ঢাকা ০৫:৩৫ অপরাহ্ন, শনিবার, ৩১ অক্টোবর ২০২৬, ১৬ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম ::
সহকর্মীদের ভালোবাসা ও শুভকামনায় বিদায় সংবর্ধনা পেলেন পুলিশ পরিদর্শক আবু নোমান ভোলাহাটে বাড়িতে হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাটের অভিযোগ! হত্যার চেষ্টায় গুরুতর আহত যুবক! মিরসরাইয়ে প্রকল্পে ১ কোটি ১৮ লাখ টাকা আত্মসাৎ: আসামি ১৩ মধ্যরাতে গৃহবধূর বাসায় ভাঙচুর, টাকা-স্বর্ণালংকার লুটের অভিযোগ বাড্ডা থানার এসআই হানিফের বিরুদ্ধে জ্বালানি সংকটের দায় সরকারের নয়, বিরোধী দলের লং মার্চ অযৌক্তিক: রিজভী সাংবাদিক নূরে আলমের বাবা জাকির হোসেন আর নেই কুমিল্লা বোর্ডে ১৫ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পাস করেনি কেউ লিবিয়ার বন্দিদশা থেকে মুক্ত হয়ে দেশে ফিরে কৃতজ্ঞতা জানালেন ৫ যুবক ঢাকা-বরিশাল লংমার্চ, গোপালগঞ্জের ভাটিয়াপাড়ায় ১১ দলীয় ঐক্যের পথসভা গোপালগঞ্জে বিনা ধান-২৬ চাষে ব্যাপক ফলনের সাফল্য

কাঁচি-ট্রিমারে বদলায় মানুষের রূপ, বদলায় না তাড়াইলের নরসুন্দর শান্তর ভাগ্য

মানুষের বাহ্যিক অবয়ব পরিপাটি রাখা এবং সমসাময়িক ফ্যাশনে নিজেকে আকর্ষণীয় করে তোলার পেছনে যাদের অবদান অনস্বীকার্য, তারা হলেন আমাদের সমাজের নরসুন্দর বা ক্ষৌরকার সম্প্রদায়।

কিশোরগঞ্জের তাড়াইল উপজেলা সদরের বালিগাতী মোড়ের সাচাইল গ্রামের সাধারণ সেলুনে কর্মরত তরুণ কারিগর শ্রী শান্ত চন্দ্র শীলের কথাই ধরা যাক। সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত অক্লান্ত হাড়ভাঙা খাটুনি শেষে যা উপার্জন হয়, তা দিয়ে বর্তমানের ঊর্ধ্বমুখী বাজারে টিকে থাকা অত্যন্ত কঠিন। ছয় সদস্যের পরিবারের ভরণপোষণ জোগাতে তাকে নিয়মিত হিমশিম খেতে হচ্ছে।

শনিবার (৩১ অক্টোবর) এই প্রতিনিধির সঙ্গে কথা হয় নরসুন্দর শ্রী শান্ত চন্দ্র শীলের। তিনি আক্ষেপ করে বলেন, সারাদিনে গ্রাহকদের সেবা দিয়ে যা উপার্জন করি, তা দিয়ে এই চড়া মূল্যের বাজারে মাস পার করা অসম্ভব হয়ে পড়ে। কেবল ঈদ বা বড় কোনো সামাজিক উৎসবের সময়েই কিছুটা বাড়তি আয়ের মুখ দেখি, যা দিয়ে পেছনের বকেয়া ঋণ শোধ করতেই শেষ হয়ে যায়। তিনি আরও বলেন, কালের বিবর্তনে আমাদের কাজের পরিবেশ ও প্রযুক্তিতে আধুনিকতা এলেও, জীবনযাত্রার মান ও ভেতরের অন্তর্নিহিত কষ্টগুলো রয়ে গেছে আগের মতোই। সামাজিক অবহেলা আর আর্থিক টানাপোড়েন আজও আমাদের নিত্যদিনের সঙ্গী।

জানা যায়, এক সময় এই পেশাটি কেবল নির্দিষ্ট কিছু সনাতন ধর্মাবলম্বী পরিবারের ঐতিহ্যগত জীবিকা হলেও, বর্তমান যুগে ধর্মীয় ভেদাভেদ ভুলে সব শ্রেণির মানুষই এই শিল্পে যুক্ত হচ্ছেন। অতীতে দেখা যেত হাট-বাজারে বা রাস্তার ধারে গাছের ছায়ায় সামান্য একটা আয়না, কাঁচি, ক্ষুর আর একটি নড়বড়ে চেয়ার নিয়ে বসতেন নাপিতরা। প্রযুক্তির ছোঁয়ায় ও সময়ের আবর্তনে সেই চিরচেনা গ্রামীণ দৃশ্য এখন অনেকটাই বিলুপ্তপ্রায়। সনাতন কাঁচি বা ব্লেডের পাশাপাশি এখন সেলুনগুলোতে ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে আধুনিক ট্রিমার, ইলেকট্রিক শেভার, হেয়ার ড্রায়ারসহ নানাবিধ আধুনিক যন্ত্রপাতি ও প্রসাধনসামগ্রী। ফলে এটি এখন আর কেবল কোনো নির্দিষ্ট বংশগত পেশা হিসেবে সীমাবদ্ধ নেই, বরং অনেক শিক্ষিত তরুণও আধুনিক ‘জেন্টস পার্লার’ বা সুসজ্জিত সেলুন ব্যবসাকে একটি লাভজনক ও সম্মানজনক পেশা হিসেবে বেছে নিচ্ছেন।

তাড়াইল সরকারি মুক্তিযোদ্ধা কলেজের অধ্যক্ষ মুহাম্মাদ রফিকুল ইসলাম বলেন, অর্থনৈতিক সংকটের চেয়েও এই সম্প্রদায়ের বুকে বড় আঘাত হানে সমাজের নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি। আজও আমাদের সমাজব্যবস্থার একটি বড় অংশে এই পেশার মানুষকে অবজ্ঞার চোখে দেখা হয়। এই সামাজিক হীনমন্যতা ও লোকলজ্জার ভয়ে অনেকেই সমাজে নিজের পেশাগত পরিচয় দিতে চরম দ্বিধাবোধ করেন। এমনকি অনেক কর্মীকে লোকচক্ষুর অন্তরালে নিজের পরিবার বা আত্মীয়-স্বজনকেও লুকিয়ে রাখতে হয় যে তারা সেলুনে কাজ করছেন। একটি প্রগতিশীল ও সভ্য সমাজে বাস করেও কেন একজন মানুষকে তার সৎ শ্রমের পেশা নিয়ে লজ্জিত হতে হবে, এই মৌলিক প্রশ্নটি আজ আমাদের নাগরিক বিবেককে গভীরভাবে নাড়া দেয়।

Tag :

আপনার মতামত লিখুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল ও অন্যান্য তথ্য সঞ্চয় করে রাখুন

আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

সহকর্মীদের ভালোবাসা ও শুভকামনায় বিদায় সংবর্ধনা পেলেন পুলিশ পরিদর্শক আবু নোমান

কাঁচি-ট্রিমারে বদলায় মানুষের রূপ, বদলায় না তাড়াইলের নরসুন্দর শান্তর ভাগ্য

আপডেট সময় ০৪:০১:১৬ অপরাহ্ন, শনিবার, ৩১ অক্টোবর ২০২৬

মানুষের বাহ্যিক অবয়ব পরিপাটি রাখা এবং সমসাময়িক ফ্যাশনে নিজেকে আকর্ষণীয় করে তোলার পেছনে যাদের অবদান অনস্বীকার্য, তারা হলেন আমাদের সমাজের নরসুন্দর বা ক্ষৌরকার সম্প্রদায়।

কিশোরগঞ্জের তাড়াইল উপজেলা সদরের বালিগাতী মোড়ের সাচাইল গ্রামের সাধারণ সেলুনে কর্মরত তরুণ কারিগর শ্রী শান্ত চন্দ্র শীলের কথাই ধরা যাক। সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত অক্লান্ত হাড়ভাঙা খাটুনি শেষে যা উপার্জন হয়, তা দিয়ে বর্তমানের ঊর্ধ্বমুখী বাজারে টিকে থাকা অত্যন্ত কঠিন। ছয় সদস্যের পরিবারের ভরণপোষণ জোগাতে তাকে নিয়মিত হিমশিম খেতে হচ্ছে।

শনিবার (৩১ অক্টোবর) এই প্রতিনিধির সঙ্গে কথা হয় নরসুন্দর শ্রী শান্ত চন্দ্র শীলের। তিনি আক্ষেপ করে বলেন, সারাদিনে গ্রাহকদের সেবা দিয়ে যা উপার্জন করি, তা দিয়ে এই চড়া মূল্যের বাজারে মাস পার করা অসম্ভব হয়ে পড়ে। কেবল ঈদ বা বড় কোনো সামাজিক উৎসবের সময়েই কিছুটা বাড়তি আয়ের মুখ দেখি, যা দিয়ে পেছনের বকেয়া ঋণ শোধ করতেই শেষ হয়ে যায়। তিনি আরও বলেন, কালের বিবর্তনে আমাদের কাজের পরিবেশ ও প্রযুক্তিতে আধুনিকতা এলেও, জীবনযাত্রার মান ও ভেতরের অন্তর্নিহিত কষ্টগুলো রয়ে গেছে আগের মতোই। সামাজিক অবহেলা আর আর্থিক টানাপোড়েন আজও আমাদের নিত্যদিনের সঙ্গী।

জানা যায়, এক সময় এই পেশাটি কেবল নির্দিষ্ট কিছু সনাতন ধর্মাবলম্বী পরিবারের ঐতিহ্যগত জীবিকা হলেও, বর্তমান যুগে ধর্মীয় ভেদাভেদ ভুলে সব শ্রেণির মানুষই এই শিল্পে যুক্ত হচ্ছেন। অতীতে দেখা যেত হাট-বাজারে বা রাস্তার ধারে গাছের ছায়ায় সামান্য একটা আয়না, কাঁচি, ক্ষুর আর একটি নড়বড়ে চেয়ার নিয়ে বসতেন নাপিতরা। প্রযুক্তির ছোঁয়ায় ও সময়ের আবর্তনে সেই চিরচেনা গ্রামীণ দৃশ্য এখন অনেকটাই বিলুপ্তপ্রায়। সনাতন কাঁচি বা ব্লেডের পাশাপাশি এখন সেলুনগুলোতে ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে আধুনিক ট্রিমার, ইলেকট্রিক শেভার, হেয়ার ড্রায়ারসহ নানাবিধ আধুনিক যন্ত্রপাতি ও প্রসাধনসামগ্রী। ফলে এটি এখন আর কেবল কোনো নির্দিষ্ট বংশগত পেশা হিসেবে সীমাবদ্ধ নেই, বরং অনেক শিক্ষিত তরুণও আধুনিক ‘জেন্টস পার্লার’ বা সুসজ্জিত সেলুন ব্যবসাকে একটি লাভজনক ও সম্মানজনক পেশা হিসেবে বেছে নিচ্ছেন।

তাড়াইল সরকারি মুক্তিযোদ্ধা কলেজের অধ্যক্ষ মুহাম্মাদ রফিকুল ইসলাম বলেন, অর্থনৈতিক সংকটের চেয়েও এই সম্প্রদায়ের বুকে বড় আঘাত হানে সমাজের নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি। আজও আমাদের সমাজব্যবস্থার একটি বড় অংশে এই পেশার মানুষকে অবজ্ঞার চোখে দেখা হয়। এই সামাজিক হীনমন্যতা ও লোকলজ্জার ভয়ে অনেকেই সমাজে নিজের পেশাগত পরিচয় দিতে চরম দ্বিধাবোধ করেন। এমনকি অনেক কর্মীকে লোকচক্ষুর অন্তরালে নিজের পরিবার বা আত্মীয়-স্বজনকেও লুকিয়ে রাখতে হয় যে তারা সেলুনে কাজ করছেন। একটি প্রগতিশীল ও সভ্য সমাজে বাস করেও কেন একজন মানুষকে তার সৎ শ্রমের পেশা নিয়ে লজ্জিত হতে হবে, এই মৌলিক প্রশ্নটি আজ আমাদের নাগরিক বিবেককে গভীরভাবে নাড়া দেয়।