দেশের কোনো থানায় বসে বিচার-সালিশ না করার নির্দেশ দিয়েছেন হাইকোর্ট। বিষয়টি মেহেরপুর সদর থানার ওসিসহ সব কর্মকর্তা-কর্মচারী অবগত থাকলেও, প্রতিদিনের ন্যায় এসআই স্বপন গত ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬ তারিখে থানায় সালিশ বৈঠক ডেকে ২ লাখ ৫০ হাজার টাকা জরিমানার মাধ্যমে একটি দাম্পত্য জীবনের সমাপ্তি ঘটিয়েছেন বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।
জানা যায়, গত ১৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ তারিখে মেহেরপুর চক্করপাড়ার প্রবাসী মো. সিরাজুল ইসলামের মেয়ে মোছা. খাদিজা খাতুনের সঙ্গে গাংনী পৌরসভার ১ নম্বর ওয়ার্ডের বাঁশবাড়িয়া দক্ষিণপাড়ার মো. একরামের ছেলে মো. রিন্টুর বিয়ে হয়। বিয়ের ২০ দিন পর দাম্পত্য কলহের কারণে তাঁরা আলাদা থাকতে শুরু করেন।
এই বিষয়ে তৃতীয় পক্ষের মাধ্যমে সুরাহা না করে গত ১১ সেপ্টেম্বর ২০২৬ তারিখ রাতে মেয়ের পক্ষ থেকে ২০ জন প্রতিনিধি ছেলের বাড়িতে যান। ছেলে কুষ্টিয়ায় একটি কোম্পানিতে চাকরির সুবাদে বাইরে থাকায়, মেয়ের পক্ষের লোকজন বিষয়টি সমাধানের জন্য ছেলের বাবাকে এক সপ্তাহের সময় বেঁধে দিয়ে আসেন। পরিবারকে অপমান করার উদ্দেশ্যে লোকজন আনা হয়েছে মনে করে ছেলে রাগ করে গত ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬ তারিখে কুষ্টিয়ার একটি কাজী অফিস থেকে স্ত্রীকে তালাক দেন এবং তালাকনামা তাঁর স্ত্রীর কাছে পাঠিয়ে দেন।
তালাকনামা পেয়ে গত ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬ তারিখে মেয়ে মেহেরপুর সদর থানায় যৌতুকের একটি এজাহার দায়ের করেন। মেয়ের পক্ষের লোকজনের পরামর্শে এজাহারটি মামলা হিসেবে নথিবদ্ধ না করে আপস-মীমাংসার উদ্যোগ নেওয়া হয়। এর ভিত্তিতে গত ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬ তারিখ সকাল ১০টা ৩০ মিনিটে উভয় পক্ষকে মোবাইলে ডেকে নেওয়া হয়। মেহেরপুর সদর থানার গোলঘরে বসিয়ে ২ লাখ ৫০ হাজার টাকার বিনিময়ে তাঁদের দাম্পত্য জীবনের ইতি টানেন ‘ডিভোর্স স্পেশালিস্ট’ হিসেবে পরিচিত এসআই স্বপন।
সালিশের শুরুতে উভয় পক্ষের বক্তব্য শোনেন। মেয়ে সংসার করতে চাইলেও তাঁর ইচ্ছাকে সম্মান না জানিয়ে এসআই স্বপন জরিমানার মাধ্যমে মীমাংসা করার প্রস্তাব দেন। মেয়ের পক্ষ ৪ লাখ টাকা দাবি করলে ছেলের পক্ষ ১ লাখ ৮০ হাজার টাকা দিতে সম্মত হয়। একপর্যায়ে এসআই স্বপন মধ্যস্থতাকারী হিসেবে ৩ লাখ টাকা নির্ধারণ করেন। ছেলের পক্ষ তা দিতে অস্বীকৃতি জানালে শেষ পর্যন্ত ২ লাখ ৫০ হাজার টাকায় রফা হয়।
এরপর ছেলের পক্ষ থেকে নগদ ৫০ হাজার টাকা সালিশকারীর হাতে দেওয়া হয় এবং বাকি ২ লাখ টাকা পরিশোধের জন্য ছেলের পিতা এক মাসের সময় নেন। সঙ্গে সঙ্গে একজন মহুরি ডেকে ৩০০ টাকার স্ট্যাম্পে আপসনামা লেখার নাম করে সাদা স্ট্যাম্পে বাদী, বিবাদী ও উপস্থিত ব্যক্তিবর্গের স্বাক্ষর করিয়ে তা এসআই স্বপনের কাছে রেখে দেওয়া হয়। বাকি ২ লাখ টাকা থানায় জমা দিয়ে ‘খোলা তালাক’সহ চূড়ান্ত মীমাংসা করা হবে বলে জানা গেছে।
এ বিষয়ে এসআই স্বপনের বক্তব্য জানতে চাইলে তিনি বলেন, হাইকোর্টের নির্দেশ সম্পর্কে তিনি অবগত আছেন। তিনি আরও বলেন, ‘এই আপস-মীমাংসা আমি করিনি। আমার উপস্থিতিতে দুই পক্ষের উপস্থিত গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গের ওপর ছেড়ে দিয়েছিলাম। তাঁরা আপস-মীমাংসা করেছেন।’
এ বিষয়ে মেহেরপুর জজ কোর্টের আইনজীবীর বক্তব্য নিতে গেলে তিনি বলেন, ‘আপস-মীমাংসা করার জন্য আদালতে লিগ্যাল এইডে একজন বিচারককে সরকার নিয়োগ দিয়ে রেখেছে। এরপরও হাইকোর্টের নির্দেশ অমান্য করে থানার ওসি বা দারোগা বাবুদের বিচার-সালিশ কেন করতে হবে? এ বিষয়টি প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষরা দেখেও না দেখার ভান করে’—বলে মন্তব্য করেন তিনি।
মেহেরপুর প্রতিনিধি 


















