চলতি বছরে এশিয়ার তৃতীয় বৃহত্তম অর্থনীতির দেশ ভারতের চেয়ে বাংলাদেশের মাথাপিছু মোট দেশজ উৎপাদন (জিডিপি) বেশি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে বলে জানিয়েছে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ)।
জিডিপি হলো নির্দিষ্ট সময়ে একটি দেশের ভেতরে উৎপাদিত সব পণ্য ও সেবার মোট আর্থিক মূল্য। সামগ্রিক জিডিপির আকারে ভারত বাংলাদেশের চেয়ে প্রায় আট গুণ বড় হলেও মোট জনসংখ্যা দিয়ে জিডিপি ভাগ করে হিসাব করা মাথাপিছু জিডিপিতে বিশ্বের সবচেয়ে জনবহুল দেশ ভারতকে পেছনে ফেলতে যাচ্ছে ১৭ কোটি ৫০ লাখ মানুষের দেশ বাংলাদেশ।
আইএমএফের প্রাক্কলন অনুযায়ী, ২০২৬ সালে বাংলাদেশের মাথাপিছু জিডিপি দাঁড়াবে ২ হাজার ৮৮৬ মার্কিন ডলারে। অন্যদিকে, ভারতের ক্ষেত্রে এই অঙ্ক হবে ২ হাজার ৭৪৭ ডলার। ১৯৭১ সালে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে স্বাধীনতা অর্জন করে বাংলাদেশ। গত দুই দশকে দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম সফল অর্থনীতি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে দেশটি। বর্তমানে বাংলাদেশের অর্থনীতি পাকিস্তানের চেয়েও বড়।
অর্থনীতিবিদদের মতে, বাংলাদেশের এই সাফল্যের পেছনে রয়েছে ৩৮ বিলিয়ন ডলারের তৈরি পোশাকশিল্প, প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্স এবং কর্মক্ষেত্রে নারীদের ক্রমবর্ধমান অংশগ্রহণ। তবে উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও জিডিপি প্রবৃদ্ধির ধীরগতি বর্তমানে এই অগ্রগতির ওপর চাপ সৃষ্টি করছে। চলতি বছরে ভারতের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ৭ শতাংশ হওয়ার সম্ভাবনা থাকলেও বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি নেমে আসতে পারে ৩ দশমিক ৬ শতাংশে।
তাহলে মাথাপিছু জিডিপিতে ভারতকে ছাড়িয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশ—এই তথ্যের প্রকৃত অর্থ কী? অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির এই হিসাব থেকে কী বোঝা যায়?
আইএমএফের প্রতিবেদনে কী আছে?
আইএমএফের ২০২৬ সালের অক্টোবরের ‘ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক আউটলুক’ প্রতিবেদনে দুটি বড় যুদ্ধের কারণে সৃষ্ট বৈশ্বিক মূল্যস্ফীতি ও জ্বালানি সংকটের প্রভাবে ভারত ও বাংলাদেশের অর্থনীতি কীভাবে প্রভাবিত হচ্ছে, তার একটি চিত্র উঠে এসেছে।
আইএমএফের প্রাক্কলন অনুযায়ী, ২০২৬ সালে বাংলাদেশের মোট জিডিপি হবে ৫০৬ দশমিক ৪ বিলিয়ন ডলার, আর ভারতের হবে ৪ দশমিক ১৫ ট্রিলিয়ন ডলার। তবে ক্রয়ক্ষমতার সমতা বা পারচেজিং পাওয়ার প্যারিটি (পিপিপি) বিবেচনায় মাথাপিছু জিডিপিতে ভারত এগিয়ে রয়েছে। পিপিপি সূচকে ভারতের মাথাপিছু জিডিপি ১২ হাজার ৯৯৮ ডলারের বিপরীতে বাংলাদেশের মাথাপিছু জিডিপি দাঁড়াবে ১০ হাজার ৮৮৪ ডলারে।
পিপিপি হলো একটি অর্থনৈতিক সূচক, যা স্থানীয় জীবনযাত্রার ব্যয় সমন্বয় করে মানুষের প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতা তুলনা করতে সহায়তা করে। এই সূচক অনুযায়ী, বাংলাদেশের নাগরিকদের তুলনায় ভারতীয়দের ক্রয়ক্ষমতা তুলনামূলক বেশি।
মূল্যস্ফীতির চিত্রে আইএমএফ জানিয়েছে, ভারতে গড় ভোক্তা মূল্যস্ফীতি ৫ শতাংশের মধ্যে থাকলেও বাংলাদেশে তা ৮ দশমিক ৭ শতাংশে পৌঁছাতে পারে। এতে বাংলাদেশে জীবনযাত্রার ব্যয়ের ওপর বাড়তি চাপের বিষয়টি স্পষ্ট হয়।
ভারতে ২০২৬ সালে ৭ শতাংশ প্রবৃদ্ধির প্রত্যাশা করা হলেও বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি হতে পারে ৩ দশমিক ৬ শতাংশ, যা ভারতের তুলনায় প্রায় অর্ধেক।
উন্নয়নশীল দেশগুলোতে গড় মাথাপিছু জিডিপি প্রায় ৭ হাজার ৭৪৬ ডলার এবং বৈশ্বিক গড় মাথাপিছু জিডিপি প্রায় ১৫ হাজার ৮৮৯ ডলার। সেই তুলনায় বাংলাদেশের মাথাপিছু জিডিপি ২ হাজার ৮৮৬ ডলার এবং ভারতের ২ হাজার ৭৪৭ ডলার।
কোন পথে বাংলাদেশ ও ভারতের অর্থনীতি?
আইএমএফের প্রাক্কলন অনুযায়ী, আগামী বছর বাংলাদেশের মাথাপিছু জিডিপি বেড়ে ৩ হাজার ২১৯ ডলারে পৌঁছাবে। অন্যদিকে, ভারতের মাথাপিছু জিডিপি হতে পারে ৩ হাজার ৩৬ ডলার। ফলে বাংলাদেশের এই ব্যবধান ২০২৮ সাল পর্যন্ত বজায় থাকবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
তবে বর্তমান প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৯ সালে ভারত আবারও বাংলাদেশকে ছাড়িয়ে যেতে পারে। ওই বছর ভারতের মাথাপিছু জিডিপি দাঁড়াতে পারে ৩ হাজার ৬৬১ ডলারে। অন্যদিকে, বাংলাদেশের মাথাপিছু জিডিপি থাকবে ৩ হাজার ৩৩৪ ডলারে।
বিশ্লেষকদের মতে, শুধু মাথাপিছু জিডিপি দিয়ে একটি দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি বোঝা সম্ভব নয়। কারণ, এই সূচক আয় ও সম্পদের বৈষম্যের চিত্র তুলে ধরে না। এ ছাড়া ডলারের বিপরীতে মুদ্রার বিনিময় হারের পরিবর্তনের কারণেও প্রকৃত উৎপাদন না বাড়লেও বা কমলেও এই পরিসংখ্যানে পরিবর্তন আসতে পারে।
গত দুই দশকে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি মূলত রপ্তানিমুখী পোশাকশিল্প ও প্রবাসী আয়ের ওপর নির্ভর করে গড়ে উঠেছে। অন্যদিকে, ভারত একটি বৈচিত্র্যময় অর্থনীতি বজায় রেখেছে, যেখানে শিল্প ও কৃষির পাশাপাশি সেবা খাত, প্রযুক্তিশিল্প এবং বৃহৎ অভ্যন্তরীণ বাজার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। তবে উভয় দেশেই প্রবৃদ্ধির সুফল ধনী পরিবারগুলোর মধ্যে বেশি কেন্দ্রীভূত হওয়ায় আয়বৈষম্য বেড়েছে।
বাংলাদেশ কি সফলতার নতুন উদাহরণ?
দক্ষিণ এশিয়ার অর্থনীতিতে বাংলাদেশ কি নতুন কোনো সফলতার উদাহরণ? এই প্রশ্নের জবাবে বিশ্লেষকদের কেউ কেউ ইতিবাচক মত দিলেও আয়বৈষম্য নিয়ে সতর্ক করেছেন।
ভারতীয় অর্থনীতিবিদ সন্তোষ মেহরোত্রা আল-জাজিরাকে জানান, জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার কমানোর পাশাপাশি বাংলাদেশ বার্ষিক গড়ে ৬ শতাংশ হারে টেকসই প্রবৃদ্ধি বজায় রেখেছে। বাংলাদেশের জিডিপিতে শিল্প উৎপাদনের অবদান ২০১৪ সালের ১৬ দশমিক ৬ শতাংশ থেকে বেড়ে ২০২৫ সালে ২২ শতাংশে উন্নীত হয়েছে।
বিশ্বব্যাংকের তথ্যমতে, ভারতের জিডিপিতে শিল্প খাতের অবদান ২০১৪ সালের ১৫ দশমিক ১ শতাংশ থেকে কমে ২০২৪ সালে ১৩ দশমিক ৫ শতাংশে নেমে এসেছে।
এদিকে, মধ্যপ্রাচ্যকেন্দ্রিক বৈশ্বিক উত্তেজনা এবং হরমুজ প্রণালীতে নৌযান চলাচলে বাধার কারণে তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) সংকটে পড়েছে বাংলাদেশ। কারণ, দেশটি তার ব্যবহৃত জ্বালানির ৯৫ শতাংশই আমদানি করে।
একই সঙ্গে লোহিত সাগর ও মধ্যপ্রাচ্যের নৌপথে বিঘ্ন সৃষ্টি হওয়ায় বাংলাদেশের মোট রপ্তানি আয়ের ৮০ শতাংশের বেশি জোগান দেওয়া তৈরি পোশাকশিল্পও আন্তর্জাতিক চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ছে।
নিজস্ব প্রতিবেদক 























