ঢাকা ০৯:০৩ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৩১ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম ::
তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী ফিরোজ আলম ও স্টেনোগ্রাফার শহীদুলকে ঘিরে বদলি বাণিজ্য ও ঘুষের অভিযোগ গণতান্ত্রিক আন্দোলনের শহিদ-আহতদের পরিবারের পাশে দাঁড়াতে হবে: জাহিদ হোসেন সুপ্রিম কোর্টের সামনে ককটেল বিস্ফোরণ বড়লেখায় অবৈধভাবে টিলা কাটার সময় এক্সকাভেটর আটক ইরানি হামলায় ৪১৭ মার্কিন সেনা আহত, বহু যুদ্ধবিমান ধ্বংস শিমুলিয়া ইউনিয়ন ভূমি অফিসের নায়েব নাসিরউদ্দিনের বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ ঋণখেলাপি হওয়ায় পদ হারালেন রিহ্যাব সভাপতি আলী আফজাল আসিফের অর্থপাচারের সত্যতা পেতে প্রয়োজনে বিদেশে চিঠি দেবে দুদক অসুস্থ হয়েও রোগীর সেবায় ডা. ইরফান, পেলেন সম্মাননা কুমিল্লায় ১৮তম মিডিয়া ক্রিকেট টুর্নামেন্টের খেলোয়াড় রেজিস্ট্রেশন উদ্বোধন

তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী ফিরোজ আলম ও স্টেনোগ্রাফার শহীদুলকে ঘিরে বদলি বাণিজ্য ও ঘুষের অভিযোগ

  • নিজস্ব প্রতিবেদক
  • আপডেট সময় ০৮:৩৮:১১ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬
  • ৫১০ বার পড়া হয়েছে

জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের (ডিপিএইচই) চট্টগ্রাম সার্কেল, কুমিল্লা কার্যালয়কে ঘিরে বদলি বাণিজ্য, ঘুষ, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ভয়ভীতি প্রদর্শন, হয়রানি এবং জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। এসব অভিযোগের কেন্দ্রে রয়েছেন চট্টগ্রাম সার্কেল, কুমিল্লার তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী ফিরোজ আলম চৌধুরী এবং একই কার্যালয়ের স্টেনোগ্রাফার মোঃ শহীদুল ইসলাম। অভিযোগকারীদের দাবি, দীর্ঘদিন ধরে এই দুইজনের প্রভাব ও সমন্বয়ের মাধ্যমে কার্যালয়ের বিভিন্ন প্রশাসনিক কার্যক্রম, বিশেষ করে বদলি ও বিভিন্ন চাকরিসংক্রান্ত কাজে অর্থ লেনদেনের একটি প্রভাববলয় তৈরি হয়েছে।

তাদের বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক), স্থানীয় সরকার বিভাগ এবং জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলীর কাছে লিখিত অভিযোগ দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগপত্রের অনুলিপি ও সংশ্লিষ্ট নথি থেকে জানা গেছে। অভিযোগকারীদের দাবি, একাধিক দপ্তরে লিখিত অভিযোগ দেওয়ার পরও কার্যকর ব্যবস্থা না হওয়ায় সংশ্লিষ্টদের প্রভাব অব্যাহত রয়েছে।

অভিযোগপত্রে বলা হয়েছে, মোঃ শহীদুল ইসলাম ১৯৮৯ সাল থেকে চট্টগ্রাম সার্কেল, কুমিল্লা কার্যালয়ে স্টেনোগ্রাফার পদে কর্মরত। অভিযোগকারীদের হিসাবে প্রায় ৩৫ থেকে ৩৬ বছর ধরে একই কর্মস্থলে থাকার কারণে তিনি কার্যালয়ের ভেতরে ব্যাপক প্রভাব তৈরি করেছেন। অভিযোগে দাবি করা হয়েছে, স্টেনোগ্রাফার পদে কর্মরত হলেও তিনি অফিসের প্রধান সহকারীসহ বিভিন্ন কর্মকর্তা-কর্মচারীর ওপর প্রভাব বিস্তার করতেন এবং তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলীর কার্যালয়ের বিভিন্ন প্রশাসনিক কর্মকাণ্ডে তার প্রভাব ছিল।

অভিযোগকারীদের ভাষ্য অনুযায়ী, তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী ফিরোজ আলম চৌধুরী ও স্টেনোগ্রাফার শহীদুল ইসলামকে ঘিরেই বদলি ও অন্যান্য প্রশাসনিক কার্যক্রমে একটি প্রভাববলয় গড়ে ওঠে। অভিযোগে দাবি করা হয়েছে, চট্টগ্রাম সার্কেলের আওতাধীন চাঁদপুর থেকে কক্সবাজারের টেকনাফ পর্যন্ত বিভিন্ন জেলা ও উপজেলার কর্মচারীদের বদলি করিয়ে দেওয়ার নামে অর্থ লেনদেন করা হতো। অভিযোগকারীদের দাবি, প্রতি সপ্তাহেই এ ধরনের বদলি নিয়ে তদবির ও অর্থ লেনদেনের ঘটনা ঘটত এবং শহীদুল ইসলামের এ ক্ষেত্রে বিশেষ প্রভাব ছিল।

লিখিত অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, শহীদুল ইসলাম তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী ফিরোজ আলম চৌধুরীর নাম ব্যবহার করে সার্কেলাধীন বিভিন্ন কর্মচারীকে ফোন করতেন এবং টাকা নিয়ে অফিসে এসে দেখা করতে বলতেন। অভিযোগ অনুযায়ী, সরাসরি টাকা না দিলে শহীদুল ইসলামের মেয়ের নামে ব্যবহৃত একটি বিকাশ নম্বরে টাকা পাঠাতে বলা হতো।

অভিযোগকারীদের দাবি, শহীদুল ইসলামের কথামতো কাজ না করলে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের এক জেলা থেকে অন্য জেলায় শাস্তিমূলক বদলি, সাময়িক বরখাস্ত কিংবা বিভিন্নভাবে হয়রানির ভয় দেখানো হতো। অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, বিভিন্ন কর্মচারীর বিরুদ্ধে কথিত ভুয়া কাগজপত্রের মাধ্যমে অভিযোগ তৈরি করে তাদের হয়রানি ও বদলির ভয় দেখানো এবং পরবর্তী সময়ে অর্থ আদায়ের অভিযোগও রয়েছে।

অভিযোগপত্রে বলা হয়েছে, চট্টগ্রাম সার্কেলের আওতাধীন কর্মচারীদের পেনশন-সংক্রান্ত কাজে প্রত্যেকের কাছ থেকে ৫০ থেকে ৬০ হাজার টাকা, জিপিএফের চূড়ান্ত উত্তোলনের জন্য ১৫ থেকে ২০ হাজার টাকা এবং পিআরএল মঞ্জুরের জন্য ১০ থেকে ১৫ হাজার টাকা পর্যন্ত ঘুষ নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। এ ছাড়া বিভিন্ন পদের কর্মচারীদের কাছ থেকে পরিস্থিতি অনুযায়ী ৬০-৭০ হাজার টাকা থেকে শুরু করে এক লাখ টাকা পর্যন্ত নেওয়ার অভিযোগও করা হয়েছে।

অভিযোগকারীদের ভাষ্য, তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী ফিরোজ আলম চৌধুরীর নাম ও পদমর্যাদা ব্যবহার করে শহীদুল ইসলাম এসব অর্থ লেনদেন ও তদবিরের কাজ করতেন। অভিযোগের সত্যতা যাচাই করতে সংশ্লিষ্ট সময়ের ফোনকল, ব্যাংক ও মোবাইল আর্থিক সেবার লেনদেন, বদলি-সংক্রান্ত নথি এবং কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বক্তব্য তদন্তের দাবি জানিয়েছেন অভিযোগকারীরা।

দুদকে দেওয়া অভিযোগে দাবি করা হয়েছে, শহীদুল ইসলাম দীর্ঘদিন একই অফিসে কর্মরত থেকে নিজেকে প্রভাবশালী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। অভিযোগকারীদের ভাষ্য, তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য দুদক, স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় এবং জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলীর কাছে লিখিত অভিযোগ দেওয়া হলেও এখন পর্যন্ত কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।

শহীদুল ইসলামের বিরুদ্ধে জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের অভিযোগও আনা হয়েছে। অভিযোগপত্রে বলা হয়েছে, অনিয়ম, দুর্নীতি ও ঘুষের মাধ্যমে তিনি বিপুল সম্পদের মালিক হয়েছেন। অভিযোগকারীদের দাবি, তার নিজ জেলা বরিশাল সদর এলাকায় জমি ও দোতলা বাড়ি রয়েছে। কুমিল্লা শহরের কান্দিরপাড় এলাকায় একটি বহুতল ভবন নির্মাণাধীন রয়েছে বলেও অভিযোগ করা হয়েছে। অভিযোগে ভবনটির সাততলা হওয়ার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। এ ছাড়া ঢাকার আফতাবনগরে একটি ফ্ল্যাট এবং তার ও পরিবারের সদস্যদের নামে বিভিন্ন ব্যাংকে নগদ অর্থ, এফডিআর, সঞ্চয়পত্রসহ বিভিন্ন সম্পদ রয়েছে বলে অভিযোগ করা হয়েছে।

অভিযোগকারীরা এসব সম্পদের অর্থের উৎস এবং সম্পদগুলো বৈধ আয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কি না, তা তদন্তের দাবি জানিয়েছেন। একই সঙ্গে শহীদুল ইসলাম ও তার পরিবারের সদস্যদের নামে থাকা ব্যাংক হিসাব, এফডিআর, সঞ্চয়পত্র, জমি, বাড়ি, ফ্ল্যাটসহ অন্যান্য সম্পদের হিসাব অনুসন্ধানের দাবিও জানানো হয়েছে।

অভিযোগপত্রে আরও দাবি করা হয়েছে, শহীদুল ইসলাম কুমিল্লার সাবেক এলজিআরডি মন্ত্রী তাজুল ইসলাম এবং সাবেক সংসদ সদস্য আ.ক.ম. বাহাউদ্দিন বাহারের ঘনিষ্ঠজন ও আত্মীয় পরিচয় দিয়ে প্রভাব বিস্তার করতেন। তাকে দিয়ে পুরো জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর নিয়ন্ত্রণ করা হতো বলেও অভিযোগে দাবি করা হয়েছে।

২০২৪ সালের ১৭ নভেম্বর নোয়াখালী সদর এলাকার বাসিন্দা ও বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়ক হিসেবে পরিচয় দেওয়া মোঃ আবদুল হান্নানের স্বাক্ষরে প্রধান প্রকৌশলী, জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর এবং দুদক বরাবর পৃথক অভিযোগ দেওয়া হয়েছে বলে নথিতে দেখা যায়। ওই অভিযোগে ১৯৮৯ সাল থেকে একই কার্যালয়ে শহীদুল ইসলামের কর্মরত থাকার কথা উল্লেখ করে তার বিরুদ্ধে ঘুষ, বদলি বাণিজ্য, হয়রানি এবং জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের অভিযোগ এনে তদন্ত ও বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানানো হয়।

এরপর ২০২৫ সালের ৩ ফেব্রুয়ারি জিয়া উদ্দিন মোঃ রুবেল নামে এক ব্যক্তির স্বাক্ষরে দুদক ও স্থানীয় সরকার বিভাগের সচিব বরাবর একই ধরনের অভিযোগ দেওয়া হয় বলে নথিতে উল্লেখ রয়েছে। ওই অভিযোগে নিজেকে কুমিল্লা সদর এলাকার স্থায়ী বাসিন্দা হিসেবে পরিচয় দিয়ে তিনি শহীদুল ইসলামের বিরুদ্ধে অনিয়ম, দুর্নীতি, ঘুষ ও বদলি বাণিজ্যের অভিযোগ আনেন। অভিযোগে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জিম্মি করা, তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলীর নাম ব্যবহার করে টাকা আদায়, পেনশন ও জিপিএফ-সংক্রান্ত কাজে ঘুষ নেওয়া এবং সম্পদ অর্জনের অভিযোগ করা হয়।

অভিযোগের একটি অংশে বলা হয়েছে, শহীদুল ইসলামের বিরুদ্ধে বিভিন্ন কর্মচারীর নামে অভিযোগ সৃষ্টি করে তাদের শাস্তিমূলক বদলি বা সাময়িক বরখাস্তের ভয় দেখানো হতো। এরপর তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলীর নাম ব্যবহার করে তাদের কাছ থেকে অর্থ নেওয়া হতো বলে অভিযোগকারীদের দাবি।

এদিকে অভিযোগগুলোর সময়কাল ও সাম্প্রতিক প্রশাসনিক কার্যক্রমের মধ্যে বদলি-সংক্রান্ত একাধিক অফিস আদেশও পাওয়া গেছে। তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলীর কার্যালয়, জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর, চট্টগ্রাম সার্কেল, কুমিল্লা থেকে ১৫ আগস্ট ২০২৬ তারিখে জারি করা একটি অফিস আদেশে চকরিয়া ও পেকুয়া উপজেলার দুই অফিস সহকারী-কাম-কম্পিউটার মুদ্রাক্ষরিককে পরস্পর বদলি করা হয়েছে।

১৭ আগস্ট ২০২৬ তারিখের আরেক অফিস আদেশে লক্ষ্মীপুর সদর, বোয়ালখালী ও কর্ণফুলী উপজেলার তিন মেকানিককে যথাক্রমে রায়পুর, কর্ণফুলী ও চাটখিল উপজেলায় বদলি করা হয়েছে।

৩০ আগস্ট ২০২৬ তারিখে জারি করা আরও একটি অফিস আদেশে রাঙ্গুনিয়া উপজেলার মেকানিক মোঃ আহসানুল হককে ফটিকছড়ি উপজেলায় এবং ফটিকছড়ি উপজেলার মেকানিক দয়াল দে ও পাপড়ি দাশ গুপ্তাকে ফটিকছড়ি উত্তর উপজেলায় বদলি করা হয়। একই দিনে জারি করা আরেক আদেশে ফটিকছড়ি উপজেলার মেকানিক জুয়েল বিশ্বাসকে রাউজান উপজেলায়, রাউজান উপজেলার পংকজ কান্তি নাগকে ফটিকছড়ি উপজেলায় এবং উখিয়া উপজেলার নাছির উদ্দিনকে চকরিয়া উপজেলায় বদলি করা হয়।

অভিযোগকারীরা বলছেন, তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী ফিরোজ আলম চৌধুরী ও স্টেনোগ্রাফার শহীদুল ইসলামের ভূমিকা সম্পর্কে নিরপেক্ষ তদন্ত প্রয়োজন। বিশেষ করে শহীদুল ইসলামের একই কর্মস্থলে দীর্ঘ ৩৫-৩৬ বছর থাকার বিষয়টি প্রশাসনিকভাবে পর্যালোচনা, তার চাকরির নথি, নিয়োগ ও পদায়ন, একই কর্মস্থলে দীর্ঘদিন থাকার অনুমোদন, বদলি-সংক্রান্ত নথি, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের অভিযোগ, কথিত আর্থিক লেনদেন এবং সম্পদের বিবরণ তদন্ত করা প্রয়োজন বলে দাবি করেছেন তারা।

অভিযোগকারীদের আরও দাবি, শহীদুল ইসলামের বিরুদ্ধে একাধিক দপ্তরে লিখিত অভিযোগ দেওয়ার পরও তিনি এখনো চট্টগ্রাম সার্কেল, কুমিল্লা কার্যালয়ে বহাল রয়েছেন। তাদের অভিযোগ, ফিরোজ আলম চৌধুরীর তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী হিসেবে দায়িত্ব পালনের সময়ও কথিত বদলি বাণিজ্য ও অন্যান্য অনিয়মের অভিযোগ সামনে এসেছে। ফলে দুজনের কথিত ভূমিকা, পারস্পরিক যোগাযোগ এবং প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে কার কী ভূমিকা ছিল, তা খতিয়ে দেখতে নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানিয়েছেন তারা।

অভিযোগগুলোর বিষয়ে তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী ফিরোজ আলম চৌধুরী এবং স্টেনোগ্রাফার মোঃ শহীদুল ইসলামের বক্তব্য নেওয়ার চেষ্টা করা হয়। তাদের মোবাইল ফোনে বারবার কল করা হলেও এ প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত তারা কোনো সাড়া দেননি।

আপনার মতামত লিখুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল ও অন্যান্য তথ্য সঞ্চয় করে রাখুন

আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী ফিরোজ আলম ও স্টেনোগ্রাফার শহীদুলকে ঘিরে বদলি বাণিজ্য ও ঘুষের অভিযোগ

তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী ফিরোজ আলম ও স্টেনোগ্রাফার শহীদুলকে ঘিরে বদলি বাণিজ্য ও ঘুষের অভিযোগ

আপডেট সময় ০৮:৩৮:১১ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬

জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের (ডিপিএইচই) চট্টগ্রাম সার্কেল, কুমিল্লা কার্যালয়কে ঘিরে বদলি বাণিজ্য, ঘুষ, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ভয়ভীতি প্রদর্শন, হয়রানি এবং জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। এসব অভিযোগের কেন্দ্রে রয়েছেন চট্টগ্রাম সার্কেল, কুমিল্লার তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী ফিরোজ আলম চৌধুরী এবং একই কার্যালয়ের স্টেনোগ্রাফার মোঃ শহীদুল ইসলাম। অভিযোগকারীদের দাবি, দীর্ঘদিন ধরে এই দুইজনের প্রভাব ও সমন্বয়ের মাধ্যমে কার্যালয়ের বিভিন্ন প্রশাসনিক কার্যক্রম, বিশেষ করে বদলি ও বিভিন্ন চাকরিসংক্রান্ত কাজে অর্থ লেনদেনের একটি প্রভাববলয় তৈরি হয়েছে।

তাদের বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক), স্থানীয় সরকার বিভাগ এবং জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলীর কাছে লিখিত অভিযোগ দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগপত্রের অনুলিপি ও সংশ্লিষ্ট নথি থেকে জানা গেছে। অভিযোগকারীদের দাবি, একাধিক দপ্তরে লিখিত অভিযোগ দেওয়ার পরও কার্যকর ব্যবস্থা না হওয়ায় সংশ্লিষ্টদের প্রভাব অব্যাহত রয়েছে।

অভিযোগপত্রে বলা হয়েছে, মোঃ শহীদুল ইসলাম ১৯৮৯ সাল থেকে চট্টগ্রাম সার্কেল, কুমিল্লা কার্যালয়ে স্টেনোগ্রাফার পদে কর্মরত। অভিযোগকারীদের হিসাবে প্রায় ৩৫ থেকে ৩৬ বছর ধরে একই কর্মস্থলে থাকার কারণে তিনি কার্যালয়ের ভেতরে ব্যাপক প্রভাব তৈরি করেছেন। অভিযোগে দাবি করা হয়েছে, স্টেনোগ্রাফার পদে কর্মরত হলেও তিনি অফিসের প্রধান সহকারীসহ বিভিন্ন কর্মকর্তা-কর্মচারীর ওপর প্রভাব বিস্তার করতেন এবং তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলীর কার্যালয়ের বিভিন্ন প্রশাসনিক কর্মকাণ্ডে তার প্রভাব ছিল।

অভিযোগকারীদের ভাষ্য অনুযায়ী, তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী ফিরোজ আলম চৌধুরী ও স্টেনোগ্রাফার শহীদুল ইসলামকে ঘিরেই বদলি ও অন্যান্য প্রশাসনিক কার্যক্রমে একটি প্রভাববলয় গড়ে ওঠে। অভিযোগে দাবি করা হয়েছে, চট্টগ্রাম সার্কেলের আওতাধীন চাঁদপুর থেকে কক্সবাজারের টেকনাফ পর্যন্ত বিভিন্ন জেলা ও উপজেলার কর্মচারীদের বদলি করিয়ে দেওয়ার নামে অর্থ লেনদেন করা হতো। অভিযোগকারীদের দাবি, প্রতি সপ্তাহেই এ ধরনের বদলি নিয়ে তদবির ও অর্থ লেনদেনের ঘটনা ঘটত এবং শহীদুল ইসলামের এ ক্ষেত্রে বিশেষ প্রভাব ছিল।

লিখিত অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, শহীদুল ইসলাম তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী ফিরোজ আলম চৌধুরীর নাম ব্যবহার করে সার্কেলাধীন বিভিন্ন কর্মচারীকে ফোন করতেন এবং টাকা নিয়ে অফিসে এসে দেখা করতে বলতেন। অভিযোগ অনুযায়ী, সরাসরি টাকা না দিলে শহীদুল ইসলামের মেয়ের নামে ব্যবহৃত একটি বিকাশ নম্বরে টাকা পাঠাতে বলা হতো।

অভিযোগকারীদের দাবি, শহীদুল ইসলামের কথামতো কাজ না করলে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের এক জেলা থেকে অন্য জেলায় শাস্তিমূলক বদলি, সাময়িক বরখাস্ত কিংবা বিভিন্নভাবে হয়রানির ভয় দেখানো হতো। অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, বিভিন্ন কর্মচারীর বিরুদ্ধে কথিত ভুয়া কাগজপত্রের মাধ্যমে অভিযোগ তৈরি করে তাদের হয়রানি ও বদলির ভয় দেখানো এবং পরবর্তী সময়ে অর্থ আদায়ের অভিযোগও রয়েছে।

অভিযোগপত্রে বলা হয়েছে, চট্টগ্রাম সার্কেলের আওতাধীন কর্মচারীদের পেনশন-সংক্রান্ত কাজে প্রত্যেকের কাছ থেকে ৫০ থেকে ৬০ হাজার টাকা, জিপিএফের চূড়ান্ত উত্তোলনের জন্য ১৫ থেকে ২০ হাজার টাকা এবং পিআরএল মঞ্জুরের জন্য ১০ থেকে ১৫ হাজার টাকা পর্যন্ত ঘুষ নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। এ ছাড়া বিভিন্ন পদের কর্মচারীদের কাছ থেকে পরিস্থিতি অনুযায়ী ৬০-৭০ হাজার টাকা থেকে শুরু করে এক লাখ টাকা পর্যন্ত নেওয়ার অভিযোগও করা হয়েছে।

অভিযোগকারীদের ভাষ্য, তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী ফিরোজ আলম চৌধুরীর নাম ও পদমর্যাদা ব্যবহার করে শহীদুল ইসলাম এসব অর্থ লেনদেন ও তদবিরের কাজ করতেন। অভিযোগের সত্যতা যাচাই করতে সংশ্লিষ্ট সময়ের ফোনকল, ব্যাংক ও মোবাইল আর্থিক সেবার লেনদেন, বদলি-সংক্রান্ত নথি এবং কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বক্তব্য তদন্তের দাবি জানিয়েছেন অভিযোগকারীরা।

দুদকে দেওয়া অভিযোগে দাবি করা হয়েছে, শহীদুল ইসলাম দীর্ঘদিন একই অফিসে কর্মরত থেকে নিজেকে প্রভাবশালী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। অভিযোগকারীদের ভাষ্য, তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য দুদক, স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় এবং জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলীর কাছে লিখিত অভিযোগ দেওয়া হলেও এখন পর্যন্ত কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।

শহীদুল ইসলামের বিরুদ্ধে জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের অভিযোগও আনা হয়েছে। অভিযোগপত্রে বলা হয়েছে, অনিয়ম, দুর্নীতি ও ঘুষের মাধ্যমে তিনি বিপুল সম্পদের মালিক হয়েছেন। অভিযোগকারীদের দাবি, তার নিজ জেলা বরিশাল সদর এলাকায় জমি ও দোতলা বাড়ি রয়েছে। কুমিল্লা শহরের কান্দিরপাড় এলাকায় একটি বহুতল ভবন নির্মাণাধীন রয়েছে বলেও অভিযোগ করা হয়েছে। অভিযোগে ভবনটির সাততলা হওয়ার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। এ ছাড়া ঢাকার আফতাবনগরে একটি ফ্ল্যাট এবং তার ও পরিবারের সদস্যদের নামে বিভিন্ন ব্যাংকে নগদ অর্থ, এফডিআর, সঞ্চয়পত্রসহ বিভিন্ন সম্পদ রয়েছে বলে অভিযোগ করা হয়েছে।

অভিযোগকারীরা এসব সম্পদের অর্থের উৎস এবং সম্পদগুলো বৈধ আয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কি না, তা তদন্তের দাবি জানিয়েছেন। একই সঙ্গে শহীদুল ইসলাম ও তার পরিবারের সদস্যদের নামে থাকা ব্যাংক হিসাব, এফডিআর, সঞ্চয়পত্র, জমি, বাড়ি, ফ্ল্যাটসহ অন্যান্য সম্পদের হিসাব অনুসন্ধানের দাবিও জানানো হয়েছে।

অভিযোগপত্রে আরও দাবি করা হয়েছে, শহীদুল ইসলাম কুমিল্লার সাবেক এলজিআরডি মন্ত্রী তাজুল ইসলাম এবং সাবেক সংসদ সদস্য আ.ক.ম. বাহাউদ্দিন বাহারের ঘনিষ্ঠজন ও আত্মীয় পরিচয় দিয়ে প্রভাব বিস্তার করতেন। তাকে দিয়ে পুরো জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর নিয়ন্ত্রণ করা হতো বলেও অভিযোগে দাবি করা হয়েছে।

২০২৪ সালের ১৭ নভেম্বর নোয়াখালী সদর এলাকার বাসিন্দা ও বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়ক হিসেবে পরিচয় দেওয়া মোঃ আবদুল হান্নানের স্বাক্ষরে প্রধান প্রকৌশলী, জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর এবং দুদক বরাবর পৃথক অভিযোগ দেওয়া হয়েছে বলে নথিতে দেখা যায়। ওই অভিযোগে ১৯৮৯ সাল থেকে একই কার্যালয়ে শহীদুল ইসলামের কর্মরত থাকার কথা উল্লেখ করে তার বিরুদ্ধে ঘুষ, বদলি বাণিজ্য, হয়রানি এবং জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের অভিযোগ এনে তদন্ত ও বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানানো হয়।

এরপর ২০২৫ সালের ৩ ফেব্রুয়ারি জিয়া উদ্দিন মোঃ রুবেল নামে এক ব্যক্তির স্বাক্ষরে দুদক ও স্থানীয় সরকার বিভাগের সচিব বরাবর একই ধরনের অভিযোগ দেওয়া হয় বলে নথিতে উল্লেখ রয়েছে। ওই অভিযোগে নিজেকে কুমিল্লা সদর এলাকার স্থায়ী বাসিন্দা হিসেবে পরিচয় দিয়ে তিনি শহীদুল ইসলামের বিরুদ্ধে অনিয়ম, দুর্নীতি, ঘুষ ও বদলি বাণিজ্যের অভিযোগ আনেন। অভিযোগে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জিম্মি করা, তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলীর নাম ব্যবহার করে টাকা আদায়, পেনশন ও জিপিএফ-সংক্রান্ত কাজে ঘুষ নেওয়া এবং সম্পদ অর্জনের অভিযোগ করা হয়।

অভিযোগের একটি অংশে বলা হয়েছে, শহীদুল ইসলামের বিরুদ্ধে বিভিন্ন কর্মচারীর নামে অভিযোগ সৃষ্টি করে তাদের শাস্তিমূলক বদলি বা সাময়িক বরখাস্তের ভয় দেখানো হতো। এরপর তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলীর নাম ব্যবহার করে তাদের কাছ থেকে অর্থ নেওয়া হতো বলে অভিযোগকারীদের দাবি।

এদিকে অভিযোগগুলোর সময়কাল ও সাম্প্রতিক প্রশাসনিক কার্যক্রমের মধ্যে বদলি-সংক্রান্ত একাধিক অফিস আদেশও পাওয়া গেছে। তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলীর কার্যালয়, জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর, চট্টগ্রাম সার্কেল, কুমিল্লা থেকে ১৫ আগস্ট ২০২৬ তারিখে জারি করা একটি অফিস আদেশে চকরিয়া ও পেকুয়া উপজেলার দুই অফিস সহকারী-কাম-কম্পিউটার মুদ্রাক্ষরিককে পরস্পর বদলি করা হয়েছে।

১৭ আগস্ট ২০২৬ তারিখের আরেক অফিস আদেশে লক্ষ্মীপুর সদর, বোয়ালখালী ও কর্ণফুলী উপজেলার তিন মেকানিককে যথাক্রমে রায়পুর, কর্ণফুলী ও চাটখিল উপজেলায় বদলি করা হয়েছে।

৩০ আগস্ট ২০২৬ তারিখে জারি করা আরও একটি অফিস আদেশে রাঙ্গুনিয়া উপজেলার মেকানিক মোঃ আহসানুল হককে ফটিকছড়ি উপজেলায় এবং ফটিকছড়ি উপজেলার মেকানিক দয়াল দে ও পাপড়ি দাশ গুপ্তাকে ফটিকছড়ি উত্তর উপজেলায় বদলি করা হয়। একই দিনে জারি করা আরেক আদেশে ফটিকছড়ি উপজেলার মেকানিক জুয়েল বিশ্বাসকে রাউজান উপজেলায়, রাউজান উপজেলার পংকজ কান্তি নাগকে ফটিকছড়ি উপজেলায় এবং উখিয়া উপজেলার নাছির উদ্দিনকে চকরিয়া উপজেলায় বদলি করা হয়।

অভিযোগকারীরা বলছেন, তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী ফিরোজ আলম চৌধুরী ও স্টেনোগ্রাফার শহীদুল ইসলামের ভূমিকা সম্পর্কে নিরপেক্ষ তদন্ত প্রয়োজন। বিশেষ করে শহীদুল ইসলামের একই কর্মস্থলে দীর্ঘ ৩৫-৩৬ বছর থাকার বিষয়টি প্রশাসনিকভাবে পর্যালোচনা, তার চাকরির নথি, নিয়োগ ও পদায়ন, একই কর্মস্থলে দীর্ঘদিন থাকার অনুমোদন, বদলি-সংক্রান্ত নথি, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের অভিযোগ, কথিত আর্থিক লেনদেন এবং সম্পদের বিবরণ তদন্ত করা প্রয়োজন বলে দাবি করেছেন তারা।

অভিযোগকারীদের আরও দাবি, শহীদুল ইসলামের বিরুদ্ধে একাধিক দপ্তরে লিখিত অভিযোগ দেওয়ার পরও তিনি এখনো চট্টগ্রাম সার্কেল, কুমিল্লা কার্যালয়ে বহাল রয়েছেন। তাদের অভিযোগ, ফিরোজ আলম চৌধুরীর তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী হিসেবে দায়িত্ব পালনের সময়ও কথিত বদলি বাণিজ্য ও অন্যান্য অনিয়মের অভিযোগ সামনে এসেছে। ফলে দুজনের কথিত ভূমিকা, পারস্পরিক যোগাযোগ এবং প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে কার কী ভূমিকা ছিল, তা খতিয়ে দেখতে নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানিয়েছেন তারা।

অভিযোগগুলোর বিষয়ে তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী ফিরোজ আলম চৌধুরী এবং স্টেনোগ্রাফার মোঃ শহীদুল ইসলামের বক্তব্য নেওয়ার চেষ্টা করা হয়। তাদের মোবাইল ফোনে বারবার কল করা হলেও এ প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত তারা কোনো সাড়া দেননি।