ঢাকা ০৭:৪৬ অপরাহ্ন, সোমবার, ০৯ মার্চ ২০২৬, ২৫ ফাল্গুন ১৪৩২ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম ::
বিশ্ব নারী দিবসে প্রান্তিক নারীদের মাঝে চারা গাছ বিতরণ করলো রূপনকশা টিম ইয়ার্ডে জমে আছে ৪২০ কোটি টাকার পাথর, ক্রয় না করায় সংকটে খনি পার্বতীপুরে অভিযান চালিয়ে বিপুল পরিমাণ মাদকসহ আটক এক বালিয়াডাঙ্গী কৃষি অফিসে দিনব্যাপী প্রশিক্ষণ কর্মশালা অগ্রিম ঈদুল ফিতরের শুভেচ্ছা জানালেন সাংবাদিক মোঃ শিহাব উদ্দিন রহিমানপুরে মির্জা ফখরুল ও ‘ফ্যামিলি কার্ড’—মানবিক রাজনীতির এক নতুন দিগন্ত বাঞ্ছারামপুর প্রেস ক্লাবের ইফতার ও দোয়া মাহফিল অনুষ্ঠিত। হৃদয়ে শ্রীমঙ্গলের উদ্যোগে ১৫৫০ পরিবারের মাঝে রমজানের খাদ্য সামগ্রী বিতরণ পার্বতীপুরে বিএনপির ইফতার মাহফিলে সাবেক মেয়র মিনহাজুল হককে মেয়র প্রার্থী ঘোষণা শ্রীপুরে সাংবাদিককে মিথ্যা মামলা দেওয়ায় মানববন্ধন ও প্রতিবাদ সমাবেশ

ঝালকাঠি পানি উন্নয়ন বোর্ডে নিলয় পাশাকে ঘিরে দুর্নীতির অভিযোগ

ঝালকাঠি পানি উন্নয়ন বোর্ডে দায়িত্ব পালনকালে নানা অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগে আলোচনায় এসেছেন নির্বাহী প্রকৌশলী এ কে এম নিলয় পাশা। সুগন্ধা নদীর ভাঙন থেকে ঝালকাঠি সদর ও নলছিটি উপজেলা রক্ষায় গৃহীত প্রায় ৬৮০ কোটি টাকার একটি বড় প্রকল্পকে কেন্দ্র করে তার বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগগুলো এখন স্থানীয়ভাবে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। প্রকল্প শুরুর আগেই কয়েক লাখ টাকা তোলার অভিযোগ থেকে শুরু করে প্রকল্প বাস্তবায়নের সময় নিম্নমানের উপকরণ ব্যবহার, গোপনে কোটেশন দেখিয়ে বিল উত্তোলন, অফিসে অনিয়মিত উপস্থিতি—এমন একাধিক অভিযোগ ঘিরে প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়েছে ঝালকাঠি পানি উন্নয়ন বোর্ডের কার্যক্রম।

স্থানীয় সূত্র, ঠিকাদার ও সংশ্লিষ্ট দপ্তরের নথিপত্র ঘেঁটে জানা গেছে, ২০২৩ সালের ১৪ মার্চ ঝালকাঠি পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী হিসেবে দায়িত্ব নেন নিলয় পাশা। দায়িত্ব গ্রহণের পরপরই বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে তিনি আলোচনায় আসেন। অভিযোগ রয়েছে, যোগদানের অল্প সময়ের মধ্যেই অফিস কম্পাউন্ডে থাকা লক্ষাধিক টাকা মূল্যের দুটি বড় মেহগনি গাছ কেটে নেওয়ার চেষ্টা করা হয়। গাছগুলো বরিশালে নিয়ে যাওয়ার সময় পুলিশ তা আটক করে বলে স্থানীয় সূত্র দাবি করেছে। পরে ঊর্ধ্বতন পর্যায়ের কিছু কর্মকর্তার সহায়তা ও বন বিভাগের সংশ্লিষ্টতার মাধ্যমে পেছনের তারিখ দেখিয়ে বিষয়টি সামাল দেওয়া হয় বলে অভিযোগ রয়েছে।

এরপর থেকেই তার কর্মকাণ্ড নিয়ে নানা প্রশ্ন উঠতে থাকে। সবচেয়ে বড় অভিযোগটি উঠে আসে সুগন্ধা নদীর ভাঙন থেকে ঝালকাঠি সদর ও নলছিটি উপজেলার বিভিন্ন এলাকা রক্ষার জন্য নেওয়া ৬৮০ কোটি ১৩ লাখ টাকা ব্যয়ের একটি প্রকল্পকে কেন্দ্র করে। একনেকে অনুমোদিত এই প্রকল্পের আওতায় প্রায় ১৩ দশমিক ২১৫ কিলোমিটার নদীতীর সংরক্ষণ ও প্রতিরক্ষা কাজ করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়। প্রকল্পটির অধীনে জিও ব্যাগ ফেলা, সিসি ব্লক বসানো এবং নদীতীর মজবুত করার কাজ করার কথা রয়েছে। প্রকল্পটি বাস্তবায়নের জন্য মোট ৩৪টি প্যাকেজে কাজ ভাগ করা হয়েছে, যার মধ্যে ১৮টি ঝালকাঠি সদর উপজেলায় এবং ১৬টি নলছিটি উপজেলায়।

অভিযোগ রয়েছে, প্রকল্পের মূল কাজ শুরু হওয়ার আগেই গত বছরের জুন মাসে নির্বাহী প্রকৌশলী নিলয় পাশা অতিগোপনে কয়েকটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের নামে কোটেশন দেখিয়ে ল্যাপটপ, ফটোকপি মেশিন ও অফিস আসবাবপত্র কেনার নামে প্রায় ২৫ লাখ টাকা বিল তুলে নেন। স্থানীয় ঠিকাদারদের দাবি, এই কোটেশন প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ গোপনে সম্পন্ন করা হয় এবং ঝালকাঠির কোনো ঠিকাদারকে বিষয়টি জানানো হয়নি। অথচ সাধারণত কোনো সরকারি অফিসে কোটেশন আহ্বান করা হলে স্থানীয় ঠিকাদাররা তা আগে থেকেই জানতে পারেন। এ ক্ষেত্রে তা হয়নি বলে অভিযোগ উঠেছে।

এই কোটেশনে বরিশালের একটি প্রতিষ্ঠান ওশিয়ান এন্টারপ্রাইজের নাম ব্যবহার করা হয়েছে বলে জানা যায়। তবে প্রতিষ্ঠানটির মালিক তানভির আহমেদ দাবি করেছেন, তিনি কোটেশনের বিষয়ে পুরোপুরি অবগত ছিলেন না। তার ভাষ্য অনুযায়ী, তিনি কিছু ল্যাপটপ, ফটোকপি মেশিন ও কিছু আসবাবপত্র সরবরাহ করলেও পুরো প্রক্রিয়ায় আরও কয়েকটি প্রতিষ্ঠান যুক্ত ছিল। স্থানীয়দের অভিযোগ, ২৫ লাখ টাকার কোটেশনের বিপরীতে অফিসে মাত্র দুটি ল্যাপটপ ও তিনটি ফটোকপি মেশিন আনা হয়েছে, বাকি মালামালের কোনো হদিস পাওয়া যায়নি।

একই সময় আরও একটি অভিযোগ ওঠে যে, কাঠালিয়া লঞ্চঘাট এলাকায় বিষখালী নদীর তীর রক্ষার দুটি জরুরি কাজ দেখিয়ে পিরোজপুরের একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের নামে প্রায় ৩০ লাখ টাকা উত্তোলন করা হয়েছে। তবে বাস্তবে কাজের অগ্রগতি বা সাইটে কার্যক্রম নিয়ে স্থানীয়ভাবে প্রশ্ন উঠেছে।

ঝালকাঠির কয়েকজন ঠিকাদার নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন, নির্বাহী প্রকৌশলী নিলয় পাশা প্রায়ই স্থানীয় অফিসে উপস্থিত থাকেন না। তার স্ত্রী নাসরিন ইসলাম বরিশালে পানি উন্নয়ন বোর্ডের চিফ অফিসে নির্বাহী প্রকৌশলী হিসেবে কর্মরত। ফলে তিনি বেশির ভাগ সময় বরিশালেই অবস্থান করেন। অভিযোগ রয়েছে, বরিশালে তিনি নিজের জন্য একটি বিকল্প অফিসও তৈরি করেছেন। ঝালকাঠির ঠিকাদার বা অফিসের কর্মচারীরা প্রয়োজনীয় ফাইল বা নথিতে স্বাক্ষর নেওয়ার জন্য বরিশালে গিয়ে তার সঙ্গে যোগাযোগ করেন।

আরও অভিযোগ রয়েছে, অফিসে দুজন সরকারি ড্রাইভার থাকা সত্ত্বেও তিনি প্রায়ই স্পিডবোট চালক দিয়ে অফিসের গাড়ি চালান এবং সেই গাড়িতেই নিয়মিত বরিশাল যাতায়াত করেন। সরকারি সম্পদের এ ধরনের ব্যবহার নিয়েও স্থানীয়ভাবে প্রশ্ন উঠেছে।

অভিযোগের আরেকটি দিক হলো, রাজনৈতিক পরিচয় ঘিরেও নিলয় পাশাকে নিয়ে আলোচনা রয়েছে। স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, আওয়ামী লীগের আমলে মুক্তিযোদ্ধা কোটায় তিনি সরকারি চাকরিতে যোগ দেন। তবে বর্তমানে নিজের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ থেকে নিজেকে দূরে রাখতে তিনি বিভিন্ন মহলে নিজেকে ভিন্ন রাজনৈতিক মতাদর্শের সমর্থক হিসেবে পরিচয় দেওয়ার চেষ্টা করছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। কিছু ক্ষেত্রে তিনি নিজেকে জামায়াতের সমর্থক হিসেবে পরিচয় দিয়ে পরিস্থিতি ভিন্ন খাতে নেওয়ার চেষ্টা করছেন বলেও স্থানীয়রা দাবি করেছেন।

এরই মধ্যে চলতি বছরের শুরুতে সুগন্ধা নদীর তীর রক্ষা প্রকল্পের কাজ শুরু হয়। প্রকল্পের কাজ ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে শুরু হয়ে ২০২৭ সালের জুনে শেষ হওয়ার কথা রয়েছে। তবে কাজ শুরু হওয়ার কিছুদিনের মধ্যেই বিভিন্ন অনিয়মের অভিযোগ সামনে আসে। স্থানীয়দের অভিযোগ, নদী প্রতিরক্ষা কাজে নিম্নমানের বালু ব্যবহার করা হচ্ছে। ব্লক তৈরির ক্ষেত্রে বালুর অনুপাতে কম সিমেন্ট দেওয়া হচ্ছে এবং জিও ব্যাগে নির্ধারিত মানের বালু ব্যবহার করা হচ্ছে না।

সরেজমিনে কুতুবনগর এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, ব্লক তৈরিতে ব্যবহৃত বালুর মান নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। পানি উন্নয়ন বোর্ডের দায়িত্বপ্রাপ্ত ওয়ার্ক অ্যাসিস্ট্যান্ট পঙ্কজ কুমার সরকার জানিয়েছেন, নিয়ম অনুযায়ী ব্লক তৈরিতে ১ দশমিক ৫০ ফাইননেস মডুলাস বালু ব্যবহার করার কথা। কিন্তু সেখানে ১ দশমিক ৩৭ ফাইননেস মডুলাসের বালু ব্যবহার করা হচ্ছিল। বিষয়টি ধরা পড়ার পর টাস্কফোর্স ওই বালু বাতিল করে এবং সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারকে তা অপসারণের নির্দেশ দেওয়া হয়। প্রায় এক মাস কাজও বন্ধ রাখা হয়েছিল।

দায়িত্বপ্রাপ্ত এক এসও জানান, প্রায় ৪০০ কিউবিক বালু বাতিল করা হয়েছে। তবে বাতিল ঘোষণার আগে ওই বালু দিয়ে কত ব্লক তৈরি হয়েছে তা নির্দিষ্টভাবে বলা সম্ভব হয়নি। স্থানীয়রা অভিযোগ করেছেন, বাতিল করা বালুর স্তূপ এখনো সাইটে পড়ে রয়েছে।

এছাড়া ব্লক তৈরির সময় সিমেন্টের পরিমাণ নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। স্থানীয়দের দাবি, নিয়ম অনুযায়ী ছয় ভাগ বালুর বিপরীতে এক ভাগ সিমেন্ট দেওয়ার কথা থাকলেও বাস্তবে ১২ ভাগ বালুর বিপরীতে এক ভাগ সিমেন্ট দেওয়া হচ্ছে। এতে ব্লকের শক্তি কমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

জিও ব্যাগ ব্যবহারের ক্ষেত্রেও অনিয়মের অভিযোগ পাওয়া গেছে। নদীর গভীর ও ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলোতে যেখানে বেশি সংখ্যক জিও ব্যাগ ফেলার প্রয়োজন, সেখানে তা ফেলা হয়নি বলে অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয়দের মতে, ওইসব এলাকায় কমপক্ষে ১৫ থেকে ২০ হাজার জিও ব্যাগ প্রয়োজন। তবে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, তাদের কাছে মাত্র তিন থেকে চার হাজার জিও ব্যাগ মজুত রয়েছে।

ভাটারিকান্দা এলাকাতেও অনিয়মের চিত্র দেখা গেছে বলে অভিযোগ রয়েছে। সেখানে ব্লক ঢালাইয়ের সময় পানি উন্নয়ন বোর্ডের কোনো তদারকি কর্মকর্তা উপস্থিত ছিলেন না বলে স্থানীয়রা জানিয়েছেন। পরে এক এসও ঘটনাস্থলে এসে কাজের তদারকি করেন।

এসব অভিযোগের বিষয়ে নির্বাহী প্রকৌশলী নিলয় পাশা দাবি করেছেন, তার বিরুদ্ধে আনা অনিয়মের অভিযোগ সঠিক নয়। তিনি বলেন, ল্যাপটপ, ফটোকপি মেশিন ও অন্যান্য মালামাল কেনার ক্ষেত্রে সঠিক নিয়ম অনুসরণ করা হয়েছে এবং কোটেশন প্রক্রিয়াও বিধি অনুযায়ী সম্পন্ন হয়েছে। তার বক্তব্য, কোনো ঠিকাদার কোটেশনের বিষয়ে জানেন না—এমন দাবি বিশ্বাসযোগ্য নয়।

নদীতীর রক্ষা প্রকল্পের অনিয়মের অভিযোগ সম্পর্কেও তিনি বলেছেন, জিও ব্যাগে গাঁথনি বালু ব্যবহারের বাধ্যবাধকতা নেই এবং নির্দিষ্ট মানের ভিটে বালু ব্যবহার করা গেলেও তা গ্রহণযোগ্য। এছাড়া লোকবল সংকটের কারণে সব সাইটে নিয়মিত তদারকি করা সম্ভব হচ্ছে না বলেও তিনি দাবি করেন।

তবে স্থানীয়দের মতে, এত বড় একটি প্রকল্পে তদারকির অভাব এবং নিম্নমানের উপকরণ ব্যবহার হলে ভবিষ্যতে নদীতীর রক্ষা কার্যক্রম মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। এতে একদিকে যেমন রাষ্ট্রীয় অর্থের অপচয় হবে, অন্যদিকে নদীভাঙনের ঝুঁকিতে থাকা হাজারো মানুষের নিরাপত্তাও হুমকির মুখে পড়তে পারে।

প্রকল্পের দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রকল্প পরিচালক পার্থ প্রতিম সাহা জানিয়েছেন, বিষয়টি তার নজরে এসেছে এবং নির্বাহী প্রকৌশলীর সঙ্গে আলোচনা করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

স্থানীয় বাসিন্দারা বলছেন, সুগন্ধা নদীর ভাঙন দীর্ঘদিন ধরে ঝালকাঠি ও নলছিটি এলাকার মানুষের জন্য বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। নদীর তীর রক্ষা প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে বহু মানুষ উপকৃত হওয়ার কথা। কিন্তু প্রকল্পের শুরু থেকেই যদি অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ ওঠে, তাহলে সেই আশার জায়গা নষ্ট হয়ে যেতে পারে।

তাদের দাবি, প্রকল্পের সব কাজ সঠিকভাবে তদারকি করা এবং অভিযোগগুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত করা জরুরি। প্রয়োজনে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ারও দাবি জানিয়েছেন তারা।

স্থানীয় সচেতন মহলের মতে, সরকারি উন্নয়ন প্রকল্পে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত না হলে দেশের উন্নয়ন কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত হবে। তাই ঝালকাঠি পানি উন্নয়ন বোর্ডের এই প্রকল্পের অভিযোগগুলো দ্রুত তদন্ত করে প্রকৃত সত্য উদঘাটন করা এখন সময়ের দাবি।

Tag :

আপনার মতামত লিখুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল ও অন্যান্য তথ্য সঞ্চয় করে রাখুন

জনপ্রিয় সংবাদ

বিশ্ব নারী দিবসে প্রান্তিক নারীদের মাঝে চারা গাছ বিতরণ করলো রূপনকশা টিম

ঝালকাঠি পানি উন্নয়ন বোর্ডে নিলয় পাশাকে ঘিরে দুর্নীতির অভিযোগ

আপডেট সময় ০৩:২২:১৪ অপরাহ্ন, সোমবার, ৯ মার্চ ২০২৬

ঝালকাঠি পানি উন্নয়ন বোর্ডে দায়িত্ব পালনকালে নানা অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগে আলোচনায় এসেছেন নির্বাহী প্রকৌশলী এ কে এম নিলয় পাশা। সুগন্ধা নদীর ভাঙন থেকে ঝালকাঠি সদর ও নলছিটি উপজেলা রক্ষায় গৃহীত প্রায় ৬৮০ কোটি টাকার একটি বড় প্রকল্পকে কেন্দ্র করে তার বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগগুলো এখন স্থানীয়ভাবে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। প্রকল্প শুরুর আগেই কয়েক লাখ টাকা তোলার অভিযোগ থেকে শুরু করে প্রকল্প বাস্তবায়নের সময় নিম্নমানের উপকরণ ব্যবহার, গোপনে কোটেশন দেখিয়ে বিল উত্তোলন, অফিসে অনিয়মিত উপস্থিতি—এমন একাধিক অভিযোগ ঘিরে প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়েছে ঝালকাঠি পানি উন্নয়ন বোর্ডের কার্যক্রম।

স্থানীয় সূত্র, ঠিকাদার ও সংশ্লিষ্ট দপ্তরের নথিপত্র ঘেঁটে জানা গেছে, ২০২৩ সালের ১৪ মার্চ ঝালকাঠি পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী হিসেবে দায়িত্ব নেন নিলয় পাশা। দায়িত্ব গ্রহণের পরপরই বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে তিনি আলোচনায় আসেন। অভিযোগ রয়েছে, যোগদানের অল্প সময়ের মধ্যেই অফিস কম্পাউন্ডে থাকা লক্ষাধিক টাকা মূল্যের দুটি বড় মেহগনি গাছ কেটে নেওয়ার চেষ্টা করা হয়। গাছগুলো বরিশালে নিয়ে যাওয়ার সময় পুলিশ তা আটক করে বলে স্থানীয় সূত্র দাবি করেছে। পরে ঊর্ধ্বতন পর্যায়ের কিছু কর্মকর্তার সহায়তা ও বন বিভাগের সংশ্লিষ্টতার মাধ্যমে পেছনের তারিখ দেখিয়ে বিষয়টি সামাল দেওয়া হয় বলে অভিযোগ রয়েছে।

এরপর থেকেই তার কর্মকাণ্ড নিয়ে নানা প্রশ্ন উঠতে থাকে। সবচেয়ে বড় অভিযোগটি উঠে আসে সুগন্ধা নদীর ভাঙন থেকে ঝালকাঠি সদর ও নলছিটি উপজেলার বিভিন্ন এলাকা রক্ষার জন্য নেওয়া ৬৮০ কোটি ১৩ লাখ টাকা ব্যয়ের একটি প্রকল্পকে কেন্দ্র করে। একনেকে অনুমোদিত এই প্রকল্পের আওতায় প্রায় ১৩ দশমিক ২১৫ কিলোমিটার নদীতীর সংরক্ষণ ও প্রতিরক্ষা কাজ করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়। প্রকল্পটির অধীনে জিও ব্যাগ ফেলা, সিসি ব্লক বসানো এবং নদীতীর মজবুত করার কাজ করার কথা রয়েছে। প্রকল্পটি বাস্তবায়নের জন্য মোট ৩৪টি প্যাকেজে কাজ ভাগ করা হয়েছে, যার মধ্যে ১৮টি ঝালকাঠি সদর উপজেলায় এবং ১৬টি নলছিটি উপজেলায়।

অভিযোগ রয়েছে, প্রকল্পের মূল কাজ শুরু হওয়ার আগেই গত বছরের জুন মাসে নির্বাহী প্রকৌশলী নিলয় পাশা অতিগোপনে কয়েকটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের নামে কোটেশন দেখিয়ে ল্যাপটপ, ফটোকপি মেশিন ও অফিস আসবাবপত্র কেনার নামে প্রায় ২৫ লাখ টাকা বিল তুলে নেন। স্থানীয় ঠিকাদারদের দাবি, এই কোটেশন প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ গোপনে সম্পন্ন করা হয় এবং ঝালকাঠির কোনো ঠিকাদারকে বিষয়টি জানানো হয়নি। অথচ সাধারণত কোনো সরকারি অফিসে কোটেশন আহ্বান করা হলে স্থানীয় ঠিকাদাররা তা আগে থেকেই জানতে পারেন। এ ক্ষেত্রে তা হয়নি বলে অভিযোগ উঠেছে।

এই কোটেশনে বরিশালের একটি প্রতিষ্ঠান ওশিয়ান এন্টারপ্রাইজের নাম ব্যবহার করা হয়েছে বলে জানা যায়। তবে প্রতিষ্ঠানটির মালিক তানভির আহমেদ দাবি করেছেন, তিনি কোটেশনের বিষয়ে পুরোপুরি অবগত ছিলেন না। তার ভাষ্য অনুযায়ী, তিনি কিছু ল্যাপটপ, ফটোকপি মেশিন ও কিছু আসবাবপত্র সরবরাহ করলেও পুরো প্রক্রিয়ায় আরও কয়েকটি প্রতিষ্ঠান যুক্ত ছিল। স্থানীয়দের অভিযোগ, ২৫ লাখ টাকার কোটেশনের বিপরীতে অফিসে মাত্র দুটি ল্যাপটপ ও তিনটি ফটোকপি মেশিন আনা হয়েছে, বাকি মালামালের কোনো হদিস পাওয়া যায়নি।

একই সময় আরও একটি অভিযোগ ওঠে যে, কাঠালিয়া লঞ্চঘাট এলাকায় বিষখালী নদীর তীর রক্ষার দুটি জরুরি কাজ দেখিয়ে পিরোজপুরের একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের নামে প্রায় ৩০ লাখ টাকা উত্তোলন করা হয়েছে। তবে বাস্তবে কাজের অগ্রগতি বা সাইটে কার্যক্রম নিয়ে স্থানীয়ভাবে প্রশ্ন উঠেছে।

ঝালকাঠির কয়েকজন ঠিকাদার নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন, নির্বাহী প্রকৌশলী নিলয় পাশা প্রায়ই স্থানীয় অফিসে উপস্থিত থাকেন না। তার স্ত্রী নাসরিন ইসলাম বরিশালে পানি উন্নয়ন বোর্ডের চিফ অফিসে নির্বাহী প্রকৌশলী হিসেবে কর্মরত। ফলে তিনি বেশির ভাগ সময় বরিশালেই অবস্থান করেন। অভিযোগ রয়েছে, বরিশালে তিনি নিজের জন্য একটি বিকল্প অফিসও তৈরি করেছেন। ঝালকাঠির ঠিকাদার বা অফিসের কর্মচারীরা প্রয়োজনীয় ফাইল বা নথিতে স্বাক্ষর নেওয়ার জন্য বরিশালে গিয়ে তার সঙ্গে যোগাযোগ করেন।

আরও অভিযোগ রয়েছে, অফিসে দুজন সরকারি ড্রাইভার থাকা সত্ত্বেও তিনি প্রায়ই স্পিডবোট চালক দিয়ে অফিসের গাড়ি চালান এবং সেই গাড়িতেই নিয়মিত বরিশাল যাতায়াত করেন। সরকারি সম্পদের এ ধরনের ব্যবহার নিয়েও স্থানীয়ভাবে প্রশ্ন উঠেছে।

অভিযোগের আরেকটি দিক হলো, রাজনৈতিক পরিচয় ঘিরেও নিলয় পাশাকে নিয়ে আলোচনা রয়েছে। স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, আওয়ামী লীগের আমলে মুক্তিযোদ্ধা কোটায় তিনি সরকারি চাকরিতে যোগ দেন। তবে বর্তমানে নিজের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ থেকে নিজেকে দূরে রাখতে তিনি বিভিন্ন মহলে নিজেকে ভিন্ন রাজনৈতিক মতাদর্শের সমর্থক হিসেবে পরিচয় দেওয়ার চেষ্টা করছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। কিছু ক্ষেত্রে তিনি নিজেকে জামায়াতের সমর্থক হিসেবে পরিচয় দিয়ে পরিস্থিতি ভিন্ন খাতে নেওয়ার চেষ্টা করছেন বলেও স্থানীয়রা দাবি করেছেন।

এরই মধ্যে চলতি বছরের শুরুতে সুগন্ধা নদীর তীর রক্ষা প্রকল্পের কাজ শুরু হয়। প্রকল্পের কাজ ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে শুরু হয়ে ২০২৭ সালের জুনে শেষ হওয়ার কথা রয়েছে। তবে কাজ শুরু হওয়ার কিছুদিনের মধ্যেই বিভিন্ন অনিয়মের অভিযোগ সামনে আসে। স্থানীয়দের অভিযোগ, নদী প্রতিরক্ষা কাজে নিম্নমানের বালু ব্যবহার করা হচ্ছে। ব্লক তৈরির ক্ষেত্রে বালুর অনুপাতে কম সিমেন্ট দেওয়া হচ্ছে এবং জিও ব্যাগে নির্ধারিত মানের বালু ব্যবহার করা হচ্ছে না।

সরেজমিনে কুতুবনগর এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, ব্লক তৈরিতে ব্যবহৃত বালুর মান নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। পানি উন্নয়ন বোর্ডের দায়িত্বপ্রাপ্ত ওয়ার্ক অ্যাসিস্ট্যান্ট পঙ্কজ কুমার সরকার জানিয়েছেন, নিয়ম অনুযায়ী ব্লক তৈরিতে ১ দশমিক ৫০ ফাইননেস মডুলাস বালু ব্যবহার করার কথা। কিন্তু সেখানে ১ দশমিক ৩৭ ফাইননেস মডুলাসের বালু ব্যবহার করা হচ্ছিল। বিষয়টি ধরা পড়ার পর টাস্কফোর্স ওই বালু বাতিল করে এবং সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারকে তা অপসারণের নির্দেশ দেওয়া হয়। প্রায় এক মাস কাজও বন্ধ রাখা হয়েছিল।

দায়িত্বপ্রাপ্ত এক এসও জানান, প্রায় ৪০০ কিউবিক বালু বাতিল করা হয়েছে। তবে বাতিল ঘোষণার আগে ওই বালু দিয়ে কত ব্লক তৈরি হয়েছে তা নির্দিষ্টভাবে বলা সম্ভব হয়নি। স্থানীয়রা অভিযোগ করেছেন, বাতিল করা বালুর স্তূপ এখনো সাইটে পড়ে রয়েছে।

এছাড়া ব্লক তৈরির সময় সিমেন্টের পরিমাণ নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। স্থানীয়দের দাবি, নিয়ম অনুযায়ী ছয় ভাগ বালুর বিপরীতে এক ভাগ সিমেন্ট দেওয়ার কথা থাকলেও বাস্তবে ১২ ভাগ বালুর বিপরীতে এক ভাগ সিমেন্ট দেওয়া হচ্ছে। এতে ব্লকের শক্তি কমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

জিও ব্যাগ ব্যবহারের ক্ষেত্রেও অনিয়মের অভিযোগ পাওয়া গেছে। নদীর গভীর ও ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলোতে যেখানে বেশি সংখ্যক জিও ব্যাগ ফেলার প্রয়োজন, সেখানে তা ফেলা হয়নি বলে অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয়দের মতে, ওইসব এলাকায় কমপক্ষে ১৫ থেকে ২০ হাজার জিও ব্যাগ প্রয়োজন। তবে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, তাদের কাছে মাত্র তিন থেকে চার হাজার জিও ব্যাগ মজুত রয়েছে।

ভাটারিকান্দা এলাকাতেও অনিয়মের চিত্র দেখা গেছে বলে অভিযোগ রয়েছে। সেখানে ব্লক ঢালাইয়ের সময় পানি উন্নয়ন বোর্ডের কোনো তদারকি কর্মকর্তা উপস্থিত ছিলেন না বলে স্থানীয়রা জানিয়েছেন। পরে এক এসও ঘটনাস্থলে এসে কাজের তদারকি করেন।

এসব অভিযোগের বিষয়ে নির্বাহী প্রকৌশলী নিলয় পাশা দাবি করেছেন, তার বিরুদ্ধে আনা অনিয়মের অভিযোগ সঠিক নয়। তিনি বলেন, ল্যাপটপ, ফটোকপি মেশিন ও অন্যান্য মালামাল কেনার ক্ষেত্রে সঠিক নিয়ম অনুসরণ করা হয়েছে এবং কোটেশন প্রক্রিয়াও বিধি অনুযায়ী সম্পন্ন হয়েছে। তার বক্তব্য, কোনো ঠিকাদার কোটেশনের বিষয়ে জানেন না—এমন দাবি বিশ্বাসযোগ্য নয়।

নদীতীর রক্ষা প্রকল্পের অনিয়মের অভিযোগ সম্পর্কেও তিনি বলেছেন, জিও ব্যাগে গাঁথনি বালু ব্যবহারের বাধ্যবাধকতা নেই এবং নির্দিষ্ট মানের ভিটে বালু ব্যবহার করা গেলেও তা গ্রহণযোগ্য। এছাড়া লোকবল সংকটের কারণে সব সাইটে নিয়মিত তদারকি করা সম্ভব হচ্ছে না বলেও তিনি দাবি করেন।

তবে স্থানীয়দের মতে, এত বড় একটি প্রকল্পে তদারকির অভাব এবং নিম্নমানের উপকরণ ব্যবহার হলে ভবিষ্যতে নদীতীর রক্ষা কার্যক্রম মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। এতে একদিকে যেমন রাষ্ট্রীয় অর্থের অপচয় হবে, অন্যদিকে নদীভাঙনের ঝুঁকিতে থাকা হাজারো মানুষের নিরাপত্তাও হুমকির মুখে পড়তে পারে।

প্রকল্পের দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রকল্প পরিচালক পার্থ প্রতিম সাহা জানিয়েছেন, বিষয়টি তার নজরে এসেছে এবং নির্বাহী প্রকৌশলীর সঙ্গে আলোচনা করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

স্থানীয় বাসিন্দারা বলছেন, সুগন্ধা নদীর ভাঙন দীর্ঘদিন ধরে ঝালকাঠি ও নলছিটি এলাকার মানুষের জন্য বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। নদীর তীর রক্ষা প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে বহু মানুষ উপকৃত হওয়ার কথা। কিন্তু প্রকল্পের শুরু থেকেই যদি অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ ওঠে, তাহলে সেই আশার জায়গা নষ্ট হয়ে যেতে পারে।

তাদের দাবি, প্রকল্পের সব কাজ সঠিকভাবে তদারকি করা এবং অভিযোগগুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত করা জরুরি। প্রয়োজনে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ারও দাবি জানিয়েছেন তারা।

স্থানীয় সচেতন মহলের মতে, সরকারি উন্নয়ন প্রকল্পে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত না হলে দেশের উন্নয়ন কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত হবে। তাই ঝালকাঠি পানি উন্নয়ন বোর্ডের এই প্রকল্পের অভিযোগগুলো দ্রুত তদন্ত করে প্রকৃত সত্য উদঘাটন করা এখন সময়ের দাবি।