ঢাকা ১২:২২ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ১৭ জুলাই ২০২৬, ২ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম ::
এ-প্লাসের মরীচিকা বনাম প্রকৃত শিক্ষা: আমাদের মানসিকতার অবক্ষয় প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্র বিষয়ক উপদেষ্টার সঙ্গে পাঁচ ইউরোপীয় রাষ্ট্রদূতের বৈঠক ধামরাইয়ের ঐতিহাসিক রথযাত্রার উদ্বোধনে সম্প্রীতি ও সৌহার্দ্যের বার্তা দিলেন চীফ হুইপ ফ্যাসিস্ট আমলে শাহিন চেয়ারম্যানের সহযোগী হয়ে কেরানীগঞ্জে ব্যাপক ঘুষ দুর্নীতির অভিযোগ ফ্যাসিবাদের অবসান ঘটিয়ে অর্জিত স্বাধীনতার মর্যাদা রক্ষা করতে হবে : পবিপ্রবি উপাচার্য বড়লেখায় জমি বিরোধ মামলা তুলে নিতে হুমকি ও হয়রানির অভিযোগ রঞ্জু মিয়ার বিরুদ্ধে অনিয়ম-দুর্নীতি ও ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ ধামইরহাটে ওড়না প্যাঁচানো অবস্থায় গাছের ডাল থেকে এইচএসসি পরীক্ষার্থীর লাশ উদ্ধার বিশ্বের সবচেয়ে বিপজ্জনক ফুটবলার মেসি-কেইন কেন ওমর সানিকে চাবুক মারতেন মৌসুমী?

নির্বাচন ক্ষমতার পরিবর্তন এবং গণতন্ত্রের নতুন পরীক্ষা

  • নিজস্ব প্রতিবেদক
  • আপডেট সময় ০৩:০৩:১৭ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ১০ ফেব্রুয়ারী ২০২৬
  • ৬৩৭ বার পড়া হয়েছে

দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকা বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ ‘ফ্যাসিবাদী’ শাসনের অভিযোগে ক্ষমতাচ্যুত হয়েছে। দলটির কার্যক্রম বর্তমানে স্থগিত এবং দলীয়প্রধান শেখ হাসিনা ভারতে অবস্থান করছেন। এই প্রেক্ষাপটে এবারের জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে, যেখানে বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামী প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। ইতোমধ্যে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ঠাকুরগাঁওয়ে এক জনসভায় মন্তব্য করেছেন, বিগত নির্বাচনগুলোতে শুধু বিএনপি ও আওয়ামী লীগের মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিত হতো। কিন্তু দলটির প্রধান শেখ হাসিনা দেশ ছেড়ে তাদের বিপদে ফেলে গেছেন। সাধারণ মানুষ মনে করছেন, এই নির্বাচন কেবল সরকার গঠনের প্রক্রিয়া নয়; এটি বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক ভবিষ্যৎ নির্ধারণের এক গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা।

এটা ঠিক যে, আওয়ামী লীগের ক্ষমতাচ্যুতি ও রাজনৈতিক নিষ্ক্রিয়তা দেশের রাজনীতিতে একটি বড় শূন্যতা তৈরি করেছে। স্বাধীনতার নেতৃত্বদানকারী ও বহু নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী একটি দলের হঠাৎ অনুপস্থিতি স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন তোলে– এই নির্বাচন কতটা অংশগ্রহণমূলক ও প্রতিনিধিত্বশীল হবে? তবে একই সঙ্গে এটাও সত্য যে, দীর্ঘ সময় ক্ষমতায় থাকার ফলে দলটির বিরুদ্ধে কর্তৃত্ববাদ, নির্বাচন ব্যবস্থার ওপর প্রভাব বিস্তার এবং মতপ্রকাশের স্বাধীনতা সংকুচিত করার অভিযোগ জমে উঠেছিল। এই অভিযোগগুলোর বিচার ও রাজনৈতিক মূল্যায়ন ইতিহাস ও আইনি প্রক্রিয়ার বিষয়; কিন্তু এর প্রভাব বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় সুস্পষ্ট।

এই পরিস্থিতিতে বিএনপি একটি প্রধান রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে সামনে এসেছে। বহুবার ক্ষমতায় থাকা এবং দীর্ঘদিন আন্দোলন-সংগ্রামের মধ্য দিয়ে যাওয়া দলটি দেশের একটি বিশাল ভোটব্যাংকের প্রতিনিধিত্ব করে। বিএনপির সামনে এখন বড় সুযোগ, কিন্তু একই সঙ্গে বড় দায়িত্বও। ক্ষমতার বাইরে থাকার সময় তারা যে গণতন্ত্র, ভোটাধিকার ও মানবাধিকারের কথা বলেছে, ক্ষমতার সম্ভাব্য দ্বারপ্রান্তে এসে সেই অঙ্গীকার বাস্তবায়নের পরীক্ষায় পড়বে দলটি। শুধু সরকার গঠনই নয়, একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক ও সহনশীল রাজনৈতিক পরিবেশ তৈরিই হবে তাদের জন্য আসল চ্যালেঞ্জ।

অন্যদিকে জামায়াতে ইসলামীও এই নির্বাচনে গুরুত্বপূর্ণ প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে আলোচনায় এসেছে। দলটির একটি সংগঠিত সমর্থকগোষ্ঠী রয়েছে এবং সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পুনর্বিন্যাসে তারা নতুন করে সক্রিয় হয়েছে। তবে জামায়াতকে ঘিরে অতীতের বিতর্ক জনমনে রয়ে গেছে।
এই নির্বাচনকে ঘিরে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো সংবিধান ও রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব। একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচন মানেই কেবল ব্যালট বাক্সে ভোট পড়া নয়; বরং প্রশাসনের নিরপেক্ষতা, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পেশাদারিত্ব, নির্বাচন কমিশনের স্বাধীনতা এবং গণমাধ্যমের অবাধ ভূমিকার সমন্বয়। কোনো পক্ষ যদি রাষ্ট্রযন্ত্রকে রাজনৈতিক স্বার্থে ব্যবহার করে, তবে ক্ষমতার পরিবর্তন হলেও গণতন্ত্রের প্রকৃত রূপ প্রতিষ্ঠিত হবে না।

আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপটও উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। আওয়ামী লীগের ক্ষমতাচ্যুতি ও নেতৃত্বের বিদেশে অবস্থান আন্তর্জাতিক মহলের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। একটি স্বচ্ছ ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচনই পারে বিশ্বদরবারে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি পুনরুদ্ধার করতে এবং সার্বভৌম সিদ্ধান্ত গ্রহণে দেশের অবস্থানকে শক্তিশালী করতে।

এ ক্ষেত্রে নাগরিক সমাজ ও গণমাধ্যমের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তারা যেন কোনো রাজনৈতিক পক্ষের প্রচারযন্ত্রে পরিণত না হয়ে সংবিধান, গণতন্ত্র ও জনগণের অধিকারের পক্ষে অবস্থান নেয়। সমালোচনা, প্রশ্ন এবং তথ্যভিত্তিক বিশ্লেষণই পারে রাজনৈতিক শক্তিগুলোকে জবাবদিহির মধ্যে রাখতে।

২০২৬ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচন একটি ক্ষমতার পরিবর্তনের নির্বাচন নয়; এটি একটি রাজনৈতিক সংস্কারের সুযোগ। আওয়ামী লীগের অনুপস্থিতি, বিএনপির উত্থান এবং জামায়াতের সক্রিয়তা– সব মিলিয়ে বাংলাদেশের গণতন্ত্র এক নতুন মোড়ে দাঁড়িয়ে আছে। এই মোড়ে দায়িত্বশীলতা, সংযম ও সংবিধানসম্মত পথেই ভবিষ্যতের বাংলাদেশ গড়ার একমাত্র উপায়।

 

Tag :

আপনার মতামত লিখুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল ও অন্যান্য তথ্য সঞ্চয় করে রাখুন

আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

এ-প্লাসের মরীচিকা বনাম প্রকৃত শিক্ষা: আমাদের মানসিকতার অবক্ষয়

নির্বাচন ক্ষমতার পরিবর্তন এবং গণতন্ত্রের নতুন পরীক্ষা

আপডেট সময় ০৩:০৩:১৭ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ১০ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকা বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ ‘ফ্যাসিবাদী’ শাসনের অভিযোগে ক্ষমতাচ্যুত হয়েছে। দলটির কার্যক্রম বর্তমানে স্থগিত এবং দলীয়প্রধান শেখ হাসিনা ভারতে অবস্থান করছেন। এই প্রেক্ষাপটে এবারের জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে, যেখানে বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামী প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। ইতোমধ্যে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ঠাকুরগাঁওয়ে এক জনসভায় মন্তব্য করেছেন, বিগত নির্বাচনগুলোতে শুধু বিএনপি ও আওয়ামী লীগের মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিত হতো। কিন্তু দলটির প্রধান শেখ হাসিনা দেশ ছেড়ে তাদের বিপদে ফেলে গেছেন। সাধারণ মানুষ মনে করছেন, এই নির্বাচন কেবল সরকার গঠনের প্রক্রিয়া নয়; এটি বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক ভবিষ্যৎ নির্ধারণের এক গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা।

এটা ঠিক যে, আওয়ামী লীগের ক্ষমতাচ্যুতি ও রাজনৈতিক নিষ্ক্রিয়তা দেশের রাজনীতিতে একটি বড় শূন্যতা তৈরি করেছে। স্বাধীনতার নেতৃত্বদানকারী ও বহু নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী একটি দলের হঠাৎ অনুপস্থিতি স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন তোলে– এই নির্বাচন কতটা অংশগ্রহণমূলক ও প্রতিনিধিত্বশীল হবে? তবে একই সঙ্গে এটাও সত্য যে, দীর্ঘ সময় ক্ষমতায় থাকার ফলে দলটির বিরুদ্ধে কর্তৃত্ববাদ, নির্বাচন ব্যবস্থার ওপর প্রভাব বিস্তার এবং মতপ্রকাশের স্বাধীনতা সংকুচিত করার অভিযোগ জমে উঠেছিল। এই অভিযোগগুলোর বিচার ও রাজনৈতিক মূল্যায়ন ইতিহাস ও আইনি প্রক্রিয়ার বিষয়; কিন্তু এর প্রভাব বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় সুস্পষ্ট।

এই পরিস্থিতিতে বিএনপি একটি প্রধান রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে সামনে এসেছে। বহুবার ক্ষমতায় থাকা এবং দীর্ঘদিন আন্দোলন-সংগ্রামের মধ্য দিয়ে যাওয়া দলটি দেশের একটি বিশাল ভোটব্যাংকের প্রতিনিধিত্ব করে। বিএনপির সামনে এখন বড় সুযোগ, কিন্তু একই সঙ্গে বড় দায়িত্বও। ক্ষমতার বাইরে থাকার সময় তারা যে গণতন্ত্র, ভোটাধিকার ও মানবাধিকারের কথা বলেছে, ক্ষমতার সম্ভাব্য দ্বারপ্রান্তে এসে সেই অঙ্গীকার বাস্তবায়নের পরীক্ষায় পড়বে দলটি। শুধু সরকার গঠনই নয়, একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক ও সহনশীল রাজনৈতিক পরিবেশ তৈরিই হবে তাদের জন্য আসল চ্যালেঞ্জ।

অন্যদিকে জামায়াতে ইসলামীও এই নির্বাচনে গুরুত্বপূর্ণ প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে আলোচনায় এসেছে। দলটির একটি সংগঠিত সমর্থকগোষ্ঠী রয়েছে এবং সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পুনর্বিন্যাসে তারা নতুন করে সক্রিয় হয়েছে। তবে জামায়াতকে ঘিরে অতীতের বিতর্ক জনমনে রয়ে গেছে।
এই নির্বাচনকে ঘিরে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো সংবিধান ও রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব। একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচন মানেই কেবল ব্যালট বাক্সে ভোট পড়া নয়; বরং প্রশাসনের নিরপেক্ষতা, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পেশাদারিত্ব, নির্বাচন কমিশনের স্বাধীনতা এবং গণমাধ্যমের অবাধ ভূমিকার সমন্বয়। কোনো পক্ষ যদি রাষ্ট্রযন্ত্রকে রাজনৈতিক স্বার্থে ব্যবহার করে, তবে ক্ষমতার পরিবর্তন হলেও গণতন্ত্রের প্রকৃত রূপ প্রতিষ্ঠিত হবে না।

আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপটও উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। আওয়ামী লীগের ক্ষমতাচ্যুতি ও নেতৃত্বের বিদেশে অবস্থান আন্তর্জাতিক মহলের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। একটি স্বচ্ছ ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচনই পারে বিশ্বদরবারে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি পুনরুদ্ধার করতে এবং সার্বভৌম সিদ্ধান্ত গ্রহণে দেশের অবস্থানকে শক্তিশালী করতে।

এ ক্ষেত্রে নাগরিক সমাজ ও গণমাধ্যমের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তারা যেন কোনো রাজনৈতিক পক্ষের প্রচারযন্ত্রে পরিণত না হয়ে সংবিধান, গণতন্ত্র ও জনগণের অধিকারের পক্ষে অবস্থান নেয়। সমালোচনা, প্রশ্ন এবং তথ্যভিত্তিক বিশ্লেষণই পারে রাজনৈতিক শক্তিগুলোকে জবাবদিহির মধ্যে রাখতে।

২০২৬ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচন একটি ক্ষমতার পরিবর্তনের নির্বাচন নয়; এটি একটি রাজনৈতিক সংস্কারের সুযোগ। আওয়ামী লীগের অনুপস্থিতি, বিএনপির উত্থান এবং জামায়াতের সক্রিয়তা– সব মিলিয়ে বাংলাদেশের গণতন্ত্র এক নতুন মোড়ে দাঁড়িয়ে আছে। এই মোড়ে দায়িত্বশীলতা, সংযম ও সংবিধানসম্মত পথেই ভবিষ্যতের বাংলাদেশ গড়ার একমাত্র উপায়।