গণপূর্ত অধিদপ্তরের শেরেবাংলা নগর-১ উপবিভাগের উপবিভাগীয় প্রকৌশলী মতিউর রহমানের বিরুদ্ধে টেন্ডার নিয়ন্ত্রণ, কমিশনের বিনিময়ে কাজ ভাগ করা, প্রকল্প সম্পাদনে অনিয়ম এবং কোটি কোটি টাকা আত্মসাৎ করার অভিযোগ উঠেছে। একাধিক সূত্রে জানা গেছে, বিগত কয়েক বছর ধরে মতিউর রহমান সরকারি দপ্তরের দায়িত্ব ও ক্ষমতাকে তার ব্যক্তিগত স্বার্থে ব্যবহার করে কোটি কোটি টাকা অর্জন করেছেন। তার কর্মকাণ্ড শুধু সরকারি প্রকল্পের স্বচ্ছতাকে প্রভাবিত করেছে না, বরং অনেক প্রকৃত ঠিকাদারের অধিকারকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে এবং সরকারি অর্থের অপচয় নিশ্চিত করেছে।
অধিদপ্তর সূত্র জানায়, মতিউর রহমান ২০০০-এর দশকের শেষের দিকে উপবিভাগীয় প্রকৌশলী হিসেবে দায়িত্বগ্রহণ করার পর থেকেই বিভিন্ন প্রকল্পের টেন্ডার প্রক্রিয়ায় সক্রিয়ভাবে জড়িত ছিলেন। তার বিশেষ কৌশল ছিল—একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট গঠন করা, যার মাধ্যমে সরকারি প্রকল্পের বরাদ্দকৃত অর্থের একটি বড় অংশ ব্যক্তি ও ঘনিষ্ঠ ঠিকাদারদের মধ্যে ভাগাভাগি করা হতো। এই সিন্ডিকেটে তার ঘনিষ্ঠ কয়েকজন ঠিকাদার তার নির্দেশে কাজ করতেন এবং প্রকল্পের প্রকৃত মান যাচাই না করে বিল উত্তোলন করতেন।
উল্লেখযোগ্য যে, মতিউর রহমান শুধুমাত্র সরকারি কর্মকর্তার ভূমিকায় সীমাবদ্ধ থাকতেন না। স্থানীয় রাজনৈতিক মহলের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা বজায় রেখে তিনি নিজের প্রভাব বিস্তার করতেন। জনশ্রুতি রয়েছে, তিনি নিজেকে ক্ষমতাসীন দলের ঘনিষ্ঠ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। এমনকি তার অভিযোগ আছে, তিনি উপবিভাগীয় প্রকৌশলী থেকে নির্বাহী প্রকৌশলী পদে পদায়ন পাওয়ার জন্য আওয়ামী লীগের এক প্রভাবশালী নেতার কাছে মোটা অঙ্কের অর্থ বিনিয়োগ করেছেন। এই ধরনের প্রভাবশালী সম্পর্ক তাকে সরকারি প্রকল্পের বরাদ্দ ও নিয়ন্ত্রণে অতিরিক্ত ক্ষমতা দিয়েছিল।
একাধিক সূত্র জানায়, মতিউর রহমানের নেতৃত্বে সিন্ডিকেটের মাধ্যমে ওটিএম (OTM) পদ্ধতিতে টেন্ডার নিয়ন্ত্রণ করা হতো। এই পদ্ধতিতে তিনি এবং তার ঘনিষ্ঠরা কয়েকজন ঠিকাদারের লাইসেন্স ব্যবহার করে দরপত্র দাখিল করতেন। প্রকল্প বাস্তবায়নে তাদের কার্যকলাপ প্রায়শই নামমাত্র ছিল। এর ফলে প্রকল্পের বাস্তব কাজের তুলনায় সরকারের ব্যয় কয়েকগুণ বেড়ে যেত। ঠিকাদাররা অভিযোগ করেছেন, যারা এই সিন্ডিকেটের অংশ ছিলেন না, তারা কোনো প্রকল্পে কাজের সুযোগই পেতেন না। ফলে সরকারি প্রকল্পে স্বচ্ছতা ক্ষুণ্ণ হয় এবং জনগণের টাকায় বিকৃতি ঘটে।
একাধিক স্থানীয় ঠিকাদার ও অধিদপ্তরের কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন, মতিউর রহমানের সিন্ডিকেট শুধু টেন্ডার নিয়ন্ত্রণে সীমাবদ্ধ ছিল না। তারা বিভিন্ন প্রকল্পের উপকরণ ও সরঞ্জাম ক্রয়, শ্রমিক নিয়োগ এবং প্রকল্পের বাস্তবায়ন নিয়ন্ত্রণ করত। প্রকল্পের বিল এবং অগ্রগতির হিসাব সম্পূর্ণ তার হাতে থাকায় তিনি চাইলে প্রকল্পের ব্যয় ও লাভের হিসাব তার সুবিধামতো পরিবর্তন করতে পারতেন। ফলে সরকারী প্রকল্পের বরাদ্দ অর্থের একটি বড় অংশ প্রকৃত কার্যক্রমে ব্যবহার হতো না, বরং সিন্ডিকেটের মাধ্যমে তার ঘনিষ্ঠদের মধ্যে বিতরণ হতো।
অভিযোগ রয়েছে, মতিউর রহমান সরকারি প্রকল্পে কাজ না করেও বিল উত্তোলন করতেন। এই প্রক্রিয়ায় প্রকল্পের কাজের মান কমে যেত এবং প্রকল্পের সঠিক সময়মতো সম্পন্ন হওয়া হতো না। অধিকাংশ প্রকল্পে ঠিকাদারদের জন্য চাপ তৈরি করা হতো—যদি তারা সিন্ডিকেটের নির্দেশ মানতে না চায়, তবে তাদের প্রকল্প থেকে বাদ দেওয়ার হুমকি দেওয়া হতো। এটি স্থানীয় ঠিকাদারদের মধ্যে একটি ভয় ও অনিশ্চয়তার পরিবেশ তৈরি করেছিল।
অধিদপ্তরের একাধিক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, সরকারি কর্মকর্তারূপে দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি মতিউর রহমান নিজের রাজনৈতিক পরিচয় ব্যবহার করে অধিদপ্তরের কর্মকর্তাদের উপর প্রভাব বিস্তার করতেন। তিনি স্থানীয় রাজনৈতিক নেতাদের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রেখে সরকারি প্রকল্পের বরাদ্দ ও নিয়ন্ত্রণে নিজের সুবিধা নিশ্চিত করতেন। ফলে তার বিরুদ্ধে অভিযোগ করার সাহস কেবলমাত্র খুব সীমিত কর্মীদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। অনেকেই তার কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে মুখ খুলতে ভয় পেতেন।
অভিযোগ রয়েছে, মতিউর রহমানের বিরুদ্ধে অবৈধ সম্পদ অর্জনের বিষয়ও। সরকারি দায়িত্বের সীমিত আয়ের সঙ্গে তার ও তার পরিবারের নামে অর্জিত সম্পদের পরিমাণ অমিলপূর্ণ। রাজধানীসহ বিভিন্ন স্থানে জমি, ফ্ল্যাট এবং ব্যবসায় তার বা পরিবারের নামের অধিকার থাকা তথ্য মিলেছে। বিশেষ করে, তার কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত প্রকল্প ও টেন্ডার সম্পর্কিত অর্থের অংশ তার ব্যক্তিগত সম্পদে পরিণত হওয়ার তথ্য অনেকেই জানিয়েছেন।
স্থানীয় ঠিকাদাররা জানিয়েছেন, গণপূর্তের বিভিন্ন প্রকল্পে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হলে এমন সিন্ডিকেট ভেঙে দেওয়ার প্রয়োজন রয়েছে। তারা দাবি করেছেন, যারা প্রকল্প বাস্তবায়নে অংশ নেন, তাদের জন্য সমান সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে। একাধিক ঠিকাদার অভিযোগ করেছেন, তারা সিন্ডিকেটের বাইরে থাকলে প্রকল্পে অংশগ্রহণ করা প্রায় অসম্ভব হয়ে যেত। এই প্রক্রিয়ায় সরকারের প্রকল্পের কার্যকরতা কমে গিয়েছে এবং জনসাধারণের টাকায় ক্ষতি হয়েছে।
অধিদপ্তরের একাধিক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, মতিউর রহমানের বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন ধরে অভিযোগ থাকলেও রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে তৎকালীন সময়ে কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। তবে সাম্প্রতিক সময়ে তার কর্মকাণ্ড পুনরায় আলোচনার বিষয় হয়ে এসেছে। সরকারি কর্মীদের এবং স্থানীয় ঠিকাদারদের দাবি, বিষয়টি অবিলম্বে নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করা উচিত।
গণপূর্ত অধিদপ্তরের বিভিন্ন সূত্র জানিয়েছে, মতিউর রহমানের সিন্ডিকেটের সদস্যরা প্রকল্পের বিভিন্ন পর্যায়ে নিজেরাই দায়িত্ব ভাগাভাগি করতেন। কেউ সরবরাহ, কেউ শ্রমিক নিয়োগ এবং কেউ প্রকল্পের বাস্তবায়ন দেখাশোনা করতেন। এই ব্যবস্থা তাদের সুবিধার্থে ছিল, কিন্তু প্রকল্পের স্বচ্ছতা এবং মানের জন্য ক্ষতিকর। প্রকল্প বাস্তবায়নের দায়িত্ব নির্ধারিত সরকারি প্রক্রিয়া অনুসরণ না করায় বহু ক্ষেত্রে সরকারি অর্থ অপচয় হয়েছে।
জনশ্রুতি রয়েছে, মতিউর রহমান শুধু টেন্ডার নিয়ন্ত্রণ ও বিল উত্তোলনেই সীমাবদ্ধ ছিলেন না। তিনি সরকারি প্রকল্পের বিভিন্ন পর্যায়ে নিজের প্রভাব বিস্তার করতেন। ঠিকাদারদের মধ্যে যারা তার নির্দেশ মানত না, তাদের প্রকল্প থেকে সরিয়ে দেওয়া হতো। ফলে অনেক প্রকল্পে কাজের মান কমে যেত। এছাড়া তার সিন্ডিকেটের কারণে প্রকল্পের বাস্তবায়নের ব্যয় বেড়ে যেত এবং সরকারি অর্থের যথাযথ ব্যবহার হতো না।
স্থানীয়রা জানিয়েছেন, মতিউর রহমান শুধু অর্থনৈতিক সুবিধা অর্জন করতেন না, তিনি রাজনৈতিক ক্ষমতাও গড়ে তুলতেন। তিনি সরকারি কর্মকর্তাদের মধ্যে নিজের অবস্থান দৃঢ় করতেন এবং প্রভাব বিস্তারের মাধ্যমে সরকারি প্রকল্পের নিয়ন্ত্রণ নিজের হাতে রাখতেন। জনশ্রুতি রয়েছে, তিনি সরকারি দায়িত্ব পালনের সময় একাধিকবার নিজেকে ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলের কর্মী হিসেবে পরিচয় করিয়েছেন।
উল্লেখযোগ্য, সরকারি কর্মকর্তারূপে দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি মতিউর রহমানের রাজনৈতিক পরিচয় এবং সিন্ডিকেটের ক্ষমতা তার বিরুদ্ধে অভিযোগগুলো লুকিয়ে রাখতে সাহায্য করত। একাধিক কর্মকর্তা জানান, অনেকেই তার বিরুদ্ধে অভিযোগ করার সাহস পাননি। যাদের অভিযোগ করার সাহস হয়েছে, তাদের ওপর নানা ধরনের চাপ প্রয়োগ করা হয়েছে।
অধিদপ্তরের একটি সূত্র জানিয়েছে, মতিউর রহমানের বিরুদ্ধে অভিযোগগুলো দীর্ঘদিন ধরে উঠলেও কোনো সুস্পষ্ট পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। তবে স্থানীয় ঠিকাদাররা বলছেন, সরকারি প্রকল্পে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হলে তাকে এবং তার সিন্ডিকেটের কার্যক্রমের বিষয়টি পুনরায় তদন্ত করা জরুরি। এতে ভবিষ্যতে সরকারি প্রকল্পের সঠিক বাস্তবায়ন নিশ্চিত হবে এবং জনসাধারণের টাকার অপচয় রোধ করা যাবে।
এ বিষয়ে মতিউর রহমানের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলে তিনি কোনো বক্তব্য দেননি। গণপূর্ত অধিদপ্তরের দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, অভিযোগের বিষয়ে সুনির্দিষ্ট তথ্য পাওয়া গেলে তা তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
অতীতে মতিউর রহমানের কর্মকাণ্ড শুধু টেন্ডার নিয়ন্ত্রণ বা অর্থ আত্মসাত পর্যন্ত সীমাবদ্ধ ছিল না। তার সিন্ডিকেট সরকারের বিভিন্ন প্রকল্পে প্রভাব বিস্তারের মাধ্যমে নানা ধরনের অনিয়মে লিপ্ত ছিল। স্থানীয় ঠিকাদাররা জানান, তার সিন্ডিকেটের কারণে প্রকল্পের কাজে সুষ্ঠু প্রতিযোগিতা স্থাপন করা সম্ভব হতো না। ঠিকাদাররা প্রায়শই অভিযোগ করেন, যারা সিন্ডিকেটের সঙ্গে না থাকত, তারা প্রকল্পে অংশগ্রহণ করতে পারত না। ফলে সরকারি প্রকল্পের কার্যকারিতা কমে যেত এবং জনসাধারণের অর্থের অপচয় হতো।
অধিদপ্তরের একাধিক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, মতিউর রহমানের বিরুদ্ধে অভিযোগগুলো দীর্ঘদিন ধরেই প্রকাশিত হলেও রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। তবে সাম্প্রতিক সময়ে বিষয়টি পুনরায় আলোচনার বিষয় হয়ে এসেছে। স্থানীয় ঠিকাদাররা আশা করছেন, এই অভিযোগগুলো তদন্ত করে সরকারি প্রকল্পে স্বচ্ছতা এবং প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশ নিশ্চিত করা হবে।
মোটকথা, গণপূর্ত অধিদপ্তরের শেরেবাংলা নগর-১ উপবিভাগের উপবিভাগীয় প্রকৌশলী মতিউর রহমানের কর্মকাণ্ড একটি গুরুতর সমস্যা হিসেবে উদ্ভুত হয়েছে। টেন্ডার নিয়ন্ত্রণ, কমিশনের বিনিময়ে কাজ ভাগ করা, প্রকল্প বাস্তবায়নে অনিয়ম এবং কোটি কোটি টাকা আত্মসাত—এই সব অভিযোগ তাকে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নজরে এনেছে। স্থানীয় ঠিকাদার, সরকারি কর্মকর্তা এবং জনগণ আশা করছেন, বিষয়টি সম্পূর্ণ নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করা হবে এবং যারা সরকারি প্রকল্পের অর্থ আত্মসাতের সঙ্গে জড়িত তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
নিজস্ব প্রতিবেদক 

























