ঢাকা ০৪:১৬ অপরাহ্ন, শনিবার, ২৫ এপ্রিল ২০২৬, ১২ বৈশাখ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম ::
৩ টন সমপরিমাণ যৌন উত্তেজক ওষুধ জব্দ, এআই দিয়ে কণ্ঠ নকল করে প্রতারণা লালপুরে প্রাথমিক বিদ্যালয় গোল্ডকাপ ফুটবল টুর্নামেন্ট ২০২৬ এর উদ্বোধন বাংলাদেশি কর্মী নিয়োগে ‘তুরাপ’ প্রকল্প থেকে সরে দাঁড়িয়েছে মালয়েশিয়া মেয়ের স্বামীর সঙ্গে শাশুড়ী ওমরায় যেতে পারবেন? রামপালে ভুয়া ফেসবুক আইডি খুলে অপপ্রচার: সংবাদ সম্মেলনে প্রতিবাদ ৯৯৯-এ ফোন, ঘরের দরজা ভেঙে শ্রমিকের মরদেহ উদ্ধার ‘জুলাই গণঅভ্যুত্থান আবারও প্রমাণ করেছে, রাষ্ট্রের প্রকৃত মালিক জনগণ’ জামায়াত এমপির ওপর হামলা, গ্রেপ্তার ৯ যুদ্ধের ডামাডোল পেরিয়ে হজে যাচ্ছেন ৩০ হাজার ইরানি ট্রান্সফর্মার চুরি করতে গিয়ে প্রাণ গেল যুবকের

১৩ দিনেই পাল্টে গেল তদন্ত প্রতিবেদন, দোষী থেকে ‘নির্দোষ’ পিডি তবিবুর

নজিরবিহীন ঘটনা ঘটিয়েছে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের স্থানীয় সরকার বিভাগ। ‘অনিয়ম ও দুর্নীতির প্রাথমিক সত্যতা’ পাওয়ার ভিত্তিতে এক কর্মকর্তাকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। মাত্র ১৩ দিনের ব্যবধানে সেই অভিযোগ ‘প্রমাণিত হয়নি’ বলে তাকে পুনর্বহালের আদেশ জারি করা হয়েছে।

অভিযুক্ত ওই কর্মকর্তাকে নিয়ে দুই প্রজ্ঞাপনে বিপরীত বক্তব্য উঠে আসায় স্থানীয় সরকার বিভাগের তদন্তপ্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা ও বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

স্থানীয় সরকার বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, গত ৯ এপ্রিল স্থানীয় সরকার বিভাগের এক প্রজ্ঞাপনে জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলী ও প্রকল্প পরিচালক মো. তবিবুর রহমান তালুকদারের বিরুদ্ধে তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনে অনিয়ম ও দুর্নীতির প্রাথমিক সত্যতা পাওয়া গেছে বলে উল্লেখ করা হয়। ওই অভিযোগের ভিত্তিতে সরকারি কর্মচারী (শৃঙ্খলা ও আপিল) বিধিমালা, ২০১৮ অনুযায়ী তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় এবং তাকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়, যাতে রাষ্ট্রপতির আদেশক্রমে জনস্বার্থে এ আদেশ জারি করা হলো বলে উল্লেখ করা হয়।

স্থানীয় সরকার বিভাগের সচিব স্বাক্ষরিত প্রজ্ঞাপনে বলা হয়, ‘জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের ‘মানবসম্পদ উন্নয়নে গ্রামীণ পানি সরবরাহ, স্যানিটেশন ও স্বাস্থ্যবিধি (১ম সংশোধিত)’ এবং ‘গ্রামীণ স্যানিটেশন’ প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক মো. তবিবুর রহমান তালুকদারের বিরুদ্ধে তদন্তে অনিয়ম ও দুর্নীতির প্রাথমিক সত্যতা পাওয়া গেছে। এ প্রেক্ষিতে সরকারি কর্মচারী (শৃঙ্খলা ও আপিল) বিধিমালা, ২০১৮ অনুযায়ী তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে এবং এ ক্ষেত্রে তাকে সাময়িক বরখাস্ত করা সমীচীন হবে।’

‘সরকারি চাকরি আইন-২০১৮ এর ধারা-৩৯(১) ও সরকারি কর্মচারী (শৃঙ্খলা ও আপিল) বিধিমালা, ২০১৮ এর বিধি-১২ অনুযায়ী, প্রকল্প পরিচালক মো. তবিবুর রহমান তালুকদারকে সাময়িকভাবে বরখাস্ত করা হলো। সাময়িক বরাখাস্তকালীন তিনি জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরে সংযুক্ত থাকবেন এবং বিধিমোতাবেক খোরপোশ ভাতা প্রাপ্য হবেন। জনস্বার্থে এ আদেশ জারি করা হলো।’

কিন্তু এই সিদ্ধান্তের ১৩ দিনের মাথায় গত ২২ এপ্রিল আরেকটি প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়। সম্পূর্ণ ভিন্ন চিত্র তুলে ধরে ওই প্রজ্ঞাপনে বলা হয়, ‘প্রকল্প পরিচালক মো. তবিবুর রহমান তালুকদারের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ প্রমাণিত হয়নি। অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়ায় তার বিরুদ্ধে জারি করা সাময়িক বরখাস্তের আদেশ প্রত্যাহার করে তাকে আগের প্রকল্প পরিচালক পদে পুনর্বহাল করা হয়। শুধু তা-ই নয়, বরখাস্তকালীন সময়কেও চাকরিকাল হিসেবে গণ্য করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।’

স্থানীয় সরকার বিভাগের একই সচিবের সই করা এই প্রজ্ঞাপনেও বলা হয়, ‘মো. তবিবুর রহমান তালুকদারের বিরুদ্ধে বিরুদ্ধে স্থানীয় সরকার বিভাগ কর্তৃক দায়েরকৃত বিভাগীয় মামলা নং ০১/২০২৬ এর বিরুদ্ধে উত্থাপিত সরকারি কর্মচারী (শৃঙ্খলা ও আপীল) বিধিমালা, ২০১৮ এর ৩(খ) এবং ৩(ঘ) অনুসারে অসদাচরণ ও দুর্নীতির অভিযোগ প্রমাণিত হয়নি।’

‘আনিত অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়ায় তার সাময়িক বরখাস্ত আদেশ প্রত্যাহার করা হলো এবং তাকে ‘মানবসম্পদ উন্নয়নে গ্রামীণ পানি সরবরাহ, স্যানিটেশন এবং স্বাস্থ্যবিধি (১ম সংশোধিত)’ এবং ‘গ্রামীণ স্যানিটেশন’ শীর্ষক প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক পদে পুনর্বহাল করা হলো। তার বরখাস্তকালীন সময়কে কর্মকাল হিসেবে গণ্য করা হবে।’

এমন নাটকীয় অবস্থান ও পরস্পরবিরোধী সিদ্ধান্ত প্রশাসনিক মহলে বিস্ময়ের সৃষ্টি করেছে। দুই প্রজ্ঞাপনে সম্পূর্ণ বিপরীত অবস্থানের কারণে প্রশ্ন উঠেছে তদন্তপ্রক্রিয়ার নির্ভরযোগ্যতা, সিদ্ধান্ত গ্রহণের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিয়ে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এত স্বল্প সময়ে একটি গুরুতর অভিযোগের চিত্র এভাবে বদলে যাওয়া শুধু অস্বাভাবিকই নয়, বরং পুরো প্রক্রিয়াটিকেই প্রশ্নবিদ্ধ করে তুলেছে। প্রশ্ন উঠেছে তদন্ত প্রতিবেদনের ভিত্তিতে একজন কর্মকর্তাকে বরখাস্ত করা হলো, সেই প্রতিবেদন কি এতটাই দুর্বল ছিল যে মাত্র ১৩ দিনের মধ্যে তা সম্পূর্ণ অগ্রাহ্য হয়ে গেল? বিশেষ করে প্রথম প্রজ্ঞাপনে ‘অনিয়ম ও দুর্নীতির প্রাথমিক সত্যতা’ উল্লেখ করার পর দ্বিতীয় প্রজ্ঞাপনে ‘অভিযোগ প্রমাণিত হয়নি’ বলা—দুইয়ের মধ্যে সুস্পষ্ট ব্যাখ্যার অভাব রয়েছে।

ঘটনাটি আরও তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে উঠেছে অভিযুক্ত কর্মকর্তার করা আবেদনে। বরখাস্তের পর তিনি কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন করে অভিযোগগুলো পুনঃতদন্তের দাবি জানান। তাতে নিজের নির্দোষের বিষয়টি তুলে ধরেন। তার সেই আবেদনের ১৩ দিনের মধ্যেই সিদ্ধান্ত পরিবর্তন হওয়ায় অনেকেই প্রশ্ন তুলছেন, তদন্তপ্রক্রিয়া কতটা স্বাধীন ও নিরপেক্ষ ছিল?

সংশ্লিষ্টরা আরও বলছেন, একটি বিভাগীয় মামলায় অভিযোগ প্রমাণ বা অপ্রমাণের বিষয়টি সাধারণত দীর্ঘ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে নিষ্পত্তি হয়। সেখানে এত স্বল্প সময়ে এমন নাটকীয় পরিবর্তন তদন্তের গ্রহণযোগ্যতা নিয়েই প্রশ্ন তোলে।

বিশ্লেষকদের মতে, এমন ঘটনা সুশাসন ও জবাবদিহির ক্ষেত্রে নেতিবাচক বার্তা দেয়। যদি প্রথম তদন্তে ত্রুটি থেকে থাকে, তবে তা স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা প্রয়োজন ছিল। আবার যদি দ্বিতীয় সিদ্ধান্ত সঠিক হয়, তাহলে প্রথম প্রজ্ঞাপনের ভিত্তি কী ছিল, সেটিও ব্যাখ্যা করা জরুরি।

জনপ্রশাসন বিশেষজ্ঞ ও সাবেক সচিব আবদুল্লাহ আউয়াল মজুমদার বলেন, ‘সরকারি এমন প্রতিবেদন প্রস্তুত করার ক্ষেত্রে অবশ্যই সঠিক যাচাই-বাছাই করে স্থির সিদ্ধান্ত দেওয়া উচিত, ১৩ দিনের মাথায় যেন তা পরিবর্তন করতে না হয়। বর্তমান সময়ে কানকথায় এসব তদন্ত প্রতিবেদন তৈরি হচ্ছে, যা কাম্য নয়।’ তবে এটা ম্যানেজ হতে পারে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের চলমান ‘মানবসম্পদ উন্নয়নে গ্রামীণ পানি সরবরাহ, স্যানিটেশন এবং স্বাস্থ্যবিধি (১ম সংশোধিত)’ এবং ‘গ্রামীণ স্যানিটেশন’ শীর্ষক প্রকল্প দুটির প্রকল্প পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন নির্বাহী প্রকৌশলী মো. তবিবুর রহমান তালুকদার। এর মধ্যে ‘মানবসম্পদ উন্নয়নে গ্রামীণ পানি সরবরাহ, স্যানিটেশন এবং স্বাস্থ্যবিধি (১ম সংশোধিত)’ শীর্ষক প্রকল্পে ব্যাপক অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ রয়েছে, আর এই অভিযোগ মূলত প্রকল্প পরিচালক ও সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে। অনিয়মের বিষয়টি খোদ সরকারি প্রতিষ্ঠান আইএমইডির প্রতিবেদনে উঠে এসছে।

আইএমইডির প্রতিবেদন প্রকল্প এলাকায় খোঁজ নিয়ে ‘মানবসম্পদ উন্নয়নে গ্রামীণ পানি সরবরাহ, স্যানিটেশন এবং স্বাস্থ্যবিধি (১ম সংশোধিত)’ শীর্ষক প্রকল্পের অনিয়ম নিয়ে একটি গণমাধ্যমে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয় গত বছরের ৮ জুলাই। ‘নজিরবিহীন অনিয়মের নজির জনস্বাস্থ্যের প্রকল্পে’ শিরোনামে প্রকাশিত ওই প্রতিবেদনে প্রকল্পের ব্যাপক অনিয়মের চিত্র উঠে আসে।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গ্রামীণ হতদরিদ্র জনগোষ্ঠীর জন্য নির্মিত টুইন পিট ল্যাট্রিন, পাবলিক টয়লেট ও হাত ধোয়ার স্টেশনে নিম্নমানের উপকরণ ব্যবহারের কারণে বেশির ভাগ অবকাঠামো আগেই ব্যবহার অনুপযোগী হয়ে পড়েছে, কিছু ইতোমধ্যে পরিত্যক্ত তালিকায় চলে গেছে। পানি সরবরাহের পাইপলাইন নকশাবহির্ভূতভাবে স্থাপন করা হয়েছে, ব্যবহৃত হয়েছে নিম্নমানের উপকরণ এবং অনেক ক্ষেত্রে পরিবেশ ছাড়পত্র ছাড়াই জলাশয় ভরাট করে কাজ করা হয়েছে।

এ ছাড়া ঠিকাদারদের বিল যথাযথ যাচাই ছাড়াই পরিশোধ, কাজের মান তদারকির দায়িত্বপ্রাপ্তদের নেতিবাচক প্রতিবেদন তৈরিতে বাধা এবং দুর্বল মনিটরিংয়ের অভিযোগও রয়েছে। সব মিলিয়ে ‘মানবসম্পদ উন্নয়নে গ্রামীণ পানি সরবরাহ, স্যানিটেশন ও স্বাস্থ্যবিধি’ প্রকল্পটি নজিরবিহীন অনিয়মের উদাহরণে পরিণত হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

প্রকল্পটি অনিয়ম, দুর্নীতি ও অপচয়ের বড় উদাহরণে পরিণত হয়েছে বলে আইএমইডির মূল্যায়নেও উঠে এসেছে। ১ হাজার ৮৮৩ কোটি টাকার এ প্রকল্পটি বিশ্বব্যাংক ও এআইআইবির অর্থায়নে জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর বাস্তবায়ন করছে। তবে সম্ভাব্যতা সমীক্ষা ছাড়াই শুরু হওয়ায় বাস্তবায়নকালেই এটি ব্যর্থতা, অনিয়ম ও দুর্নীতির মুখে পড়ে।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নির্ধারিত মেয়াদ শেষ হলেও প্রকল্পের অধিকাংশ কাজ অসম্পন্ন বা নিম্নমানের। চলমান অবস্থাতেই বহু স্থাপনা পরিত্যক্ত, টয়লেট ও হাত ধোয়ার স্টেশন নষ্ট এবং ব্যবস্থাপনায় বড় দুর্বলতা দেখা গেছে। অনেক জেলায় টয়লেটের টাইলস ও ফিটিংস ভেঙে গেছে, দরিদ্রদের জন্য নির্মিত টুইন পিট ল্যাট্রিনে নিম্নমানের কাঠ ব্যবহার করা হয়েছে। কমিউনিটি ক্লিনিকের টয়লেট দূরবর্তী ও অনুপযোগী স্থানে নির্মাণ করায় ব্যবহার হচ্ছে না। অডিটে একাধিক আপত্তি উঠলেও তা এখনো নিষ্পত্তি হয়নি।

এদিকে আইএমইডির সরেজমিন পরিদর্শনে দেখা যায়, ছোট পানির স্কিম ও পাবলিক টয়লেটের নির্মাণে ব্যাপক ত্রুটি রয়েছে। অনেক স্থানে ল্যান্ডিং স্টেশন ভেঙে গেছে, টয়লেটের মেঝে দেবে গেছে এবং বিদ্যুৎ সংযোগ না থাকায় বহু টয়লেট অচল হয়ে আছে। প্রতিবন্ধীবান্ধব টয়লেটের র্যাম্প ও প্রবেশপথ যথাযথ না হওয়ায় ব্যবহার অনুপযোগী।

হাত ধোয়ার স্টেশনগুলোর বেশির ভাগই অকেজো বা পরিত্যক্ত, কিছু আবার চুরি ও নষ্ট হয়েছে। পাইপলাইন স্থাপনেও নকশা মানা হয়নি এবং পরিবেশ ছাড়পত্র ছাড়াই কাজ করা হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়, নিম্নমানের উপকরণ ও দুর্বল রক্ষণাবেক্ষণের কারণে এসব স্থাপনা দ্রুত নষ্ট হচ্ছে, যা সরকারি অর্থের বড় অপচয়। সবশেষে অনিয়মের জন্য দায়ীদের কাছ থেকে ক্ষতিপূরণ আদায় ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার সুপারিশ করা হয়েছে।

সবচেয়ে গুরুতর অভিযোগ হলো, প্রকল্পটির কাজের গুণগত মান নিয়ে নেতিবাচক প্রতিবেদন তৈরিতে বাধা সৃষ্টি করা হয়েছে। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, কাজের গুণগত মান নিশ্চিতের দায়িত্বে থাকা জেলা সমন্বয়কারীরা ঠিকাদারদের কাজের অনিয়ম চিহ্নিত করে প্রতিবেদন জমা দেওয়ায় বিভিন্ন প্রতিবন্ধকতা তৈরির পাশাপাশি ভবিষ্যতে এ ধরনের প্রতিবেদন না করার জন্য নির্দেশনা দেওয়া হয়। এ জন্য নেতিবাচক প্রতিবেদন তৈরি থেকে বিরত থেকেছেন সমন্বয়কারীরা।

নিয়ম অনুযায়ী সমন্বয়কারীদের ঠিকাদারদের বিল যাচাইয়ের ক্ষমতা থাকলেও বাস্তবে তা প্রয়োগ করতে দেওয়া হয়নি। ফলে যাচাই ছাড়াই বিল পরিশোধ হয়েছে এবং অনিয়মের বিরুদ্ধে কোনো শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। অভিযোগ রয়েছে, স্বয়ং প্রকল্প পরিচালকসহ প্রকল্প-সংশ্লিষ্টরা এ অনিয়মে সহায়তা করেছেন। তবে প্রকল্প পরিচালক মো. তবিবুর রহমান তালুকদার অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, আইএমইডির প্রতিবেদনে আংশিক চিত্র এসেছে এবং সব জেলায় অনিয়ম একই মাত্রায় হয়নি। তার দাবি, তিনি কোনো অনিয়ম করেননি এবং কাউকে নেতিবাচক প্রতিবেদন দিতে নিষেধও করেননি।

তবে মূল্যায়ন প্রতিবেদন সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, প্রকল্প বাস্তবায়নে অনিয়মের পেছনে প্রকল্প পরিচালকেরই দায় বেশি। অনেক ক্ষেত্রে প্রকল্প পরিচালক জেনেশুনেই অনিয়ম করেছেন, নিয়মকানুন মানেননি। পরিচালকই ঠিকাদারদের কাজের অনিয়ম নিয়ে নেতিবাচক প্রতিবেদন তৈরি না করতে জেলা সমন্বয়কারীদের নির্দেশনা দেন। চাকরি বাঁচানোর ভয়ে প্রকল্প পরিচালকের নির্দেশনা মেনে নেতিবাচক প্রতিবেদন দেওয়া বন্ধ করেন তারা। মূল্যায়ন প্রতিবেদন সংশ্লিষ্টরা আরও বলেন, প্রকল্প পরিচালকের সহায়তা ছাড়া ঠিকাদারদের পক্ষে এত বড় অনিয়ম করা সম্ভব নয়।

অভিযোগ রয়েছে, অনিয়ম বন্ধ করার পরিবর্তে নেতিবাচক প্রতিবেদন আটকানোতেই প্রকল্প পরিচালকের বেশি মনোযোগ। অধীনস্তদের নেতিবাচক প্রতিবেদন না করার নির্দেশনা দিয়েই থেমে থাকেননি তিনি। আইএমইডির মূল্যায়ন প্রতিবেদন যাতে নেতিবাচক না হয়, সে জন্য মূল্যায়ন প্রতিবেদন তৈরির কাজের সঙ্গে সংশ্লিষ্টদের বিভিন্নভাবে ম্যানেজ (রাজি করানো) করার চেষ্টা করেন প্রকল্প পরিচালক।

এমনকি তার অনিয়মের চিত্র তুলে ধরে প্রতিবেদন প্রকাশ না করার জন্যও বিভিন্ন মাধ্যমে এই প্রতিবেদককেও অনুরোধ করেন প্রকল্প পরিচালক।

Tag :

আপনার মতামত লিখুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল ও অন্যান্য তথ্য সঞ্চয় করে রাখুন

আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

৩ টন সমপরিমাণ যৌন উত্তেজক ওষুধ জব্দ, এআই দিয়ে কণ্ঠ নকল করে প্রতারণা

১৩ দিনেই পাল্টে গেল তদন্ত প্রতিবেদন, দোষী থেকে ‘নির্দোষ’ পিডি তবিবুর

আপডেট সময় ১২:১৬:২৬ অপরাহ্ন, শনিবার, ২৫ এপ্রিল ২০২৬

নজিরবিহীন ঘটনা ঘটিয়েছে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের স্থানীয় সরকার বিভাগ। ‘অনিয়ম ও দুর্নীতির প্রাথমিক সত্যতা’ পাওয়ার ভিত্তিতে এক কর্মকর্তাকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। মাত্র ১৩ দিনের ব্যবধানে সেই অভিযোগ ‘প্রমাণিত হয়নি’ বলে তাকে পুনর্বহালের আদেশ জারি করা হয়েছে।

অভিযুক্ত ওই কর্মকর্তাকে নিয়ে দুই প্রজ্ঞাপনে বিপরীত বক্তব্য উঠে আসায় স্থানীয় সরকার বিভাগের তদন্তপ্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা ও বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

স্থানীয় সরকার বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, গত ৯ এপ্রিল স্থানীয় সরকার বিভাগের এক প্রজ্ঞাপনে জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলী ও প্রকল্প পরিচালক মো. তবিবুর রহমান তালুকদারের বিরুদ্ধে তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনে অনিয়ম ও দুর্নীতির প্রাথমিক সত্যতা পাওয়া গেছে বলে উল্লেখ করা হয়। ওই অভিযোগের ভিত্তিতে সরকারি কর্মচারী (শৃঙ্খলা ও আপিল) বিধিমালা, ২০১৮ অনুযায়ী তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় এবং তাকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়, যাতে রাষ্ট্রপতির আদেশক্রমে জনস্বার্থে এ আদেশ জারি করা হলো বলে উল্লেখ করা হয়।

স্থানীয় সরকার বিভাগের সচিব স্বাক্ষরিত প্রজ্ঞাপনে বলা হয়, ‘জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের ‘মানবসম্পদ উন্নয়নে গ্রামীণ পানি সরবরাহ, স্যানিটেশন ও স্বাস্থ্যবিধি (১ম সংশোধিত)’ এবং ‘গ্রামীণ স্যানিটেশন’ প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক মো. তবিবুর রহমান তালুকদারের বিরুদ্ধে তদন্তে অনিয়ম ও দুর্নীতির প্রাথমিক সত্যতা পাওয়া গেছে। এ প্রেক্ষিতে সরকারি কর্মচারী (শৃঙ্খলা ও আপিল) বিধিমালা, ২০১৮ অনুযায়ী তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে এবং এ ক্ষেত্রে তাকে সাময়িক বরখাস্ত করা সমীচীন হবে।’

‘সরকারি চাকরি আইন-২০১৮ এর ধারা-৩৯(১) ও সরকারি কর্মচারী (শৃঙ্খলা ও আপিল) বিধিমালা, ২০১৮ এর বিধি-১২ অনুযায়ী, প্রকল্প পরিচালক মো. তবিবুর রহমান তালুকদারকে সাময়িকভাবে বরখাস্ত করা হলো। সাময়িক বরাখাস্তকালীন তিনি জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরে সংযুক্ত থাকবেন এবং বিধিমোতাবেক খোরপোশ ভাতা প্রাপ্য হবেন। জনস্বার্থে এ আদেশ জারি করা হলো।’

কিন্তু এই সিদ্ধান্তের ১৩ দিনের মাথায় গত ২২ এপ্রিল আরেকটি প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়। সম্পূর্ণ ভিন্ন চিত্র তুলে ধরে ওই প্রজ্ঞাপনে বলা হয়, ‘প্রকল্প পরিচালক মো. তবিবুর রহমান তালুকদারের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ প্রমাণিত হয়নি। অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়ায় তার বিরুদ্ধে জারি করা সাময়িক বরখাস্তের আদেশ প্রত্যাহার করে তাকে আগের প্রকল্প পরিচালক পদে পুনর্বহাল করা হয়। শুধু তা-ই নয়, বরখাস্তকালীন সময়কেও চাকরিকাল হিসেবে গণ্য করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।’

স্থানীয় সরকার বিভাগের একই সচিবের সই করা এই প্রজ্ঞাপনেও বলা হয়, ‘মো. তবিবুর রহমান তালুকদারের বিরুদ্ধে বিরুদ্ধে স্থানীয় সরকার বিভাগ কর্তৃক দায়েরকৃত বিভাগীয় মামলা নং ০১/২০২৬ এর বিরুদ্ধে উত্থাপিত সরকারি কর্মচারী (শৃঙ্খলা ও আপীল) বিধিমালা, ২০১৮ এর ৩(খ) এবং ৩(ঘ) অনুসারে অসদাচরণ ও দুর্নীতির অভিযোগ প্রমাণিত হয়নি।’

‘আনিত অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়ায় তার সাময়িক বরখাস্ত আদেশ প্রত্যাহার করা হলো এবং তাকে ‘মানবসম্পদ উন্নয়নে গ্রামীণ পানি সরবরাহ, স্যানিটেশন এবং স্বাস্থ্যবিধি (১ম সংশোধিত)’ এবং ‘গ্রামীণ স্যানিটেশন’ শীর্ষক প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক পদে পুনর্বহাল করা হলো। তার বরখাস্তকালীন সময়কে কর্মকাল হিসেবে গণ্য করা হবে।’

এমন নাটকীয় অবস্থান ও পরস্পরবিরোধী সিদ্ধান্ত প্রশাসনিক মহলে বিস্ময়ের সৃষ্টি করেছে। দুই প্রজ্ঞাপনে সম্পূর্ণ বিপরীত অবস্থানের কারণে প্রশ্ন উঠেছে তদন্তপ্রক্রিয়ার নির্ভরযোগ্যতা, সিদ্ধান্ত গ্রহণের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিয়ে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এত স্বল্প সময়ে একটি গুরুতর অভিযোগের চিত্র এভাবে বদলে যাওয়া শুধু অস্বাভাবিকই নয়, বরং পুরো প্রক্রিয়াটিকেই প্রশ্নবিদ্ধ করে তুলেছে। প্রশ্ন উঠেছে তদন্ত প্রতিবেদনের ভিত্তিতে একজন কর্মকর্তাকে বরখাস্ত করা হলো, সেই প্রতিবেদন কি এতটাই দুর্বল ছিল যে মাত্র ১৩ দিনের মধ্যে তা সম্পূর্ণ অগ্রাহ্য হয়ে গেল? বিশেষ করে প্রথম প্রজ্ঞাপনে ‘অনিয়ম ও দুর্নীতির প্রাথমিক সত্যতা’ উল্লেখ করার পর দ্বিতীয় প্রজ্ঞাপনে ‘অভিযোগ প্রমাণিত হয়নি’ বলা—দুইয়ের মধ্যে সুস্পষ্ট ব্যাখ্যার অভাব রয়েছে।

ঘটনাটি আরও তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে উঠেছে অভিযুক্ত কর্মকর্তার করা আবেদনে। বরখাস্তের পর তিনি কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন করে অভিযোগগুলো পুনঃতদন্তের দাবি জানান। তাতে নিজের নির্দোষের বিষয়টি তুলে ধরেন। তার সেই আবেদনের ১৩ দিনের মধ্যেই সিদ্ধান্ত পরিবর্তন হওয়ায় অনেকেই প্রশ্ন তুলছেন, তদন্তপ্রক্রিয়া কতটা স্বাধীন ও নিরপেক্ষ ছিল?

সংশ্লিষ্টরা আরও বলছেন, একটি বিভাগীয় মামলায় অভিযোগ প্রমাণ বা অপ্রমাণের বিষয়টি সাধারণত দীর্ঘ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে নিষ্পত্তি হয়। সেখানে এত স্বল্প সময়ে এমন নাটকীয় পরিবর্তন তদন্তের গ্রহণযোগ্যতা নিয়েই প্রশ্ন তোলে।

বিশ্লেষকদের মতে, এমন ঘটনা সুশাসন ও জবাবদিহির ক্ষেত্রে নেতিবাচক বার্তা দেয়। যদি প্রথম তদন্তে ত্রুটি থেকে থাকে, তবে তা স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা প্রয়োজন ছিল। আবার যদি দ্বিতীয় সিদ্ধান্ত সঠিক হয়, তাহলে প্রথম প্রজ্ঞাপনের ভিত্তি কী ছিল, সেটিও ব্যাখ্যা করা জরুরি।

জনপ্রশাসন বিশেষজ্ঞ ও সাবেক সচিব আবদুল্লাহ আউয়াল মজুমদার বলেন, ‘সরকারি এমন প্রতিবেদন প্রস্তুত করার ক্ষেত্রে অবশ্যই সঠিক যাচাই-বাছাই করে স্থির সিদ্ধান্ত দেওয়া উচিত, ১৩ দিনের মাথায় যেন তা পরিবর্তন করতে না হয়। বর্তমান সময়ে কানকথায় এসব তদন্ত প্রতিবেদন তৈরি হচ্ছে, যা কাম্য নয়।’ তবে এটা ম্যানেজ হতে পারে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের চলমান ‘মানবসম্পদ উন্নয়নে গ্রামীণ পানি সরবরাহ, স্যানিটেশন এবং স্বাস্থ্যবিধি (১ম সংশোধিত)’ এবং ‘গ্রামীণ স্যানিটেশন’ শীর্ষক প্রকল্প দুটির প্রকল্প পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন নির্বাহী প্রকৌশলী মো. তবিবুর রহমান তালুকদার। এর মধ্যে ‘মানবসম্পদ উন্নয়নে গ্রামীণ পানি সরবরাহ, স্যানিটেশন এবং স্বাস্থ্যবিধি (১ম সংশোধিত)’ শীর্ষক প্রকল্পে ব্যাপক অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ রয়েছে, আর এই অভিযোগ মূলত প্রকল্প পরিচালক ও সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে। অনিয়মের বিষয়টি খোদ সরকারি প্রতিষ্ঠান আইএমইডির প্রতিবেদনে উঠে এসছে।

আইএমইডির প্রতিবেদন প্রকল্প এলাকায় খোঁজ নিয়ে ‘মানবসম্পদ উন্নয়নে গ্রামীণ পানি সরবরাহ, স্যানিটেশন এবং স্বাস্থ্যবিধি (১ম সংশোধিত)’ শীর্ষক প্রকল্পের অনিয়ম নিয়ে একটি গণমাধ্যমে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয় গত বছরের ৮ জুলাই। ‘নজিরবিহীন অনিয়মের নজির জনস্বাস্থ্যের প্রকল্পে’ শিরোনামে প্রকাশিত ওই প্রতিবেদনে প্রকল্পের ব্যাপক অনিয়মের চিত্র উঠে আসে।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গ্রামীণ হতদরিদ্র জনগোষ্ঠীর জন্য নির্মিত টুইন পিট ল্যাট্রিন, পাবলিক টয়লেট ও হাত ধোয়ার স্টেশনে নিম্নমানের উপকরণ ব্যবহারের কারণে বেশির ভাগ অবকাঠামো আগেই ব্যবহার অনুপযোগী হয়ে পড়েছে, কিছু ইতোমধ্যে পরিত্যক্ত তালিকায় চলে গেছে। পানি সরবরাহের পাইপলাইন নকশাবহির্ভূতভাবে স্থাপন করা হয়েছে, ব্যবহৃত হয়েছে নিম্নমানের উপকরণ এবং অনেক ক্ষেত্রে পরিবেশ ছাড়পত্র ছাড়াই জলাশয় ভরাট করে কাজ করা হয়েছে।

এ ছাড়া ঠিকাদারদের বিল যথাযথ যাচাই ছাড়াই পরিশোধ, কাজের মান তদারকির দায়িত্বপ্রাপ্তদের নেতিবাচক প্রতিবেদন তৈরিতে বাধা এবং দুর্বল মনিটরিংয়ের অভিযোগও রয়েছে। সব মিলিয়ে ‘মানবসম্পদ উন্নয়নে গ্রামীণ পানি সরবরাহ, স্যানিটেশন ও স্বাস্থ্যবিধি’ প্রকল্পটি নজিরবিহীন অনিয়মের উদাহরণে পরিণত হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

প্রকল্পটি অনিয়ম, দুর্নীতি ও অপচয়ের বড় উদাহরণে পরিণত হয়েছে বলে আইএমইডির মূল্যায়নেও উঠে এসেছে। ১ হাজার ৮৮৩ কোটি টাকার এ প্রকল্পটি বিশ্বব্যাংক ও এআইআইবির অর্থায়নে জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর বাস্তবায়ন করছে। তবে সম্ভাব্যতা সমীক্ষা ছাড়াই শুরু হওয়ায় বাস্তবায়নকালেই এটি ব্যর্থতা, অনিয়ম ও দুর্নীতির মুখে পড়ে।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নির্ধারিত মেয়াদ শেষ হলেও প্রকল্পের অধিকাংশ কাজ অসম্পন্ন বা নিম্নমানের। চলমান অবস্থাতেই বহু স্থাপনা পরিত্যক্ত, টয়লেট ও হাত ধোয়ার স্টেশন নষ্ট এবং ব্যবস্থাপনায় বড় দুর্বলতা দেখা গেছে। অনেক জেলায় টয়লেটের টাইলস ও ফিটিংস ভেঙে গেছে, দরিদ্রদের জন্য নির্মিত টুইন পিট ল্যাট্রিনে নিম্নমানের কাঠ ব্যবহার করা হয়েছে। কমিউনিটি ক্লিনিকের টয়লেট দূরবর্তী ও অনুপযোগী স্থানে নির্মাণ করায় ব্যবহার হচ্ছে না। অডিটে একাধিক আপত্তি উঠলেও তা এখনো নিষ্পত্তি হয়নি।

এদিকে আইএমইডির সরেজমিন পরিদর্শনে দেখা যায়, ছোট পানির স্কিম ও পাবলিক টয়লেটের নির্মাণে ব্যাপক ত্রুটি রয়েছে। অনেক স্থানে ল্যান্ডিং স্টেশন ভেঙে গেছে, টয়লেটের মেঝে দেবে গেছে এবং বিদ্যুৎ সংযোগ না থাকায় বহু টয়লেট অচল হয়ে আছে। প্রতিবন্ধীবান্ধব টয়লেটের র্যাম্প ও প্রবেশপথ যথাযথ না হওয়ায় ব্যবহার অনুপযোগী।

হাত ধোয়ার স্টেশনগুলোর বেশির ভাগই অকেজো বা পরিত্যক্ত, কিছু আবার চুরি ও নষ্ট হয়েছে। পাইপলাইন স্থাপনেও নকশা মানা হয়নি এবং পরিবেশ ছাড়পত্র ছাড়াই কাজ করা হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়, নিম্নমানের উপকরণ ও দুর্বল রক্ষণাবেক্ষণের কারণে এসব স্থাপনা দ্রুত নষ্ট হচ্ছে, যা সরকারি অর্থের বড় অপচয়। সবশেষে অনিয়মের জন্য দায়ীদের কাছ থেকে ক্ষতিপূরণ আদায় ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার সুপারিশ করা হয়েছে।

সবচেয়ে গুরুতর অভিযোগ হলো, প্রকল্পটির কাজের গুণগত মান নিয়ে নেতিবাচক প্রতিবেদন তৈরিতে বাধা সৃষ্টি করা হয়েছে। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, কাজের গুণগত মান নিশ্চিতের দায়িত্বে থাকা জেলা সমন্বয়কারীরা ঠিকাদারদের কাজের অনিয়ম চিহ্নিত করে প্রতিবেদন জমা দেওয়ায় বিভিন্ন প্রতিবন্ধকতা তৈরির পাশাপাশি ভবিষ্যতে এ ধরনের প্রতিবেদন না করার জন্য নির্দেশনা দেওয়া হয়। এ জন্য নেতিবাচক প্রতিবেদন তৈরি থেকে বিরত থেকেছেন সমন্বয়কারীরা।

নিয়ম অনুযায়ী সমন্বয়কারীদের ঠিকাদারদের বিল যাচাইয়ের ক্ষমতা থাকলেও বাস্তবে তা প্রয়োগ করতে দেওয়া হয়নি। ফলে যাচাই ছাড়াই বিল পরিশোধ হয়েছে এবং অনিয়মের বিরুদ্ধে কোনো শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। অভিযোগ রয়েছে, স্বয়ং প্রকল্প পরিচালকসহ প্রকল্প-সংশ্লিষ্টরা এ অনিয়মে সহায়তা করেছেন। তবে প্রকল্প পরিচালক মো. তবিবুর রহমান তালুকদার অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, আইএমইডির প্রতিবেদনে আংশিক চিত্র এসেছে এবং সব জেলায় অনিয়ম একই মাত্রায় হয়নি। তার দাবি, তিনি কোনো অনিয়ম করেননি এবং কাউকে নেতিবাচক প্রতিবেদন দিতে নিষেধও করেননি।

তবে মূল্যায়ন প্রতিবেদন সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, প্রকল্প বাস্তবায়নে অনিয়মের পেছনে প্রকল্প পরিচালকেরই দায় বেশি। অনেক ক্ষেত্রে প্রকল্প পরিচালক জেনেশুনেই অনিয়ম করেছেন, নিয়মকানুন মানেননি। পরিচালকই ঠিকাদারদের কাজের অনিয়ম নিয়ে নেতিবাচক প্রতিবেদন তৈরি না করতে জেলা সমন্বয়কারীদের নির্দেশনা দেন। চাকরি বাঁচানোর ভয়ে প্রকল্প পরিচালকের নির্দেশনা মেনে নেতিবাচক প্রতিবেদন দেওয়া বন্ধ করেন তারা। মূল্যায়ন প্রতিবেদন সংশ্লিষ্টরা আরও বলেন, প্রকল্প পরিচালকের সহায়তা ছাড়া ঠিকাদারদের পক্ষে এত বড় অনিয়ম করা সম্ভব নয়।

অভিযোগ রয়েছে, অনিয়ম বন্ধ করার পরিবর্তে নেতিবাচক প্রতিবেদন আটকানোতেই প্রকল্প পরিচালকের বেশি মনোযোগ। অধীনস্তদের নেতিবাচক প্রতিবেদন না করার নির্দেশনা দিয়েই থেমে থাকেননি তিনি। আইএমইডির মূল্যায়ন প্রতিবেদন যাতে নেতিবাচক না হয়, সে জন্য মূল্যায়ন প্রতিবেদন তৈরির কাজের সঙ্গে সংশ্লিষ্টদের বিভিন্নভাবে ম্যানেজ (রাজি করানো) করার চেষ্টা করেন প্রকল্প পরিচালক।

এমনকি তার অনিয়মের চিত্র তুলে ধরে প্রতিবেদন প্রকাশ না করার জন্যও বিভিন্ন মাধ্যমে এই প্রতিবেদককেও অনুরোধ করেন প্রকল্প পরিচালক।