দুদকের হাতে গ্রেপ্তারের পুরোনো ঘটনা, পাওনা টাকা ফেরত না পাওয়ার অভিযোগ, কথিত নিয়োগ বাণিজ্য ও সরকারি সম্পদ বিক্রির অভিযোগ—সব মিলিয়ে প্রশ্নের মুখে প্রশাসনিক নজরদারি।
এক জেলা থেকে অন্য জেলায় বদলি, কর্মস্থল পরিবর্তনের পর নতুন করে প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ এবং একের পর এক বিতর্কিত কর্মকাণ্ডের আলোচনা—এভাবেই জেলা পরিষদের সার্ভেয়ার মো. আল-আমিনকে ঘিরে বিভিন্ন সময়ে নানা অভিযোগ সামনে এসেছে। দিনাজপুর, নেত্রকোনা হয়ে বর্তমানে জামালপুর জেলা পরিষদে কর্মরত এই সরকারি কর্মচারীর বিরুদ্ধে ঘুষ গ্রহণ, প্রকল্প বরাদ্দের প্রলোভন দেখিয়ে অর্থ নেওয়া, কথিত নিয়োগ বাণিজ্য, সরকারি সম্পদ বিক্রি এবং খেয়াঘাট ইজারা প্রক্রিয়ায় অনিয়মের চেষ্টাসহ একাধিক গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। এসব অভিযোগের সত্যতা যাচাই এবং সংশ্লিষ্ট নথিপত্র পর্যালোচনা করে প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন অভিযোগকারীরা।
দিনাজপুরে দুদকের হাতে গ্রেপ্তার
আল-আমিনকে ঘিরে বিতর্কের সবচেয়ে আলোচিত অধ্যায় শুরু হয় দিনাজপুর জেলা পরিষদে কর্মরত থাকাকালে। ২০১৯ সালের ৫ নভেম্বর ঘুষ গ্রহণের অভিযোগে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) দিনাজপুর সমন্বিত জেলা কার্যালয়ের একটি দল তাঁকে আটক করে।
তৎকালীন সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, দিনাজপুর সদর উপজেলার এক নারী জেলা পরিষদের বাঙ্গীবেচা মৌজায় প্রায় সাড়ে ৯ শতক জমি লিজ নেওয়ার আবেদন করেছিলেন। ওই জমি লিজ দেওয়ার প্রক্রিয়ায় সার্ভেয়ার আল-আমিনের বিরুদ্ধে ২০ হাজার টাকা ঘুষ দাবি করার অভিযোগ ওঠে। অভিযোগকারীর দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে দুদক অভিযান চালিয়ে ঘুষের টাকা লেনদেনের সময় তাঁকে আটক করে। এ ঘটনায় তাঁর বিরুদ্ধে মামলা দায়েরের কথাও সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছিল।
এ ঘটনা সে সময় দিনাজপুরসহ বিভিন্ন মহলে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়। তবে ওই মামলার সর্বশেষ তদন্ত, বিচারিক কার্যক্রম এবং রায়ের বিষয়ে হালনাগাদ তথ্য পাওয়া যায়নি। ফলে মামলাটির বর্তমান অবস্থা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে যাচাই করা প্রয়োজন।
দিনাজপুরে দায়িত্ব পালনকালে জেলা পরিষদের জমি লিজ বন্দোবস্ত এবং বিভিন্ন প্রকল্পের নামে কয়েকজন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে অর্থ নেওয়ার অভিযোগও সামনে এসেছে। দিনাজপুরের পাওনাদারেরা অর্থ ফেরত পাওয়ার অপেক্ষায় দিন গুনছেন। অভিযোগকারীদের দাবি, জেলা পরিষদের জমি লিজ দেওয়া এবং উন্নয়নমূলক প্রকল্পে বরাদ্দ পাইয়ে দেওয়ার আশ্বাসে তাঁদের কাছ থেকে বিভিন্ন সময়ে অর্থ নেওয়া হয়েছিল।
তাঁদের অভিযোগ, প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী কাজ সম্পন্ন হয়নি। এমনকি দেওয়া অর্থও ফেরত পাননি তাঁরা। তৎকালীন জেলা পরিষদের দায়িত্বশীল কর্মকর্তা ও জনপ্রতিনিধিদের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগ করেও কাঙ্ক্ষিত প্রতিকার মেলেনি বলে দাবি ভুক্তভোগীদের।
নেত্রকোনায় যোগদানের পর নতুন করে অভিযোগ
দিনাজপুর থেকে বদলির পর আল-আমিন নেত্রকোনা জেলা পরিষদে যোগদান করেন। অভিযোগকারীদের ভাষ্য, সেখানে দায়িত্ব গ্রহণের পর ঠিকাদার ও বিভিন্ন প্রকল্পসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ গড়ে তোলেন তিনি। একপর্যায়ে জেলা পরিষদের উন্নয়ন প্রকল্পে বরাদ্দ পাইয়ে দেওয়ার আশ্বাস দিয়ে বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে আর্থিক লেনদেনের অভিযোগ ওঠে।
বিশেষ করে নেত্রকোনা সদরসহ বিভিন্ন উপজেলার মসজিদ ও মন্দিরের উন্নয়ন প্রকল্পের বরাদ্দ দেওয়ার কথা বলে একাধিক ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের কমিটির সভাপতির কাছ থেকে কয়েক লাখ টাকা নেওয়ার অভিযোগ করেছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।
অভিযোগ রয়েছে, তৎকালীন জেলা পরিষদের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা নাইমা খন্দকারের সঙ্গে তাঁর সুসম্পর্কের বিষয়টি উল্লেখ করে বিভিন্ন ব্যক্তিকে প্রকল্প বরাদ্দের ব্যাপারে আশ্বস্ত করতেন তিনি। তবে প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তার সম্পৃক্ততা বা এ বিষয়ে তাঁর কোনো ভূমিকার প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
নেত্রকোনা জেলা পরিষদে কর্মরত থাকাকালে আল-আমিনের বিরুদ্ধে কথিত নিয়োগ বাণিজ্যের অভিযোগও উঠেছে। চাকরি দেওয়ার আশ্বাসে কয়েকজন চাকরিপ্রার্থীর কাছ থেকে অর্থ নেওয়া এবং ভুয়া নিয়োগপত্র তৈরির অভিযোগ করেছেন ভুক্তভোগীদের কেউ কেউ।
তাঁদের দাবি, চাকরি পাওয়ার আশায় তাঁরা আল-আমিনের দেওয়া আশ্বাসে বিশ্বাস করে অর্থ প্রদান করেছিলেন। কিন্তু পরবর্তী সময়ে প্রতিশ্রুত চাকরি না পাওয়ায় তাঁরা প্রতারণার শিকার হয়েছেন বলে অভিযোগ করেন।
এ ক্ষেত্রে কথিত নিয়োগপত্রের সত্যতা, নিয়োগসংক্রান্ত সরকারি নথি, অর্থ লেনদেনের প্রমাণ এবং সংশ্লিষ্ট চাকরিপ্রার্থীদের লিখিত অভিযোগ যাচাই করা অত্যন্ত জরুরি।
নেত্রকোনা জেলা পরিষদে দায়িত্ব পালনকালে সরকারি সম্পদ ব্যবস্থাপনা নিয়েও তাঁর বিরুদ্ধে একাধিক অভিযোগ সামনে এসেছে।
অভিযোগকারীরা দাবি করেছেন, জেলা পরিষদের নিয়ন্ত্রণাধীন মোটরসাইকেল বিক্রি, মোহনগঞ্জ উপজেলা ডাকবাংলোর কেয়ারটেকারের ব্যবহৃত সেট বিক্রি এবং কেন্দুয়া ডাকবাংলোর সরকারি গাছ বিক্রির মতো ঘটনায় তাঁর ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।
এসব অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণে জেলা পরিষদের সম্পদ নিবন্ধন, বিক্রয়সংক্রান্ত অনুমোদন, নিলাম বিজ্ঞপ্তি, কার্যবিবরণী ও আর্থিক হিসাব পরীক্ষা করা প্রয়োজন। সরকারি সম্পদ বিক্রির ক্ষেত্রে যথাযথ কর্তৃপক্ষের অনুমোদন ও বিধিবদ্ধ প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়েছিল কি না, সেটিও তদন্তের দাবি রাখে।
জামালপুরে স্ট্যান্ড রিলিজ, নতুন করে আলোচনায় আল-আমিন
নেত্রকোনা থেকে স্ট্যান্ড রিলিজের পর আল-আমিন জামালপুর জেলা পরিষদে যোগদান করেন। অভিযোগকারীদের ভাষ্য, নতুন কর্মস্থলেও তাঁকে ঘিরে নানা আলোচনা ও অসন্তোষ তৈরি হয়েছে।
জামালপুর জেলা পরিষদে দায়িত্ব পালনকালে তৎকালীন প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা খন্দকার আব্দুল্লাহ আল মাহমুদ বাবুর সঙ্গে তাঁর সম্পর্কের অবনতি ঘটে বলে সংশ্লিষ্ট কয়েকটি সূত্র দাবি করেছে। বর্তমানে তিনি ত্রাণ ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা মন্ত্রণালয়ে যুগ্ম সচিব হিসেবে কর্মরত বলে জানা গেছে।
অভিযোগ রয়েছে, জামালপুর জেলা পরিষদের বিভিন্ন প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত ও কার্যক্রমকে কেন্দ্র করে আল-আমিনের সঙ্গে তৎকালীন প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তার মতবিরোধ তৈরি হয়। তবে এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বক্তব্য ও দাপ্তরিক নথি ছাড়া কোনো পক্ষের ভূমিকা সম্পর্কে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর সুযোগ নেই।
খেয়াঘাট ইজারা নিয়ে রাজস্ব হারানোর শঙ্কা
বর্তমানে জামালপুর জেলা পরিষদের নিয়ন্ত্রণাধীন খেয়াঘাট ইজারা প্রক্রিয়া নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। অভিযোগকারীদের দাবি, সরকারি সম্ভাব্য ইজারামূল্যের তুলনায় কম মূল্যে খেয়াঘাট বন্দোবস্ত দেওয়ার লক্ষ্যে কিছু ঘাট ব্যবসায়ীর সঙ্গে সার্ভেয়ার আল-আমিনের কথাবার্তা ও দরকষাকষি চলছে।
তাঁদের আশঙ্কা, সরকারি নিয়মনীতি অনুসরণ না করে কম মূল্যে খেয়াঘাট ইজারা দেওয়া হলে সরকার বিপুল পরিমাণ রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হতে পারে।
এদিকে অভিযোগ রয়েছে, টেন্ডার প্রক্রিয়া দীর্ঘায়িত হওয়ায় প্রায় চার মাস ধরে খেয়াঘাট ইজারা কার্যক্রম সম্পন্ন করা সম্ভব হয়নি। টেন্ডারে অংশগ্রহণকারী কয়েকজন দরদাতা বা বিডারের জামানত ও সংশ্লিষ্ট কাগজপত্র জেলা পরিষদ কার্যালয়ে পড়ে রয়েছে বলে দাবি করা হচ্ছে। কার্যাদেশ পাওয়ার অপেক্ষায় সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা দিনের পর দিন কার্যালয়ে যোগাযোগ করছেন।
তবে খেয়াঘাট ইজারা বিলম্বের প্রকৃত কারণ কী, দরপত্র মূল্যায়নে কোনো প্রশাসনিক বা আইনগত জটিলতা রয়েছে কি না এবং কোনো কর্মকর্তা ইচ্ছাকৃতভাবে প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত করছেন কি না, তা জেলা পরিষদের নথিপত্র পর্যালোচনা ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বক্তব্যের মাধ্যমে পরিষ্কার হওয়া প্রয়োজন।
প্রশাসনিক নজরদারি ও তদন্তের দাবি
একজন সরকারি কর্মচারীর বিরুদ্ধে একাধিক কর্মস্থলে একই ধরনের অভিযোগ ওঠা নিঃসন্দেহে প্রশাসনের জন্য গুরুত্বের বিষয়। বিশেষ করে জেলা পরিষদের জমি, উন্নয়ন প্রকল্প, নিয়োগ কার্যক্রম, সরকারি সম্পদ এবং খেয়াঘাট ইজারার মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে কোনো কর্মচারীর বিরুদ্ধে অনিয়মের অভিযোগ উঠলে তা এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই।
জামালপুর জেলা পরিষদের বর্তমান প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মাসুদ রানার কাছে সংশ্লিষ্ট মহলের প্রত্যাশা, তিনি অভিযোগগুলো নিরপেক্ষভাবে যাচাই করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন। অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে বিভাগীয় তদন্ত, আর্থিক নিরীক্ষা এবং আইন অনুযায়ী যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে—এমনটাই প্রত্যাশা ভুক্তভোগী ও সচেতন মহলের।
কর্তৃপক্ষের কাছে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন
১. ২০১৯ সালে দুদকের হাতে আটক হওয়ার ঘটনায় দায়ের করা মামলার বর্তমান অবস্থা কী?
২. দিনাজপুরে জেলা পরিষদের জমি লিজ ও প্রকল্পের নামে অর্থ নেওয়ার অভিযোগগুলোর কোনো তদন্ত হয়েছে কি না?
৩. নেত্রকোনায় মসজিদ-মন্দিরের প্রকল্প বরাদ্দের নামে অর্থ গ্রহণ এবং কথিত নিয়োগ বাণিজ্যের অভিযোগের সত্যতা যাচাই হয়েছে কি না?
৪. জেলা পরিষদের মোটরসাইকেল, ডাকবাংলোর সরঞ্জাম ও সরকারি গাছ বিক্রির ক্ষেত্রে যথাযথ অনুমোদন ও নিলাম প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়েছিল কি না?
৫. জামালপুরের খেয়াঘাট ইজারা প্রক্রিয়ায় বিলম্বের কারণ কী এবং সরকারি রাজস্ব নিশ্চিত করতে কী পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে?
৬. বিভিন্ন কর্মস্থলে তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগগুলো একত্র করে কোনো বিভাগীয় তদন্ত পরিচালনা করা হয়েছে কি না?
শেষ কথা
জেলা পরিষদ কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর ব্যক্তিগত সম্পত্তি নয়। এটি জনগণের অর্থে পরিচালিত একটি সরকারি প্রতিষ্ঠান। এখানে জমি লিজ, উন্নয়ন প্রকল্প, সরকারি সম্পদ ব্যবস্থাপনা কিংবা ইজারা কার্যক্রম—প্রতিটি ক্ষেত্রেই স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা প্রশাসনের দায়িত্ব।
মো. আল-আমিনের বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগগুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত হওয়া প্রয়োজন। অভিযোগ সত্য হলে দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে হবে। আর অভিযোগের কোনো ভিত্তি না থাকলে সেটিও তদন্তের মাধ্যমে পরিষ্কার হওয়া উচিত।
আমরা জামালপুর জেলা পরিষদের বর্তমান প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মাসুদ রানাসহ সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণ করছি। সরকারি প্রতিষ্ঠানের সুনাম, জনগণের অর্থ এবং রাষ্ট্রীয় সম্পদ রক্ষায় অভিযোগগুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত ও প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ এখন সময়ের দাবি।
এ প্রতিবেদনে উল্লিখিত অভিযোগগুলোর বিষয়ে সার্ভেয়ার মো. আল-আমিনের বক্তব্য নিতে গেলে প্রতিবেদককে সংবাদটি প্রকাশ না করার জন্য অনুরোধ করেন।
মো. রাসেল ফকির-ময়মনসিংহ ব্যুরো প্রধান 
























