বরিশাল-কুয়াকাটা মহাসড়কে টোলের নামে চাঁদাবাজি, ক্ষুব্ধ পর্যটক ও যাত্রীরা
সূর্যোদয় ও সূর্যাস্তের বেলাভূমি, দেশের সর্বদক্ষিণের সাগরকন্যাখ্যাত পর্যটনকেন্দ্র কুয়াকাটা। দেশের অন্যতম এই পর্যটনকেন্দ্রটি দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় শহর পটুয়াখালী জেলার কলাপাড়া উপজেলার ১৮ কিলোমিটার উপকূলজুড়ে বিস্তৃত। পর্যটনকেন্দ্রে সড়কপথে যাতায়াতের একমাত্র যোগাযোগের মাধ্যম বরিশাল-কুয়াকাটা মহাসড়ক।
এই মহাসড়ক ধরেই প্রতিদিন হাজার হাজার পর্যটকের আগমন ঘটে সাগরকন্যা কুয়াকাটায়। মহাসড়কটি একদিকে যেমন সরু, অপরদিকে পৌর টোলের নামে অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের কারণে প্রতিনিয়ত ক্ষোভ বাড়ছে পর্যটক, যানবাহনের চালকসহ এ রুট দিয়ে যাতায়াতকারী সাধারণ যাত্রীদের মধ্যে।
সরেজমিনে দেখা গেছে, বরিশাল থেকে কুয়াকাটা মহাসড়কে প্রতিটি যানবাহনকে পাঁচশ টাকা অতিরিক্ত গুনতে হচ্ছে। মহাসড়কের পাঁচটি স্থানে সিটি ও পৌর টোলের নামে এই অর্থ আদায় করা হচ্ছে। ফলে এর প্রভাব পড়ছে যাত্রীদের ওপর। অতিরিক্ত অর্থ আদায় করা হচ্ছে যাত্রীদের কাছ থেকে। সূত্রমতে, বরিশাল থেকে কুয়াকাটাগামী প্রতিটি পরিবহনকে বরিশাল নগরীর রূপাতলী বাসস্ট্যান্ডে ৫০ টাকা সিটি টোল, পটুয়াখালী বাস টার্মিনালে ১০০ টাকা, আমতলী পৌর টোল ১০০ টাকা, কলাপাড়ায় ৫০ টাকা এবং কুয়াকাটা পৌর টোলের নামে ১০০ টাকা করে আদায় করা হচ্ছে। এ নিয়ে পর্যটক, চালক ও সাধারণ যাত্রীদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হলেও বিষয়টি দেখার যেন কেউ নেই।
পরিবহন সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, কুয়াকাটা থেকে এই পাঁচটি স্থান দিয়ে গাড়ি আসার সময় টোল দিতেই হবে। তাতে গাড়িতে যাত্রী থাকুক বা না থাকুক। কিংবা পৌরসভার বাস টার্মিনাল ব্যবহার হোক বা না হোক। টোল না দিয়ে আসার কোনো উপায় নেই। টোল না দিলে গাড়ি আটকে দেওয়া হয়। এমনকি চালক-সুপারভাইজারদের সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করছেন টোলের নামে চাঁদা আদায়কারীরা। তারা রসিদ দিয়ে এ টোল আদায় করছেন। তাতে অনেক সময় রসিদে স্বাক্ষর থাকে, আবার অনেক সময় স্বাক্ষরবিহীন রসিদ দিয়েই টাকা নেওয়া হচ্ছে।
পরিবহন সংশ্লিষ্টরা আরও জানিয়েছেন, গাড়িপ্রতি পাঁচশ টাকা অতিরিক্ত টোলের কারণে তাঁদেরও ব্যয় বৃদ্ধি পাচ্ছে। এজন্য গাড়িভাড়া বাড়িয়ে নিতে হচ্ছে। যার প্রভাব পড়ছে পর্যটকদের ভাড়ার ওপর।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ঢাকা থেকে কুয়াকাটা যেতে প্রথমেই দক্ষিণাঞ্চলের প্রবেশদ্বার গৌরনদী পৌরসভার ওপর দিয়ে যেতে হয় পরিবহনগুলোকে। সে ক্ষেত্রে গৌরনদী বাস টার্মিনাল থাকা সত্ত্বেও এখানে কোনো প্রকার টোল বা চাঁদা দিতে হয় না কাউকে। এ বিষয়ে গৌরনদী উপজেলা নির্বাহী অফিসার ও পৌর প্রশাসক মো. ইব্রাহীম জানিয়েছেন, মহাসড়ক দিয়ে চলাচলকারী পরিবহন থেকে পৌর টোল নেওয়ার কোনো সুযোগ নেই। এটা অন্যায়। এমনকি উজিরপুর, বাকেরগঞ্জ পৌরসভার ওপর দিয়ে পরিবহন যাতায়াত করলেও কোনো টোল দিতে হয় না কাউকে।
তবে এর উল্টো চিত্র দেখা গেছে বরিশাল নগরীর রূপাতলী, পটুয়াখালী, আমতলী, কলাপাড়া ও কুয়াকাটায়। এই পাঁচটি স্থান থেকে পরিবহন চললেই টোলের নামে চাঁদা দিতে হচ্ছে পরিবহনগুলোকে।
এ বিষয়ে বাংলাদেশ মফস্বল সাংবাদিক ফোরাম (বিএমএসএফ)-এর কেন্দ্রীয় যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক খোকন আহম্মেদ হীরা বলেন, পৌর টোলের নামে যে অর্থ আদায় করা হচ্ছে, তা কিসের ভিত্তিতে নেওয়া হচ্ছে, তার স্বচ্ছতা প্রয়োজন। মহাসড়কে গাড়ি থামিয়ে এভাবে টোল আদায়ের কোনো বৈধতা আছে কি না, তা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের খতিয়ে দেখা উচিত। গৌরনদী প্রেসক্লাবের সভাপতি জহুরুল ইসলাম জহির বলেন, গত ২২ অক্টোবর গৌরনদী প্রেসক্লাবের ‘ফ্যামিলি ডে’ উপলক্ষে কুয়াকাটা পর্যটনকেন্দ্রে গিয়েছিলাম প্রেসক্লাবের সদস্য ও তাঁদের পরিবার নিয়ে। ফিরতি পথে আমাদের বহনকারী গাড়ি থেকে পৌর টোল আদায় করা হয়েছে। মহাসড়কে এভাবে গাড়ি থামিয়ে পৌর টোল আদায় কোনোভাবেই কাম্য নয়।
বরিশাল সিটি করপোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মো. রেজাউল বারী বলেন, নগরীর রূপাতলী বাস টার্মিনাল এক বছরের জন্য ইজারা দেওয়া হয়েছে। বাস টার্মিনালের বাইরে সড়ক থেকে কাউকে টোল আদায়ের অনুমতি দেওয়া হয়নি। সিটি টোলের নামে চাঁদা আদায়ে আমরা কাউকে সড়ক ইজারা দিইনি।
আমতলী পৌর নির্বাহী কর্মকর্তা মো. আলাউদ্দিন জানিয়েছেন, মহাসড়কে যানবাহন থেকে পৌর টোল আদায় বন্ধে আমরা গণবিজ্ঞপ্তি জারি করেছি। এরপরও কেউ টোল আদায় করে কি না, তা জানা নেই। তবে কেউ টোল আদায় করলে খোঁজখবর নিয়ে বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে অবহিত করা হবে।
এ বিষয়ে জানতে কলাপাড়া উপজেলা নির্বাহী অফিসারের সরকারি মোবাইল নম্বরে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ না করায় তাঁর কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি। তবে কলাপাড়ার পৌর নির্বাহী কর্মকর্তা কাব্য লাল চক্রবর্তী জানিয়েছেন, শুধু কলাপাড়া বাসস্ট্যান্ড ইজারা দেওয়া হয়েছে। মহাসড়ক কাউকে ইজারা দেওয়া হয়নি। মহাসড়কে বাস থামিয়ে টাকা নেওয়ার কোনো সুযোগ নেই।
কুয়াকাটা পৌর টোলের বিষয়ে জানতে পৌরসভার ওয়েবসাইট সার্চ করেও কারও নম্বর পাওয়া যায়নি। যে কারণে তাঁদের কোনো বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি। এ বিষয়ে বরিশাল বিভাগীয় কমিশনার মো. খলিল আহমেদ বলেন, মহাসড়কে যানবাহন থামিয়ে টোল আদায়ের কোনো সুযোগ নেই। বিষয়টি খতিয়ে দেখে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
নিজস্ব প্রতিবেদক 























