জনতা ব্যাংক পিএলসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) পদে নিয়োগের দৌড়ে এগিয়ে রয়েছেন ব্যাংকটির সাবেক উপব্যবস্থাপনা পরিচালক (ডিএমডি) মো. আশরাফুল আলম। বিভিন্ন সূত্রে এমনটাই জানা গেছে। তিনি বঙ্গবন্ধু পরিষদের জনতা ব্যাংক পিএলসির নতুন প্রাতিষ্ঠানিক কমিটির উপদেষ্টা ছিলেন। গত বছর তাকে জনতা ব্যাংকের ডিএমডি হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হলেও চলতি বছরের ২৫ জানুয়ারি তিনি অবসরে যান।
আশরাফুল আলম এর আগে জনতা ব্যাংক ভবন শাখায় মহাব্যবস্থাপক হিসেবে কর্মরত ছিলেন। আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ থেকে গত বছর জারি করা এক প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে তাকে ডিএমডি পদে নিয়োগ দেওয়া হয়।
১৯৬৭ সালে জয়পুরহাট জেলায় জন্মগ্রহণ করেন মো. আশরাফুল আলম। রাজশাহী ক্যাডেট কলেজ থেকে মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক সম্পন্ন করেন তিনি। পরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিন্যান্স ও ব্যাংকিং বিভাগ থেকে ১৯৯২ সালে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। ১৯৯৩ সালে সিনিয়র অফিসার হিসেবে জনতা ব্যাংকে যোগ দেন। কর্মজীবনে জনতা ব্যাংকের লোকাল শাখা, মতিঝিল করপোরেট, বৈদেশিক বিনিময় করপোরেট শাখা ও কামাল আতাতুর্ক শাখায় দায়িত্ব পালন করেন।
এদিকে বেক্সিমকো গ্রুপের প্রতিষ্ঠান ইয়েলো অ্যাপারেলস লিমিটেডের নামে জনতা ব্যাংক থেকে ৪১৬ কোটি ৩১ লাখ টাকা ঋণ অনুমোদন ও উত্তোলনের ঘটনায় ব্যাংকটির কয়েকজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে দুর্নীতি, জালিয়াতি ও অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ তদন্ত করছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)।
এ ঘটনায় জিজ্ঞাসাবাদ করা কর্মকর্তাদের মধ্যে মো. আশরাফুল আলমও রয়েছেন।
দুদক সূত্রে জানা গেছে, গত ১৭ জুলাই রাজধানীর সেগুনবাগিচায় দুদকের প্রধান কার্যালয়ে জনতা ব্যাংকের ১০ জন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। দুদকের উপপরিচালক মুহাম্মদ জয়নাল আবেদীনের নেতৃত্বে একটি যৌথ তদন্ত দল এ জিজ্ঞাসাবাদ করে।
দুদকের অভিযোগ, অভিযুক্ত কর্মকর্তারা ক্ষমতার অপব্যবহার করে পরস্পরের যোগসাজশে প্রতারণা ও জালিয়াতির মাধ্যমে ইয়েলো অ্যাপারেলস লিমিটেডের নামে জনতা ব্যাংকের স্থানীয় শাখা থেকে রপ্তানি উন্নয়ন তহবিল (ইডিএফ) স্কিমের আওতায় ৪১৬ কোটি ৩১ লাখ টাকা ঋণ অনুমোদন ও উত্তোলনের সুযোগ করে দেন।
তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্রের ভাষ্য, প্রতিষ্ঠানটির পরিচালকদের ব্যবসা পরিচালনায় পূর্ব অভিজ্ঞতা না থাকলেও তাঁদের নামে বিপুল অঙ্কের ঋণ অনুমোদন করা হয়। পরে ঋণপত্রের (এলসি) মাধ্যমে নিজেদের মধ্যে পণ্য আমদানি-রপ্তানির দেখানো লেনদেনের বিপরীতে অ্যাকোমোডেশন বিল তৈরি করে অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ রয়েছে।
এ ঘটনায় চলতি বছরের ৫ জানুয়ারি বেক্সিমকো গ্রুপের চেয়ারম্যান সোহেল এফ রহমানসহ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে মামলা করে দুদক। মামলায় দণ্ডবিধির প্রতারণা, জালিয়াতি ও অপরাধমূলক বিশ্বাসভঙ্গসংক্রান্ত ধারা, দুর্নীতি প্রতিরোধ আইন এবং মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইনে অভিযোগ আনা হয়েছে।
দুদক জানিয়েছে, মামলার তদন্তের স্বার্থে পর্যায়ক্রমে সংশ্লিষ্ট অন্য ব্যক্তিদেরও জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে। তদন্ত শেষে আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করা হবে।
এদিকে জনতা ব্যাংকের এমডি পদে পদোন্নতি প্রত্যাশী একজন ডেপুটি ম্যানেজিং ডিরেক্টর (ডিএমডি) নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “ফ্যাসিস্ট সরকারের আমলে সুবিধাভোগী হিসেবে পরিচিত ব্যক্তিদের ডেকে এনে যদি আবারও এমডি পদে নিয়োগ দেওয়া হয়, তাহলে দীর্ঘদিন ধরে ব্যাংকিং খাতে অভিজ্ঞতা অর্জনকারী যোগ্য কর্মকর্তারা বঞ্চিত হবেন। এতে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ পদোন্নতির পথ সংকুচিত হবে এবং কর্মকর্তাদের মধ্যে হতাশা তৈরি হবে।”
অন্য একজন পদোন্নতি প্রত্যাশী ডিএমডি অভিযোগ করেন, “বঙ্গবন্ধু পরিষদের কমিটিতে পদধারী ছিলেন—এমন ব্যক্তিদের নিয়োগের সুযোগ তৈরি করতে অবসর গ্রহণের পরও এমডি পদে নিয়োগ দেওয়ার বিধান রাখা হয়েছে বলে প্রশ্ন উঠেছে। আবার নির্দিষ্ট কাউকে নিয়োগের সুযোগ করে দিতে দুই বছরের অভিজ্ঞতার শর্ত শিথিল করার বিষয়টিও আলোচনায় এসেছে। এ ধরনের সিদ্ধান্তের ফলে নয়টি রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের জ্যেষ্ঠ ডিএমডিসহ অভিজ্ঞ কর্মকর্তাদের এমডি হওয়ার স্বাভাবিক সুযোগ সংকুচিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।”
তাঁদের মতে, এমডি নিয়োগের নীতিমালা প্রণয়ন ও সংশোধনের ক্ষেত্রে ব্যক্তিবিশেষের স্বার্থের পরিবর্তে স্বচ্ছতা, নিরপেক্ষতা, যোগ্যতা, অভিজ্ঞতা ও জ্যেষ্ঠতাকে যথাযথ গুরুত্ব দেওয়া উচিত। অন্যথায় রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর অভ্যন্তরীণ পদোন্নতি ব্যবস্থা, কর্মকর্তাদের মনোবল এবং প্রশাসনিক সুশাসন ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
নিজস্ব প্রতিবেদক 





















