ঢাকা ১২:২৮ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ২৬ এপ্রিল ২০২৬, ১২ বৈশাখ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম ::
বিদ্যুৎস্পৃষ্টে প্রাণ গেল যুবদল কর্মীর ফুলতলায় ইয়াবা ট্যাবলেট ও স্বর্ণের চেইন সহ দুজনকে আটক করেছে বিজিবি। বিশ্বরেকর্ড গড়ে জিতল পাঞ্জাব কিংস বোরহানউদ্দিনে কর্মচারীকে ফাঁদে ফেলে টাকা আত্মসাতের অভিযোগ উঠে ৪ বন্ধুর বিরুদ্ধে কোরবানির চামড়ার ন্যায্যমূল্য নির্ধারণে আন্তঃমন্ত্রণালয় কমিটি গঠন হত্যা মামলাসহ একাধিক মামলার আসামি প্রতারক মাসুদুর রহমানের খপ্পরে পরে নিঃস্ব শতাধিক পরিবার আমি আসলে নির্বাচন করতে চাই না: সুজন ভাকুর্তায় ২ সন্তানের বাবা শাহাদাত হোসেন সন্ত্রাসীদের হামলায় নিহত ঢাকাসহ সারাদেশে বজ্রবৃষ্টির আভাস মুকসুদপুরে জাতীয় পুষ্টি সপ্তাহের উদ্ধোধন
ক্ষমতা বদলের পরও বদলায়নি সিন্ডিকেট

বিটিসিএল অডিটোরিয়াম ব্রিটিশ মাসুদের কব্জায়

ছাত্র–জনতার গণঅভ্যুত্থানের মুখে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর দেশের বিভিন্ন রাষ্ট্রায়ত্ত ও আধা-রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানে দুর্নীতিবাজ ও সুবিধাবাদী চক্রের পুনর্বিন্যাস নতুন করে আলোচনায় এসেছে। সরকার পরিবর্তনের পর অনেকেই আশা করেছিলেন, এসব প্রতিষ্ঠানে দীর্ঘদিন ধরে গড়ে ওঠা অনিয়ম, স্বেচ্ছাচারিতা ও দলীয় প্রভাবের অবসান ঘটবে। কিন্তু বাস্তব চিত্র বলছে ভিন্ন কথা। বিশেষ করে বাংলাদেশ টেলিকমিউনিকেশন কোম্পানি লিমিটেড (বিটিসিএল)-এ ক্ষমতার পালাবদলের সুযোগ নিয়ে পুরনো সিন্ডিকেট নতুন পরিচয়ে আবারও সক্রিয় হয়ে উঠেছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
বিটিসিএলের মগবাজার টিএনটি কলোনি ও অডিটোরিয়ামকেন্দ্রিক সাম্প্রতিক নানা অভিযোগ সেই উদ্বেগকেই আরও ঘনীভূত করেছে। অনুসন্ধানে জানা গেছে, বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময় বিটিসিএলে একচ্ছত্র প্রভাব বিস্তারকারী একটি চক্র এখন রাজনৈতিক খোলস বদলে নিজেদের অবস্থান পাকাপোক্ত করার চেষ্টা করছে। এই চক্রের মূল হোতা হিসেবে উঠে এসেছে ৩৬ নম্বর ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের কার্যকরী সদস্য এবং বিটিসিএল কর্মচারী লীগের সাবেক সভাপতি মাসুদুর রহমান মাসুদ ওরফে ‘ব্রিটিশ মাসুদ’-এর নাম।
সূত্রমতে, ব্রিটিশ মাসুদ আওয়ামী লীগ সরকারের সময় নিজেকে ক্ষমতাসীন দলের একজন প্রভাবশালী সংগঠক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন। বিটিসিএলের অভ্যন্তরে তার প্রভাব ছিল ব্যাপক। নিয়োগ, বদলি, কোয়ার্টার বরাদ্দ, কর্মচারী সংগঠনের কার্যক্রম থেকে শুরু করে অডিটোরিয়াম ব্যবস্থাপনা—সব ক্ষেত্রেই তার কথাই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হিসেবে বিবেচিত হতো বলে অভিযোগ রয়েছে। একাধিক কর্মচারীর ভাষ্য, ওই সময় তার বিরোধিতা করা মানেই ছিল প্রশাসনিক হয়রানি কিংবা চাকরি নিয়ে অনিশ্চয়তায় পড়া।
তবে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর খুব দ্রুতই নিজের অবস্থান বদলাতে দেখা যায় তাকে। অনুসন্ধানে জানা গেছে, বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার গাড়িবহরে হামলার মামলাসহ একাধিক মামলার আসামি হয়েও বর্তমানে তিনি স্থানীয় এক প্রভাবশালী বিএনপি নেতার আশীর্বাদপুষ্ট হয়ে উঠেছেন। আওয়ামী লীগের পরিচয় ঝেড়ে ফেলে নিজেকে ‘নব্য বিএনপি’ হিসেবে উপস্থাপন করে আবারও প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করছেন তিনি। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এটি দেশের রাজনীতিতে বহুল পরিচিত সুবিধাবাদী চরিত্রেরই আরেকটি উদাহরণ, যেখানে আদর্শ নয়, বরং ক্ষমতার কাছাকাছি থাকাই মুখ্য হয়ে ওঠে।
বিটিসিএলের সাধারণ কর্মচারীদের অভিযোগ, দল বদলালেও ব্রিটিশ মাসুদের আচরণ বা কার্যক্রমে কোনো পরিবর্তন আসেনি। বরং আগের মতোই তিনি প্রশাসনের একটি অংশকে ম্যানেজ করে নিজের সিন্ডিকেট ধরে রেখেছেন। বর্তমানে তিনি মগবাজার টিএনটি কলোনি কল্যাণ সমিতির সেক্রেটারি পদ দখল করে আছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। এই পদ ব্যবহার করেই তিনি বিটিসিএল কলোনি ও আশপাশের এলাকায় এক ধরনের অঘোষিত নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেছেন।
এই চক্রের সঙ্গে বিতর্কিত আরেকটি নাম উঠে এসেছে ভিপি মো. হানিফ। অভিযোগ রয়েছে, ক্ষমতার অপব্যবহার করে তিনি নিজেকে বিটিসিএল কর্মচারী সংগঠনের (রেজিঃ নং বি-১৯০০) স্বঘোষিত আহ্বায়ক হিসেবে ঘোষণা দিয়েছেন। যদিও শ্রম অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে দেওয়া এক চিঠিতে স্পষ্টভাবে জানানো হয়েছে, বাংলাদেশ শ্রম আইন ২০০৬-এর ৩১৭ (৪) ঘ ধারা অনুযায়ী এই আহ্বায়ক কমিটি সম্পূর্ণ অবৈধ এবং এর কোনো আইনগত ভিত্তি নেই। তা সত্ত্বেও কিছু দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তার যোগসাজশে এই অবৈধ কমিটি কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
সবচেয়ে গুরুতর অভিযোগ উঠেছে বিটিসিএল অডিটোরিয়াম ও কমিউনিটি সেন্টার ঘিরে। অনুসন্ধানে জানা গেছে, রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় অবস্থিত এই অডিটোরিয়ামটি দীর্ঘদিন ধরে ব্রিটিশ মাসুদ ও তার সিন্ডিকেটের অবৈধ নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। অভিযোগ অনুযায়ী, উর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের মাসোয়ারা প্রদান করে তারা অডিটোরিয়ামটির পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে রেখেছে। এখান থেকে প্রতি মাসে প্রায় দেড় লক্ষ টাকা আয় হলেও তা সরকারি কোষাগারে জমা না দিয়ে নিজেদের মধ্যে ভাগ-বাটোয়ারা করা হচ্ছে।
বিটিসিএলের একাধিক কর্মচারী দাবি করেছেন, এই অর্থ আত্মসাতের মাধ্যমে সরকার সরাসরি রাজস্ব হারাচ্ছে। অডিটোরিয়ামটি বিভিন্ন সামাজিক অনুষ্ঠান, বিয়ে, সভা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের জন্য ভাড়া দেওয়া হলেও এর কোনো স্বচ্ছ হিসাব নেই। কোথায় কত টাকা আদায় হচ্ছে, কার কাছে যাচ্ছে—এসব বিষয়ে প্রশাসনের কাছে কোনো স্পষ্ট তথ্য নেই বলেই অভিযোগ।
শুধু অডিটোরিয়াম নয়, বিটিসিএল কলোনির সরকারি কোয়ার্টার ও ঘর নিয়ে একটি বিশাল অবৈধ বাণিজ্য গড়ে তোলার অভিযোগও রয়েছে এই চক্রের বিরুদ্ধে। অনুসন্ধানে উঠে এসেছে একাধিক চাঞ্চল্যকর তথ্য। অবসরপ্রাপ্ত কর্মচারী সৈয়দ আহম্মদের ঘর অবৈধভাবে ইমাম মো. আতিকের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। একইভাবে মসজিদের মোয়াজ্জিন লোকমান হোসেনের বরাদ্দপ্রাপ্ত ঘর বহিরাগতদের কাছে বিক্রি করে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। আরও অভিযোগ রয়েছে, গাড়িচালক আওলাদ হোসেনের কোয়ার্টার ১ লাখ ২০ হাজার টাকার বিনিময়ে মোস্তফা নামের এক ব্যক্তির কাছে বরাদ্দ ও বিক্রি করা হয়েছে।
এই ধরনের লেনদেনের মাধ্যমে সরকারি সম্পত্তি ব্যক্তিগত স্বার্থে ব্যবহৃত হচ্ছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। নিয়ম অনুযায়ী, সরকারি কোয়ার্টার কোনোভাবেই কেনাবেচা বা ভাড়া দেওয়ার সুযোগ নেই। কিন্তু বাস্তবে এসব ঘর ও কোয়ার্টার একেকটি পণ্যে পরিণত হয়েছে, যেখানে সিন্ডিকেটের অনুমতি ছাড়া কিছুই সম্ভব নয় বলে অভিযোগ।
বিটিসিএলের সাধারণ কর্মচারীরা অভিযোগ করেছেন, এই অবৈধ কার্যক্রমের বিরুদ্ধে কেউ মুখ খুললেই তাকে নানাভাবে চাপের মুখে ফেলা হয়। বদলি, বিভাগীয় মামলার ভয় দেখানো, এমনকি সামাজিকভাবে হেয় করার অভিযোগও শোনা যাচ্ছে। ফলে অধিকাংশ কর্মচারী ভয়ে প্রকাশ্যে কথা বলতে রাজি নন। নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক কর্মচারী বলেন, “আমরা রাষ্ট্রের কর্মচারী হয়েও এখানে জিম্মি হয়ে আছি। কে কোন দল করে, সেটা বড় কথা নয়; বড় কথা হচ্ছে, যারা ক্ষমতায় থাকে তারাই সব নিয়ন্ত্রণ করে।”
এ বিষয়ে জানতে বিটিসিএল অডিটোরিয়ামের দায়িত্বে থাকা মাসুদুর রহমানের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি মামলার বিষয়ে কোনো তথ্য দিতে অপারগতা প্রকাশ করেন। অন্যদিকে বিটিসিএলের উপ-ব্যবস্থাপনা পরিচালক (কর্পোরেট অ্যাফেয়ার্স) রতন কুমার হালদার এসব অভিযোগ সম্পর্কে জানতে চাইলে কৌশলে বিষয়টি এড়িয়ে যান।
বিটিসিএলের সাধারণ কর্মচারীরা এখন এই ‘হাইব্রিড’ ও ‘সুবিধাবাদী’ সিন্ডিকেটের হাত থেকে প্রতিষ্ঠানটিকে রক্ষা করতে প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের জরুরি হস্তক্ষেপ দাবি করেছেন। তাদের মতে, রাজনৈতিক পরিচয় বদলালেই অতীতের সব অভিযোগ ধুয়ে যায়—এমন সংস্কৃতি চলতে থাকলে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো কখনোই দুর্নীতিমুক্ত হবে না। তারা অডিটোরিয়াম ও কোয়ার্টার ব্যবস্থাপনায় পূর্ণাঙ্গ নিরপেক্ষ তদন্ত, অবৈধ কমিটি বাতিল এবং জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন।
রাষ্ট্রীয় সম্পদ রক্ষা ও বিটিসিএলের মতো একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানে স্বচ্ছতা ফিরিয়ে আনতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কতটা আন্তরিক ভূমিকা রাখে, এখন সেটাই দেখার বিষয় বলে মনে করছেন সচেতন মহল।

Tag :

আপনার মতামত লিখুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল ও অন্যান্য তথ্য সঞ্চয় করে রাখুন

আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

বিদ্যুৎস্পৃষ্টে প্রাণ গেল যুবদল কর্মীর

ক্ষমতা বদলের পরও বদলায়নি সিন্ডিকেট

বিটিসিএল অডিটোরিয়াম ব্রিটিশ মাসুদের কব্জায়

আপডেট সময় ১২:৩৬:৩০ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২০ জানুয়ারী ২০২৬

ছাত্র–জনতার গণঅভ্যুত্থানের মুখে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর দেশের বিভিন্ন রাষ্ট্রায়ত্ত ও আধা-রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানে দুর্নীতিবাজ ও সুবিধাবাদী চক্রের পুনর্বিন্যাস নতুন করে আলোচনায় এসেছে। সরকার পরিবর্তনের পর অনেকেই আশা করেছিলেন, এসব প্রতিষ্ঠানে দীর্ঘদিন ধরে গড়ে ওঠা অনিয়ম, স্বেচ্ছাচারিতা ও দলীয় প্রভাবের অবসান ঘটবে। কিন্তু বাস্তব চিত্র বলছে ভিন্ন কথা। বিশেষ করে বাংলাদেশ টেলিকমিউনিকেশন কোম্পানি লিমিটেড (বিটিসিএল)-এ ক্ষমতার পালাবদলের সুযোগ নিয়ে পুরনো সিন্ডিকেট নতুন পরিচয়ে আবারও সক্রিয় হয়ে উঠেছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
বিটিসিএলের মগবাজার টিএনটি কলোনি ও অডিটোরিয়ামকেন্দ্রিক সাম্প্রতিক নানা অভিযোগ সেই উদ্বেগকেই আরও ঘনীভূত করেছে। অনুসন্ধানে জানা গেছে, বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময় বিটিসিএলে একচ্ছত্র প্রভাব বিস্তারকারী একটি চক্র এখন রাজনৈতিক খোলস বদলে নিজেদের অবস্থান পাকাপোক্ত করার চেষ্টা করছে। এই চক্রের মূল হোতা হিসেবে উঠে এসেছে ৩৬ নম্বর ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের কার্যকরী সদস্য এবং বিটিসিএল কর্মচারী লীগের সাবেক সভাপতি মাসুদুর রহমান মাসুদ ওরফে ‘ব্রিটিশ মাসুদ’-এর নাম।
সূত্রমতে, ব্রিটিশ মাসুদ আওয়ামী লীগ সরকারের সময় নিজেকে ক্ষমতাসীন দলের একজন প্রভাবশালী সংগঠক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন। বিটিসিএলের অভ্যন্তরে তার প্রভাব ছিল ব্যাপক। নিয়োগ, বদলি, কোয়ার্টার বরাদ্দ, কর্মচারী সংগঠনের কার্যক্রম থেকে শুরু করে অডিটোরিয়াম ব্যবস্থাপনা—সব ক্ষেত্রেই তার কথাই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হিসেবে বিবেচিত হতো বলে অভিযোগ রয়েছে। একাধিক কর্মচারীর ভাষ্য, ওই সময় তার বিরোধিতা করা মানেই ছিল প্রশাসনিক হয়রানি কিংবা চাকরি নিয়ে অনিশ্চয়তায় পড়া।
তবে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর খুব দ্রুতই নিজের অবস্থান বদলাতে দেখা যায় তাকে। অনুসন্ধানে জানা গেছে, বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার গাড়িবহরে হামলার মামলাসহ একাধিক মামলার আসামি হয়েও বর্তমানে তিনি স্থানীয় এক প্রভাবশালী বিএনপি নেতার আশীর্বাদপুষ্ট হয়ে উঠেছেন। আওয়ামী লীগের পরিচয় ঝেড়ে ফেলে নিজেকে ‘নব্য বিএনপি’ হিসেবে উপস্থাপন করে আবারও প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করছেন তিনি। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এটি দেশের রাজনীতিতে বহুল পরিচিত সুবিধাবাদী চরিত্রেরই আরেকটি উদাহরণ, যেখানে আদর্শ নয়, বরং ক্ষমতার কাছাকাছি থাকাই মুখ্য হয়ে ওঠে।
বিটিসিএলের সাধারণ কর্মচারীদের অভিযোগ, দল বদলালেও ব্রিটিশ মাসুদের আচরণ বা কার্যক্রমে কোনো পরিবর্তন আসেনি। বরং আগের মতোই তিনি প্রশাসনের একটি অংশকে ম্যানেজ করে নিজের সিন্ডিকেট ধরে রেখেছেন। বর্তমানে তিনি মগবাজার টিএনটি কলোনি কল্যাণ সমিতির সেক্রেটারি পদ দখল করে আছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। এই পদ ব্যবহার করেই তিনি বিটিসিএল কলোনি ও আশপাশের এলাকায় এক ধরনের অঘোষিত নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেছেন।
এই চক্রের সঙ্গে বিতর্কিত আরেকটি নাম উঠে এসেছে ভিপি মো. হানিফ। অভিযোগ রয়েছে, ক্ষমতার অপব্যবহার করে তিনি নিজেকে বিটিসিএল কর্মচারী সংগঠনের (রেজিঃ নং বি-১৯০০) স্বঘোষিত আহ্বায়ক হিসেবে ঘোষণা দিয়েছেন। যদিও শ্রম অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে দেওয়া এক চিঠিতে স্পষ্টভাবে জানানো হয়েছে, বাংলাদেশ শ্রম আইন ২০০৬-এর ৩১৭ (৪) ঘ ধারা অনুযায়ী এই আহ্বায়ক কমিটি সম্পূর্ণ অবৈধ এবং এর কোনো আইনগত ভিত্তি নেই। তা সত্ত্বেও কিছু দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তার যোগসাজশে এই অবৈধ কমিটি কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
সবচেয়ে গুরুতর অভিযোগ উঠেছে বিটিসিএল অডিটোরিয়াম ও কমিউনিটি সেন্টার ঘিরে। অনুসন্ধানে জানা গেছে, রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় অবস্থিত এই অডিটোরিয়ামটি দীর্ঘদিন ধরে ব্রিটিশ মাসুদ ও তার সিন্ডিকেটের অবৈধ নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। অভিযোগ অনুযায়ী, উর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের মাসোয়ারা প্রদান করে তারা অডিটোরিয়ামটির পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে রেখেছে। এখান থেকে প্রতি মাসে প্রায় দেড় লক্ষ টাকা আয় হলেও তা সরকারি কোষাগারে জমা না দিয়ে নিজেদের মধ্যে ভাগ-বাটোয়ারা করা হচ্ছে।
বিটিসিএলের একাধিক কর্মচারী দাবি করেছেন, এই অর্থ আত্মসাতের মাধ্যমে সরকার সরাসরি রাজস্ব হারাচ্ছে। অডিটোরিয়ামটি বিভিন্ন সামাজিক অনুষ্ঠান, বিয়ে, সভা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের জন্য ভাড়া দেওয়া হলেও এর কোনো স্বচ্ছ হিসাব নেই। কোথায় কত টাকা আদায় হচ্ছে, কার কাছে যাচ্ছে—এসব বিষয়ে প্রশাসনের কাছে কোনো স্পষ্ট তথ্য নেই বলেই অভিযোগ।
শুধু অডিটোরিয়াম নয়, বিটিসিএল কলোনির সরকারি কোয়ার্টার ও ঘর নিয়ে একটি বিশাল অবৈধ বাণিজ্য গড়ে তোলার অভিযোগও রয়েছে এই চক্রের বিরুদ্ধে। অনুসন্ধানে উঠে এসেছে একাধিক চাঞ্চল্যকর তথ্য। অবসরপ্রাপ্ত কর্মচারী সৈয়দ আহম্মদের ঘর অবৈধভাবে ইমাম মো. আতিকের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। একইভাবে মসজিদের মোয়াজ্জিন লোকমান হোসেনের বরাদ্দপ্রাপ্ত ঘর বহিরাগতদের কাছে বিক্রি করে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। আরও অভিযোগ রয়েছে, গাড়িচালক আওলাদ হোসেনের কোয়ার্টার ১ লাখ ২০ হাজার টাকার বিনিময়ে মোস্তফা নামের এক ব্যক্তির কাছে বরাদ্দ ও বিক্রি করা হয়েছে।
এই ধরনের লেনদেনের মাধ্যমে সরকারি সম্পত্তি ব্যক্তিগত স্বার্থে ব্যবহৃত হচ্ছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। নিয়ম অনুযায়ী, সরকারি কোয়ার্টার কোনোভাবেই কেনাবেচা বা ভাড়া দেওয়ার সুযোগ নেই। কিন্তু বাস্তবে এসব ঘর ও কোয়ার্টার একেকটি পণ্যে পরিণত হয়েছে, যেখানে সিন্ডিকেটের অনুমতি ছাড়া কিছুই সম্ভব নয় বলে অভিযোগ।
বিটিসিএলের সাধারণ কর্মচারীরা অভিযোগ করেছেন, এই অবৈধ কার্যক্রমের বিরুদ্ধে কেউ মুখ খুললেই তাকে নানাভাবে চাপের মুখে ফেলা হয়। বদলি, বিভাগীয় মামলার ভয় দেখানো, এমনকি সামাজিকভাবে হেয় করার অভিযোগও শোনা যাচ্ছে। ফলে অধিকাংশ কর্মচারী ভয়ে প্রকাশ্যে কথা বলতে রাজি নন। নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক কর্মচারী বলেন, “আমরা রাষ্ট্রের কর্মচারী হয়েও এখানে জিম্মি হয়ে আছি। কে কোন দল করে, সেটা বড় কথা নয়; বড় কথা হচ্ছে, যারা ক্ষমতায় থাকে তারাই সব নিয়ন্ত্রণ করে।”
এ বিষয়ে জানতে বিটিসিএল অডিটোরিয়ামের দায়িত্বে থাকা মাসুদুর রহমানের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি মামলার বিষয়ে কোনো তথ্য দিতে অপারগতা প্রকাশ করেন। অন্যদিকে বিটিসিএলের উপ-ব্যবস্থাপনা পরিচালক (কর্পোরেট অ্যাফেয়ার্স) রতন কুমার হালদার এসব অভিযোগ সম্পর্কে জানতে চাইলে কৌশলে বিষয়টি এড়িয়ে যান।
বিটিসিএলের সাধারণ কর্মচারীরা এখন এই ‘হাইব্রিড’ ও ‘সুবিধাবাদী’ সিন্ডিকেটের হাত থেকে প্রতিষ্ঠানটিকে রক্ষা করতে প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের জরুরি হস্তক্ষেপ দাবি করেছেন। তাদের মতে, রাজনৈতিক পরিচয় বদলালেই অতীতের সব অভিযোগ ধুয়ে যায়—এমন সংস্কৃতি চলতে থাকলে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো কখনোই দুর্নীতিমুক্ত হবে না। তারা অডিটোরিয়াম ও কোয়ার্টার ব্যবস্থাপনায় পূর্ণাঙ্গ নিরপেক্ষ তদন্ত, অবৈধ কমিটি বাতিল এবং জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন।
রাষ্ট্রীয় সম্পদ রক্ষা ও বিটিসিএলের মতো একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানে স্বচ্ছতা ফিরিয়ে আনতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কতটা আন্তরিক ভূমিকা রাখে, এখন সেটাই দেখার বিষয় বলে মনে করছেন সচেতন মহল।