দুর্নীতির অভিযোগ, চলমান তদন্ত এবং প্রশাসনিক বিতর্ককে উপেক্ষা করেই আবারও স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি)-এর প্রধান প্রকৌশলী পদে আব্দুর রশিদ মিয়াকে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেওয়ার ঘটনায় প্রশাসনিক অঙ্গনে তীব্র আলোচনা-সমালোচনার জন্ম দিয়েছে। নতুন সরকার গঠনের অল্প সময়ের মধ্যেই এমন একটি সিদ্ধান্ত শুধু বিস্ময়ই তৈরি করেনি, বরং রাষ্ট্রীয় নিয়োগ প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা এবং নীতিগত অবস্থান নিয়েও বড় ধরনের প্রশ্ন তুলেছে। বিশেষ করে, যখন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশনের অনুসন্ধান চলমান এবং তার বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন ধরে অনিয়ম, ক্ষমতার অপব্যবহার ও অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগ রয়েছে, তখন এই পুনর্নিয়োগকে ঘিরে জনমনে নানা সন্দেহ ও সংশয় তৈরি হওয়াই স্বাভাবিক।
সরকারি নথি, বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদন এবং সংশ্লিষ্ট সূত্রে পাওয়া তথ্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, আব্দুর রশিদ মিয়ার চাকরিজীবন শুরু হয়েছিল ১৯৮৯ সালে এলজিইডিতে একজন প্রকৌশলী হিসেবে। দীর্ঘ সময় ধরে তিনি এই প্রতিষ্ঠানে কাজ করলেও তার কর্মজীবনের সবচেয়ে আলোচিত দিক হয়ে উঠেছে দ্রুত ও ধারাবাহিক পদোন্নতি। বিশেষ করে ২০১০ সালের পর থেকে তার পদোন্নতির গতি প্রশাসনিক মহলে অস্বাভাবিক হিসেবে বিবেচিত হয়েছে। ২০১০ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে তিনি মোট আটবার পদোন্নতি পেয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে, যা সাধারণত সরকারি চাকরির প্রচলিত কাঠামো ও জ্যেষ্ঠতা ভিত্তিক নিয়মের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
এই পদোন্নতির পেছনে প্রভাব ও রাজনৈতিক পরিচয়ের ভূমিকা ছিল বলে অভিযোগ রয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর দাবি, তিনি একটি প্রভাবশালী প্রকৌশলী সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত থেকে ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক বলয়ের ঘনিষ্ঠতা কাজে লাগিয়ে নিজের অবস্থান শক্তিশালী করেন। এর ফলে প্রশাসনিক কাঠামোর ভেতরে একটি শক্তিশালী নেটওয়ার্ক তৈরি করতে সক্ষম হন, যা তাকে একের পর এক গুরুত্বপূর্ণ পদে বসতে সহায়তা করেছে। এতে করে জ্যেষ্ঠতা ও যোগ্যতার ভিত্তিতে পদোন্নতির যে প্রচলিত ধারণা, তা প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে বলে মনে করছেন অনেক কর্মকর্তা।
দুর্নীতির অভিযোগের দিক থেকেও তার নাম বারবার সামনে এসেছে। ২০২৩ সালের ২৯ মার্চ তার বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশনে একটি লিখিত অভিযোগ জমা পড়ে, যার ভিত্তিতে অনুসন্ধান শুরু হয় এবং তা এখনো চলমান রয়েছে বলে জানা গেছে। অভিযোগে উল্লেখ করা হয়, বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্প, দরপত্র প্রক্রিয়া এবং নিয়োগ কার্যক্রমে প্রভাব খাটিয়ে বিপুল পরিমাণ অর্থ আত্মসাৎ করেছেন তিনি। এছাড়া নির্দিষ্ট কিছু ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের পক্ষে কাজ পাইয়ে দেওয়া এবং প্রতিযোগিতামূলক দরপত্র প্রক্রিয়াকে সীমিত করার অভিযোগও রয়েছে।
দুদক ও সংশ্লিষ্ট অনুসন্ধান সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, আব্দুর রশিদ মিয়া ও তার পরিবারের সদস্যদের নামে-বেনামে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ স্থাবর সম্পদের তথ্য পাওয়া গেছে। রাজধানী ঢাকার বিভিন্ন অভিজাত এলাকায় তার একাধিক বাড়ি, ফ্ল্যাট ও প্লট থাকার কথা বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। মোহাম্মদপুর ও ধানমন্ডি এলাকায় ছয়তলা বাড়ি, গুলশান ও বনানীতে একাধিক ফ্ল্যাট ও প্লট—এসব সম্পদের বাজারমূল্য কয়েকশ কোটি টাকা পর্যন্ত হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে, যদিও এ বিষয়ে সুনির্দিষ্ট হিসাব এখনো প্রকাশিত হয়নি।
শুধু রাজধানীতেই নয়, ঢাকার বাইরেও রাজশাহী, সিরাজগঞ্জ ও বগুড়াসহ বিভিন্ন জেলায় তার নামে বা তার ঘনিষ্ঠজনদের নামে জমি, বাড়ি ও ব্যবসায়িক সম্পদের অস্তিত্ব পাওয়া গেছে বলে দাবি করেছেন অনুসন্ধান সংশ্লিষ্টরা। এসব সম্পদের মধ্যে রয়েছে বহুতল ভবন, বাগানবাড়ি, ফুড গার্ডেন, ডায়াগনস্টিক সেন্টার এবং কৃষিজমি। এছাড়া বিভিন্ন ব্যাংকে বিপুল পরিমাণ অর্থ জমা ও এফডিআর থাকার কথাও অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।
অভিযোগের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, তার স্ত্রী ও আত্মীয়দের নামে পরিচালিত ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানগুলোর মাধ্যমে এলজিইডির বড় বড় প্রকল্প বাস্তবায়নের সুযোগ নেওয়া হয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে হাজার কোটি টাকার বেশি প্রকল্পে কাজ করার সুযোগ পাওয়া গেছে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে। এতে করে স্বার্থের সংঘাত তৈরি হয়েছে এবং সরকারি অর্থের সুষ্ঠু ব্যবহার নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। দরপত্র প্রক্রিয়ায় প্রভাব বিস্তার, প্রতিযোগিতা সীমিত করা এবং নির্দিষ্ট গোষ্ঠীকে সুবিধা দেওয়ার অভিযোগও বারবার সামনে এসেছে।
২০২৪ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর অনেকেই ধারণা করেছিলেন যে, প্রশাসনিক কাঠামোয় পরিবর্তন আসবে এবং বিতর্কিত কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। কিন্তু বাস্তবে দেখা গেছে, আব্দুর রশিদ মিয়ার ক্ষেত্রে তেমন কোনো পরিবর্তন হয়নি। বরং অন্তর্বর্তী সরকারের সময়েও তিনি পদোন্নতি পেয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। এমনকি একাধিক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাকে উপেক্ষা করে তাকে এগিয়ে দেওয়া হয়েছে বলেও দাবি করেছেন সংশ্লিষ্টরা।
২০২৫ সালের শুরুতে আরও একটি পদোন্নতির ঘটনায় ঘুষ লেনদেনের অভিযোগ সামনে আসে। অভিযোগ অনুযায়ী, একটি প্রভাবশালী মহলের সহায়তায় বিপুল অর্থের বিনিময়ে তিনি এই পদোন্নতি নিশ্চিত করেন। গুলশান ও উত্তরা এলাকায় এ সংক্রান্ত বৈঠক অনুষ্ঠিত হয় এবং একটি স্ট্যাম্প দলিলের মাধ্যমে অর্থ লেনদেনের বিষয়টি চূড়ান্ত করা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। যদিও এসব অভিযোগের বিষয়ে সরকারি কোনো আনুষ্ঠানিক ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি।
সবচেয়ে বেশি বিতর্ক তৈরি হয়েছে তার সর্বশেষ নিয়োগকে কেন্দ্র করে। প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী এলজিইডির প্রধান প্রকৌশলী পদে সাধারণত গ্রেড-১ বা গ্রেড-২ কর্মকর্তাদের নিয়োগ দেওয়ার কথা। কিন্তু আব্দুর রশিদ মিয়া গ্রেড-৩ পদমর্যাদা নিয়েই এই দায়িত্ব পেয়েছেন বলে জানা গেছে। এতে করে প্রশাসনিক নীতিমালা অনুসরণ করা হয়েছে কি না, তা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন উঠেছে।
এলজিইডির ভেতরেও এই নিয়োগ নিয়ে অসন্তোষ বিরাজ করছে। একাধিক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন, দীর্ঘদিন ধরে পদোন্নতি ও পদায়নের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতার অভাব রয়েছে। যোগ্যতা ও জ্যেষ্ঠতার পরিবর্তে প্রভাব ও ব্যক্তিগত পরিচয়কে গুরুত্ব দেওয়ার সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠানের পেশাগত পরিবেশকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। এতে করে মেধাবী ও যোগ্য কর্মকর্তারা বঞ্চিত হচ্ছেন এবং প্রতিষ্ঠানের সামগ্রিক কার্যক্রমেও নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।
একজন জ্যেষ্ঠ প্রকৌশলী বলেন, নিয়ম মেনে যারা ক্যারিয়ার গড়েছেন, তারা বারবার অবহেলিত হয়েছেন। এখন আবার একই ধরনের বিতর্কিত সিদ্ধান্ত নেওয়া হলে প্রতিষ্ঠানের ভেতরে হতাশা আরও বাড়বে। এতে করে কর্মপরিবেশ যেমন ক্ষতিগ্রস্ত হবে, তেমনি উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নেও প্রভাব পড়তে পারে।
বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এই নিয়োগ সরকারের ঘোষিত দুর্নীতিবিরোধী অবস্থানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। একজন দুর্নীতির অভিযোগে অভিযুক্ত এবং তদন্তাধীন কর্মকর্তাকে পুনরায় গুরুত্বপূর্ণ পদে বসানো হলে সরকারের বিশ্বাসযোগ্যতা প্রশ্নবিদ্ধ হতে পারে। এতে করে জনগণের মধ্যে একটি নেতিবাচক বার্তা যায় যে, অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও প্রভাবশালী ব্যক্তিরা পার পেয়ে যাচ্ছেন।
এদিকে, অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও আব্দুর রশিদ মিয়ার পক্ষ থেকে এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি। তার সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি কোনো প্রতিক্রিয়া জানাননি বলে জানা গেছে। সরকারের পক্ষ থেকেও এই নিয়োগের পক্ষে বিস্তারিত কোনো ব্যাখ্যা দেওয়া হয়নি, যা বিষয়টিকে আরও রহস্যময় করে তুলেছে।
সব মিলিয়ে দেখা যাচ্ছে, দুর্নীতির অভিযোগ, চলমান তদন্ত এবং প্রশাসনিক বিতর্কের মধ্যেই আব্দুর রশিদ মিয়ার পুনর্নিয়োগ রাষ্ট্রীয় স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা এবং নিয়োগ প্রক্রিয়ার ন্যায্যতা নিয়ে নতুন করে বড় প্রশ্ন তুলেছে। এই প্রশ্নগুলোর সন্তোষজনক জবাব না পাওয়া গেলে ভবিষ্যতে এ ধরনের সিদ্ধান্তের প্রভাব আরও বিস্তৃত হতে পারে এবং তা প্রশাসনের প্রতি জনগণের আস্থাকেও দুর্বল করে দিতে পারে।
নিজস্ব প্রতিবেদক 




















