দেশের অন্যতম শীর্ষ ব্যবসা প্রতিষ্ঠান সামিট গ্রুপ, এর চেয়ারম্যান আজিজ খান এবং তার পরিবারের সদস্যরা হাজার হাজার কোটি টাকা বিদেশে পাচার করেছেন। পাচারের অর্থ দিয়ে তারা বিভিন্ন দেশে গড়ে তুলেছেন সম্পদের পাহাড়।
বিদেশে যেকোনো ধরনের বিনিয়োগের আগে বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুমতি নেওয়ার আইনি বিধান রয়েছে। কিন্তু সামিট গ্রুপ অনুমতির ধারে-কাছেও যায়নি। বিভিন্ন তদন্তে দেখা গেছে, সামিট গ্রুপ ব্যাংলাদেশ ব্যাংককে মিথ্যা তথ্য দিয়ে অর্থ দেশ থেকে বের করে নিয়ে গেছে।
সামিট গ্রুপের চেয়ারম্যান আজিজ খান এবং তার পরিবারের সদস্যরা বিদেশে টাকা পাচার করেছেন বলে বিভিন্ন তদন্তকারী প্রতিষ্ঠানে ইতোমধ্যেই নামে-বেনামে অনেক অভিযোগ জমা পড়েছে। এসব অভিযোগ আমলে নিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট, দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক), জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) এবং সিআইডি তদন্ত করছে।
অভিযোগে বলা হয়েছে, সামিট গ্রুপের কর্মকর্তারা প্রকাশ্যেই বিদেশে বিনিয়োগ করেছেন। তারা জাহাজ, বিলাসবহুল বাড়ি, ভিলা, অ্যাপার্টমেন্ট ও ফ্ল্যাট, বাণিজ্যিক স্থাপনা ও বিপণিবিতান কিনেছেন। পাচারের টাকায় নামিদামি হোটেলও গড়ে তুলেছেন তারা।
পাচারের অর্থে আজিজ খান এবং তার পরিবার সিঙ্গাপুর, কেনিয়া, মালয়েশিয়া, দুবাই, ভারত, শ্রীলঙ্কা, সৌদি আরব, যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র ও হংকংয়ে বেশি বিনিয়োগ করেছেন। বিনিয়োগ করা অর্থের উৎস নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয় না এবং বিনা শর্তে বৈধ বলে স্বীকৃতি দেওয়া হয়; এমন সব দেশ বা শহরেই বেশিরভাগ অর্থ পাচার করা হয়েছে।
এনবিআরে জমা পড়া অভিযোগে দেখা গেছে, সামিট গ্রুপের কর্মকর্তারা মিথ্যা তথ্য দিয়ে ব্যাংকিং চ্যানেলের মাধ্যমে বেশিরভাগ (৮০ শতাংশ) অর্থ পাচার করেছেন। কোনো ধরনের গোপনীয়তা ছাড়াই তারা বিদেশে কোম্পানি খুলে পাচার করা অর্থ বৈধ (সাদা) বলে স্বীকৃতি আদায় করেছেন। ওই সব কোম্পানির মুনাফা দেখিয়ে সেখান থেকেও পাচারের অর্থ অন্য দেশে নিয়ে বড় ধরনের বিনিয়োগ করেছে সামিট গ্রুপ।
বিশ্বের শীর্ষ ধনীদের তালিকা প্রকাশ করে ফোর্বস ম্যাগাজিন। আজিজ খান সিঙ্গাপুরের ৪১তম ধনী। ফোর্বসের তথ্য অনুসারে, ৬৮ বছর বয়সী আজিজ খান বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত সিঙ্গাপুরের স্থায়ী বাসিন্দা। তার পরিবারের অন্য সদস্যরাও সিঙ্গাপুরের নাগরিক। আজিজ খানের সামিট গ্রুপ বাংলাদেশের একটি শীর্ষ বেসরকারি প্রতিষ্ঠান। বিদ্যুৎ, বন্দর, ফাইবার অপটিকস, আবাসন ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের ব্যবসা রয়েছে এই প্রতিষ্ঠানটির।
২০১৬ সালে পানামা পেপারসে সামিট গ্রুপের আজিজ খানের নাম আসে। এ বিষয়ে সে সময়ই দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) অনুসন্ধানের উদ্যোগ নেয়। কিন্তু তৎকালীন সরকারের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সহায়তায় তদন্ত থামিয়ে দিতে সক্ষম হয় সামিট গ্রুপ। ২০২৪ সালের ৮ আগস্ট অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর তদন্ত আবার শুরু হয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান আমাদের মাতৃভূমিকে বলেন, দেশ থেকে অনেকেই অর্থ পাচার করে নিয়ে গেছেন। বিনিয়োগের অর্থে কর নেই এমন সব দেশেই পাচারের অর্থ নেওয়া হয়েছে। এরপর সেখান থেকে অবৈধ অর্থ বৈধ করে অন্য দেশে নিয়ে বিনিয়োগ করা হয়েছে, যা বেআইনি। এভাবে অর্থ নিয়ে যাওয়াকে পাচার হিসেবে গণ্য করা হয়, যা শাস্তিযোগ্য অপরাধ।
তিনি বলেন, ‘এরই মধ্যে অনেক প্রতিষ্ঠানের অর্থপাচার এবং বিদেশে পাচারের অর্থে বিনিয়োগের বিষয়গুলো তদন্তে উঠে এসেছে, যা এখন তদন্তাধীন।’
আওয়ামী লীগ সরকারের বিমান ও পর্যটন মন্ত্রী ফারুক খানের ভাই আজিজ খান সামিট গ্রুপের চেয়ারম্যান। ফোর্বসের তথ্য মতে, আজিজ খান ১.১২ বিলিয়ন ডলারের মালিক। এই টাকা তিনি বাংলাদেশ থেকে বৈধ উপায়ে নিয়েছেন বলে কোনো তথ্য কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাছে নেই। আজিজ খান শুধু যে সিঙ্গাপুরেরই শীর্ষ ধনী তাই নয়, ফোর্বসের ২০২৪ সালে প্রকাশিত নিরীক্ষা ও পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বিশ্বের শীর্ষ ধনীদের সারিতেও আছেন তিনি। ৭৮ দেশের ২ হাজার ৭৮১ জনের তালিকায় ২ হাজার ৫৪৫ নম্বরে রয়েছেন আজিজ খান।
সামিট কমিউনিকেশনের চেয়ারম্যান মুহাম্মদ ফরিদ খান আওয়ামী লীগের (কার্যক্রম নিষিদ্ধ) প্রেসিডিয়াম সদস্য। ফরিদ শেখ হাসিনার ছেলে ও সজীব ওয়াজেদ জয়েরও ঘনিষ্ঠ বন্ধু। এ জন্য সামিট বিগত সরকারের সময়ে বিভিন্ন ধরনের সুবিধা নিয়েছে বলে অভিযোগ আছে।
এ বিষয়ে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যশনাল-টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান বলেন, সামিট গ্রুপের নামে অর্থ নয়ছয় করার অভিযোগ আছে। সামিট গ্রুপের নামে ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগও আছে। সামিট গ্রুপ ক্ষমতার অপব্যবহার করে আর্থিক অনিয়ম করেছে। বর্তমান সরকারের উচিত বিগত আর্থিক অনিয়ম থেকে দেশকে রক্ষা করতে সামিট গ্রুপ এবং এর চেয়াম্যানের অপকর্মের তদন্ত করা।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সূত্র মতে, এ পর্যন্ত সাকল্যে ২০টি প্রতিষ্ঠানকে বিদেশে বিনিয়োগের অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। তবে সামিটের এত বড় অঙ্কের অবৈধ বিনিয়োগের তথ্য সরকারের কোনো প্রতিষ্ঠানের কাছে নেই। প্রকাশিত শ্বেতপত্রে বলা হয়েছে, বিগত সরকারের ১৫ বছরে বাংলাদেশ থেকে ২৮ উপায়ে দুর্নীতির মাধ্যমে ২৩৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলার অবৈধভাবে পাচার হয়েছে এবং পাচারের অর্থে বিদেশে অবৈধভাবে বিনিয়োগ করা হয়েছে।
নিজস্ব প্রতিবেদক 






















