নারায়ণগঞ্জের প্রভাবশালী একটি পরিবারের সঙ্গে সম্পৃক্ততা, রাজনৈতিক ঘনিষ্ঠতা এবং ক্ষমতার বলয়ে অবস্থানকে ঘিরে দীর্ঘদিন ধরেই নানা আলোচনা ও সমালোচনার কেন্দ্রে রয়েছেন গণপূর্ত অধিদপ্তরের এক কর্মকর্তা। সম্প্রতি সেই আলোচনায় নতুন করে যুক্ত হয়েছে দুর্নীতির বিস্তর অভিযোগ। অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে আছেন গণপূর্ত অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলী জোবায়ের বিন হায়দার। বিভিন্ন সূত্রের বরাত দিয়ে অভিযোগ উঠেছে, তিনি প্রকল্পের নামে কমিশন বাণিজ্য, ঠিকাদারদের বিল আটকে ঘুষ আদায়, কাজ না করেই বিল উত্তোলন এবং পদায়ন বাণিজ্যের মাধ্যমে একটি শক্তিশালী দুর্নীতির নেটওয়ার্ক গড়ে তুলেছেন।
অভিযোগ রয়েছে, নারায়ণগঞ্জে কথিত আজমেরী বাহিনীর প্রধান হিসেবে পরিচিত পিজা শামীমের ছেলে হওয়ায় জোবায়ের বিন হায়দার দীর্ঘদিন ধরে ক্ষমতার প্রভাব কাজে লাগিয়ে নিজের অবস্থান সুদৃঢ় করেছেন। স্থানীয় অনেকের ভাষ্য অনুযায়ী, এই পারিবারিক ও রাজনৈতিক যোগাযোগ তাকে প্রশাসনিক নানা সুবিধা এনে দিয়েছে। ফলে তিনি দীর্ঘ সময় ধরে দপ্তরের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে থেকে প্রকল্পের কাজ ও বরাদ্দকে ঘিরে একটি প্রভাবশালী বলয় গড়ে তুলতে সক্ষম হয়েছেন।
গণপূর্ত অধিদপ্তর, যা দেশের সরকারি অবকাঠামো নির্মাণ ও রক্ষণাবেক্ষণের অন্যতম প্রধান সংস্থা, সেখানে নির্বাহী প্রকৌশলীর দায়িত্ব অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই পদে থাকা কর্মকর্তারা বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পের বাস্তবায়ন, টেন্ডার প্রক্রিয়া তদারকি এবং কাজের গুণগত মান নিশ্চিত করার দায়িত্ব পালন করেন। কিন্তু অভিযোগ উঠেছে, দায়িত্ব পালনের পরিবর্তে জোবায়ের বিন হায়দার এই পদকে ব্যবহার করেছেন ব্যক্তিগত সম্পদ বৃদ্ধির একটি মাধ্যম হিসেবে।
সূত্র জানায়, বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পের নামে ঠিকাদারদের কাছ থেকে নিয়মিত কমিশন আদায় করা তার একটি রুটিন কার্যক্রমে পরিণত হয়েছে। অভিযোগ অনুযায়ী, কোনো প্রকল্পের কাজ পেতে বা বিল ছাড় করাতে ঠিকাদারদের কাছ থেকে ১৫ থেকে ২০ শতাংশ পর্যন্ত কমিশন নেওয়া হতো। সংশ্লিষ্ট অনেক ঠিকাদার দাবি করেন, এই কমিশন না দিলে তাদের কাজের বিল দীর্ঘদিন আটকে রাখা হতো অথবা টেন্ডার প্রক্রিয়ায় নানা ধরনের বাধার মুখে পড়তে হতো। ফলে বাধ্য হয়ে অনেকেই কমিশন দিতে সম্মত হতেন।
অভিযোগ আরও রয়েছে, কিছু ক্ষেত্রে প্রকল্পের কাজ সম্পূর্ণ না করেই পুরো বিল উত্তোলনের সুযোগ করে দেওয়া হয়েছে। এতে সরকারের বিপুল পরিমাণ অর্থ অপচয় হয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন। দপ্তরের ভেতরে-বাইরে একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট গড়ে তুলে এই ধরনের অনিয়ম পরিচালনা করা হয়েছে বলেও অভিযোগ উঠেছে।
দপ্তরের কয়েকজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, দীর্ঘদিন ধরে একটি নির্দিষ্ট চক্র গণপূর্তের কিছু প্রকল্পে আধিপত্য বিস্তার করে রেখেছে। এই চক্রের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক থাকার কারণেই অনেক ক্ষেত্রে জোবায়ের বিন হায়দারের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলেও তা কার্যকরভাবে তদন্তের মুখে পড়েনি। বরং তার প্রভাবের কারণে অনেকেই প্রকাশ্যে কিছু বলতে সাহস পান না বলে দাবি করেছেন সংশ্লিষ্টরা।
অন্যদিকে অভিযোগ রয়েছে, পদায়ন বাণিজ্যের মাধ্যমেও বিপুল অর্থ লেনদেন হয়েছে। দপ্তরের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োগ বা বদলির ক্ষেত্রে প্রভাব খাটিয়ে অর্থ আদায়ের অভিযোগও উঠেছে তার বিরুদ্ধে। যদিও এসব অভিযোগের বিষয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়নি, তবুও সংশ্লিষ্ট মহলে বিষয়টি নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে আলোচনা চলছে।
জোবায়ের বিন হায়দারের রাজনৈতিক যোগাযোগ নিয়েও নানা কথা শোনা যায়। অভিযোগ রয়েছে, তিনি দীর্ঘদিন ধরে ক্ষমতাসীন দলের প্রভাবশালী ব্যক্তিদের ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত ছিলেন। বিশেষ করে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা-এর এক সফরে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করার ঘটনা তার প্রভাব ও যোগাযোগের বিষয়টি সামনে এনে দেয়।
২০২৩ সালের ১২ নভেম্বর নরসিংদীতে একটি সরকারি সফরে যান শেখ হাসিনা। ওই সফরের বিভিন্ন প্রস্তুতি ও সমন্বয়ের ক্ষেত্রে জোবায়ের বিন হায়দার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন বলে প্রশাসনিক সূত্রে জানা যায়। পরবর্তীতে তার এই ভূমিকার জন্য তাকে আনুষ্ঠানিকভাবে ধন্যবাদও জানানো হয়।
নরসিংদীর তৎকালীন জেলা প্রশাসক বদিউল আলম ১৮ নভেম্বর ২০২৩ তারিখে জোবায়ের বিন হায়দারকে একটি কৃতজ্ঞতা পত্র প্রদান করেন বলে জানা গেছে। সেই পত্রে সরকারি সফর সফলভাবে সম্পন্ন করতে সহযোগিতার জন্য তাকে ধন্যবাদ জানানো হয়েছিল। এই ঘটনার পর প্রশাসনিক মহলে তার প্রভাব নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়।
তবে সমালোচকদের মতে, সরকারি সফরে ভূমিকা রাখা বা প্রশাসনিক স্বীকৃতি পাওয়া কোনো কর্মকর্তাকে দুর্নীতির অভিযোগ থেকে মুক্ত করে না। বরং অভিযোগগুলো গুরুত্ব সহকারে তদন্ত করা প্রয়োজন, যাতে সত্যতা যাচাই করা যায়।
গণপূর্ত অধিদপ্তর দেশের অবকাঠামো উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। সরকারি ভবন, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, হাসপাতালসহ অসংখ্য স্থাপনা নির্মাণ ও রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব এই দপ্তরের ওপর ন্যস্ত। তাই এই দপ্তরের কোনো কর্মকর্তার বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ উঠলে তা শুধু একটি ব্যক্তিগত বিষয় নয়, বরং পুরো প্রতিষ্ঠানের ভাবমূর্তির ওপর প্রভাব ফেলে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, অবকাঠামো খাতে দুর্নীতি হলে তার প্রভাব দীর্ঘমেয়াদে দেশের উন্নয়নে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। কারণ নিম্নমানের নির্মাণ কাজ বা অনিয়মের কারণে ভবিষ্যতে বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। তাই এই খাতে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি।
স্থানীয় কয়েকজন ঠিকাদার অভিযোগ করেছেন, অনেক সময় প্রকল্পের কাজ শুরু করার আগেই তাদের কাছ থেকে নির্দিষ্ট হারে কমিশন দাবি করা হতো। কেউ কেউ দাবি করেন, কাজের বিল অনুমোদনের জন্যও আলাদা করে অর্থ দিতে হতো। এসব অভিযোগের কারণে অনেক ঠিকাদার নীরবে অসন্তোষ প্রকাশ করলেও প্রকাশ্যে কিছু বলতে চান না, কারণ এতে ভবিষ্যতে তাদের কাজের সুযোগ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
দপ্তরের ভেতরে থাকা কিছু কর্মকর্তার মতে, এই ধরনের অভিযোগ যদি সত্য প্রমাণিত হয়, তাহলে তা সরকারি অর্থের অপচয়ের পাশাপাশি প্রশাসনিক শৃঙ্খলার জন্যও মারাত্মক হুমকি হয়ে দাঁড়াবে। তারা মনে করেন, অভিযোগগুলো নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে যাচাই করা হলে প্রকৃত পরিস্থিতি স্পষ্ট হয়ে উঠবে।
এদিকে স্থানীয় সামাজিক ও রাজনৈতিক মহলেও বিষয়টি নিয়ে আলোচনা চলছে। অনেকেই মনে করছেন, সরকারি দপ্তরে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হলে অভিযোগের বিষয়ে দ্রুত তদন্ত হওয়া প্রয়োজন। একই সঙ্গে অভিযোগ প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়াও জরুরি।
তবে এই সব অভিযোগের বিষয়ে জোবায়ের বিন হায়দারের সরাসরি কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি। তার ঘনিষ্ঠ কয়েকজন দাবি করেছেন, তাকে উদ্দেশ্য করে উদ্দেশ্যমূলকভাবে এসব অভিযোগ ছড়ানো হচ্ছে। তাদের মতে, প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার কারণে কিছু মহল তার বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালাতে পারে।
তবুও অভিযোগের পরিমাণ ও বিস্তার এতটাই বেশি যে বিষয়টি নিয়ে জনমনে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে সরকারি প্রকল্পে কমিশন বাণিজ্য এবং বিল উত্তোলনের অভিযোগ সাধারণ মানুষের মধ্যেও উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে।
সুশাসন নিয়ে কাজ করা কয়েকজন বিশ্লেষক বলেন, বাংলাদেশে সরকারি উন্নয়ন প্রকল্পে দুর্নীতির অভিযোগ নতুন নয়। তবে প্রতিটি অভিযোগের ক্ষেত্রে সঠিক তদন্ত ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা হলে ধীরে ধীরে পরিস্থিতির উন্নতি সম্ভব।
তারা আরও বলেন, সরকারি দপ্তরে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা বাড়াতে প্রযুক্তির ব্যবহার, টেন্ডার প্রক্রিয়ার ডিজিটালাইজেশন এবং স্বাধীন নজরদারি ব্যবস্থার প্রয়োজন রয়েছে। এতে অনিয়মের সুযোগ কমে আসবে এবং দুর্নীতির অভিযোগও কমবে।
গণপূর্ত অধিদপ্তরের মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানে কোনো কর্মকর্তার বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ ওঠা নিঃসন্দেহে একটি গুরুতর বিষয়। তাই সংশ্লিষ্ট মহল আশা করছে, অভিযোগগুলো নিয়ে যথাযথ তদন্ত হবে এবং সত্য উদঘাটিত হবে।
একই সঙ্গে তারা মনে করেন, তদন্তের মাধ্যমে যদি অভিযোগের সত্যতা প্রমাণিত হয়, তাহলে আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা নেওয়া উচিত। এতে ভবিষ্যতে অন্য কর্মকর্তাদের জন্যও একটি বার্তা যাবে যে সরকারি দায়িত্ব পালনে অনিয়ম বা দুর্নীতির কোনো সুযোগ নেই।
অন্যদিকে যদি অভিযোগগুলো ভিত্তিহীন প্রমাণিত হয়, তাহলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার সম্মান ও সুনাম রক্ষার বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন। কারণ প্রমাণ ছাড়া কারও বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রচারিত হলে তা তার ব্যক্তিগত ও পেশাগত জীবনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
সব মিলিয়ে গণপূর্ত অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলী জোবায়ের বিন হায়দারকে ঘিরে ওঠা দুর্নীতির অভিযোগ বর্তমানে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে। অভিযোগগুলোর সত্যতা যাচাই এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের দায়িত্ব এখন সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের ওপরই নির্ভর করছে।
নিজস্ব প্রতিবেদক 























