রংপুর মেডিকেলে চিকিৎসার নামে হচ্ছেটা কী? নার্স ও চিকিৎসকের দায়িত্বহীনতার কারণে হাসপাতালে চিকিৎসাকালীন নবজাতকের মৃত্যু। ভুক্তভোগী পরিবারের আন্দোলন ও প্রতিবাদ। রংপুর মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালে ৬০০ জন চিকিৎসা নেওয়ার ব্যবস্থা থাকলেও পরবর্তীতে ২০২৫ সালে ১০০০ জনের চিকিৎসা ব্যবস্থা আছে। ৪১টি ওয়ার্ডে ১০০০ জনের রোগীর চিকিৎসার জন্য যে জনবলের প্রয়োজন তা যৎসামান্য। সরকারি পরিচ্ছন্নকর্মী হিসেবে ৬৪ জনের নিয়োগ আছে, অথচ রংপুর বিভাগের ৮টি জেলার রোগীরা প্রতিদিনের মতো ২০০০–২৬০০ জন চিকিৎসা নিচ্ছে। এ অবস্থায় মেডিকেল কর্তৃপক্ষের পক্ষে চিকিৎসা প্রদান সম্ভব হচ্ছে না।
সরকার বাহাদুরের পক্ষে রংপুর সদর হাসপাতাল শিশু বিভাগে ২৫০ জনের সীট প্রদানের বিধান থাকলেও এখন পর্যন্ত নির্ভরযোগ্য ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়নি। তাই মেডিকেল চিকিৎসা ব্যবস্থা দুর্বল হয়ে পড়েছে। অন্যদিকে, রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে শিশু বিভাগে চিকিৎসক ও নার্সদের অবহেলার কারণে নবজাতক শিশুর মৃত্যু ঘটেছে। ভুক্তভোগী পরিবার রংপুর মেডিকেলের পরিচালক বরাবর লিখিত অভিযোগ দাখিল করেছেন। দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য পরিচালক শিশু বিভাগের প্রধান ডা. খায়রুজ্জামানকে নির্দেশ প্রদান করেছেন।
ডা. খায়রুজ্জামান গণমাধ্যমকে বলেছেন, “আমার গ্রামের বাড়ী কুড়িগ্রাম জেলার ফুলবাড়ী উপজেলায়। রংপুর মেডিকেল কলেজের ছাত্র ছিলাম এবং দীর্ঘদিন ঢাকা মেডিকেলে চাকরি শেষে রংপুর মেডিকেলে যোগদান করে নিরাপদ চিকিৎসা প্রদানের চেষ্টা করছি। শিশু বিভাগে কর্মকর্তার সংখ্যা ৮ জন হলেও আছেন মাত্র ২ জন; বাকী ৬ জন নেই। তাই চিকিৎসা প্রদান করা আমাদের পক্ষে কঠিন হয়ে পড়েছে। তবে আমরা চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি শিশু বিভাগের আধুনিক যন্ত্রাংশ ব্যবহার করে আমাদের ৮টি জেলা থেকে শিশু রোগীদের উন্নত চিকিৎসা প্রদান নিশ্চিত করতে।”
ভুক্তভোগী অভিযোগ করেন, মেডিকেলের রোগীদের কাছ থেকে মোবাইল চুরি, ঔষধপত্র চুরি, বেড ভাড়ার নামে ২০০ টাকা করে, এবং কাঁচ ঘরে রাখার নামে ১০,০০০ টাকা চাঁদা দাবি করা হচ্ছে। এমনকি রক্ত দিলেও তা রোগীর শরীরে না দিয়ে আত্মসাৎ করা হচ্ছে, যা নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনা। শতাধিক ভুক্তভোগী বিভিন্ন জেলার সম্মিলিত কপি রংপুর জেলা প্রশাসকের মাধ্যমে প্রধান উপদেষ্টার বরাবর স্মারকলিপি প্রদান করার প্রস্তুতি নিচ্ছেন।
আক্তার জাহান বেগম, পিতা: মোঃ ইলিয়াছ হোসেনপ্রধান, গ্রাম: ভীমশহর, পোস্ট: ভেন্ডাবাড়ী, থানা: পীরগঞ্জ, জেলা: রংপুর। গত ২৯/০১/২০২৬ তারিখে আমার ছোটবোন মোছাঃ আরজুমান বেগম, স্বামী: মোঃ খায়রুল ইসলাম, থানা: পীরগঞ্জ, জেলা: রংপুর সন্ধ্যায় ডেলিভারি বিষয় নিয়ে রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি হন। রাত আনুমানিক ০২.০০ ঘটিকায় সিজারিয়ান অপারেশনের মাধ্যমে পুত্র সন্তানের জন্ম দেন। নবজাতকের জন্মকালীন শ্বাসরুদ্ধতা হয়। নবজাতক শিশু ইউনিটে ভর্তি করা হয় এবং মা পোস্ট-অপারেটিভ ইউনিটে নেওয়া হয়।
ভোর প্রায় ০৬.০০ টার দিকে মায়ের প্রসব পরবর্তী খিচুনি ও শ্বাসকষ্ট শুরু হলে কর্তব্যরত চিকিৎসক প্রসূতিকে আইসিইউতে নেওয়ার পরামর্শ দেন। কিন্তু জানান যে, রংপুর হাসপাতালে আইসিইউতে কোনো বেড খালি নেই এবং প্রাইভেট হাসপাতালে নেওয়ার সুপারিশ করেন।
অতঃপর দ্রুত গতিতে প্রায় ০৭.৩০ ঘটিকায় প্রসূতিকে নিকটস্থ গুড হেলথ হাসপাতালে আইসিইউতে ভর্তি করা হয়। হাসপাতাল আইসিইউতে বেড না থাকায় এবং প্রাইভেট হাসপাতালে বিলম্ব হওয়ায় পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়। কারণ, প্রসূতিকে আইসিইউতে নেওয়ার সময় তার অক্সিজেন লেভেল ৫৪%। অপরদিকে নবজাতকের চিকিৎসা চলাকালীন অবস্থায় ১ দিন পর বাবু চোখ মেললেও স্বাভাবিক হয়। এসময় মায়ের ব্রেস্টফিডিংও করা হয়। নবজাতক অনেকটা সুস্থ হলেও অবশেষে ০৫/০২/২০২৬ তারিখ সন্ধ্যায় মৃত্যু হয়।
ভুক্তভোগী পরিবারের অভিযোগ অনুযায়ী, SCANU-তে নবজাতকের অব্যবস্থাপনা লক্ষ্য করা যায়। শিশু ওয়ার্ডে ১০ নম্বর ওয়ার্ডে ওঠার সময় দেখা যায়, ভাতিজা এবং একজন চিকিৎসক (নাম অজানা) ১০ নম্বর ওয়ার্ড থেকে নবজাতককে ভিজিট দিয়ে ৯ নম্বর ওয়ার্ডের চিকিৎসক ডিউটিরুমে যাচ্ছেন। তাদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।
পরিবারের পক্ষ থেকে চিকিৎসককে ডাকা হলেও কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। শুধু কৃত্রিম শ্বাস-প্রশ্বাস দেওয়া হয়েছে। নবজাতকের উপর দায়িত্বশীল নার্স এবং চিকিৎসকরা যথাযথ মনোযোগ দেননি।
রংপুর মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আশিকুর রহমান বলেন, “আমরা দীর্ঘদিনের এই সমস্যা সমাধানে চেষ্টা অব্যাহত রেখেছি। দালাল ও দুর্নীতিবাজদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য রংপুরবাসীর আন্তরিক সহযোগিতা প্রয়োজন। রংপুরে ক্যান্সার, হার্ট ও কিডনি পরীক্ষার জন্য ১৭ নম্বর বিল্ডিং এখনও চালু হয়নি। চালু হলে রোগীরা সুচিকিৎসা পাবেন। ৫ তলা বিশিষ্ট জাইকার অনুদানে পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক বিল্ডিংটি নির্দিষ্ট সময়ে হস্তান্তর করতে পারেনি, যার কারণে বরাদ্দ ফেরৎ যাচ্ছে। গণপূর্ত বিভাগের প্রজেক্টের পিডি এখনও নির্ভরযোগ্য কাজ সম্পন্ন করতে পারেনি।”
বিশেষ প্রতিনিধি 





















