ি জেলা সদরসহ ৯ উপজেলার ৮ হাজার কৃষকের মাঝে হাইব্রিড বীজ বিতরণের উদ্যোগ নেয় কৃষি অধিদপ্তর। অভিযোগ পাওয়া গেছে, একটি কোম্পানির সঙ্গে গোপন চুক্তি করে ১ হাজার ২৫০ টাকায় কেনা বীজের মূল্য ১ হাজার ৮০০ টাকা দেখিয়ে মোটা অঙ্কের অর্থ হাতিয়ে নিয়েছেন বাছিরুল আলম এবং জেলা পরিষদের দায়িত্ব বিরত চেয়ারম্যান জিরুনা ত্রিপুরা। এতে প্রকল্পের মোট বরাদ্দের ১ কোটি ৪৪ লাখ টাকার মধ্যে ৪৪ লাখ টাকাই বেহাত করেছেন তারা।
গোপন একটি সূত্র জানায়, বাছিরুল আলমের ঘনিষ্ঠ সহযোগী কয়েকজন উপজেলা কৃষি কর্মকর্তার সহায়তায় পুরো লেনদেন সম্পন্ন হয়েছিল। অথচ জেলা পরিষদের তৎকালীন মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তা সুমন চৌধুরী সরকারি ক্রয় নীতিমালা (পিপিআর-২০০৬ ও ২০০৮) অনুযায়ী বীজ কেনার জন্য দাপ্তরিক নির্দেশনা দিলেও তা উপেক্ষা করে অর্থ আত্মসাৎ করা হয়। সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী বীজ কেনার জন্য একটি কৃষি পুনর্বাসন কমিটি রয়েছে। পদাধিকার বলে কমিটির আহ্বায়ক ছিলেন জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান জিরুনা ত্রিপুরা এবং সদস্যসচিব ছিলেন কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের ভারপ্রাপ্ত উপপরিচালক বাছিরুল আলম। এ ছাড়াও জেলা পরিষদের সদস্য কংজপ্রু মারমা যাবতীয় বিষয় দেখভালের জন্য কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের আহ্বায়ক হিসেবে দায়িত্বে রয়েছেন। তবে বীজ কেনা এবং বিতরণের বিষয়ে কোনো কিছুই অবগত নন বলে জানিয়েছেন তিনি।
পেঁয়াজ ও অড়হর বীজ বিতরণেও নয়ছয়

গত মৌসুমে শীতকালীন পেঁয়াজ প্রদর্শনীতে প্রতি কেজি ৬ হাজার টাকায় কেনা বীজের অর্ধেক বিতরণ করে বাকি অংশের টাকা আত্মসাতেরও অভিযোগ উঠেছে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের ভারপ্রাপ্ত উপপরিচালক বাছিরুল আলমের বিরুদ্ধে। ১৮টি প্রদর্শনীর জন্য প্রতিটি প্রদর্শনীতে ১ কেজি বীজ বিতরণের নির্দেশনা থাকলেও কৃষকদের দেওয়া হয়েছে মাত্র ৫০০ গ্রাম করে। এই খাতেও ৫৪ হাজার টাকা লোপাট হয়েছে।
বীজ পাওয়া কয়েকজন কৃষক নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, তাদের ৫০০ গ্রাম বীজ দেওয়া হলেও কেউ জানতে চাইলে ১ কেজি বীজ পেয়েছেন বলে জানানোর কঠোর নির্দেশনা দেন কৃষি কর্মকর্তারা। তা না হলে পরে আর কোনো ধরনের সহায়তা পাবেন না- এমন হুমকি দেওয়া হয় কৃষকদের।

শুধু তাই নয়, বীজ সহায়তা প্রকল্পে কাগজে-কলমে ১৭ জন কৃষকের নামে ১ কেজি করে পেঁয়াজ বীজ বিতরণ দেখানো হলেও বাস্তবে কোনো কৃষককেই পেঁয়াজের বীজ দেওয়া হয়নি বলে অধিদপ্তরের একটি গোপন সূত্র জানিয়েছে। আর এতে আত্মসাৎ করা হয়েছে ১ লাখ ২ হাজার টাকা। অপরদিকে অড়হর কর্মসূচিতেও একই ধরনের অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে। ওই কর্মসূচির আওতায় প্রতিজন কৃষক ২ কেজি করে বীজ পাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু কৃষকদের দেওয়া হয়েছে এক কেজি বা তারও কম। মাঠপর্যায়ে এখনো চলছে বিতরণের নামে এমন ভেলকিবাজি।

৩ দিনের ট্যুর ১ দিনে শেষ করে অর্থ আত্মসাৎ

পারিবারিক পুষ্টিবাগান প্রকল্পেও অনিয়মের অভিযোগ পাওয়া গেছে বাছিরুল আলমের বিরুদ্ধে। গত বছরের ডিসেম্বরে ৩০ জন কৃষকের জায়গায় ২০ জনকে নিয়ে ৩ দিনের মোটিভেশনাল ট্যুর মাত্র ১ দিনে শেষ করে মোটা দাগে অর্থ হাতিয়ে নিয়েছেন তিনি।

গুইমারা উপজেলার উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তা সুমন কান্তি নাথ ও পানছড়ি উপজেলার উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তা জমির উদ্দিনসহ ওই মোটিভেশনাল ট্যুরে অংশ নেওয়া অন্য কৃষি কর্মকর্তারা অনিচ্ছা সত্ত্বেও স্বীকার করেছেন, মোটিভেশনাল ট্যুরটি দিনে দিনে শেষ করে মাস্টাররোলে তিন দিনের স্বাক্ষর নেওয়া হয়েছিল। তবে এর বেশি আর কিছু বলতে রাজি হননি ট্যুরে অংশ নেওয়া কৃষি কর্মকর্তারা।

৪০ লাখ টাকার কৃষিযন্ত্র গায়েব

২০২৩ সালের নভেম্বরে ইউএনডিপি ও পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে খাগড়াছড়ির চারটি উপজেলার জন্য ১ কোটি ৪০ লাখ টাকা ব্যয়ে চারটি রাইচ হার্ভেস্টার যন্ত্র কেনা হয়। তবে বাছিরুল আলম ভারপ্রাপ্ত উপপরিচালকের দায়িত্ব গ্রহণের পরপরই শেখ হাসিনা সরকারের পতনের ঠিক এক মাস আগে পানছড়ি উপজেলার রাইচ হার্ভেস্টার যন্ত্রটি গায়েব হয়ে যায়। অভিযোগ পাওয়া গেছে, খাগড়াছড়ি আসনের আওয়ামী লীগের সাবেক সংসদ সদস্য কুজেন্দ্র লাল ত্রিপুরার ব্যক্তিগত কর্মকর্তা খগেন্দ্র ত্রিপুরার সঙ্গে যোগসাজশে কৃষকদের জন্য কেনা রাইচ হার্ভেস্টার যন্ত্র বিক্রি করে অর্থ লোপাট করেছেন বাছিরুল আলম। ৪০ লাখ টাকার ওই কৃষিযন্ত্র এক বছর ধরে গায়েব। অথচ রহস্যজনক কারণে এ বিষয়ে একেবারেই নির্বিকার কৃষি বিভাগ ও জেলা পরিষদ।
ঢাকায় জমি, বাড়ি-গাড়ি-ফ্ল্যাট

এত সব অনিয়মের নেপথ্যে রয়েছে বাছিরুল আলমের বিত্তবৈভবের বিস্তার। ঢাকার মিরপুরের শেওড়াপাড়া এলাকায় বিলাসবহুল বাড়ি, উত্তরা এলাকায় কোটি টাকার প্লট, জমি ও ব্যক্তিগত দামি গাড়ি রয়েছে তার- এমন গুঞ্জন ছড়িয়ে পড়েছে দপ্তরের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মাঝে।

এদিকে ঢাকায় নিজের বাড়ি ও ফ্ল্যাট থাকার কথা স্বীকার করলেও বাকি সব অভিযোগই প্রত্যাখ্যান করেছেন খাগড়াছড়ি কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের ভারপ্রাপ্ত উপ-পরিচালক বাছিরুল আলম। বাছিরুল আলম বলেন, ‘আমার পুরান ঢাকায় পৈতৃক বাড়ি এবং মিরপুরের শেওড়াপাড়ায় নিজের ফ্ল্যাট রয়েছে, এ কথা সত্যি। তবে এসব সম্পদ আমার বেতনের টাকায় কেনা। এর বাইরে আমার বিরুদ্ধে যেসব অভিযোগ তোলা হয়েছে তার কোনোটারই ভিত্তি নেই। আমার বিভাগের কিছু কর্মকর্তার অনিয়ম ও দায়িত্বে অবহেলা নিয়ে কথা বলায় আমার বিরুদ্ধে তারা ষড়যন্ত্র করছে।’

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলা পরিষদের কাছে ন্যস্ত। আর পদাধিকার বলে কৃষি পুনর্বাসন কমিটির আহ্বায়ক হলেন জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান। এতসব অনিয়মের অভিযোগ প্রসঙ্গে জানতে খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলা পরিষদের দায়িত্বরত চেয়ারম্যান ও কৃষি পুনর্বাসন কমিটির আহ্বায়ক জিরুনা ত্রিপুরার সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেও তার কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
খাগড়াছড়ি জেলা পরিষদ সদস্য ও কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের আহ্বায়ক কংজ্যপ্রু মারমা বলেন, ‘আহ্বায়ক হিসেবে দায়িত্বে থাকলেও বীজ কেনার বিষয়ে কিছুই জানা নেই আমার। তবে মোটিভেশনাল ট্যুরে তিন দিনের প্রশিক্ষণ এক দিনে শেষ করার অভিযোগটি আমিও শুনেছি। এর বাইরে আপাতত কিছুই বলতে চাইছি না।’

 

Tag :

আপনার মতামত লিখুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল ও অন্যান্য তথ্য সঞ্চয় করে রাখুন

আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

মাদারীপুরের রাজৈর এ অনুষ্ঠিতব্য এসএসসি ও সমমান পরীক্ষা -২০২৬ এর পরীক্ষা শুরু

কৃষি কর্মকর্তা বাছিরুল আলম হাতে জিম্মি লাখো দরিদ্র কৃষক

আপডেট সময় ১০:২৪:৫৩ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ২ অগাস্ট ২০২৫

খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলার কৃষকরা যখন প্রাকৃতিক দুর্যোগসহ নানামুখী সংকট মোকাবিলায় লড়ছেন, তখন কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের জেলার সর্বোচ্চ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে লাগামহীন দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে। সরকারি বরাদ্দের প্রায় প্রতিটি খাতে নয়ছয় এবং অর্থ আত্মসাতের মাধ্যমে তিনি দুর্নীতির চাষাবাদে মজেছেন- এমনটাই বলছেন অধিদপ্তরের একাধিক কর্মকর্তা-কর্মচারী ও ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকরা।
২০২৪ সালের ১৭ এপ্রিল খাগড়াছড়ি কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক কিশোর কুমার মজুমদারের বদলির পর প্রভাবশালী আওয়ামী লীগ নেতা ও তৎকালীন জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান মংসুইপ্রু চৌধুরী অপুর আশীর্বাদপুষ্ট হয়ে ভারপ্রাপ্ত হিসেবে খাগড়াছড়ি কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালকের দায়িত্ব পান জেলা প্রশিক্ষণ কর্মকর্তা মোহাম্মদ বাছিরুল আলম। প্রশিক্ষণ কর্মকর্তা হয়েও উপপরিচালকের দায়িত্ব পালন করে চলেছেন এক বছরেরও বেশি সময় ধরে। দায়িত্ব পাওয়ার পর থেকেই একের পর এক প্রকল্পে অনিয়ম ও অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ জমতে থাকে প্রশিক্ষণ কর্মকর্তা থেকে হঠাৎ উপপরিচালক বনে যাওয়া বাছিরুল আলমের বিরুদ্ধে।

সবজি বীজ বিতরণে ৪৪ লাখ টাকা আত্মসাৎ

খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলা পরিষদের দায়িত্ব বিরত চেয়ারম্যান জিরুনা ত্রিপুরার সঙ্গে যোগসাজশে শীতকালীন সবজি বীজ বিতরণের নামে ৪৪ লাখ টাকা আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছে খাগড়াছড়ি কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের ভারপ্রাপ্ত উপপরিচালক মোহাম্মদ বাছিরুল আলমের বিরুদ্ধে। গত বছরের শেষ দিকে শীতকালীন সবজি উৎপাদনে সরকারি সহায়তার অংশ হিসেবে খাগড়াছড়ি জেলা সদরসহ ৯ উপজেলার ৮ হাজার কৃষকের মাঝে হাইব্রিড বীজ বিতরণের উদ্যোগ নেয় কৃষি অধিদপ্তর। অভিযোগ পাওয়া গেছে, একটি কোম্পানির সঙ্গে গোপন চুক্তি করে ১ হাজার ২৫০ টাকায় কেনা বীজের মূল্য ১ হাজার ৮০০ টাকা দেখিয়ে মোটা অঙ্কের অর্থ হাতিয়ে নিয়েছেন বাছিরুল আলম এবং জেলা পরিষদের দায়িত্ব বিরত চেয়ারম্যান জিরুনা ত্রিপুরা। এতে প্রকল্পের মোট বরাদ্দের ১ কোটি ৪৪ লাখ টাকার মধ্যে ৪৪ লাখ টাকাই বেহাত করেছেন তারা।
গোপন একটি সূত্র জানায়, বাছিরুল আলমের ঘনিষ্ঠ সহযোগী কয়েকজন উপজেলা কৃষি কর্মকর্তার সহায়তায় পুরো লেনদেন সম্পন্ন হয়েছিল। অথচ জেলা পরিষদের তৎকালীন মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তা সুমন চৌধুরী সরকারি ক্রয় নীতিমালা (পিপিআর-২০০৬ ও ২০০৮) অনুযায়ী বীজ কেনার জন্য দাপ্তরিক নির্দেশনা দিলেও তা উপেক্ষা করে অর্থ আত্মসাৎ করা হয়। সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী বীজ কেনার জন্য একটি কৃষি পুনর্বাসন কমিটি রয়েছে। পদাধিকার বলে কমিটির আহ্বায়ক ছিলেন জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান জিরুনা ত্রিপুরা এবং সদস্যসচিব ছিলেন কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের ভারপ্রাপ্ত উপপরিচালক বাছিরুল আলম। এ ছাড়াও জেলা পরিষদের সদস্য কংজপ্রু মারমা যাবতীয় বিষয় দেখভালের জন্য কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের আহ্বায়ক হিসেবে দায়িত্বে রয়েছেন। তবে বীজ কেনা এবং বিতরণের বিষয়ে কোনো কিছুই অবগত নন বলে জানিয়েছেন তিনি।
পেঁয়াজ ও অড়হর বীজ বিতরণেও নয়ছয়

গত মৌসুমে শীতকালীন পেঁয়াজ প্রদর্শনীতে প্রতি কেজি ৬ হাজার টাকায় কেনা বীজের অর্ধেক বিতরণ করে বাকি অংশের টাকা আত্মসাতেরও অভিযোগ উঠেছে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের ভারপ্রাপ্ত উপপরিচালক বাছিরুল আলমের বিরুদ্ধে। ১৮টি প্রদর্শনীর জন্য প্রতিটি প্রদর্শনীতে ১ কেজি বীজ বিতরণের নির্দেশনা থাকলেও কৃষকদের দেওয়া হয়েছে মাত্র ৫০০ গ্রাম করে। এই খাতেও ৫৪ হাজার টাকা লোপাট হয়েছে।
বীজ পাওয়া কয়েকজন কৃষক নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, তাদের ৫০০ গ্রাম বীজ দেওয়া হলেও কেউ জানতে চাইলে ১ কেজি বীজ পেয়েছেন বলে জানানোর কঠোর নির্দেশনা দেন কৃষি কর্মকর্তারা। তা না হলে পরে আর কোনো ধরনের সহায়তা পাবেন না- এমন হুমকি দেওয়া হয় কৃষকদের।

শুধু তাই নয়, বীজ সহায়তা প্রকল্পে কাগজে-কলমে ১৭ জন কৃষকের নামে ১ কেজি করে পেঁয়াজ বীজ বিতরণ দেখানো হলেও বাস্তবে কোনো কৃষককেই পেঁয়াজের বীজ দেওয়া হয়নি বলে অধিদপ্তরের একটি গোপন সূত্র জানিয়েছে। আর এতে আত্মসাৎ করা হয়েছে ১ লাখ ২ হাজার টাকা। অপরদিকে অড়হর কর্মসূচিতেও একই ধরনের অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে। ওই কর্মসূচির আওতায় প্রতিজন কৃষক ২ কেজি করে বীজ পাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু কৃষকদের দেওয়া হয়েছে এক কেজি বা তারও কম। মাঠপর্যায়ে এখনো চলছে বিতরণের নামে এমন ভেলকিবাজি।

৩ দিনের ট্যুর ১ দিনে শেষ করে অর্থ আত্মসাৎ

পারিবারিক পুষ্টিবাগান প্রকল্পেও অনিয়মের অভিযোগ পাওয়া গেছে বাছিরুল আলমের বিরুদ্ধে। গত বছরের ডিসেম্বরে ৩০ জন কৃষকের জায়গায় ২০ জনকে নিয়ে ৩ দিনের মোটিভেশনাল ট্যুর মাত্র ১ দিনে শেষ করে মোটা দাগে অর্থ হাতিয়ে নিয়েছেন তিনি।

গুইমারা উপজেলার উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তা সুমন কান্তি নাথ ও পানছড়ি উপজেলার উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তা জমির উদ্দিনসহ ওই মোটিভেশনাল ট্যুরে অংশ নেওয়া অন্য কৃষি কর্মকর্তারা অনিচ্ছা সত্ত্বেও স্বীকার করেছেন, মোটিভেশনাল ট্যুরটি দিনে দিনে শেষ করে মাস্টাররোলে তিন দিনের স্বাক্ষর নেওয়া হয়েছিল। তবে এর বেশি আর কিছু বলতে রাজি হননি ট্যুরে অংশ নেওয়া কৃষি কর্মকর্তারা।

৪০ লাখ টাকার কৃষিযন্ত্র গায়েব

২০২৩ সালের নভেম্বরে ইউএনডিপি ও পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে খাগড়াছড়ির চারটি উপজেলার জন্য ১ কোটি ৪০ লাখ টাকা ব্যয়ে চারটি রাইচ হার্ভেস্টার যন্ত্র কেনা হয়। তবে বাছিরুল আলম ভারপ্রাপ্ত উপপরিচালকের দায়িত্ব গ্রহণের পরপরই শেখ হাসিনা সরকারের পতনের ঠিক এক মাস আগে পানছড়ি উপজেলার রাইচ হার্ভেস্টার যন্ত্রটি গায়েব হয়ে যায়। অভিযোগ পাওয়া গেছে, খাগড়াছড়ি আসনের আওয়ামী লীগের সাবেক সংসদ সদস্য কুজেন্দ্র লাল ত্রিপুরার ব্যক্তিগত কর্মকর্তা খগেন্দ্র ত্রিপুরার সঙ্গে যোগসাজশে কৃষকদের জন্য কেনা রাইচ হার্ভেস্টার যন্ত্র বিক্রি করে অর্থ লোপাট করেছেন বাছিরুল আলম। ৪০ লাখ টাকার ওই কৃষিযন্ত্র এক বছর ধরে গায়েব। অথচ রহস্যজনক কারণে এ বিষয়ে একেবারেই নির্বিকার কৃষি বিভাগ ও জেলা পরিষদ।
ঢাকায় জমি, বাড়ি-গাড়ি-ফ্ল্যাট

এত সব অনিয়মের নেপথ্যে রয়েছে বাছিরুল আলমের বিত্তবৈভবের বিস্তার। ঢাকার মিরপুরের শেওড়াপাড়া এলাকায় বিলাসবহুল বাড়ি, উত্তরা এলাকায় কোটি টাকার প্লট, জমি ও ব্যক্তিগত দামি গাড়ি রয়েছে তার- এমন গুঞ্জন ছড়িয়ে পড়েছে দপ্তরের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মাঝে।

এদিকে ঢাকায় নিজের বাড়ি ও ফ্ল্যাট থাকার কথা স্বীকার করলেও বাকি সব অভিযোগই প্রত্যাখ্যান করেছেন খাগড়াছড়ি কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের ভারপ্রাপ্ত উপ-পরিচালক বাছিরুল আলম। বাছিরুল আলম বলেন, ‘আমার পুরান ঢাকায় পৈতৃক বাড়ি এবং মিরপুরের শেওড়াপাড়ায় নিজের ফ্ল্যাট রয়েছে, এ কথা সত্যি। তবে এসব সম্পদ আমার বেতনের টাকায় কেনা। এর বাইরে আমার বিরুদ্ধে যেসব অভিযোগ তোলা হয়েছে তার কোনোটারই ভিত্তি নেই। আমার বিভাগের কিছু কর্মকর্তার অনিয়ম ও দায়িত্বে অবহেলা নিয়ে কথা বলায় আমার বিরুদ্ধে তারা ষড়যন্ত্র করছে।’

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলা পরিষদের কাছে ন্যস্ত। আর পদাধিকার বলে কৃষি পুনর্বাসন কমিটির আহ্বায়ক হলেন জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান। এতসব অনিয়মের অভিযোগ প্রসঙ্গে জানতে খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলা পরিষদের দায়িত্বরত চেয়ারম্যান ও কৃষি পুনর্বাসন কমিটির আহ্বায়ক জিরুনা ত্রিপুরার সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেও তার কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
খাগড়াছড়ি জেলা পরিষদ সদস্য ও কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের আহ্বায়ক কংজ্যপ্রু মারমা বলেন, ‘আহ্বায়ক হিসেবে দায়িত্বে থাকলেও বীজ কেনার বিষয়ে কিছুই জানা নেই আমার। তবে মোটিভেশনাল ট্যুরে তিন দিনের প্রশিক্ষণ এক দিনে শেষ করার অভিযোগটি আমিও শুনেছি। এর বাইরে আপাতত কিছুই বলতে চাইছি না।’