ঢাকা ১০:৩৫ অপরাহ্ন, বুধবার, ০৪ নভেম্বর ২০২৬, ২০ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম ::
কৃষিকে আধুনিক ও লাভজনক করতে প্রযুক্তির বিকল্প নেই: প্রধানমন্ত্রী বোরহানউদ্দিনে ওজোপাডিকোর প্রকৌশলী মেহেদীর বিরুদ্ধে গ্রাহক হয়রানির অভিযোগ জানুয়ারি থেকে নতুন মজুরি, বৃহস্পতিবার কাজে ফেরার আহ্বান শ্রমিকদের একনেকে ৫৮ হাজার ৮৯ কোটি টাকার ১৩ প্রকল্প অনুমোদন বিএনপিকে দুর্বল ভাবলে বোকার স্বর্গে বাস করছেন: ডিএসসিসি প্রশাসক পোশাকশিল্পে চলমান পরিস্থিতি স্বাভাবিক শ্রমিক আন্দোলন নয়: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী শাহজাহানপুরে রাজউকের নকশা লঙ্ঘন করে ১০ তলা ভবন নির্মাণ, নেপথ্যে অর্থ লেনদেনের অভিযোগ চীনা মন্ত্রীর সঙ্গে রাষ্ট্রপতির সাক্ষাৎ, দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক জোরদারের আহ্বান অপপ্রচার ছাপিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে শক্ত অবস্থান গড়ছে সশস্ত্র বাহিনী ফায়ার সার্ভিসে গুরুত্বপূর্ণ পদে পদায়নে তদবির, মামুনুর রশিদকে ঘিরে অনিয়মের অভিযোগ

শাহজাহানপুরে রাজউকের নকশা লঙ্ঘন করে ১০ তলা ভবন নির্মাণ, নেপথ্যে অর্থ লেনদেনের অভিযোগ

রাজধানীর শাহজাহানপুরের আমতলা মসজিদ গলিতে রাজউকের অনুমোদিত নকশা লঙ্ঘন করে প্রায় ৬ কাঠা জমি ঘিরে ১০ তলা ভবন নির্মাণের গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগ অনুযায়ী, ২০২৩ সালে রাজউক ভবন নির্মাণের অনুমোদন নেওয়া হয়েছে। শুধু জমির পরিমাণেই নয়, ভবনের সেটব্যাক, ক্যান্টিলিভার, বারান্দা সম্প্রসারণ এবং নির্মাণবিধি অনুসরণ নিয়েও উঠেছে একাধিক প্রশ্ন।

সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয়, ভবনমালিকের বক্তব্যসংবলিত একটি তথ্যপত্রে রাজউকের কর্মকর্তাদের পরিদর্শনের সময় টাকা দেওয়ার দাবি উঠে এসেছে।

অন্যদিকে, এসব অনিয়মের অভিযোগ রাজউক চেয়ারম্যান বরাবর দাখিলের পর ভবনমালিকের পক্ষ থেকে সাংবাদিক পরিচয়ে অভিযোগকারীদের ভয়ভীতি প্রদর্শনের অভিযোগও উঠেছে। ফলে প্রশ্ন উঠেছে—রাজউকের অনুমোদন ও তদারকি ব্যবস্থার আড়ালে কি চলছে অনিয়মের বাণিজ্য?

অভিযোগের সঙ্গে সংযুক্ত ভবন-সংক্রান্ত তথ্যপত্রে উল্লেখ রয়েছে, শাহজাহানপুর আমতলা মসজিদ গলিতে প্রায় ৬ কাঠা জমির ওপর ১০ তলা ভবনটি নির্মাণাধীন। এতে রাজউকের প্ল্যান অনুমোদনের সাল ২০২৩ উল্লেখ করা হয়েছে।

অনুমোদিত নকশায় জমির সীমানা, ভবনের অবস্থান ও আয়তন যেভাবে নির্ধারণ করা হয়েছে, বাস্তব নির্মাণ তার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কি না, তা রাজউকের সরেজমিন পরিমাপের মাধ্যমে যাচাই করা জরুরি।

সেটব্যাকের জায়গা রেখেও বাড়ানো হয়েছে ক্যান্টিলিভার!

ভবন-সংক্রান্ত তথ্যপত্রে আরও উল্লেখ করা হয়েছে, ভবনটির চারপাশে প্রয়োজনীয় সেটব্যাক বা খালি জায়গা রাখা হয়েছে বলে দেখা গেলেও ওপরের তলাগুলোতে ক্যান্টিলিভার ও বারান্দা বাড়িয়ে নির্মাণ করা হয়েছে। এতে অনুমোদিত নকশার বাইরে ভবনের সম্প্রসারণ হয়েছে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।

তথ্যপত্র অনুযায়ী, ভবনটি দুই ইউনিটবিশিষ্ট। প্রতিটি ফ্ল্যাটের আয়তন প্রায় ১ হাজার ১০০ বর্গফুট। প্রতি বর্গফুটের বিক্রয়মূল্য ১০ হাজার ৫০০ টাকা উল্লেখ করে প্রতিটি ফ্ল্যাটের আনুমানিক মূল্য ১ কোটি ১৫ লাখ ৫০ হাজার টাকা দেখানো হয়েছে। ভবনটি কোনো ডেভেলপার কোম্পানির প্রকল্প নয়; মালিক নিজেই ফ্ল্যাট বিক্রি করছেন বলে তথ্যপত্রে উল্লেখ রয়েছে।

এ অবস্থায় অনুমোদিত নকশা লঙ্ঘন করে নির্মাণের অভিযোগ সত্য প্রমাণিত হলে এর আর্থিক সুবিধাভোগী কে এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অনুমোদন ও তদারকি কতটা যথাযথ ছিল, তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।

ভবন নির্মাণকাজের দায়িত্বে থাকা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি দাবি করেছেন, অনুমোদিত নকশার বাইরে অতিরিক্ত ক্যান্টিলিভার ও তলা নির্মাণে সহযোগিতা পাওয়ার জন্য সংশ্লিষ্ট কয়েকজন ব্যক্তিকে অর্থ প্রদান করা হয়েছে। তাঁর এ বক্তব্যে অবৈধ নির্মাণকাজে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের আর্থিক লেনদেন ও যোগসাজশের অভিযোগ সামনে এসেছে।

এই ভবন ঘিরে সবচেয়ে গুরুতর প্রশ্ন তৈরি হয়েছে ভবনমালিকের নিজের বক্তব্যসংবলিত তথ্যপত্রে উঠে আসা কিছু দাবিকে কেন্দ্র করে। সেখানে ভবনমালিকের বক্তব্য হিসেবে উল্লেখ রয়েছে, রাজউকের অনুমোদিত প্ল্যান অনুযায়ী হুবহু ভবন নির্মাণ বাস্তবে সম্ভব হয় না, তাই কিছু পরিবর্তন করতে হয়।

তাহলে কি রাজউক ভবনমালিকের কাছে বিশেষ সুবিধা ভোগ করে অবৈধ ভবন নির্মাণ করতে সাহায্য করছেন?

তথ্যপত্রে আরও উল্লেখ রয়েছে, ভবনমালিকের ভাষ্য অনুযায়ী, তাঁকে দ্রুত নির্মাণকাজ শেষ করে বসবাস শুরু করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। ভবনে লোকজন বসবাস শুরু করলে সেটি বসবাসরত ভবন হিসেবে বিবেচিত হবে এবং ভেঙে ফেলার ঝুঁকি থাকবে না বলেও তিনি দাবি করেছেন।

ভবনমালিকের এমন বক্তব্য অত্যন্ত গুরুতর। কারণ, রাজউকের কোনো কর্মকর্তা-কর্মচারী যদি অর্থের বিনিময়ে নকশাবহির্ভূত নির্মাণকাজে ছাড় দেন কিংবা বিধিবহির্ভূত স্থাপনা টিকিয়ে রাখার আশ্বাস দেন, তাহলে সেটি শুধু দায়িত্বে অবহেলা নয়, সম্ভাব্য দুর্নীতি ও ক্ষমতার অপব্যবহারেরও ইঙ্গিত বহন করে।

তবে এসব বক্তব্যের প্রেক্ষাপট, অর্থ লেনদেনের পরিমাণ এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের পরিচয় যাচাই করা প্রয়োজন। রাজউকের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ভূমিকা এবং ভবনটির অনুমোদনসংক্রান্ত নথি তদন্তের আওতায় আনা জরুরি।

অভিযোগের পরও নির্মাণকাজ, রাজউকের ভূমিকা কোথায়?

ভবনটির নির্মাণসংক্রান্ত অনিয়মের অভিযোগ তুলে ইতোমধ্যে রাজউক চেয়ারম্যান বরাবর লিখিত অভিযোগ দাখিল করা হয়েছে। অভিযোগে ভবনটির অনুমোদিত নকশা, প্রকৃত জমির পরিমাণ, ভবনের উচ্চতা, ফ্লোর এরিয়া রেশিও (FAR), রাস্তার প্রস্থ, সেটব্যাক এবং ক্যান্টিলিভার সম্প্রসারণসহ নির্মাণবিধির বিভিন্ন বিষয় তদন্তের দাবি জানানো হয়েছে।

এছাড়াও, অভিযোগে ভবনটির সামনের রাস্তার প্রস্থ প্রায় ২০ ফুট এবং পাশের রাস্তার প্রস্থ প্রায় ১৫ ফুট উল্লেখ করা হয়েছে। এসব রাস্তার প্রস্থ বিবেচনায় ভবনটির অনুমোদিত উচ্চতা ও নির্মাণের বৈধতা যাচাইয়ের দাবি জানানো হয়েছে।

এ বিষয়ে রাজউকের জোন ৬/১-এর ভবন পরিদর্শক সাইফুল ইসলামের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বিষয়টি সম্পর্কে অবগত হওয়ার পর প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের আশ্বাস দেন। তবে অভিযোগের পর সরেজমিন পরিদর্শন, নির্মাণকাজের বৈধতা যাচাই কিংবা কোনো আইনগত পদক্ষেপ এখনো রাজউক কর্তৃপক্ষ থেকে নেওয়া হয়নি বলে তদন্তে উঠে এসেছে।

স্থানীয়দের প্রশ্ন, রাজউকের অনুমোদিত নকশা লঙ্ঘনের অভিযোগ এবং কর্মকর্তাদের টাকা দেওয়ার মতো গুরুতর দাবি সামনে আসার পরও কেন দ্রুত তদন্ত ও কার্যকর ব্যবস্থা দৃশ্যমান হচ্ছে না? সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা কি বিষয়টি জানেন না, নাকি জানার পরও নীরব ভূমিকা পালন করছেন?

অভিযোগ করতেই সাংবাদিক পরিচয়ে হুমকি!

ভবনটির অনিয়মের অভিযোগ রাজউকে দাখিলের পর নতুন করে বিতর্ক তৈরি হয়েছে, অভিযোগকারীদের সঙ্গে ভবনমালিকের পক্ষ থেকে কথিত ফোনালাপকে কেন্দ্র করে। অভিযোগকারীদের দাবি, ভবনটির মালিক সাংবাদিক তোহিদুল। রাজউকে লিখিত অভিযোগ দায়েরের বিষয়টি জানার পর তিনি ফোন করে অভিযোগকারীদের সঙ্গে আপত্তিকর ভাষায় কথা বলেন এবং ভয়ভীতি প্রদর্শন করেন।

ভাষ্য অনুযায়ী, ফোনালাপে তিনি নিজের ক্ষমতা ও প্রভাবের কথা উল্লেখ করে বলেন, তাঁর বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব নয়। তাঁরা যা-ই করুন না কেন, কোনো ফলাফল হবে না। তাঁর এমন বক্তব্যে অভিযোগকারীরা নিজেদের নিরাপত্তা এবং ভবিষ্যৎ অনুসন্ধানী কার্যক্রম নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।

একজন গণমাধ্যমকর্মীর পরিচয় ব্যবহার করে যদি কেউ নিজের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের তদন্ত ঠেকাতে কিংবা অভিযোগকারীদের ভয় দেখাতে চেষ্টা করেন, তা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। সাংবাদিকতা কোনো ব্যক্তিগত প্রভাব বিস্তার কিংবা আইনগত জবাবদিহি এড়ানোর হাতিয়ার হতে পারে না। তাঁদের ভয়ভীতি প্রদর্শনের মাধ্যমে ভবনটির নির্মাণসংক্রান্ত অনিয়মের বিষয়ে অনুসন্ধান ও আইনগত পদক্ষেপ থেকে বিরত রাখার চেষ্টা করা হয়েছে।

নকশা অনুমোদন, পরিদর্শন ও অর্থ লেনদেন—তদন্তের মুখে রাজউক

সব মিলিয়ে শাহজাহানপুরের এই ভবনটি ঘিরে কয়েকটি গুরুতর প্রশ্ন সামনে এসেছে। ৬ কাঠা জমি ঘিরে ১০ তলা ভবন নির্মাণের অভিযোগ কীভাবে বাস্তবায়িত হলো? অনুমোদিত নকশার বাইরে ক্যান্টিলিভার ও বারান্দা সম্প্রসারণের বিষয়টি রাজউক কর্তৃপক্ষ কেন ব্যবস্থা গ্রহণ করছেন না? রাজউক-সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গে কোনো অনৈতিক আর্থিক লেনদেন, রাজউকে অভিযোগ করার পর অভিযোগকারীদের ভয়ভীতি প্রদর্শনের অভিযোগের প্রতিকার কী?

এসব প্রশ্নের উত্তর পেতে ভবনটির অনুমোদিত নকশা, নির্মাণ অনুমোদনের ফাইল, পরিদর্শন প্রতিবেদন, সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের কার্যক্রম এবং মালিকের অবৈধ ভবন নির্মাণকে নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করা প্রয়োজন। পাশাপাশি রাজউকের কোনো কর্মকর্তা-কর্মচারীর বিরুদ্ধে অর্থ গ্রহণ বা অনৈতিক সহযোগিতার প্রমাণ পাওয়া গেলে তাঁদের বিরুদ্ধেও আইনগত ব্যবস্থা নিতে হবে।

রাজউকের অনুমোদনকে ঢাল বানিয়ে নকশাবহির্ভূত ভবন নির্মাণ, শাহজাহানপুরের এই ১০ তলা ভবনের নেপথ্যে কারা, কার প্রশ্রয়ে চলছে নির্মাণকাজ এবং রাজউকের ভেতরে কোনো অসাধু চক্র সক্রিয় কি না—নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে বের করা অত্যন্ত জরুরি।

নগর পরিকল্পনাবিদ-সংশ্লিষ্টরা বলেছেন, অনুমোদনবিহীন ও নকশাবহির্ভূত ভবন ভূমিকম্পের সময় সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে ওঠে। এ ধরনের ভবন ধসে পড়লে শুধু ভবনের বাসিন্দাই নয়, আশপাশের মানুষের জীবনও হুমকির মুখে পড়ে।

স্থানীয়দের দাবি, দ্রুত প্রশাসনিক হস্তক্ষেপের মাধ্যমে নির্মাণকাজ বন্ধ করে যথাযথ তদন্তের মাধ্যমে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হোক, যাতে বড় ধরনের দুর্ঘটনা এড়ানো সম্ভব হয়।

এছাড়াও নগর বিশেষজ্ঞ বলছেন, রাজউকের মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে এমন অভিযোগ সংস্থাটির বিশ্বাসযোগ্যতাকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। তাঁরা দ্রুত স্বাধীন তদন্ত কমিটি গঠন এবং অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন।

Tag :

আপনার মতামত লিখুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল ও অন্যান্য তথ্য সঞ্চয় করে রাখুন

আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

কৃষিকে আধুনিক ও লাভজনক করতে প্রযুক্তির বিকল্প নেই: প্রধানমন্ত্রী

শাহজাহানপুরে রাজউকের নকশা লঙ্ঘন করে ১০ তলা ভবন নির্মাণ, নেপথ্যে অর্থ লেনদেনের অভিযোগ

আপডেট সময় ০৯:১৯:৫৪ অপরাহ্ন, বুধবার, ৪ নভেম্বর ২০২৬

রাজধানীর শাহজাহানপুরের আমতলা মসজিদ গলিতে রাজউকের অনুমোদিত নকশা লঙ্ঘন করে প্রায় ৬ কাঠা জমি ঘিরে ১০ তলা ভবন নির্মাণের গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগ অনুযায়ী, ২০২৩ সালে রাজউক ভবন নির্মাণের অনুমোদন নেওয়া হয়েছে। শুধু জমির পরিমাণেই নয়, ভবনের সেটব্যাক, ক্যান্টিলিভার, বারান্দা সম্প্রসারণ এবং নির্মাণবিধি অনুসরণ নিয়েও উঠেছে একাধিক প্রশ্ন।

সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয়, ভবনমালিকের বক্তব্যসংবলিত একটি তথ্যপত্রে রাজউকের কর্মকর্তাদের পরিদর্শনের সময় টাকা দেওয়ার দাবি উঠে এসেছে।

অন্যদিকে, এসব অনিয়মের অভিযোগ রাজউক চেয়ারম্যান বরাবর দাখিলের পর ভবনমালিকের পক্ষ থেকে সাংবাদিক পরিচয়ে অভিযোগকারীদের ভয়ভীতি প্রদর্শনের অভিযোগও উঠেছে। ফলে প্রশ্ন উঠেছে—রাজউকের অনুমোদন ও তদারকি ব্যবস্থার আড়ালে কি চলছে অনিয়মের বাণিজ্য?

অভিযোগের সঙ্গে সংযুক্ত ভবন-সংক্রান্ত তথ্যপত্রে উল্লেখ রয়েছে, শাহজাহানপুর আমতলা মসজিদ গলিতে প্রায় ৬ কাঠা জমির ওপর ১০ তলা ভবনটি নির্মাণাধীন। এতে রাজউকের প্ল্যান অনুমোদনের সাল ২০২৩ উল্লেখ করা হয়েছে।

অনুমোদিত নকশায় জমির সীমানা, ভবনের অবস্থান ও আয়তন যেভাবে নির্ধারণ করা হয়েছে, বাস্তব নির্মাণ তার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কি না, তা রাজউকের সরেজমিন পরিমাপের মাধ্যমে যাচাই করা জরুরি।

সেটব্যাকের জায়গা রেখেও বাড়ানো হয়েছে ক্যান্টিলিভার!

ভবন-সংক্রান্ত তথ্যপত্রে আরও উল্লেখ করা হয়েছে, ভবনটির চারপাশে প্রয়োজনীয় সেটব্যাক বা খালি জায়গা রাখা হয়েছে বলে দেখা গেলেও ওপরের তলাগুলোতে ক্যান্টিলিভার ও বারান্দা বাড়িয়ে নির্মাণ করা হয়েছে। এতে অনুমোদিত নকশার বাইরে ভবনের সম্প্রসারণ হয়েছে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।

তথ্যপত্র অনুযায়ী, ভবনটি দুই ইউনিটবিশিষ্ট। প্রতিটি ফ্ল্যাটের আয়তন প্রায় ১ হাজার ১০০ বর্গফুট। প্রতি বর্গফুটের বিক্রয়মূল্য ১০ হাজার ৫০০ টাকা উল্লেখ করে প্রতিটি ফ্ল্যাটের আনুমানিক মূল্য ১ কোটি ১৫ লাখ ৫০ হাজার টাকা দেখানো হয়েছে। ভবনটি কোনো ডেভেলপার কোম্পানির প্রকল্প নয়; মালিক নিজেই ফ্ল্যাট বিক্রি করছেন বলে তথ্যপত্রে উল্লেখ রয়েছে।

এ অবস্থায় অনুমোদিত নকশা লঙ্ঘন করে নির্মাণের অভিযোগ সত্য প্রমাণিত হলে এর আর্থিক সুবিধাভোগী কে এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অনুমোদন ও তদারকি কতটা যথাযথ ছিল, তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।

ভবন নির্মাণকাজের দায়িত্বে থাকা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি দাবি করেছেন, অনুমোদিত নকশার বাইরে অতিরিক্ত ক্যান্টিলিভার ও তলা নির্মাণে সহযোগিতা পাওয়ার জন্য সংশ্লিষ্ট কয়েকজন ব্যক্তিকে অর্থ প্রদান করা হয়েছে। তাঁর এ বক্তব্যে অবৈধ নির্মাণকাজে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের আর্থিক লেনদেন ও যোগসাজশের অভিযোগ সামনে এসেছে।

এই ভবন ঘিরে সবচেয়ে গুরুতর প্রশ্ন তৈরি হয়েছে ভবনমালিকের নিজের বক্তব্যসংবলিত তথ্যপত্রে উঠে আসা কিছু দাবিকে কেন্দ্র করে। সেখানে ভবনমালিকের বক্তব্য হিসেবে উল্লেখ রয়েছে, রাজউকের অনুমোদিত প্ল্যান অনুযায়ী হুবহু ভবন নির্মাণ বাস্তবে সম্ভব হয় না, তাই কিছু পরিবর্তন করতে হয়।

তাহলে কি রাজউক ভবনমালিকের কাছে বিশেষ সুবিধা ভোগ করে অবৈধ ভবন নির্মাণ করতে সাহায্য করছেন?

তথ্যপত্রে আরও উল্লেখ রয়েছে, ভবনমালিকের ভাষ্য অনুযায়ী, তাঁকে দ্রুত নির্মাণকাজ শেষ করে বসবাস শুরু করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। ভবনে লোকজন বসবাস শুরু করলে সেটি বসবাসরত ভবন হিসেবে বিবেচিত হবে এবং ভেঙে ফেলার ঝুঁকি থাকবে না বলেও তিনি দাবি করেছেন।

ভবনমালিকের এমন বক্তব্য অত্যন্ত গুরুতর। কারণ, রাজউকের কোনো কর্মকর্তা-কর্মচারী যদি অর্থের বিনিময়ে নকশাবহির্ভূত নির্মাণকাজে ছাড় দেন কিংবা বিধিবহির্ভূত স্থাপনা টিকিয়ে রাখার আশ্বাস দেন, তাহলে সেটি শুধু দায়িত্বে অবহেলা নয়, সম্ভাব্য দুর্নীতি ও ক্ষমতার অপব্যবহারেরও ইঙ্গিত বহন করে।

তবে এসব বক্তব্যের প্রেক্ষাপট, অর্থ লেনদেনের পরিমাণ এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের পরিচয় যাচাই করা প্রয়োজন। রাজউকের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ভূমিকা এবং ভবনটির অনুমোদনসংক্রান্ত নথি তদন্তের আওতায় আনা জরুরি।

অভিযোগের পরও নির্মাণকাজ, রাজউকের ভূমিকা কোথায়?

ভবনটির নির্মাণসংক্রান্ত অনিয়মের অভিযোগ তুলে ইতোমধ্যে রাজউক চেয়ারম্যান বরাবর লিখিত অভিযোগ দাখিল করা হয়েছে। অভিযোগে ভবনটির অনুমোদিত নকশা, প্রকৃত জমির পরিমাণ, ভবনের উচ্চতা, ফ্লোর এরিয়া রেশিও (FAR), রাস্তার প্রস্থ, সেটব্যাক এবং ক্যান্টিলিভার সম্প্রসারণসহ নির্মাণবিধির বিভিন্ন বিষয় তদন্তের দাবি জানানো হয়েছে।

এছাড়াও, অভিযোগে ভবনটির সামনের রাস্তার প্রস্থ প্রায় ২০ ফুট এবং পাশের রাস্তার প্রস্থ প্রায় ১৫ ফুট উল্লেখ করা হয়েছে। এসব রাস্তার প্রস্থ বিবেচনায় ভবনটির অনুমোদিত উচ্চতা ও নির্মাণের বৈধতা যাচাইয়ের দাবি জানানো হয়েছে।

এ বিষয়ে রাজউকের জোন ৬/১-এর ভবন পরিদর্শক সাইফুল ইসলামের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বিষয়টি সম্পর্কে অবগত হওয়ার পর প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের আশ্বাস দেন। তবে অভিযোগের পর সরেজমিন পরিদর্শন, নির্মাণকাজের বৈধতা যাচাই কিংবা কোনো আইনগত পদক্ষেপ এখনো রাজউক কর্তৃপক্ষ থেকে নেওয়া হয়নি বলে তদন্তে উঠে এসেছে।

স্থানীয়দের প্রশ্ন, রাজউকের অনুমোদিত নকশা লঙ্ঘনের অভিযোগ এবং কর্মকর্তাদের টাকা দেওয়ার মতো গুরুতর দাবি সামনে আসার পরও কেন দ্রুত তদন্ত ও কার্যকর ব্যবস্থা দৃশ্যমান হচ্ছে না? সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা কি বিষয়টি জানেন না, নাকি জানার পরও নীরব ভূমিকা পালন করছেন?

অভিযোগ করতেই সাংবাদিক পরিচয়ে হুমকি!

ভবনটির অনিয়মের অভিযোগ রাজউকে দাখিলের পর নতুন করে বিতর্ক তৈরি হয়েছে, অভিযোগকারীদের সঙ্গে ভবনমালিকের পক্ষ থেকে কথিত ফোনালাপকে কেন্দ্র করে। অভিযোগকারীদের দাবি, ভবনটির মালিক সাংবাদিক তোহিদুল। রাজউকে লিখিত অভিযোগ দায়েরের বিষয়টি জানার পর তিনি ফোন করে অভিযোগকারীদের সঙ্গে আপত্তিকর ভাষায় কথা বলেন এবং ভয়ভীতি প্রদর্শন করেন।

ভাষ্য অনুযায়ী, ফোনালাপে তিনি নিজের ক্ষমতা ও প্রভাবের কথা উল্লেখ করে বলেন, তাঁর বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব নয়। তাঁরা যা-ই করুন না কেন, কোনো ফলাফল হবে না। তাঁর এমন বক্তব্যে অভিযোগকারীরা নিজেদের নিরাপত্তা এবং ভবিষ্যৎ অনুসন্ধানী কার্যক্রম নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।

একজন গণমাধ্যমকর্মীর পরিচয় ব্যবহার করে যদি কেউ নিজের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের তদন্ত ঠেকাতে কিংবা অভিযোগকারীদের ভয় দেখাতে চেষ্টা করেন, তা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। সাংবাদিকতা কোনো ব্যক্তিগত প্রভাব বিস্তার কিংবা আইনগত জবাবদিহি এড়ানোর হাতিয়ার হতে পারে না। তাঁদের ভয়ভীতি প্রদর্শনের মাধ্যমে ভবনটির নির্মাণসংক্রান্ত অনিয়মের বিষয়ে অনুসন্ধান ও আইনগত পদক্ষেপ থেকে বিরত রাখার চেষ্টা করা হয়েছে।

নকশা অনুমোদন, পরিদর্শন ও অর্থ লেনদেন—তদন্তের মুখে রাজউক

সব মিলিয়ে শাহজাহানপুরের এই ভবনটি ঘিরে কয়েকটি গুরুতর প্রশ্ন সামনে এসেছে। ৬ কাঠা জমি ঘিরে ১০ তলা ভবন নির্মাণের অভিযোগ কীভাবে বাস্তবায়িত হলো? অনুমোদিত নকশার বাইরে ক্যান্টিলিভার ও বারান্দা সম্প্রসারণের বিষয়টি রাজউক কর্তৃপক্ষ কেন ব্যবস্থা গ্রহণ করছেন না? রাজউক-সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গে কোনো অনৈতিক আর্থিক লেনদেন, রাজউকে অভিযোগ করার পর অভিযোগকারীদের ভয়ভীতি প্রদর্শনের অভিযোগের প্রতিকার কী?

এসব প্রশ্নের উত্তর পেতে ভবনটির অনুমোদিত নকশা, নির্মাণ অনুমোদনের ফাইল, পরিদর্শন প্রতিবেদন, সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের কার্যক্রম এবং মালিকের অবৈধ ভবন নির্মাণকে নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করা প্রয়োজন। পাশাপাশি রাজউকের কোনো কর্মকর্তা-কর্মচারীর বিরুদ্ধে অর্থ গ্রহণ বা অনৈতিক সহযোগিতার প্রমাণ পাওয়া গেলে তাঁদের বিরুদ্ধেও আইনগত ব্যবস্থা নিতে হবে।

রাজউকের অনুমোদনকে ঢাল বানিয়ে নকশাবহির্ভূত ভবন নির্মাণ, শাহজাহানপুরের এই ১০ তলা ভবনের নেপথ্যে কারা, কার প্রশ্রয়ে চলছে নির্মাণকাজ এবং রাজউকের ভেতরে কোনো অসাধু চক্র সক্রিয় কি না—নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে বের করা অত্যন্ত জরুরি।

নগর পরিকল্পনাবিদ-সংশ্লিষ্টরা বলেছেন, অনুমোদনবিহীন ও নকশাবহির্ভূত ভবন ভূমিকম্পের সময় সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে ওঠে। এ ধরনের ভবন ধসে পড়লে শুধু ভবনের বাসিন্দাই নয়, আশপাশের মানুষের জীবনও হুমকির মুখে পড়ে।

স্থানীয়দের দাবি, দ্রুত প্রশাসনিক হস্তক্ষেপের মাধ্যমে নির্মাণকাজ বন্ধ করে যথাযথ তদন্তের মাধ্যমে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হোক, যাতে বড় ধরনের দুর্ঘটনা এড়ানো সম্ভব হয়।

এছাড়াও নগর বিশেষজ্ঞ বলছেন, রাজউকের মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে এমন অভিযোগ সংস্থাটির বিশ্বাসযোগ্যতাকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। তাঁরা দ্রুত স্বাধীন তদন্ত কমিটি গঠন এবং অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন।