মানুষের জীবন কখনোই একরৈখিক নয়। সুখ ও স্বাচ্ছন্দ্যের পাশাপাশি দুঃখ, ব্যথা, অসুস্থতা ও নানা রকম বিপদ-আপদ মানুষের নিত্যসঙ্গী। অনেক সময় এসব কষ্ট মানুষকে হতাশ করে তোলে, মনে হয়; এ বুঝি আল্লাহর অসন্তুষ্টির লক্ষণ। অথচ ইসলাম আমাদের শেখায়, একজন মুমিনের জীবনে আসা প্রতিটি কষ্টই আল্লাহর হিকমত ও রহমতের অন্তর্ভুক্ত।
দুনিয়ার সামান্য যন্ত্রণা অনেক সময় আখিরাতের বড় শাস্তি থেকে রক্ষার উপায় হয়ে ওঠে এবং বান্দার গুনাহ মোচনের মাধ্যম হয়। আল্লাহ তাআলা তাঁর প্রিয় বান্দাদেরকে পরীক্ষার ভেতর দিয়ে পরিশুদ্ধ করেন, তাদের মর্যাদা বৃদ্ধি করেন এবং নিজেদের দিকে আরও গভীরভাবে ফিরিয়ে আনেন। এ বাস্তবতাই রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর উম্মতকে স্পষ্ট ভাষায় বুঝিয়ে দিয়েছেন। মুমিনের জীবনে বিপদ ও কষ্ট কীভাবে গুনাহ মাফের কারণ হয়।
সে বিষয়ে একটি হৃদয়স্পর্শী হাদিসে তিনি বলেন—
أَنَّ عَائِشَةَ ـ رضى الله عنها ـ زَوْجَ النَّبِيِّ صلى الله عليه وسلم صلى الله عليه وسلم قَالَتْ قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم “ مَا مِنْ مُصِيبَةٍ تُصِيبُ الْمُسْلِمَ إِلاَّ كَفَّرَ اللَّهُ بِهَا عَنْهُ، حَتَّى الشَّوْكَةِ يُشَاكُهَا ”.
নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সহধর্মিণী ’আয়িশাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ মুসলিম ব্যক্তির উপর যে সকল বিপদ-আপদ আসে এর দ্বারা আল্লাহ তার পাপ দূর করে দেন। এমনকি যে কাঁটা তার শরীরে ফুটে এর দ্বারাও। (বুখারি, হাদিস: ৫৬৪০)
এই হাদিসে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মুমিনের জীবনে আপতিত দুঃখ-কষ্ট ও বিপদ-আপদের একটি গভীর আধ্যাত্মিক ব্যাখ্যা প্রদান করেছেন।
সাধারণভাবে মানুষ কষ্টকে শাস্তি বা দুর্ভাগ্য মনে করে। কিন্তু নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি সংশোধন করে দিয়েছেন।তিনি জানিয়ে দিয়েছেন, একজন মুসলিম যখন অসুস্থতা, দুঃখ, ব্যথা, চিন্তা, মানসিক কষ্ট বা দৈহিক যন্ত্রণার সম্মুখীন হয়, তখন আল্লাহ তাআলা সেগুলোকে তার গুনাহ মোচনের মাধ্যম বানিয়ে দেন। অর্থাৎ এসব কষ্ট নিছক যন্ত্রণা নয়; বরং তা বান্দার আত্মশুদ্ধির একটি কার্যকর উপায়।
হাদিসে ‘এমনকি যে কাঁটা তার শরীরে ফুটে’—এই উদাহরণটি বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ।
এর মাধ্যমে বোঝানো হয়েছে, কষ্ট যত সামান্যই হোক না কেন; একটি কাঁটার ফোঁটার মতো তুচ্ছ যন্ত্রণাও আল্লাহর কাছে অবমূল্য নয়। বান্দা যদি ঈমান ও সবরের সঙ্গে সেই কষ্ট সহ্য করে, তবে আল্লাহ তাআলা তার বিনিময়ে পাপ মাফ করে দেন। এতে আল্লাহর দয়া ও ন্যায়বিচারের বিস্তৃতি স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
এই হাদিস আরও শিক্ষা দেয় যে, মুমিনের জীবনে বিপদ আসা মানেই আল্লাহর অসন্তুষ্টি নয়। বরং অনেক সময় আল্লাহ তাঁর প্রিয় বান্দাকে দুনিয়াতেই পরিশুদ্ধ করে নিতে চান, যাতে সে আখিরাতে হালকা হিসাব নিয়ে উপস্থিত হতে পারে। এ দৃষ্টিকোণ থেকে বিপদ-আপদ আল্লাহর রহমতের এক নীরব ভাষা—যা মানুষকে আত্মসমালোচনায়, তাওবার পথে এবং আল্লাহর দিকে আরও বেশি ফিরে আসতে সহায়তা করে।
তবে এই গুনাহ মোচনের প্রতিদান তখনই পূর্ণতা পায়, যখন বান্দা কষ্টের মুহূর্তে সবর অবলম্বন করে, আল্লাহর ফয়সালার প্রতি সন্তুষ্ট থাকে এবং অভিযোগ বা হতাশার পথে না গিয়ে তাঁরই সাহায্য কামনা করে। অন্যথায় কষ্ট পরীক্ষায় রূপ নিলেও তার ফল নষ্ট হয়ে যেতে পারে। তাই এই হাদিস মুমিনকে শুধু সান্ত্বনাই দেয় না; বরং সবর, তাওবা ও আল্লাহর প্রতি দৃঢ় বিশ্বাস গড়ে তোলার আহ্বানও জানায়।
সারকথা, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এই হাদিসের মাধ্যমে আমাদের শিখিয়েছেন—মুমিনের জীবনের প্রতিটি কষ্ট অর্থবহ। দুনিয়ার যন্ত্রণা যদি ঈমান ও সবরের সঙ্গে গ্রহণ করা হয়, তবে তা আখিরাতের মুক্তির সোপানে পরিণত হয়।
ধর্ম ডেস্ক 
























