ঢাকা ০৪:৫৮ অপরাহ্ন, রবিবার, ২৬ এপ্রিল ২০২৬, ১৩ বৈশাখ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম ::
বিদ্যুৎ লাইসেন্সে ৬৬৪ কোটির ঘুষ কেলেঙ্কারি: বদলি নাটক, আড়ালে মূলহোতা আতা মোল্লা রাজউক ইমারত পরিদর্শক মোঃ আমিনুল ইসলামের বিরুদ্ধে ঘুষ বাণিজ্যের অভিযোগ সম্পাদক-প্রকাশক পরিষদের আত্মপ্রকাশ, নেতৃত্বে আয়ান, খায়রুল ও মতিউর কালবৈশাখীর আঘাতে ক্ষতবিক্ষত বালিয়াডাঙ্গী মির্জাপুর উপজেলা কল্যাণ সমিতির উদ্যোগে সংবর্ধনা ও বার্ষিক বনভোজন  -২০২৬ অনুষ্ঠিত অভিযোগে ভারী সাবেক এসপি নির্যাতন, অর্থ আদায় ও দুর্নীতির চিত্র সামনে ফরম্যাট বদলাতেই ব্যাটিং অর্ডারে পরিবর্তন, সমস্যা দেখেন না লিটন মাতৃগর্ভে ভাগ্যের ভালো-মন্দ নির্ধারণ হয় যেভাবে ময়মনসিংহে প্রধান শিক্ষকের বিরুদ্ধে অনিয়মের পাহাড় সাফ ও বিদেশি কোটার ২ জন করে বিদেশি নেওয়ার প্রস্তাব
ব্যর্থতার কেন্দ্রবিন্দুতে প্রকল্প পরিচালক নাজিম উদ্দিন

কাজে আসছে না ৪৬ কোটি টাকার হালদা রক্ষা প্রকল্প

  • নিজস্ব প্রতিবেদক
  • আপডেট সময় ০২:৩৫:১৬ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৪ ডিসেম্বর ২০২৫
  • ৫৭১ বার পড়া হয়েছে

প্রাকৃতিক মৎস্য প্রজনন ক্ষেত্র হিসেবে দেশের জন্য অনন্য হালদা নদী। সরকারের গেজেট প্রত্যয়নক্রমে “মৎস্য হেরিটেজ” হিসেবে ঘোষিত এই নদীর জীববৈচিত্র্য রক্ষার উদ্দেশ্যে প্রায় ৪৬ কোটি ৩৭ লাখ ৭২ হাজার টাকার যে প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়েছিল, সেই প্রকল্প আজ প্রশ্নের মুখে। কারণ প্রকল্প শুরু হওয়ার পর দুই বছর পেরিয়ে গেলেও এর দৃশ্যমান কোনো সুফল পাননি হালদা পাড়ের মানুষ, মৎস্যজীবী কিংবা নদী গবেষকরা। অভিযোগ–নির্দেশনা, বাজেট, কর্মসূচি সবই ছিল কাগজে-কলমে; বাস্তবে কিছুই হয়নি। আর এই ব্যর্থতার কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে এসেছে একজন ব্যক্তির নাম—প্রকল্প পরিচালক নাজিম উদ্দিন।

নদীর দুই পাড়ের মানুষ, মৎস্যজীবী, পরিবেশকর্মী, স্থানীয় প্রশাসনের বিভিন্ন সদস্য ও প্রকল্প-সম্পৃক্তদের সঙ্গে কথা বলে স্পষ্ট হয়েছে একটি বিষয়—প্রকল্পের প্রায় সব ব্যর্থতার দায় সরাসরি গিয়ে ঠেকেছে প্রকল্প পরিচালকের দায়িত্বহীনতা, স্বচ্ছতা সংকট ও প্রকল্প বাস্তবায়নে উদাসীনতার দিকে। সরকারি প্রকল্পের সিকিভাগ কাজ না এগোনো, মাঠপর্যায়ে তদারকিহীনতা, প্রশাসনের সঙ্গে সমন্বয়হীনতা, প্রকল্প পরিচালকের অনুপস্থিতি এবং অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার প্রশ্নের জবাব এড়িয়ে যাওয়া—সব মিলিয়ে পুরো প্রকল্পটিকে অকার্যকর, দুর্বল ও অদক্ষ ব্যবস্থাপনার উদাহরণে পরিণত করেছে।

নদী রক্ষায় নেওয়া প্রকল্পটি ২০২৩ সালের অক্টোবর মাসে শুরু হয় এবং শেষ হওয়ার কথা ২০২৭ সালে। কিন্তু শুরু থেকে আজ পর্যন্ত প্রকল্পের বাস্তবায়নচিত্র দেখলে মনে হয়—এটি যেন শুরুই হয়নি। যেসব কর্মসূচি বাস্তবায়নের কথা ছিল সেগুলোর কোনোটিই আকৃতি পায়নি। নদীতে অব্যাহতভাবে চলছে বিষ প্রয়োগ, জাল ফেলা, বড়শি দিয়ে মাছ ধরা, যান্ত্রিক নৌযান চলাচল, বালু উত্তোলন, রাসায়নিক বর্জ্য নিঃসরণ। অথচ এগুলো বন্ধ করাই ছিল প্রকল্পের মূল লক্ষ্য। তাই প্রশ্ন উঠেছে—যে প্রকল্প নদী বাঁচাবে বলে নেওয়া হয়েছিল, সেই প্রকল্পই কি আজ হালদাকে বিপন্ন করে তুলছে?

প্রকল্পের আওতায় রাউজান ও হাটহাজারীর ৬টি পুরাতন হ্যাচারি সংস্কারের কথা ছিল। কিন্তু রাউজানের কাগতিয়া ও পশ্চিম গহিরা হ্যাচারি দুইটি আগের মতোই পরিত্যক্ত পড়ে আছে। হাটহাজারীর কয়েকটি হ্যাচারিতে নামমাত্র সংস্কার করা হলেও তা কার্যকর হয়নি। প্রকল্পের আওতায় ছিল ডিমসংগ্রহকারী, মৎস্য কর্মকর্তা, কর্মচারীদের প্রশিক্ষণ প্রদান, বিকল্প কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও গবেষণাগার নির্মাণের উদ্যোগ—কিন্তু বাস্তবে এসবের কোনো চিহ্ন নেই। নদীর দুই পাড় ঘুরে দেখা গেছে, প্রকল্পের কোনো কাজই পরিদর্শনযোগ্য অবস্থায় নেই।

সবচেয়ে আলোচিত ব্যর্থতা—নদীতে টহল পরিচালনার জন্য প্রকল্প থেকে কোনো নৌযান দেওয়া হয়নি। অথচ নদীতে যান্ত্রিক নৌযান, বালু উত্তোলন, জাল ফেলাসহ অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড নিয়ন্ত্রণের জন্য নৌযান সরবরাহ ছিল প্রকল্পের অন্যতম প্রতিশ্রুতি। আবার নদীতে নজরদারির জন্য ছয় উপজেলা প্রশাসনকে দেওয়া ড্রোনগুলোও অচল অবস্থায় পড়ে আছে। নদীপাড়ের মানুষের ভাষ্য—কখনও এসব ড্রোন আকাশে উঠতে দেখেননি তারা।

এ পরিস্থিতিতে হাটহাজারী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আবদুল্লাহ আল মুমিন ও নৌপুলিশ কোনোভাবে তাদের হাতে থাকা সীমিত সম্পদ নিয়ে অভিযান পরিচালনা করছেন। ফলাফল—অভিযানে বালুবাহী নৌযান আটক হয়েছে, জরিমানা হয়েছে, কয়েকজন গ্রেফতার হয়েছে; কিন্তু প্রকল্পের দিক থেকে যে সহায়তা পাওয়ার কথা ছিল তা পাওয়া যায়নি। নৌপুলিশের কাছে থাকা একমাত্র নৌযানে দুই উপজেলা কভার করতে হচ্ছে—যা বাস্তবিকই অপর্যাপ্ত। আর এই ব্যর্থতার দায়ও প্রকল্প পরিচালকেরই। কারণ প্রকল্পের বাজেট পরিকল্পনায় টহল নৌযান বরাদ্দ ছিল, ড্রোন ছিল, ফিল্ড অফিসার ছিল, কিন্তু কার্যকর হয়নি কিছুই।

প্রকল্পের ব্যর্থতা সম্পর্কে জানতে চেয়ে প্রতিবেদক একাধিকবার প্রকল্প পরিচালকের অফিসে গেলেও তাকে পাওয়া যায়নি। ফোনে যোগাযোগ করলেও সাড়া মেলেনি। এমনকি পাঠানো ক্ষুদে বার্তারও কোনো জবাব পাওয়া যায়নি। একজন সরকারি প্রকল্প পরিচালকের এমন দায়িত্বহীন আচরণ আরও ক্ষোভ বাড়িয়েছে নদীপাড়ের মানুষের মধ্যে। তারা মনে করেন—প্রকল্পের কাজ না হওয়ার প্রধান কারণ হলো প্রকল্প পরিচালকের মাঠপর্যায়ে না আসা এবং প্রকল্প বাস্তবায়নে অনাগ্রহ।

প্রকল্প পরিচালক নাজিম উদ্দিন অবশ্য স্বীকার করেছেন যে প্রকল্পের সিকি ভাগ কাজও এখনো শেষ হয়নি। তবে কেন হয়নি, কী বাধা, কী করণীয়—এসব প্রশ্নে তিনি মুখ বন্ধ রেখেছেন। তার অফিসে গিয়ে তাকে পাওয়া না যাওয়া কিংবা ফোনে সাড়া না দেওয়ার বিষয়টিও প্রশ্নবিদ্ধ। একটি প্রায় ৫০ কোটি টাকার জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পের নেতৃত্বে থাকা ব্যক্তির এমন আচরণ প্রকল্প ব্যর্থতার সবচেয়ে বড় সূচক বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

হালদা নদী সংরক্ষণে নেওয়া প্রকল্পটির অন্যতম উদ্দেশ্য ছিল নদীর দূষণ রোধ, যান্ত্রিক নৌযান বন্ধ, জাল ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞা, বালু উত্তোলন নিয়ন্ত্রণ ও হ্যাচারি সংস্কার। কিন্তু প্রকল্প শুরু হওয়ার পরও নদীর বিভিন্ন পয়েন্টে দেখা গেছে কারেন্ট জাল ভাসানো, বড়শি দিয়ে মাছ শিকার, বালুভর্তি বড় বড় নৌযান চলাচল, সংযুক্ত খালে বিষ প্রয়োগ। কাগতিয়া, মইশকরম, গহিরা, নোয়াজিশপুর—যেখানেই যাওয়া হোক দেখা গেছে বিপর্যস্ত পরিবেশ। বিষাক্ত বর্জ্যে কালো পানির স্রোত, ইটভাটার ধোঁয়া, রাসায়নিক বর্জ্য, ডুবন্ত পাখার আঘাতে ডলফিন-মাছের মৃত্যু—সব মিলিয়ে হালদা নদী যেন মৃত্যুবরণ করছে, আর এই মৃত্যুর পেছনে দায়িত্বহীনতা স্পষ্ট করছে প্রকল্প পরিচালকের ব্যর্থতা।

হালদা পাড়ের মানুষ অভিযোগ করেন—এই প্রকল্প মূলত সুবিধাভোগীদের অর্থনৈতিক উন্নতির জন্য তৈরি হয়েছে, নদী রক্ষার জন্য নয়। প্রকল্পের নাম শুনে মানুষ আশায় বুক বেঁধেছিল। তারা ভেবেছিল নদীর পাড়ে নতুন অবকাঠামো হবে, গবেষণাগার হবে, মৎস্যজীবীদের উন্নয়ন হবে, নদী দূষণ কমবে। কিন্তু দুই বছর পর এসে প্রকল্পের নামই পরিচিত হয়েছে ব্যর্থতার প্রতীক হিসেবে।

নদীপাড়ের মৎস্যজীবীরা বলেছেন—হালদায় ডিম ছাড়ার মৌসুমে সুরক্ষা বাড়ানোর কথা প্রকল্পে উল্লেখ থাকলেও বাস্তবে কোনো তৎপরতা দেখা যায় না। মাছ মারা, ডলফিন মারা, বালু উত্তোলন বন্ধে প্রকল্প পরিচালক তদারকি করেননি। বরং প্রকল্পের লোকজন মাঝেমধ্যে সভা-সেমিনার করলেও নদীর সংকট নিয়ে মত দেওয়ার সুযোগ পাওয়া যায় না সাধারণ অংশিজনদের। ফলে প্রকল্পটি জনসম্পৃক্ততা হারিয়েছে।

নদী গবেষক, পরিবেশবিদ এবং স্থানীয় এনজিও প্রতিনিধিদের অভিযোগ—প্রকল্প পরিচালক মাঠে না গিয়ে প্রকল্প পরিচালনার যে “দূরবর্তী পদ্ধতি” বেছে নিয়েছেন, তা মূলত প্রকল্পটিকে অচলই করে রেখেছে। ফিল্ডে যারা কাজ করবেন তাদের ব্রিফিং নেই, পর্যবেক্ষণ-রিপোর্টিং নেই, গ্রাউন্ড অ্যাকশন নেই। প্রকল্প পরিচালক অফিসে থাকেন না, ফোন ধরেন না—ফলে প্রকল্পের কাজও এগোয় না।

নদী সুরক্ষার মতো জটিল এবং পরিবেশগতভাবে সংবেদনশীল একটি প্রকল্প পরিচালনার ক্ষেত্রে যেখানে মাঠপর্যায়ে প্রতিদিন উপস্থিত থেকে কাজ করার প্রয়োজন, সেখানে প্রকল্প পরিচালকের অনুপস্থিতি প্রকল্পকে অকার্যকর করেছে—এ ব্যাপারে স্থানীয় প্রশাসনের অভ্যন্তরীণ কর্মকর্তারাও মন্তব্য করেছেন।

হাটহাজারীর ইউএনও আবদুল্লাহ আল মুমিনের নেতৃত্বে যত অভিযান হয়েছে, সেগুলো মূলত প্রশাসনের নিজস্ব উদ্যোগে। প্রকল্প থেকে সহায়তা থাকলে আরও বড় পরিসরে অভিযান চালানো যেত। প্রকল্প পরিচালক কার্যকর উদ্যোগ নিলে নদীর বিভিন্ন পয়েন্টে ২৪ ঘণ্টার নজরদারি সম্ভব হতো। ইটভাটা, কারখানা, বালু উত্তোলনকারী, যান্ত্রিক নৌযানের বিরুদ্ধে আইনের কঠোর প্রয়োগ হতো। কিন্তু প্রকল্প পরিচালক সেই ভূমিকা পালন করেননি।

নদীর বুকে বয়ে যাওয়া জীববৈচিত্র্য আজ ধ্বংসের মুখে। প্রকল্পের ব্যর্থতা শুধু প্রশাসনিক নয়, পরিবেশগত বিপর্যয়ের আশঙ্কাও বাড়িয়েছে বহুগুণে। আর এর কেন্দ্রে উঠে আসছে একটিই নাম—নাজিম উদ্দিন। ৪৬ কোটি টাকার প্রকল্পের নেতা হিসেবে তার দায়িত্ব ছিল নদীকে রক্ষা করা, প্রকল্পকে এগিয়ে নেওয়া, জবাবদিহিতার মাধ্যমে মাঠপর্যায়ের তদারকি নিশ্চিত করা। কিন্তু তিনি বরং প্রকল্পকে স্থবির করে রেখেছেন। আর সেই স্থবিরতার মূল্য দিচ্ছে হালদা নদী, তার জীববৈচিত্র্য, ডলফিন, মাছের প্রজনন, হাজারো মানুষের জীবিকা।

দুই বছর পর এসে প্রকল্পের অগ্রগতি যখন সিকিভাগ না হওয়াই স্বীকার করতে হয়, যখন প্রকল্প পরিচালককে অফিসে পাওয়া যায় না, ফোনেও সাড়া মেলে না, যখন মাঠপর্যায়ে কোনো বাস্তবায়ন দেখা যায় না—তখন প্রশ্ন জাগে, হালদা রক্ষায় সরকারের এই বিপুল অর্থ বরাদ্দের সুফল কে পেল? নদী তো পেল না। মৎস্যজীবী পেল না। গবেষণা পেল না। টহল পেল না। হ্যাচারি পেল না। তাহলে প্রকল্পটিই বা কার জন্য?

হালদা পাড়ের মানুষের ক্ষোভ তাই প্রকল্প পরিচালকের দিকেই। তাদের দাবি—নদী বাঁচাতে হলে প্রকল্প পরিচালকের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে। প্রয়োজন হলে প্রকল্প পরিচালক পরিবর্তন করতে হবে। কারণ একজন ব্যক্তির দায়িত্বহীনতা পুরো নদী রক্ষা প্রকল্পকে ব্যর্থতার দিকে ঠেলে দিয়েছে।

এখনো সময় আছে। প্রকল্পটির অগ্রগতি দ্রুত এগিয়ে নিতে হলে প্রকল্প পরিচালকের ভূমিকা বদলাতে হবে বা প্রয়োজন হলে নতুন নেতৃত্ব দিতে হবে। নাহলে যে নদীকে রক্ষা করার কথা ছিল, সেই নদীই শেষ পর্যন্ত ইতিহাস হয়ে যাবে দায়িত্বহীনতার কারণে। আর এই ব্যর্থতার দায় চিরকাল বহন করে যাবে আজকের প্রকল্প কর্তৃপক্ষ, বিশেষ করে প্রকল্পের দায়িত্বে থাকা নাজিম উদ্দিন।

Tag :

আপনার মতামত লিখুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল ও অন্যান্য তথ্য সঞ্চয় করে রাখুন

আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

বিদ্যুৎ লাইসেন্সে ৬৬৪ কোটির ঘুষ কেলেঙ্কারি: বদলি নাটক, আড়ালে মূলহোতা আতা মোল্লা

ব্যর্থতার কেন্দ্রবিন্দুতে প্রকল্প পরিচালক নাজিম উদ্দিন

কাজে আসছে না ৪৬ কোটি টাকার হালদা রক্ষা প্রকল্প

আপডেট সময় ০২:৩৫:১৬ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৪ ডিসেম্বর ২০২৫

প্রাকৃতিক মৎস্য প্রজনন ক্ষেত্র হিসেবে দেশের জন্য অনন্য হালদা নদী। সরকারের গেজেট প্রত্যয়নক্রমে “মৎস্য হেরিটেজ” হিসেবে ঘোষিত এই নদীর জীববৈচিত্র্য রক্ষার উদ্দেশ্যে প্রায় ৪৬ কোটি ৩৭ লাখ ৭২ হাজার টাকার যে প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়েছিল, সেই প্রকল্প আজ প্রশ্নের মুখে। কারণ প্রকল্প শুরু হওয়ার পর দুই বছর পেরিয়ে গেলেও এর দৃশ্যমান কোনো সুফল পাননি হালদা পাড়ের মানুষ, মৎস্যজীবী কিংবা নদী গবেষকরা। অভিযোগ–নির্দেশনা, বাজেট, কর্মসূচি সবই ছিল কাগজে-কলমে; বাস্তবে কিছুই হয়নি। আর এই ব্যর্থতার কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে এসেছে একজন ব্যক্তির নাম—প্রকল্প পরিচালক নাজিম উদ্দিন।

নদীর দুই পাড়ের মানুষ, মৎস্যজীবী, পরিবেশকর্মী, স্থানীয় প্রশাসনের বিভিন্ন সদস্য ও প্রকল্প-সম্পৃক্তদের সঙ্গে কথা বলে স্পষ্ট হয়েছে একটি বিষয়—প্রকল্পের প্রায় সব ব্যর্থতার দায় সরাসরি গিয়ে ঠেকেছে প্রকল্প পরিচালকের দায়িত্বহীনতা, স্বচ্ছতা সংকট ও প্রকল্প বাস্তবায়নে উদাসীনতার দিকে। সরকারি প্রকল্পের সিকিভাগ কাজ না এগোনো, মাঠপর্যায়ে তদারকিহীনতা, প্রশাসনের সঙ্গে সমন্বয়হীনতা, প্রকল্প পরিচালকের অনুপস্থিতি এবং অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার প্রশ্নের জবাব এড়িয়ে যাওয়া—সব মিলিয়ে পুরো প্রকল্পটিকে অকার্যকর, দুর্বল ও অদক্ষ ব্যবস্থাপনার উদাহরণে পরিণত করেছে।

নদী রক্ষায় নেওয়া প্রকল্পটি ২০২৩ সালের অক্টোবর মাসে শুরু হয় এবং শেষ হওয়ার কথা ২০২৭ সালে। কিন্তু শুরু থেকে আজ পর্যন্ত প্রকল্পের বাস্তবায়নচিত্র দেখলে মনে হয়—এটি যেন শুরুই হয়নি। যেসব কর্মসূচি বাস্তবায়নের কথা ছিল সেগুলোর কোনোটিই আকৃতি পায়নি। নদীতে অব্যাহতভাবে চলছে বিষ প্রয়োগ, জাল ফেলা, বড়শি দিয়ে মাছ ধরা, যান্ত্রিক নৌযান চলাচল, বালু উত্তোলন, রাসায়নিক বর্জ্য নিঃসরণ। অথচ এগুলো বন্ধ করাই ছিল প্রকল্পের মূল লক্ষ্য। তাই প্রশ্ন উঠেছে—যে প্রকল্প নদী বাঁচাবে বলে নেওয়া হয়েছিল, সেই প্রকল্পই কি আজ হালদাকে বিপন্ন করে তুলছে?

প্রকল্পের আওতায় রাউজান ও হাটহাজারীর ৬টি পুরাতন হ্যাচারি সংস্কারের কথা ছিল। কিন্তু রাউজানের কাগতিয়া ও পশ্চিম গহিরা হ্যাচারি দুইটি আগের মতোই পরিত্যক্ত পড়ে আছে। হাটহাজারীর কয়েকটি হ্যাচারিতে নামমাত্র সংস্কার করা হলেও তা কার্যকর হয়নি। প্রকল্পের আওতায় ছিল ডিমসংগ্রহকারী, মৎস্য কর্মকর্তা, কর্মচারীদের প্রশিক্ষণ প্রদান, বিকল্প কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও গবেষণাগার নির্মাণের উদ্যোগ—কিন্তু বাস্তবে এসবের কোনো চিহ্ন নেই। নদীর দুই পাড় ঘুরে দেখা গেছে, প্রকল্পের কোনো কাজই পরিদর্শনযোগ্য অবস্থায় নেই।

সবচেয়ে আলোচিত ব্যর্থতা—নদীতে টহল পরিচালনার জন্য প্রকল্প থেকে কোনো নৌযান দেওয়া হয়নি। অথচ নদীতে যান্ত্রিক নৌযান, বালু উত্তোলন, জাল ফেলাসহ অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড নিয়ন্ত্রণের জন্য নৌযান সরবরাহ ছিল প্রকল্পের অন্যতম প্রতিশ্রুতি। আবার নদীতে নজরদারির জন্য ছয় উপজেলা প্রশাসনকে দেওয়া ড্রোনগুলোও অচল অবস্থায় পড়ে আছে। নদীপাড়ের মানুষের ভাষ্য—কখনও এসব ড্রোন আকাশে উঠতে দেখেননি তারা।

এ পরিস্থিতিতে হাটহাজারী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আবদুল্লাহ আল মুমিন ও নৌপুলিশ কোনোভাবে তাদের হাতে থাকা সীমিত সম্পদ নিয়ে অভিযান পরিচালনা করছেন। ফলাফল—অভিযানে বালুবাহী নৌযান আটক হয়েছে, জরিমানা হয়েছে, কয়েকজন গ্রেফতার হয়েছে; কিন্তু প্রকল্পের দিক থেকে যে সহায়তা পাওয়ার কথা ছিল তা পাওয়া যায়নি। নৌপুলিশের কাছে থাকা একমাত্র নৌযানে দুই উপজেলা কভার করতে হচ্ছে—যা বাস্তবিকই অপর্যাপ্ত। আর এই ব্যর্থতার দায়ও প্রকল্প পরিচালকেরই। কারণ প্রকল্পের বাজেট পরিকল্পনায় টহল নৌযান বরাদ্দ ছিল, ড্রোন ছিল, ফিল্ড অফিসার ছিল, কিন্তু কার্যকর হয়নি কিছুই।

প্রকল্পের ব্যর্থতা সম্পর্কে জানতে চেয়ে প্রতিবেদক একাধিকবার প্রকল্প পরিচালকের অফিসে গেলেও তাকে পাওয়া যায়নি। ফোনে যোগাযোগ করলেও সাড়া মেলেনি। এমনকি পাঠানো ক্ষুদে বার্তারও কোনো জবাব পাওয়া যায়নি। একজন সরকারি প্রকল্প পরিচালকের এমন দায়িত্বহীন আচরণ আরও ক্ষোভ বাড়িয়েছে নদীপাড়ের মানুষের মধ্যে। তারা মনে করেন—প্রকল্পের কাজ না হওয়ার প্রধান কারণ হলো প্রকল্প পরিচালকের মাঠপর্যায়ে না আসা এবং প্রকল্প বাস্তবায়নে অনাগ্রহ।

প্রকল্প পরিচালক নাজিম উদ্দিন অবশ্য স্বীকার করেছেন যে প্রকল্পের সিকি ভাগ কাজও এখনো শেষ হয়নি। তবে কেন হয়নি, কী বাধা, কী করণীয়—এসব প্রশ্নে তিনি মুখ বন্ধ রেখেছেন। তার অফিসে গিয়ে তাকে পাওয়া না যাওয়া কিংবা ফোনে সাড়া না দেওয়ার বিষয়টিও প্রশ্নবিদ্ধ। একটি প্রায় ৫০ কোটি টাকার জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পের নেতৃত্বে থাকা ব্যক্তির এমন আচরণ প্রকল্প ব্যর্থতার সবচেয়ে বড় সূচক বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

হালদা নদী সংরক্ষণে নেওয়া প্রকল্পটির অন্যতম উদ্দেশ্য ছিল নদীর দূষণ রোধ, যান্ত্রিক নৌযান বন্ধ, জাল ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞা, বালু উত্তোলন নিয়ন্ত্রণ ও হ্যাচারি সংস্কার। কিন্তু প্রকল্প শুরু হওয়ার পরও নদীর বিভিন্ন পয়েন্টে দেখা গেছে কারেন্ট জাল ভাসানো, বড়শি দিয়ে মাছ শিকার, বালুভর্তি বড় বড় নৌযান চলাচল, সংযুক্ত খালে বিষ প্রয়োগ। কাগতিয়া, মইশকরম, গহিরা, নোয়াজিশপুর—যেখানেই যাওয়া হোক দেখা গেছে বিপর্যস্ত পরিবেশ। বিষাক্ত বর্জ্যে কালো পানির স্রোত, ইটভাটার ধোঁয়া, রাসায়নিক বর্জ্য, ডুবন্ত পাখার আঘাতে ডলফিন-মাছের মৃত্যু—সব মিলিয়ে হালদা নদী যেন মৃত্যুবরণ করছে, আর এই মৃত্যুর পেছনে দায়িত্বহীনতা স্পষ্ট করছে প্রকল্প পরিচালকের ব্যর্থতা।

হালদা পাড়ের মানুষ অভিযোগ করেন—এই প্রকল্প মূলত সুবিধাভোগীদের অর্থনৈতিক উন্নতির জন্য তৈরি হয়েছে, নদী রক্ষার জন্য নয়। প্রকল্পের নাম শুনে মানুষ আশায় বুক বেঁধেছিল। তারা ভেবেছিল নদীর পাড়ে নতুন অবকাঠামো হবে, গবেষণাগার হবে, মৎস্যজীবীদের উন্নয়ন হবে, নদী দূষণ কমবে। কিন্তু দুই বছর পর এসে প্রকল্পের নামই পরিচিত হয়েছে ব্যর্থতার প্রতীক হিসেবে।

নদীপাড়ের মৎস্যজীবীরা বলেছেন—হালদায় ডিম ছাড়ার মৌসুমে সুরক্ষা বাড়ানোর কথা প্রকল্পে উল্লেখ থাকলেও বাস্তবে কোনো তৎপরতা দেখা যায় না। মাছ মারা, ডলফিন মারা, বালু উত্তোলন বন্ধে প্রকল্প পরিচালক তদারকি করেননি। বরং প্রকল্পের লোকজন মাঝেমধ্যে সভা-সেমিনার করলেও নদীর সংকট নিয়ে মত দেওয়ার সুযোগ পাওয়া যায় না সাধারণ অংশিজনদের। ফলে প্রকল্পটি জনসম্পৃক্ততা হারিয়েছে।

নদী গবেষক, পরিবেশবিদ এবং স্থানীয় এনজিও প্রতিনিধিদের অভিযোগ—প্রকল্প পরিচালক মাঠে না গিয়ে প্রকল্প পরিচালনার যে “দূরবর্তী পদ্ধতি” বেছে নিয়েছেন, তা মূলত প্রকল্পটিকে অচলই করে রেখেছে। ফিল্ডে যারা কাজ করবেন তাদের ব্রিফিং নেই, পর্যবেক্ষণ-রিপোর্টিং নেই, গ্রাউন্ড অ্যাকশন নেই। প্রকল্প পরিচালক অফিসে থাকেন না, ফোন ধরেন না—ফলে প্রকল্পের কাজও এগোয় না।

নদী সুরক্ষার মতো জটিল এবং পরিবেশগতভাবে সংবেদনশীল একটি প্রকল্প পরিচালনার ক্ষেত্রে যেখানে মাঠপর্যায়ে প্রতিদিন উপস্থিত থেকে কাজ করার প্রয়োজন, সেখানে প্রকল্প পরিচালকের অনুপস্থিতি প্রকল্পকে অকার্যকর করেছে—এ ব্যাপারে স্থানীয় প্রশাসনের অভ্যন্তরীণ কর্মকর্তারাও মন্তব্য করেছেন।

হাটহাজারীর ইউএনও আবদুল্লাহ আল মুমিনের নেতৃত্বে যত অভিযান হয়েছে, সেগুলো মূলত প্রশাসনের নিজস্ব উদ্যোগে। প্রকল্প থেকে সহায়তা থাকলে আরও বড় পরিসরে অভিযান চালানো যেত। প্রকল্প পরিচালক কার্যকর উদ্যোগ নিলে নদীর বিভিন্ন পয়েন্টে ২৪ ঘণ্টার নজরদারি সম্ভব হতো। ইটভাটা, কারখানা, বালু উত্তোলনকারী, যান্ত্রিক নৌযানের বিরুদ্ধে আইনের কঠোর প্রয়োগ হতো। কিন্তু প্রকল্প পরিচালক সেই ভূমিকা পালন করেননি।

নদীর বুকে বয়ে যাওয়া জীববৈচিত্র্য আজ ধ্বংসের মুখে। প্রকল্পের ব্যর্থতা শুধু প্রশাসনিক নয়, পরিবেশগত বিপর্যয়ের আশঙ্কাও বাড়িয়েছে বহুগুণে। আর এর কেন্দ্রে উঠে আসছে একটিই নাম—নাজিম উদ্দিন। ৪৬ কোটি টাকার প্রকল্পের নেতা হিসেবে তার দায়িত্ব ছিল নদীকে রক্ষা করা, প্রকল্পকে এগিয়ে নেওয়া, জবাবদিহিতার মাধ্যমে মাঠপর্যায়ের তদারকি নিশ্চিত করা। কিন্তু তিনি বরং প্রকল্পকে স্থবির করে রেখেছেন। আর সেই স্থবিরতার মূল্য দিচ্ছে হালদা নদী, তার জীববৈচিত্র্য, ডলফিন, মাছের প্রজনন, হাজারো মানুষের জীবিকা।

দুই বছর পর এসে প্রকল্পের অগ্রগতি যখন সিকিভাগ না হওয়াই স্বীকার করতে হয়, যখন প্রকল্প পরিচালককে অফিসে পাওয়া যায় না, ফোনেও সাড়া মেলে না, যখন মাঠপর্যায়ে কোনো বাস্তবায়ন দেখা যায় না—তখন প্রশ্ন জাগে, হালদা রক্ষায় সরকারের এই বিপুল অর্থ বরাদ্দের সুফল কে পেল? নদী তো পেল না। মৎস্যজীবী পেল না। গবেষণা পেল না। টহল পেল না। হ্যাচারি পেল না। তাহলে প্রকল্পটিই বা কার জন্য?

হালদা পাড়ের মানুষের ক্ষোভ তাই প্রকল্প পরিচালকের দিকেই। তাদের দাবি—নদী বাঁচাতে হলে প্রকল্প পরিচালকের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে। প্রয়োজন হলে প্রকল্প পরিচালক পরিবর্তন করতে হবে। কারণ একজন ব্যক্তির দায়িত্বহীনতা পুরো নদী রক্ষা প্রকল্পকে ব্যর্থতার দিকে ঠেলে দিয়েছে।

এখনো সময় আছে। প্রকল্পটির অগ্রগতি দ্রুত এগিয়ে নিতে হলে প্রকল্প পরিচালকের ভূমিকা বদলাতে হবে বা প্রয়োজন হলে নতুন নেতৃত্ব দিতে হবে। নাহলে যে নদীকে রক্ষা করার কথা ছিল, সেই নদীই শেষ পর্যন্ত ইতিহাস হয়ে যাবে দায়িত্বহীনতার কারণে। আর এই ব্যর্থতার দায় চিরকাল বহন করে যাবে আজকের প্রকল্প কর্তৃপক্ষ, বিশেষ করে প্রকল্পের দায়িত্বে থাকা নাজিম উদ্দিন।