ঢাকার মিটফোর্ড হাসপাতালের হিসাবরক্ষক জাহিদুর রহিমের বিরুদ্ধে প্রায় ৮ কোটি টাকার অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগ উঠেছে। দীর্ঘদিন ধরে সরকারি অর্থ ব্যবস্থাপনার সঙ্গে যুক্ত থেকে তিনি ক্ষমতার অপব্যবহার করে বিপুল পরিমাণ সম্পদের মালিক হয়েছেন বলে অভিযোগে দাবি করা হয়েছে। বিষয়টি সামনে আসার পর সংশ্লিষ্ট প্রশাসনিক ও দপ্তর পর্যায়ে ব্যাপক আলোচনা ও উদ্বেগের সৃষ্টি হয়েছে।
সূত্রের বরাতে জানা যায়, জাহিদুর রহিম সরকারি হাসপাতালে হিসাবরক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করার সময় বিভিন্ন আর্থিক লেনদেন ও হিসাব ব্যবস্থাপনার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত ছিলেন। এই দায়িত্ব পালনের সুযোগকে কাজে লাগিয়ে তিনি অনিয়ম, দুর্নীতি এবং অর্থ আত্মসাতের মাধ্যমে অবৈধ সম্পদ গড়ে তুলেছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। যদিও এখন পর্যন্ত এসব অভিযোগ আনুষ্ঠানিকভাবে প্রমাণিত হয়নি, তবে প্রাথমিক অনুসন্ধানে কিছু অসংগতি এবং সন্দেহজনক সম্পদের তথ্য পাওয়া গেছে বলে দাবি করা হচ্ছে।
অভিযোগের সূত্র অনুযায়ী, সরকারি অর্থ ব্যবস্থাপনায় দায়িত্ব পালন করার সময় তিনি বিভিন্ন বিল, ক্রয় প্রক্রিয়া এবং হিসাব সংক্রান্ত নথিপত্রে গরমিল করেছেন বলে সন্দেহ করা হচ্ছে। একই সঙ্গে প্রকল্প ও সরবরাহ খাতে বরাদ্দকৃত অর্থের কিছু অংশ অনিয়মের মাধ্যমে আত্মসাৎ করা হয়েছে কিনা, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। এসব অভিযোগের প্রেক্ষিতে সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলো বিষয়টি খতিয়ে দেখার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করছে বলে জানা গেছে।
অনুসন্ধানে আরও বলা হয়, জাহিদুর রহিম এবং তার পরিবারের সদস্যদের নামে রাজধানী ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় একাধিক জমি, ফ্ল্যাট ও ভবনের তথ্য পাওয়া গেছে, যা তার বৈধ আয়ের সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ বলে ধারণা করা হচ্ছে। এই সম্পদের মধ্যে রয়েছে ডেমরা এলাকার বাঁশের পুলে “নূরমহল” নামে একটি আট তলা ভবন, যা তার নামের সঙ্গে যুক্ত বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে। এছাড়াও একই এলাকার বাদশা মিয়া রোডের মুসলিম নগর টাওয়ারে তার নামে দুটি ফ্ল্যাট থাকার তথ্য পাওয়া গেছে বলে জানা যায়।
এছাড়া ওই এলাকায় আরও একটি আট তলা ভবন নির্মাণাধীন অবস্থায় রয়েছে, যার মালিকানাও তার সঙ্গে সম্পৃক্ত বলে অনুসন্ধান প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এসব সম্পদের আর্থিক উৎস এবং অর্জনের প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, সরকারি বেতনের সীমিত আয়ের সঙ্গে এত বিপুল সম্পদ অর্জনের বিষয়টি স্বাভাবিকভাবে ব্যাখ্যা করা কঠিন, যদি না তার আয়ের বাইরের কোনো উৎস থাকে।
সরকারি দপ্তরের অভ্যন্তরীণ একটি সূত্র বলছে, দীর্ঘদিন ধরে হিসাব বিভাগে দায়িত্ব পালন করার কারণে তার কাছে বিভিন্ন আর্থিক নথি ও লেনদেনের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ ছিল। এই অবস্থানকে ব্যবহার করে অনিয়ম সংঘটিত হয়ে থাকতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে এখনো পর্যন্ত কোনো নিরপেক্ষ তদন্ত সংস্থা তার বিরুদ্ধে চূড়ান্ত কোনো সিদ্ধান্ত দেয়নি।
অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে প্রশাসনিক পর্যায়ে প্রাথমিকভাবে বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে বলে জানা গেছে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, অভিযোগগুলো যাচাই-বাছাই করে প্রয়োজনীয় তদন্ত কার্যক্রম গ্রহণ করা হবে। যদি প্রমাণ পাওয়া যায়, তাহলে তার বিরুদ্ধে প্রচলিত আইন অনুযায়ী কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এদিকে বিষয়টি প্রকাশ্যে আসার পর স্বাস্থ্য খাতের আর্থিক ব্যবস্থাপনা ও স্বচ্ছতা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। সরকারি হাসপাতালগুলোতে বাজেট বরাদ্দ, সরবরাহ ব্যবস্থা এবং হিসাবরক্ষণ প্রক্রিয়ায় দীর্ঘদিন ধরে স্বচ্ছতার ঘাটতির অভিযোগ রয়েছে। বিশেষ করে অর্থ ব্যবস্থাপনার সঙ্গে যুক্ত কিছু পদে দায়িত্বপ্রাপ্তদের বিরুদ্ধে অতীতে বিভিন্ন অনিয়মের অভিযোগ ওঠার নজিরও রয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে জাহিদুর রহিমের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ নতুন করে সেই বিতর্ককে উসকে দিয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সরকারি অর্থ ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হলে প্রতিটি লেনদেন কঠোর নজরদারির আওতায় আনা জরুরি। ডিজিটাল হিসাব ব্যবস্থা, নিয়মিত অডিট এবং স্বাধীন তদন্ত কাঠামো ছাড়া এ ধরনের অনিয়ম পুরোপুরি রোধ করা কঠিন। একই সঙ্গে তারা মনে করেন, অভিযোগ উঠলেই কাউকে দোষী সাব্যস্ত করা ঠিক নয়, বরং নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে সত্য উদঘাটন করা প্রয়োজন।
স্থানীয় পর্যায়ের কিছু সূত্র দাবি করছে, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির সম্পদের বিষয়ে আগেও বিভিন্ন মহলে আলোচনা ছিল, তবে সেগুলো আনুষ্ঠানিক তদন্তে রূপ নেয়নি। এবার অভিযোগগুলো আরও সুস্পষ্টভাবে সামনে আসায় বিষয়টি গুরুত্ব পাচ্ছে। তবে এখনো পর্যন্ত কোনো আদালত বা দুর্নীতি দমন সংস্থা তাকে দোষী সাব্যস্ত করেনি।
এ ধরনের অভিযোগ সাধারণত সরকারি কর্মচারীদের মধ্যে আর্থিক শৃঙ্খলা এবং নৈতিকতা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তোলে। বিশেষ করে স্বাস্থ্য খাতের মতো সংবেদনশীল একটি খাতে দায়িত্ব পালনকারী ব্যক্তির বিরুদ্ধে এমন অভিযোগ উঠলে তা সাধারণ মানুষের মধ্যেও উদ্বেগ সৃষ্টি করে। কারণ এই খাতটি সরাসরি জনসেবার সঙ্গে যুক্ত এবং এখানে অর্থের সঠিক ব্যবহার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
অভিযোগের বিষয়ে জাহিদুর রহিমের পক্ষ থেকে এখনো আনুষ্ঠানিক কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি বলে জানা গেছে। তবে তদন্ত শুরু হলে তার বক্তব্য এবং সংশ্লিষ্ট নথিপত্র যাচাই করা হবে বলে প্রশাসনিক সূত্রগুলো ইঙ্গিত দিয়েছে।
অন্যদিকে সংশ্লিষ্ট মহলে ধারণা করা হচ্ছে, যদি অভিযোগগুলো সত্য প্রমাণিত হয়, তাহলে এটি শুধু ব্যক্তিগত দুর্নীতির বিষয় হবে না, বরং একটি বৃহত্তর প্রশাসনিক দুর্বলতার চিত্রও প্রকাশ করবে। কারণ সরকারি অর্থ ব্যবস্থাপনায় দীর্ঘদিন ধরে নজরদারির ঘাটতি থাকলে এমন অনিয়মের সুযোগ তৈরি হয়।
এদিকে নাগরিক সমাজের কিছু অংশ বলছে, এই ধরনের অভিযোগের ক্ষেত্রে দ্রুত ও স্বচ্ছ তদন্ত অত্যন্ত জরুরি। কারণ দীর্ঘ সময় ধরে তদন্ত ঝুলে থাকলে জনমনে বিভ্রান্তি তৈরি হয় এবং সরকারি প্রতিষ্ঠানের প্রতি আস্থাও কমে যায়। তারা মনে করেন, দোষী প্রমাণিত হলে কঠোর শাস্তি দেওয়া উচিত এবং একই সঙ্গে ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনা রোধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করা প্রয়োজন।
অন্যদিকে প্রশাসনিক বিশ্লেষকদের মতে, শুধু একজন ব্যক্তিকে কেন্দ্র করে বিষয়টি সীমাবদ্ধ না রেখে পুরো হিসাব ব্যবস্থার কাঠামো পর্যালোচনা করা দরকার। কারণ অনেক সময় সিস্টেমের দুর্বলতার কারণে ব্যক্তি পর্যায়ে অনিয়মের সুযোগ তৈরি হয়।
বর্তমানে বিষয়টি প্রাথমিক অনুসন্ধান পর্যায়ে রয়েছে বলে জানা গেছে। তদন্তের অগ্রগতি অনুযায়ী পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া হবে। সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলো বলছে, স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে কোনো ধরনের চাপ বা প্রভাব ছাড়াই তদন্ত পরিচালনা করা হবে।
সব মিলিয়ে মিটফোর্ড হাসপাতালের এই হিসাবরক্ষকের বিরুদ্ধে ওঠা অবৈধ সম্পদের অভিযোগ প্রশাসনিক ও সামাজিক দুই ক্ষেত্রেই আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ে তদন্তই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। তদন্তে কী তথ্য উঠে আসে এবং শেষ পর্যন্ত বিষয়টি কোন দিকে গড়ায়, তা নিয়েই এখন সবার দৃষ্টি নিবদ্ধ রয়েছে।
নিজস্ব প্রতিবেদক 
























