চট্টগ্রামের মিরসরাই এবং ফেনী জেলার বিস্তীর্ণ কৃষিজমিতে সেচ সুবিধা পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্যে নেওয়া হয়েছিল একটি উচ্চাভিলাষী প্রকল্প। “মুহুরী সেচ ব্যবস্থাপনা উন্নয়ন প্রকল্প” নামে পরিচিত এই উদ্যোগটি ছিল কৃষি উৎপাদন বাড়ানো এবং কৃষকদের জীবনমান উন্নয়নের একটি বড় পদক্ষেপ। কিন্তু প্রকল্পটি এখন পরিণত হয়েছে দুর্নীতি, অনিয়ম এবং অর্থ লোপাটের এক ভয়াবহ উদাহরণে, যার কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে এসেছে প্রকল্প পরিচালক (পিডি) রাফিউস সাজ্জাদ-এর নাম।
২০১৫-১৬ অর্থবছরে শুরু হওয়া এই প্রকল্পের আওতায় ৫৩৪ কিলোমিটার ভূগর্ভস্থ পাইপলাইন স্থাপন এবং ৮৫০টি সেচ পাম্প বসানোর পরিকল্পনা নেওয়া হয়। লক্ষ্য ছিল ফেনীর পাঁচটি উপজেলা এবং মিরসরাই উপজেলার প্রায় ১৮ হাজার হেক্টর জমিতে সেচ সুবিধা পৌঁছে দেওয়া। প্রকল্প বাস্তবায়নে মোট ৫৬২ কোটি ৬৯ লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়, যার একটি বড় অংশ অর্থায়ন করে এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক এবং বাস্তবায়নের দায়িত্বে ছিল বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড।
কিন্তু বাস্তবতা বলছে সম্পূর্ণ ভিন্ন গল্প। প্রকল্পটি ২০২৪ সালের ৩০ জুন সমাপ্ত ঘোষণা করে ৫০৭ কোটি টাকার বেশি অর্থ ঠিকাদারদের পরিশোধ করা হলেও মাঠপর্যায়ে গিয়ে দেখা গেছে, অধিকাংশ সেচ পাম্পই অকার্যকর বা অস্তিত্বহীন। তদন্ত প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, ৮৫০টি পাম্পের মধ্যে ৩৩৩টির কোনো হদিস পাওয়া যায়নি। অর্থাৎ প্রায় অর্ধেক পাম্প কেবল কাগজে-কলমে রয়েছে। বাকি ৫১৭টির মধ্যে মাত্র ১৫০টি আংশিক চালু রয়েছে এবং সেগুলোও নিম্নমানের সরঞ্জাম দিয়ে পরিচালিত।
এই প্রকল্পে অনিয়মের সবচেয়ে বড় অভিযোগ হলো—কাগজে-কলমে প্রকল্প বাস্তবায়ন দেখিয়ে বিপুল অঙ্কের অর্থ আত্মসাৎ করা হয়েছে। তদন্ত কমিটির এক সদস্যের ভাষ্য অনুযায়ী, প্রকল্প পরিচালকসহ সংশ্লিষ্ট ১৬ জন কর্মকর্তা ঠিকাদারদের সঙ্গে যোগসাজশ করে অন্তত ২০০ কোটি টাকা লোপাট করেছেন। এই অর্থ মূলত সেই ৩৩৩টি ‘অদৃশ্য’ সেচ পাম্পের বিপরীতে বরাদ্দ ছিল, যা বাস্তবে কখনো স্থাপনই করা হয়নি।
প্রকল্পটির দায়িত্বে থাকা রাফিউস সাজ্জাদ সম্পর্কে অভিযোগ রয়েছে, তিনি দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই টেন্ডার প্রক্রিয়াকে নিজের নিয়ন্ত্রণে এনে পছন্দের ঠিকাদারদের মাধ্যমে কাজ বণ্টন করেন। ৯টি প্যাকেজে বিভক্ত প্রকল্পের প্রতিটি ধাপে দরপত্র আহ্বান করা হলেও প্রাক্কলিত মূল্যের চেয়ে বেশি দামে কাজ দেওয়া হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, এই অতিরিক্ত মূল্যের একটি বড় অংশ কমিশন হিসেবে ভাগবাটোয়ারা করা হয়েছে।
একজন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, “প্রকল্প পরিচালক রাফিউস সাজ্জাদ যোগ দেওয়ার পর থেকেই প্রকল্পটি বাণিজ্যে পরিণত হয়। কাজের অগ্রগতি না থাকলেও বিল উত্তোলন করা হতো, আর সেই বিলের একটি অংশ কমিশন হিসেবে নেওয়া হতো।” তিনি আরও জানান, একটি সাবস্টেশন স্থাপনে যেখানে ২৫ থেকে ৩০ কোটি টাকা ব্যয়ের কথা, সেখানে ৪৪ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। এতে প্রকল্প ব্যয়ের অস্বাভাবিক বৃদ্ধি ঘটেছে।
তদন্তে আরও উঠে এসেছে, একটি বিদেশি (জার্মান) ঠিকাদার প্রতিষ্ঠানকে প্রাক্কলিত মূল্যের চেয়ে ১৩ শতাংশ বেশি দামে কাজ দেওয়া হয়েছে। এ ধরনের সিদ্ধান্ত প্রকল্পের স্বচ্ছতা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তুলেছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এ ধরনের অতিরিক্ত ব্যয় সাধারণত পরিকল্পিত কমিশন বাণিজ্যের ইঙ্গিত দেয়।
প্রকল্প বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে নিম্নমানের সরঞ্জাম ব্যবহারের অভিযোগও মারাত্মক। পাইপলাইনগুলো ছিল কম থিকনেসের, যা সহজেই ভেঙে গেছে। অনেক ক্ষেত্রে পাইপের অবস্থান শনাক্ত করাও সম্ভব হয়নি, কারণ কোনো সঠিক লে-আউট সংরক্ষণ করা হয়নি। পাম্পহাউজ, হেডার ট্যাংক এবং অন্যান্য অবকাঠামো নির্মাণেও নিম্নমানের ইট ও নির্মাণসামগ্রী ব্যবহার করা হয়েছে। ফলে প্রকল্পটি শুরু হওয়ার কিছুদিনের মধ্যেই অকার্যকর হয়ে পড়ে।
তদন্ত কমিটি সরেজমিনে গিয়ে ৫৯১টি সেচ স্কিম বন্ধ অবস্থায় পেয়েছে, যা প্রকল্পের কার্যকারিতা নিয়ে বড় ধরনের প্রশ্ন তৈরি করেছে। প্রতি পাম্পের আওতায় ২০ হেক্টর জমিতে সেচ দেওয়ার কথা থাকলেও বাস্তবে অনেক ক্ষেত্রে ৭-৮ হেক্টর জমিতেও সেচ পৌঁছায়নি। ফলে প্রকল্পের মূল লক্ষ্য পুরোপুরি ব্যর্থ হয়েছে।
এই প্রকল্পের মাধ্যমে কৃষকদের যে সুবিধা পাওয়ার কথা ছিল, তা বাস্তবে তারা পাননি। হাজারো কৃষক সেচ সুবিধা থেকে বঞ্চিত হয়েছেন। যদি প্রকল্পটি সঠিকভাবে বাস্তবায়িত হতো, তাহলে বিপুল পরিমাণ ধান উৎপাদন সম্ভব ছিল, যা দেশের খাদ্য নিরাপত্তায় গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে পারত। কিন্তু অনিয়ম ও দুর্নীতির কারণে সেই সম্ভাবনা নষ্ট হয়েছে।
পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের তদন্ত কমিটির নেতৃত্বে ছিলেন ড. আ ন ম বজলুর রশীদ। তার নেতৃত্বাধীন কমিটি ১২ পৃষ্ঠার প্রতিবেদনে প্রকল্পটির নানা অনিয়ম তুলে ধরে এবং সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করে। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, প্রকল্পটি কখনোই বাস্তবে সম্পূর্ণ চালু হয়নি এবং কাগজে-কলমে কাজ দেখিয়ে বৈদেশিক অর্থের অপচয় করা হয়েছে।
তবে আশ্চর্যজনকভাবে, পরবর্তীতে বিভাগীয় তদন্তে অভিযুক্তদের দায়মুক্তি দেওয়া হয়। এই তদন্তের নেতৃত্বে ছিলেন মোল্লা মিজানুর রহমান, যিনি বলেন, “আমরা জানি তারা অপরাধী, কিন্তু কাগজে-কলমে প্রমাণ পাওয়া যায়নি।” তার এই বক্তব্য নতুন করে বিতর্ক সৃষ্টি করেছে।
তিনি আরও দাবি করেন, প্রকল্প এলাকায় ট্রান্সফরমার চুরি, দূরবর্তী অবস্থান এবং প্রযুক্তিগত সমস্যার কারণে অনেক অবকাঠামো নষ্ট হয়ে গেছে। কিন্তু প্রশ্ন থেকে যায়—যদি প্রকল্পটি সঠিকভাবে বাস্তবায়িত হতো, তাহলে এত বড় পরিসরে অনিয়ম কীভাবে সম্ভব হলো?
অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে রাফিউস সাজ্জাদ নিজেকে নির্দোষ দাবি করেন। তিনি বলেন, “তদন্তে আসলে কিছুই পাওয়া যায়নি। কেউ কেউ ব্যক্তিগতভাবে আমার বিরোধিতা করছেন।” তবে তার এই বক্তব্য তদন্ত প্রতিবেদনের তথ্যের সঙ্গে সাংঘর্ষিক।
প্রকল্পটির শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত চারজন প্রকল্প পরিচালক দায়িত্ব পালন করেন, যার মধ্যে তিনজন ইতোমধ্যে অবসরে গেছেন। কিন্তু শেষ পর্যায়ে দায়িত্বে থাকা রাফিউস সাজ্জাদের সময়েই সবচেয়ে বেশি অনিয়ম হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। বিশেষ করে টেন্ডার প্রক্রিয়া, বিল উত্তোলন এবং কাজের মান নিয়ন্ত্রণে তার ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
তদন্ত প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, প্রকল্প বাস্তবায়নে কনসালটেন্টদের ভূমিকা ছিল অত্যন্ত দুর্বল এবং অনেক ক্ষেত্রে তারা দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হয়েছেন। তারা মাঠপর্যায়ে যাচাই-বাছাই না করেই কাজ সম্পন্ন দেখিয়েছেন, যা প্রকল্পের ব্যর্থতার অন্যতম কারণ।
বর্তমানে এই তদন্ত প্রতিবেদন পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের সচিবের দপ্তরে রয়েছে এবং পরবর্তী সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় আছে। তবে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা না নেওয়া হলে এ ধরনের অনিয়ম ভবিষ্যতেও চলতে থাকবে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
ফেনী-মিরসরাই সেচ প্রকল্প এখন শুধু একটি ব্যর্থ উন্নয়ন প্রকল্প নয়, বরং এটি হয়ে উঠেছে দুর্নীতি, অনিয়ম এবং জবাবদিহিতার অভাবের প্রতীক। প্রকল্প পরিচালক রাফিউস সাজ্জাদকে ঘিরে ওঠা অভিযোগগুলো সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে প্রমাণিত হলে এটি দেশের উন্নয়ন ব্যবস্থার জন্য একটি বড় সতর্কবার্তা হয়ে থাকবে।
সংবাদ শিরোনাম ::
রাফিউস সাজ্জাদের বিরুদ্ধে ২০০ কোটি টাকার দুর্নীতি
-
নিজস্ব প্রতিবেদক - আপডেট সময় ১২:২৮:০১ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ৭ এপ্রিল ২০২৬
- ৫১৪ বার পড়া হয়েছে
Tag :
জনপ্রিয় সংবাদ























