ঢাকা ০৯:৫৬ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৭ অক্টোবর ২০২৬, ১২ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম ::
এনায়েত উল্লাহ আব্বাসীর বক্তব্য ও সাংবাদিক হত্যার প্রতিবাদে সিসকপের মানববন্ধন পঞ্চগড় জেলা পরিষদের ভারপ্রাপ্ত প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তার সঙ্গে প্রশাসকের শুভেচ্ছা বিনিময় পবিপ্রবির পরিবহন সংকট নিরসনে বিআরটিসির সঙ্গে চুক্তি স্বাক্ষর এনবিআরে যোগ দিতে গিয়ে জানলেন নিয়োগপত্র জাল নকশা লঙ্ঘন করে ভবন নির্মাণ, চট্টগ্রামে ৪ ভবনের অংশ ভাঙল সিডিএ, সিলগালা ২টি বরগুনায় ‘প্রতিষ্ঠা’ প্রকল্পের অবহিতকরণ সভা জিডিপিতে ভারতকে ছাড়াবে বাংলাদেশ, বাস্তবে লাভ কতটা? চার বছরে ২ হাজার ২৭৫ কোটি টাকা লোকসান, তবু লভ্যাংশ ঘোষণা তিতাসের মেট্রোরেলের চার প্যাকেজের চুক্তি সই, নির্মিত হবে ৮ স্টেশন জুলাই হত্যা মামলার আসামিরাও ডিএনসিসির বড় ঠিকাদার, ৫ আ.লীগ নেতার প্রতিষ্ঠানে ৮০৫ কোটি টাকার কাজ

জুলাই হত্যা মামলার আসামিরাও ডিএনসিসির বড় ঠিকাদার, ৫ আ.লীগ নেতার প্রতিষ্ঠানে ৮০৫ কোটি টাকার কাজ

আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে স্বেচ্ছাসেবক দল নেতা সাজেদুল ইসলাম সুমনকে গুমের স্বীকারোক্তি দিয়েছিলেন কিসমৎ হায়াৎ। তিনি ছাড়াও গত এক বছরে ডিএনসিসির ঠিকাদারি কাজের বড় একটি অংশ গেছে আ.লীগ নেতা ও তাদের ঘনিষ্ঠদের প্রতিষ্ঠানের হাতে।

দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নোয়াখালী-১ আসন থেকে আওয়ামী লীগের মনোনয়নপত্র সংগ্রহ করেন যুবলীগের শিল্প ও বাণিজ্যবিষয়ক সম্পাদক আবদুল হাই। সাত মাসের মাথায় জুলাই অভ্যুত্থানের পর ভারতে পালিয়ে যান। সেখান থেকে যান নেপালে। পরে দেশে ফিরে সক্রিয় হন কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের মিছিল-মিটিংয়ে। ২০২৫ সালের ৬ এপ্রিল রাজধানীর গুলিস্তান থেকে গ্রেপ্তার হন। মুগদা থানায় জুলাই হত্যাকাণ্ডের মামলার এই আসামি এখন ডিএনসিসির সবচেয়ে বড় ঠিকাদার। আবদুল হাইসহ জুলাই হত্যাকাণ্ডের মামলার আসামি পাঁচ আওয়ামী লীগ নেতার মালিকানাধীন বা সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানকে ৮০৫ কোটি টাকার কাজ দিয়েছে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি)।

২০২৫ সালের ১ জুলাই থেকে চলতি বছরের ৫ অক্টোবর। এই এক বছর তিন মাসে ২ হাজার ৭৭৭ কোটি টাকার ঠিকাদারি কাজ দিয়েছে ডিএনসিসি। এই সময়ে কাজ পাওয়া ১৯৩ প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ২৫টির হাতে গেছে মোট কাজের প্রায় ৭০ শতাংশ।

আবদুল হাইয়ের মতো আওয়ামী লীগ-সংশ্লিষ্ট অন্য ঠিকাদাররাও ডিএনসিসির বড় অঙ্কের কাজ পেয়েছেন। শুধু পাঁচ আওয়ামী লীগ নেতার ছয় প্রতিষ্ঠানকেই দেওয়া হয়েছে ৮০৫ কোটি টাকার কাজ। এটি একই সময়ে দেওয়া মোট কাজের প্রায় ২৯ শতাংশ।

পাঁচ আওয়ামী লীগ নেতার ছয় প্রতিষ্ঠান

ডিএনসিসির কাজ পাওয়া পাঁচ আওয়ামী লীগ নেতার ছয়টি প্রতিষ্ঠান হলো মাইশা কনস্ট্রাকশন লিমিটেড, এইচ এম হেলাল অ্যান্ড কোং লিমিটেড, আসিফ ইনফ্রাস্ট্রাকচার লিমিটেড, এম এস আলিফ ট্রেডার্স, ইউটোফিয়া কনস্ট্রাকশন অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং লিমিটেড ও জনি এন্টারপ্রাইজ। এর সবকটির মালিকদের বিরুদ্ধে জুলাই হত্যাকাণ্ডের মামলা রয়েছে।

আবদুল হাইয়ের বিরুদ্ধে ছাত্র-জনতার ওপর হামলার অভিযোগে মুগদা থানায় জুলাই হত্যাকাণ্ডের মামলা রয়েছে। এ ছাড়া পল্টন মডেল থানায় সন্ত্রাসবিরোধী আইনে দুটি মামলা আছে। দেশকে অস্থিতিশীল করতে গুলিস্তান ও পল্টন এলাকায় মিছিলে নেতৃত্ব দেওয়া এবং অর্থ জোগানোর অভিযোগে পল্টন মডেল থানায় এই দুই মামলা হয়।

মুগদা থানার মামলায় গ্রেপ্তারি পরোয়ানা থাকলেও সেটি গোপন করে পল্টন থানার সন্ত্রাসবিরোধী আইনের মামলায় জামিনে মুক্তি পান আবদুল হাই। তাঁর প্রতিষ্ঠান আসিফ ইনফ্রাস্ট্রাকচার লিমিটেড এখন ডিএনসিসির বড় ঠিকাদার।

আসিফ ইনফ্রাস্ট্রাকচারের একই ঠিকানায় রয়েছে এম এস আলিফ ট্রেডার্স। কাগজে-কলমে দুই প্রতিষ্ঠানের মালিক আলাদা। এম এস আলিফ ট্রেডার্সের লাইসেন্স আবদুল হাইয়ের ভাতিজা এবং অফিসের কর্মচারী আবু বক্কর সিদ্দিকের নামে। ওই লাইসেন্স ব্যবহার করে এবং আসিফ ইনফ্রাস্ট্রাকচারের মাধ্যমে একক ও যৌথভাবে কাজ করা হয়েছে। ২০২৫ সালের ১ জুলাই থেকে গত ৫ অক্টোবর পর্যন্ত এভাবে ডিএনসিসি থেকে ৫৭টি দরপত্রে ৩০২ কোটি টাকার কাজ পেয়েছে তারা।

সরেজমিনে দেখা যায়, নয়াপল্টনের ইনার সার্কুলার রোডের ৫০/১ নম্বর রিজ আহমেদ স্কয়ারের ১১ তলায় একই ফ্লোরে চারটি প্রতিষ্ঠানের কার্যালয়। এগুলো হলো আসিফ ইনফ্রাস্ট্রাকচার লিমিটেড, এম এস আলিফ ট্রেডার্স, জান্নাত ট্রেডার্স এবং ওয়াই অ্যান্ড এস ট্রেডিং। সবকটির লাইসেন্স নেওয়া হয় ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন থেকে।

এম এস আলিফ ট্রেডার্সের স্বত্বাধিকারী মোহাম্মদ আবু বক্কর সিদ্দিকি বলেন, ‘আমি চাচার কোম্পানিতে স্টাফ হিসেবে আছি। এম এস আলিফ ট্রেডার্সের লাইসেন্স আমার নামে করা। বাকি দুটি প্রতিষ্ঠানও আমাদের নামে।’

একই ঠিকানায় একাধিক প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্স নেওয়ার বিষয়ে কথা হয় ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের রাজস্ব কর্মকর্তা আতাহার আলী খানের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘একই ভবনের একই ফ্লোর ব্যবহার করে একাধিক ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের লাইসেন্স নেওয়া অনৈতিক। করপোরেশন থেকে এ ধরনের লাইসেন্স দেওয়া হয় না। এটি খতিয়ে দেখতে হবে যে তারা জালিয়াতির আশ্রয় নিয়ে একই ঠিকানায় একাধিক লাইসেন্স নিয়েছে কি না। এমন হয়ে থাকলে লাইসেন্স বাতিল করা হবে।’

পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, জুলাই অভ্যুত্থানের পর আবদুল হাই ভারত ও নেপালে পলাতক ছিলেন। পরে দেশে ফিরে সরকারবিরোধী নানা তৎপরতা শুরু করেন।

মাইশা কনস্ট্রাকশন লিমিটেডের মালিক মোহাম্মদ পারভেজ কাফরুল থানা আওয়ামী লীগের সহসভাপতি। মিরপুর মডেল থানায় তাঁর বিরুদ্ধে জুলাই হত্যাকাণ্ডের মামলা রয়েছে।

এইচ এম হেলাল অ্যান্ড কোং লিমিটেডের মালিক এইচ এম হেলাল। তিনি ডিএনসিসির ৩২ নম্বর ওয়ার্ডের সাবেক কাউন্সিলর ও মোহাম্মদপুর থানা আওয়ামী লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক হাবিবুর রহমান মিজান ওরফে পাগলা মিজানের ছোট ভাই। ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানটি তাদের পারিবারিক ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান।

২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর উত্তরা পশ্চিম থানায় হেলালের বিরুদ্ধে জুলাই হত্যাকাণ্ডের মামলা হয়। এজাহারে তাঁকে আওয়ামী লীগ নেতা হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

ঢাকা-১৩ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য ও আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য জাহাঙ্গীর কবির নানকের ঘনিষ্ঠ পাগলা মিজান। জুলাই অভ্যুত্থানের সময় মোহাম্মদপুর, আদাবর, শ্যামলী ও আসাদগেট এলাকায় ছাত্র-জনতার ওপর হামলার অভিযোগ আছে তাঁর বাহিনীর বিরুদ্ধে। তখন আওয়ামী লীগ ও দলটির অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীদের অস্ত্র ও অর্থ সরবরাহকারী হিসেবে পাগলা মিজানের নাম সামনে আসে। হেলালের বিরুদ্ধে আওয়ামী লীগ আমলে পাগলা মিজানের প্রভাবে ডিএনসিসি ও স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরে একচেটিয়া টেন্ডার বাণিজ্যের অভিযোগ রয়েছে।

জনি এন্টারপ্রাইজের স্বত্বাধিকারী দিলীপ কুমার ঘোষ। ভাটারা থানায় জুলাই হত্যাকাণ্ডের মামলার এজাহারে তাঁকে আওয়ামী লীগ নেতা হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। দিলীপ জাতীয় প্রেস ক্লাবের সাবেক সাধারণ সম্পাদক শ্যামল দত্তের ব্যবসায়িক অংশীদার।

ইউটোফিয়া কনস্ট্রাকশন অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং লিমিটেডের ৬০ ভাগ শেয়ারের মালিক ফরিদ আহমেদ ঢাকা মহানগর উত্তর আওয়ামী লীগের কার্যনির্বাহী সদস্য। বাকি ৪০ ভাগ স্ত্রী রামেহা আহমেদ রোজার নামে দিয়ে তাঁকে প্রতিষ্ঠানটির চেয়ারম্যান হিসেবে রাখা হয়েছে। ফরিদের বিরুদ্ধে ভাটারা থানায় জুলাই হত্যাকাণ্ডের মামলা রয়েছে।

২ হাজার ৭৭৭ কোটি টাকার কাজ

ই-জিপির তথ্য বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ১ জুলাই থেকে গত ৫ অক্টোবর পর্যন্ত ডিএনসিসিতে ৫৬৮টি কার্যাদেশ হয়েছে। এসব কাজের মোট মূল্য ২ হাজার ৭৭৭ কোটি টাকা। এর মধ্যে ৫২৫টি দরপত্রে ২ হাজার ৭৫৫ কোটি টাকার কাজ হয়েছে উন্মুক্ত দরপদ্ধতিতে (ওটিএম)।

সীমিত দরপদ্ধতিতে (এলটিএম) হয়েছে ৬৪ লাখ টাকার একটি কাজ। এ পদ্ধতিতে নির্দিষ্ট কিছু প্রতিষ্ঠানকে আমন্ত্রণ জানানো হয়। সিঙ্গেল সোর্স ও আরএফকিউ (কোটেশন চেয়ে কাজ দেওয়ার পদ্ধতি) পদ্ধতিতে ৪২টি কাজ হয়েছে ২০ কোটি ৪৮ লাখ টাকায়।

এসব দরপত্রে কাজ করেছে ১৯৩টি প্রতিষ্ঠান। এর মধ্যে ১০৪টি প্রতিষ্ঠান একটি করে কাজ পেয়েছে। একাধিক কাজ করেছে ৮৯টি। তাদের মধ্যে ২৫টি প্রতিষ্ঠান ২৪০টি দরপত্রে ১ হাজার ৯১০ কোটি টাকার কাজ করেছে। এটি মোট কাজের প্রায় ৭০ শতাংশ। এসব প্রতিষ্ঠানের বড় একটি অংশ আওয়ামী লীগ নেতাদের বা তাঁদের ঘনিষ্ঠদের প্রতিষ্ঠান।

বিশ্লেষণ অনুযায়ী, এক বছর তিন মাসে ডিএনসিসিতে এইচ এম হেলাল অ্যান্ড কোং লিমিটেড ২৪টি দরপত্রে ১৮৭ কোটি ২৫ লাখ টাকার কাজ করেছে। মাইশা কনস্ট্রাকশন লিমিটেড ১৩টি দরপত্রে ১৫৫ কোটি ৭২ লাখ টাকার কাজ করেছে। আসিফ ইনফ্রাস্ট্রাকচার লিমিটেড করেছে ১২৮ কোটি ১১ লাখ টাকার কাজ।

আসিফ ইনফ্রাস্ট্রাকচার লিমিটেড এবং এম এস আলিফ ট্রেডার্স যৌথভাবে ১৪টি দরপত্রে ১৩৮ কোটি ১১ লাখ টাকার কাজ করেছে। এম এস আলিফ ট্রেডার্স এককভাবে ১৯টি দরপত্রে করেছে ৩৬ কোটি টাকার কাজ। দুই প্রতিষ্ঠানের ঠিকানা নয়াপল্টনের ইনার সার্কুলার রোডের ৫০/১ রিজ আহমেদ স্কয়ারের ১১ তলা।

জনি এন্টারপ্রাইজ চারটি দরপত্রে ৯৯ কোটি ৮৬ লাখ টাকার কাজ পেয়েছে। সোহেল ইঞ্জিনিয়ারিং আটটি দরপত্রে ১০৬ কোটি টাকার, জামান কনসোর্টিয়াম ১১টি দরপত্রে ৯৮ কোটি ২৫ লাখ টাকার এবং এমআর এন্টারপ্রাইজ পাঁচটি দরপত্রে ৮৪ কোটি ১১ লাখ টাকার কাজ পেয়েছে। এর মধ্যে জামান কনসোর্টিয়ামের মালিক মো. কামরুজ্জামান ভূঁইয়া আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট।

২৫ প্রতিষ্ঠানের দখলে ৭০ ভাগ কাজ

জুলাই অভ্যুত্থানের পর ডিএনসিসিতে প্রশাসকের দায়িত্ব পান মোহাম্মদ এজাজ। ২০২৫ সালের ৯ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত প্রায় এক বছর দায়িত্বে ছিলেন তিনি। গত নির্বাচনে বিএনপি ক্ষমতায় এলে ২৩ ফেব্রুয়ারি তাঁর স্থলাভিষিক্ত হন বিএনপি নেতা শফিকুল ইসলাম মিল্টন।

ডিএনসিসিতে গত ২৩ ফেব্রুয়ারি থেকে ৫ অক্টোবর পর্যন্ত হওয়া ১ হাজার ৬৬৮ কোটি টাকার ৩৩০টি দরপত্র বিশ্লেষণ করেছে। এর মধ্যে ২৮৯টিতে ১ হাজার ৬৪৭ কোটি টাকার কাজ হয়েছে উন্মুক্ত দরপদ্ধতিতে। সিঙ্গেল সোর্স ও আরএফকিউ পদ্ধতিতে ২০ কোটি ৩৮ লাখ টাকার ৪১টি কাজ হয়েছে। এ সময়ে ২৫টি প্রতিষ্ঠান ১১৭টি দরপত্রে ১ হাজার ১৪৬ কোটি টাকার কাজ করেছে। এটি মোট কাজের প্রায় ৭০ শতাংশ।

একই সময়ে মাইশা কনস্ট্রাকশন লিমিটেড ১২টি দরপত্রে ১৪৮ কোটি ৪৭ লাখ টাকার কাজ পেয়েছে। এইচ এম হেলাল অ্যান্ড কোং লিমিটেড ১৪টি দরপত্রে পেয়েছে ১২৬ কোটি টাকার কাজ। আসিফ ইনফ্রাস্ট্রাকচার লিমিটেড ১৮টি দরপত্রে ৮৮ কোটি ৮৯ লাখ টাকার কাজ পেয়েছে।

আসিফ ইনফ্রাস্ট্রাকচার লিমিটেড ও এম এস আলিফ ট্রেডার্স যৌথভাবে সাতটি দরপত্রে ৮০ কোটি ৬১ লাখ টাকার কাজ করেছে। এম এস আলিফ ট্রেডার্স এককভাবে ১৪টিতে করেছে ৩১ কোটি টাকার কাজ। মেসার্স শহীদ ব্রাদার্স আটটিতে ৫৫ কোটি ৪৭ লাখ টাকার কাজ করেছে।

চলতি অর্থবছরে ঢাকা মহানগর উত্তর আওয়ামী লীগের কার্যনির্বাহী সদস্য ফরিদ আহমেদের ডিএনসিসির ইউটোফিয়া কনস্ট্রাকশন অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং লিমিটেড ৬০ কোটি ৫৮ লাখ টাকার তিনটি দরপত্র ইউটোফিয়া কনস্ট্রাকশন অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং লিমিটেড। প্রতিষ্ঠানটি ঢাকা মহানগর উত্তর আওয়ামী লীগের কার্যনির্বাহী সদস্য ফরিদ আহমেদের। গত ২ জুলাই একই দিনে তিনটি দরপত্রের চুক্তি হয়। আ.লীগ আমলে তিনি মাল্টি ইন্টারন্যাশনাল নামে প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্স ব্যবহার করে ঠিকাদারি করতেন।

নৌবাহিনীর প্রতিষ্ঠান ডকইয়ার্ড অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং ওয়ার্কস লিমিটেড পাঁচটি দরপত্রে ৫২ কোটি ৮৬ লাখ টাকার কাজ পেয়েছে। এমআর এন্টারপ্রাইজ তিনটিতে পেয়েছে ৫২ কোটি ১২ লাখ টাকার কাজ। সোহেল ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড কনস্ট্রাকশন লিমিটেড পাঁচটি দরপত্রে ৪৯ কোটি ৪৬ লাখ টাকার, জামান কনসোর্টিয়াম লিমিটেড পাঁচটিতে ৪৪ কোটি ৬৩ লাখ এবং ইয়াসিন ইনফ্রাস্ট্রাকচার প্রাইভেট লিমিটেড পাঁচটিতে ৪৩ কোটি ৬৪ লাখ টাকার কাজ পেয়েছে।

মেসার্স লরিন এন্টারপ্রাইজ ছয়টি দরপত্রে ৩৪ কোটি ১৯ লাখ টাকার কাজ পেয়েছে। হৃদয় কনস্ট্রাকশন লিমিটেড পাঁচটিতে পেয়েছে ২৬ কোটি ১৩ লাখ টাকার কাজ। এসএবি-ওয়াইআইপিএল যৌথ উদ্যোগ একটি দরপত্রে ২৫ কোটি ২৪ লাখ টাকার কাজ পেয়েছে।

এস এম রহমান ইন্টারন্যাশনাল চারটি দরপত্রে পেয়েছে ২৫ কোটি টাকার কাজ। আরএনএল-এইচটিবিএল যৌথ উদ্যোগ একটি কাজে ২৪ কোটি ৭৯ লাখ টাকার এবং জনি এন্টারপ্রাইজ লিমিটেড একটি দরপত্রে ২৪ কোটি ৪০ লাখ টাকার কাজ পেয়েছে।

করপোরেশন সূত্র বলছে, ডিএনসিসিতে আওয়ামী লীগ আমলের প্রকৌশল ঠিকাদারের সিন্ডিকেট এখনো বহাল তবিয়তে রয়েছে। জুলাই অভ্যুত্থানের পর দুজন প্রশাসক এলেও তাঁরাও সিন্ডিকেটের সঙ্গে মিলে দরপত্র দেওয়া অব্যাহত রাখেন।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ডিএনসিসির সাতজন ঠিকাদার ও প্রকৌশলীর সঙ্গে কথা বলে জানা যায়। তাঁদের দাবি, ই-জিপিতে এসএলটি ও টিডিএসের ভিত্তিতে কাজ দেওয়া হলেও সেখানে ডিজিটাল জালিয়াতি হয়। তবে এটি শুধু এখানেই নয়, সব সরকারি প্রতিষ্ঠানেই হয়।

ঠিকাদার ও প্রকৌশলীরা বলছেন, ক্রয়কারী সংস্থা (প্রকিউরিং এনটিটি বা পিই) পছন্দের ঠিকাদারদের কাজ দিতে দরপত্র খোলার পর টিডিএসের (টেন্ডার ডেটা শিট) শর্ত যাচাইয়ের সময় অনানুষ্ঠানিকভাবে এক্সেল শিটে এসএলটি পরিমাপ করে। কোনোভাবে পছন্দের ঠিকাদার বাদ পড়লে তাঁকে প্রথম করার জন্য অন্য যোগ্য প্রতিযোগীদের বাদ দেওয়া হয়। বাদ দেওয়ার অজুহাত হয় টিডিএসের ছোটখাটো শর্ত পূরণ না হওয়া। পরে রেসপনসিভ ঠিকাদারদের এসএলটি পরিমাপ করা হয়।

অনেক সময় পিইর কাছ থেকে প্রাক্কলিত দর জেনে নিয়ে ঠিকাদাররা কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে দরপত্রে অংশ নেন। এতে নির্দিষ্ট কোম্পানির কাজ পাওয়া নিশ্চিত করতে দরপত্রে প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের দর কমবেশি করে দেওয়া হয়। দরপত্রে চাওয়া শর্ত, নিরীক্ষা প্রতিবেদন, সরাসরি যাচাইয়ের কোড এবং যন্ত্রপাতি যাচাইয়ের ক্ষেত্রেও জালিয়াতি হয় বলে দাবি তাঁদের। দরপত্র জমার দিনে ন্যাশনাল পাবলিক প্রকিউরমেন্ট অথরিটির (এনপিপিএ) তথ্য ধরে ঠিকাদার ও পিই যৌথভাবে পরিমাপ করে আনুমানিক কাছাকাছি দর ঠিক করেন।

প্রতিষ্ঠানের টেন্ডার ক্যাপাসিটির ক্ষেত্রেও জালিয়াতি হয় বলে দাবি করেন ঠিকাদার ও প্রকৌশলীরা। তাঁদের বক্তব্য, অনেক ক্ষেত্রে সিমিলার ক্যাপাসিটি (অনুরূপ কাজের সক্ষমতা) পূরণ না হলেও প্রকৌশলীরা সাধারণ ক্যাপাসিটি গ্রহণ করেন। আবার ক্যাপাসিটির পরিমাণ অনেক বেশি হলেও দরপত্রে তার অর্ধেক বা আরও কম দেখানো হয়। এসব জালিয়াতির মাধ্যমে পছন্দের ঠিকাদারদের দরপত্র দেওয়া হয়।

অভিযোগের বিষয়ে যোগাযোগ করা হলে ডিএনসিসির প্রশাসক শফিকুল ইসলাম মিল্টন বলেন, ‘সিটি করপোরেশনে দরপত্রের কার্যক্রম ইজিপিতে হয়। এখানে যারা এসএলটিতে ও টিডিএসে এগিয়ে থাকে তারা কাজ পায়। কোনো ধরনের ম্যানিপুলেশনের সুযোগ থাকে না। অনেক সময় যেসব ঠিকাদার যোগ্যতার অভাবে কাজ পায় না তারা ম্যানিপুলেশনের অভিযোগ তোলেন।’

Tag :

আপনার মতামত লিখুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল ও অন্যান্য তথ্য সঞ্চয় করে রাখুন

আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

এনায়েত উল্লাহ আব্বাসীর বক্তব্য ও সাংবাদিক হত্যার প্রতিবাদে সিসকপের মানববন্ধন

জুলাই হত্যা মামলার আসামিরাও ডিএনসিসির বড় ঠিকাদার, ৫ আ.লীগ নেতার প্রতিষ্ঠানে ৮০৫ কোটি টাকার কাজ

আপডেট সময় ০৮:০১:১৫ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৭ অক্টোবর ২০২৬

আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে স্বেচ্ছাসেবক দল নেতা সাজেদুল ইসলাম সুমনকে গুমের স্বীকারোক্তি দিয়েছিলেন কিসমৎ হায়াৎ। তিনি ছাড়াও গত এক বছরে ডিএনসিসির ঠিকাদারি কাজের বড় একটি অংশ গেছে আ.লীগ নেতা ও তাদের ঘনিষ্ঠদের প্রতিষ্ঠানের হাতে।

দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নোয়াখালী-১ আসন থেকে আওয়ামী লীগের মনোনয়নপত্র সংগ্রহ করেন যুবলীগের শিল্প ও বাণিজ্যবিষয়ক সম্পাদক আবদুল হাই। সাত মাসের মাথায় জুলাই অভ্যুত্থানের পর ভারতে পালিয়ে যান। সেখান থেকে যান নেপালে। পরে দেশে ফিরে সক্রিয় হন কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের মিছিল-মিটিংয়ে। ২০২৫ সালের ৬ এপ্রিল রাজধানীর গুলিস্তান থেকে গ্রেপ্তার হন। মুগদা থানায় জুলাই হত্যাকাণ্ডের মামলার এই আসামি এখন ডিএনসিসির সবচেয়ে বড় ঠিকাদার। আবদুল হাইসহ জুলাই হত্যাকাণ্ডের মামলার আসামি পাঁচ আওয়ামী লীগ নেতার মালিকানাধীন বা সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানকে ৮০৫ কোটি টাকার কাজ দিয়েছে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি)।

২০২৫ সালের ১ জুলাই থেকে চলতি বছরের ৫ অক্টোবর। এই এক বছর তিন মাসে ২ হাজার ৭৭৭ কোটি টাকার ঠিকাদারি কাজ দিয়েছে ডিএনসিসি। এই সময়ে কাজ পাওয়া ১৯৩ প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ২৫টির হাতে গেছে মোট কাজের প্রায় ৭০ শতাংশ।

আবদুল হাইয়ের মতো আওয়ামী লীগ-সংশ্লিষ্ট অন্য ঠিকাদাররাও ডিএনসিসির বড় অঙ্কের কাজ পেয়েছেন। শুধু পাঁচ আওয়ামী লীগ নেতার ছয় প্রতিষ্ঠানকেই দেওয়া হয়েছে ৮০৫ কোটি টাকার কাজ। এটি একই সময়ে দেওয়া মোট কাজের প্রায় ২৯ শতাংশ।

পাঁচ আওয়ামী লীগ নেতার ছয় প্রতিষ্ঠান

ডিএনসিসির কাজ পাওয়া পাঁচ আওয়ামী লীগ নেতার ছয়টি প্রতিষ্ঠান হলো মাইশা কনস্ট্রাকশন লিমিটেড, এইচ এম হেলাল অ্যান্ড কোং লিমিটেড, আসিফ ইনফ্রাস্ট্রাকচার লিমিটেড, এম এস আলিফ ট্রেডার্স, ইউটোফিয়া কনস্ট্রাকশন অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং লিমিটেড ও জনি এন্টারপ্রাইজ। এর সবকটির মালিকদের বিরুদ্ধে জুলাই হত্যাকাণ্ডের মামলা রয়েছে।

আবদুল হাইয়ের বিরুদ্ধে ছাত্র-জনতার ওপর হামলার অভিযোগে মুগদা থানায় জুলাই হত্যাকাণ্ডের মামলা রয়েছে। এ ছাড়া পল্টন মডেল থানায় সন্ত্রাসবিরোধী আইনে দুটি মামলা আছে। দেশকে অস্থিতিশীল করতে গুলিস্তান ও পল্টন এলাকায় মিছিলে নেতৃত্ব দেওয়া এবং অর্থ জোগানোর অভিযোগে পল্টন মডেল থানায় এই দুই মামলা হয়।

মুগদা থানার মামলায় গ্রেপ্তারি পরোয়ানা থাকলেও সেটি গোপন করে পল্টন থানার সন্ত্রাসবিরোধী আইনের মামলায় জামিনে মুক্তি পান আবদুল হাই। তাঁর প্রতিষ্ঠান আসিফ ইনফ্রাস্ট্রাকচার লিমিটেড এখন ডিএনসিসির বড় ঠিকাদার।

আসিফ ইনফ্রাস্ট্রাকচারের একই ঠিকানায় রয়েছে এম এস আলিফ ট্রেডার্স। কাগজে-কলমে দুই প্রতিষ্ঠানের মালিক আলাদা। এম এস আলিফ ট্রেডার্সের লাইসেন্স আবদুল হাইয়ের ভাতিজা এবং অফিসের কর্মচারী আবু বক্কর সিদ্দিকের নামে। ওই লাইসেন্স ব্যবহার করে এবং আসিফ ইনফ্রাস্ট্রাকচারের মাধ্যমে একক ও যৌথভাবে কাজ করা হয়েছে। ২০২৫ সালের ১ জুলাই থেকে গত ৫ অক্টোবর পর্যন্ত এভাবে ডিএনসিসি থেকে ৫৭টি দরপত্রে ৩০২ কোটি টাকার কাজ পেয়েছে তারা।

সরেজমিনে দেখা যায়, নয়াপল্টনের ইনার সার্কুলার রোডের ৫০/১ নম্বর রিজ আহমেদ স্কয়ারের ১১ তলায় একই ফ্লোরে চারটি প্রতিষ্ঠানের কার্যালয়। এগুলো হলো আসিফ ইনফ্রাস্ট্রাকচার লিমিটেড, এম এস আলিফ ট্রেডার্স, জান্নাত ট্রেডার্স এবং ওয়াই অ্যান্ড এস ট্রেডিং। সবকটির লাইসেন্স নেওয়া হয় ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন থেকে।

এম এস আলিফ ট্রেডার্সের স্বত্বাধিকারী মোহাম্মদ আবু বক্কর সিদ্দিকি বলেন, ‘আমি চাচার কোম্পানিতে স্টাফ হিসেবে আছি। এম এস আলিফ ট্রেডার্সের লাইসেন্স আমার নামে করা। বাকি দুটি প্রতিষ্ঠানও আমাদের নামে।’

একই ঠিকানায় একাধিক প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্স নেওয়ার বিষয়ে কথা হয় ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের রাজস্ব কর্মকর্তা আতাহার আলী খানের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘একই ভবনের একই ফ্লোর ব্যবহার করে একাধিক ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের লাইসেন্স নেওয়া অনৈতিক। করপোরেশন থেকে এ ধরনের লাইসেন্স দেওয়া হয় না। এটি খতিয়ে দেখতে হবে যে তারা জালিয়াতির আশ্রয় নিয়ে একই ঠিকানায় একাধিক লাইসেন্স নিয়েছে কি না। এমন হয়ে থাকলে লাইসেন্স বাতিল করা হবে।’

পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, জুলাই অভ্যুত্থানের পর আবদুল হাই ভারত ও নেপালে পলাতক ছিলেন। পরে দেশে ফিরে সরকারবিরোধী নানা তৎপরতা শুরু করেন।

মাইশা কনস্ট্রাকশন লিমিটেডের মালিক মোহাম্মদ পারভেজ কাফরুল থানা আওয়ামী লীগের সহসভাপতি। মিরপুর মডেল থানায় তাঁর বিরুদ্ধে জুলাই হত্যাকাণ্ডের মামলা রয়েছে।

এইচ এম হেলাল অ্যান্ড কোং লিমিটেডের মালিক এইচ এম হেলাল। তিনি ডিএনসিসির ৩২ নম্বর ওয়ার্ডের সাবেক কাউন্সিলর ও মোহাম্মদপুর থানা আওয়ামী লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক হাবিবুর রহমান মিজান ওরফে পাগলা মিজানের ছোট ভাই। ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানটি তাদের পারিবারিক ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান।

২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর উত্তরা পশ্চিম থানায় হেলালের বিরুদ্ধে জুলাই হত্যাকাণ্ডের মামলা হয়। এজাহারে তাঁকে আওয়ামী লীগ নেতা হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

ঢাকা-১৩ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য ও আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য জাহাঙ্গীর কবির নানকের ঘনিষ্ঠ পাগলা মিজান। জুলাই অভ্যুত্থানের সময় মোহাম্মদপুর, আদাবর, শ্যামলী ও আসাদগেট এলাকায় ছাত্র-জনতার ওপর হামলার অভিযোগ আছে তাঁর বাহিনীর বিরুদ্ধে। তখন আওয়ামী লীগ ও দলটির অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীদের অস্ত্র ও অর্থ সরবরাহকারী হিসেবে পাগলা মিজানের নাম সামনে আসে। হেলালের বিরুদ্ধে আওয়ামী লীগ আমলে পাগলা মিজানের প্রভাবে ডিএনসিসি ও স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরে একচেটিয়া টেন্ডার বাণিজ্যের অভিযোগ রয়েছে।

জনি এন্টারপ্রাইজের স্বত্বাধিকারী দিলীপ কুমার ঘোষ। ভাটারা থানায় জুলাই হত্যাকাণ্ডের মামলার এজাহারে তাঁকে আওয়ামী লীগ নেতা হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। দিলীপ জাতীয় প্রেস ক্লাবের সাবেক সাধারণ সম্পাদক শ্যামল দত্তের ব্যবসায়িক অংশীদার।

ইউটোফিয়া কনস্ট্রাকশন অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং লিমিটেডের ৬০ ভাগ শেয়ারের মালিক ফরিদ আহমেদ ঢাকা মহানগর উত্তর আওয়ামী লীগের কার্যনির্বাহী সদস্য। বাকি ৪০ ভাগ স্ত্রী রামেহা আহমেদ রোজার নামে দিয়ে তাঁকে প্রতিষ্ঠানটির চেয়ারম্যান হিসেবে রাখা হয়েছে। ফরিদের বিরুদ্ধে ভাটারা থানায় জুলাই হত্যাকাণ্ডের মামলা রয়েছে।

২ হাজার ৭৭৭ কোটি টাকার কাজ

ই-জিপির তথ্য বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ১ জুলাই থেকে গত ৫ অক্টোবর পর্যন্ত ডিএনসিসিতে ৫৬৮টি কার্যাদেশ হয়েছে। এসব কাজের মোট মূল্য ২ হাজার ৭৭৭ কোটি টাকা। এর মধ্যে ৫২৫টি দরপত্রে ২ হাজার ৭৫৫ কোটি টাকার কাজ হয়েছে উন্মুক্ত দরপদ্ধতিতে (ওটিএম)।

সীমিত দরপদ্ধতিতে (এলটিএম) হয়েছে ৬৪ লাখ টাকার একটি কাজ। এ পদ্ধতিতে নির্দিষ্ট কিছু প্রতিষ্ঠানকে আমন্ত্রণ জানানো হয়। সিঙ্গেল সোর্স ও আরএফকিউ (কোটেশন চেয়ে কাজ দেওয়ার পদ্ধতি) পদ্ধতিতে ৪২টি কাজ হয়েছে ২০ কোটি ৪৮ লাখ টাকায়।

এসব দরপত্রে কাজ করেছে ১৯৩টি প্রতিষ্ঠান। এর মধ্যে ১০৪টি প্রতিষ্ঠান একটি করে কাজ পেয়েছে। একাধিক কাজ করেছে ৮৯টি। তাদের মধ্যে ২৫টি প্রতিষ্ঠান ২৪০টি দরপত্রে ১ হাজার ৯১০ কোটি টাকার কাজ করেছে। এটি মোট কাজের প্রায় ৭০ শতাংশ। এসব প্রতিষ্ঠানের বড় একটি অংশ আওয়ামী লীগ নেতাদের বা তাঁদের ঘনিষ্ঠদের প্রতিষ্ঠান।

বিশ্লেষণ অনুযায়ী, এক বছর তিন মাসে ডিএনসিসিতে এইচ এম হেলাল অ্যান্ড কোং লিমিটেড ২৪টি দরপত্রে ১৮৭ কোটি ২৫ লাখ টাকার কাজ করেছে। মাইশা কনস্ট্রাকশন লিমিটেড ১৩টি দরপত্রে ১৫৫ কোটি ৭২ লাখ টাকার কাজ করেছে। আসিফ ইনফ্রাস্ট্রাকচার লিমিটেড করেছে ১২৮ কোটি ১১ লাখ টাকার কাজ।

আসিফ ইনফ্রাস্ট্রাকচার লিমিটেড এবং এম এস আলিফ ট্রেডার্স যৌথভাবে ১৪টি দরপত্রে ১৩৮ কোটি ১১ লাখ টাকার কাজ করেছে। এম এস আলিফ ট্রেডার্স এককভাবে ১৯টি দরপত্রে করেছে ৩৬ কোটি টাকার কাজ। দুই প্রতিষ্ঠানের ঠিকানা নয়াপল্টনের ইনার সার্কুলার রোডের ৫০/১ রিজ আহমেদ স্কয়ারের ১১ তলা।

জনি এন্টারপ্রাইজ চারটি দরপত্রে ৯৯ কোটি ৮৬ লাখ টাকার কাজ পেয়েছে। সোহেল ইঞ্জিনিয়ারিং আটটি দরপত্রে ১০৬ কোটি টাকার, জামান কনসোর্টিয়াম ১১টি দরপত্রে ৯৮ কোটি ২৫ লাখ টাকার এবং এমআর এন্টারপ্রাইজ পাঁচটি দরপত্রে ৮৪ কোটি ১১ লাখ টাকার কাজ পেয়েছে। এর মধ্যে জামান কনসোর্টিয়ামের মালিক মো. কামরুজ্জামান ভূঁইয়া আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট।

২৫ প্রতিষ্ঠানের দখলে ৭০ ভাগ কাজ

জুলাই অভ্যুত্থানের পর ডিএনসিসিতে প্রশাসকের দায়িত্ব পান মোহাম্মদ এজাজ। ২০২৫ সালের ৯ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত প্রায় এক বছর দায়িত্বে ছিলেন তিনি। গত নির্বাচনে বিএনপি ক্ষমতায় এলে ২৩ ফেব্রুয়ারি তাঁর স্থলাভিষিক্ত হন বিএনপি নেতা শফিকুল ইসলাম মিল্টন।

ডিএনসিসিতে গত ২৩ ফেব্রুয়ারি থেকে ৫ অক্টোবর পর্যন্ত হওয়া ১ হাজার ৬৬৮ কোটি টাকার ৩৩০টি দরপত্র বিশ্লেষণ করেছে। এর মধ্যে ২৮৯টিতে ১ হাজার ৬৪৭ কোটি টাকার কাজ হয়েছে উন্মুক্ত দরপদ্ধতিতে। সিঙ্গেল সোর্স ও আরএফকিউ পদ্ধতিতে ২০ কোটি ৩৮ লাখ টাকার ৪১টি কাজ হয়েছে। এ সময়ে ২৫টি প্রতিষ্ঠান ১১৭টি দরপত্রে ১ হাজার ১৪৬ কোটি টাকার কাজ করেছে। এটি মোট কাজের প্রায় ৭০ শতাংশ।

একই সময়ে মাইশা কনস্ট্রাকশন লিমিটেড ১২টি দরপত্রে ১৪৮ কোটি ৪৭ লাখ টাকার কাজ পেয়েছে। এইচ এম হেলাল অ্যান্ড কোং লিমিটেড ১৪টি দরপত্রে পেয়েছে ১২৬ কোটি টাকার কাজ। আসিফ ইনফ্রাস্ট্রাকচার লিমিটেড ১৮টি দরপত্রে ৮৮ কোটি ৮৯ লাখ টাকার কাজ পেয়েছে।

আসিফ ইনফ্রাস্ট্রাকচার লিমিটেড ও এম এস আলিফ ট্রেডার্স যৌথভাবে সাতটি দরপত্রে ৮০ কোটি ৬১ লাখ টাকার কাজ করেছে। এম এস আলিফ ট্রেডার্স এককভাবে ১৪টিতে করেছে ৩১ কোটি টাকার কাজ। মেসার্স শহীদ ব্রাদার্স আটটিতে ৫৫ কোটি ৪৭ লাখ টাকার কাজ করেছে।

চলতি অর্থবছরে ঢাকা মহানগর উত্তর আওয়ামী লীগের কার্যনির্বাহী সদস্য ফরিদ আহমেদের ডিএনসিসির ইউটোফিয়া কনস্ট্রাকশন অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং লিমিটেড ৬০ কোটি ৫৮ লাখ টাকার তিনটি দরপত্র ইউটোফিয়া কনস্ট্রাকশন অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং লিমিটেড। প্রতিষ্ঠানটি ঢাকা মহানগর উত্তর আওয়ামী লীগের কার্যনির্বাহী সদস্য ফরিদ আহমেদের। গত ২ জুলাই একই দিনে তিনটি দরপত্রের চুক্তি হয়। আ.লীগ আমলে তিনি মাল্টি ইন্টারন্যাশনাল নামে প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্স ব্যবহার করে ঠিকাদারি করতেন।

নৌবাহিনীর প্রতিষ্ঠান ডকইয়ার্ড অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং ওয়ার্কস লিমিটেড পাঁচটি দরপত্রে ৫২ কোটি ৮৬ লাখ টাকার কাজ পেয়েছে। এমআর এন্টারপ্রাইজ তিনটিতে পেয়েছে ৫২ কোটি ১২ লাখ টাকার কাজ। সোহেল ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড কনস্ট্রাকশন লিমিটেড পাঁচটি দরপত্রে ৪৯ কোটি ৪৬ লাখ টাকার, জামান কনসোর্টিয়াম লিমিটেড পাঁচটিতে ৪৪ কোটি ৬৩ লাখ এবং ইয়াসিন ইনফ্রাস্ট্রাকচার প্রাইভেট লিমিটেড পাঁচটিতে ৪৩ কোটি ৬৪ লাখ টাকার কাজ পেয়েছে।

মেসার্স লরিন এন্টারপ্রাইজ ছয়টি দরপত্রে ৩৪ কোটি ১৯ লাখ টাকার কাজ পেয়েছে। হৃদয় কনস্ট্রাকশন লিমিটেড পাঁচটিতে পেয়েছে ২৬ কোটি ১৩ লাখ টাকার কাজ। এসএবি-ওয়াইআইপিএল যৌথ উদ্যোগ একটি দরপত্রে ২৫ কোটি ২৪ লাখ টাকার কাজ পেয়েছে।

এস এম রহমান ইন্টারন্যাশনাল চারটি দরপত্রে পেয়েছে ২৫ কোটি টাকার কাজ। আরএনএল-এইচটিবিএল যৌথ উদ্যোগ একটি কাজে ২৪ কোটি ৭৯ লাখ টাকার এবং জনি এন্টারপ্রাইজ লিমিটেড একটি দরপত্রে ২৪ কোটি ৪০ লাখ টাকার কাজ পেয়েছে।

করপোরেশন সূত্র বলছে, ডিএনসিসিতে আওয়ামী লীগ আমলের প্রকৌশল ঠিকাদারের সিন্ডিকেট এখনো বহাল তবিয়তে রয়েছে। জুলাই অভ্যুত্থানের পর দুজন প্রশাসক এলেও তাঁরাও সিন্ডিকেটের সঙ্গে মিলে দরপত্র দেওয়া অব্যাহত রাখেন।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ডিএনসিসির সাতজন ঠিকাদার ও প্রকৌশলীর সঙ্গে কথা বলে জানা যায়। তাঁদের দাবি, ই-জিপিতে এসএলটি ও টিডিএসের ভিত্তিতে কাজ দেওয়া হলেও সেখানে ডিজিটাল জালিয়াতি হয়। তবে এটি শুধু এখানেই নয়, সব সরকারি প্রতিষ্ঠানেই হয়।

ঠিকাদার ও প্রকৌশলীরা বলছেন, ক্রয়কারী সংস্থা (প্রকিউরিং এনটিটি বা পিই) পছন্দের ঠিকাদারদের কাজ দিতে দরপত্র খোলার পর টিডিএসের (টেন্ডার ডেটা শিট) শর্ত যাচাইয়ের সময় অনানুষ্ঠানিকভাবে এক্সেল শিটে এসএলটি পরিমাপ করে। কোনোভাবে পছন্দের ঠিকাদার বাদ পড়লে তাঁকে প্রথম করার জন্য অন্য যোগ্য প্রতিযোগীদের বাদ দেওয়া হয়। বাদ দেওয়ার অজুহাত হয় টিডিএসের ছোটখাটো শর্ত পূরণ না হওয়া। পরে রেসপনসিভ ঠিকাদারদের এসএলটি পরিমাপ করা হয়।

অনেক সময় পিইর কাছ থেকে প্রাক্কলিত দর জেনে নিয়ে ঠিকাদাররা কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে দরপত্রে অংশ নেন। এতে নির্দিষ্ট কোম্পানির কাজ পাওয়া নিশ্চিত করতে দরপত্রে প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের দর কমবেশি করে দেওয়া হয়। দরপত্রে চাওয়া শর্ত, নিরীক্ষা প্রতিবেদন, সরাসরি যাচাইয়ের কোড এবং যন্ত্রপাতি যাচাইয়ের ক্ষেত্রেও জালিয়াতি হয় বলে দাবি তাঁদের। দরপত্র জমার দিনে ন্যাশনাল পাবলিক প্রকিউরমেন্ট অথরিটির (এনপিপিএ) তথ্য ধরে ঠিকাদার ও পিই যৌথভাবে পরিমাপ করে আনুমানিক কাছাকাছি দর ঠিক করেন।

প্রতিষ্ঠানের টেন্ডার ক্যাপাসিটির ক্ষেত্রেও জালিয়াতি হয় বলে দাবি করেন ঠিকাদার ও প্রকৌশলীরা। তাঁদের বক্তব্য, অনেক ক্ষেত্রে সিমিলার ক্যাপাসিটি (অনুরূপ কাজের সক্ষমতা) পূরণ না হলেও প্রকৌশলীরা সাধারণ ক্যাপাসিটি গ্রহণ করেন। আবার ক্যাপাসিটির পরিমাণ অনেক বেশি হলেও দরপত্রে তার অর্ধেক বা আরও কম দেখানো হয়। এসব জালিয়াতির মাধ্যমে পছন্দের ঠিকাদারদের দরপত্র দেওয়া হয়।

অভিযোগের বিষয়ে যোগাযোগ করা হলে ডিএনসিসির প্রশাসক শফিকুল ইসলাম মিল্টন বলেন, ‘সিটি করপোরেশনে দরপত্রের কার্যক্রম ইজিপিতে হয়। এখানে যারা এসএলটিতে ও টিডিএসে এগিয়ে থাকে তারা কাজ পায়। কোনো ধরনের ম্যানিপুলেশনের সুযোগ থাকে না। অনেক সময় যেসব ঠিকাদার যোগ্যতার অভাবে কাজ পায় না তারা ম্যানিপুলেশনের অভিযোগ তোলেন।’