গুরুত্বপূর্ণ একটি শাখায় পদায়ন পাওয়ার পর থেকেই একের পর এক অনিয়মের অভিযোগে জড়িয়েছেন কাস্টম হাউস ঢাকার সহকারী কমিশনার সাকিব আনাম খান। বিসিএস ৪০ ব্যাচের এই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অভিযোগ, সুবিধা পেলে তিনি আইন ও বিধিবিধান উপেক্ষা করে কোনো যাচাই-বাছাই ছাড়াই পণ্য চালান ছেড়ে দেন। এতে সরকার বড় অঙ্কের রাজস্ব হারাচ্ছে। কাস্টম হাউসের ভেতরে এসব বিষয় এখন প্রায় ওপেন সিক্রেট।
সর্বশেষ ঘটনাটি ঘটেছে কুরিয়ার ইউনিটে। মিথ্যা ঘোষণায় আমদানি করা একটি পণ্য চালানে তিনি শুল্ক-কর নির্ধারণ করেন মাত্র ৩৫ হাজার টাকা। পরে কাস্টম হাউসের তদন্তে দেখা যায়, ওই চালান থেকে সরকারের প্রাপ্য শুল্ক-কর ছিল ৭৬ লাখ টাকা। কিন্তু ততদিনে আমদানিকারক ও সিঅ্যান্ডএফ প্রতিষ্ঠান সহকারী কমিশনারের সহায়তায় চালান নিয়ে বেরিয়ে গেছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো এসব তথ্য জানিয়েছে।
সূত্রগুলো জানায়, গত ২৩ আগস্ট ঢাকা কাস্টম হাউসের কুরিয়ার ইউনিট দিয়ে ফুলএভার বিডি লিমিটেড নামের একটি প্রতিষ্ঠান পণ্য চালান আনে। এর বিল অব এন্ট্রি নম্বর সি-৯৯২৬২৩। কাগজপত্রে পণ্যের যে বিবরণ দেওয়া হয়, তা ছিল কাগজ। কিন্তু বাস্তবে প্রতিষ্ঠানটি আরএফ লেভেলের পণ্য খালাস করে নিয়ে যায়। কুরিয়ার ইউনিটের দায়িত্বে থাকা সাকিব আনাম খান ওই ঘোষণার ভিত্তিতেই চালানটি ছেড়ে দেন।
বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের নজরে এলে তদন্ত শুরু হয়। সেখানে ঘোষণার সঙ্গে চালানের প্রকৃত পণ্যের গরমিল ধরা পড়ে। এরপর প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে ৭৬ লাখ টাকার শুল্ক ফাঁকির মামলা করে কাস্টম হাউস কর্তৃপক্ষ। তবে মামলাটি হয়েছে চালান ছাড়ের পর। ফলে এই প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত প্রতিষ্ঠানটির কাছ থেকে একটি টাকাও আদায় করা যায়নি।
এ ঘটনায় থেমে নেই তদন্ত। কুরিয়ারের আরও ৩১টি চালানে লক দিয়েছে কাস্টম হাউসের প্রিভেন্টিভ টিম। পুরো বিষয়টি নিয়ে অভ্যন্তরীণ তদন্তও শুরু হয়েছে।
কুরিয়ার ইউনিটের মূল উদ্দেশ্য নমুনা পণ্য খালাস করা। এলসি ছাড়া আসা নমুনা পণ্য এই পথে ছাড়ের নিয়ম আছে। বিধি অনুযায়ী এক ব্যক্তি বছরে এ পথে সর্বোচ্চ প্রায় ৫ হাজার ডলারের পণ্য আনতে পারেন। অথচ কাস্টম হাউসের একাধিক কর্মকর্তার ভাষ্য, সাকিব আনাম খান আসার পর ইউনিটটি কার্যত বাণিজ্যিক আমদানিকারকদের আস্তানা হয়ে উঠেছে। কোনো কোনো সময় ফ্রেইটের চেয়ে কুরিয়ারেই বেশি বিল অব এন্ট্রি জমা পড়ছে। যদিও বাণিজ্যিক পণ্য আসার কথা ফ্রেইটের মাধ্যমে। সুবিধা দিলে খালাসের অবাধ সুযোগ মেলে বলেই নানা ধরনের পণ্য এখন কুরিয়ার দিয়ে বেরিয়ে যাচ্ছে বলে জানান কর্মকর্তারা।
ঘটনার ব্যাখ্যা জানতে চাইলে ঢাকা কাস্টম হাউসের কমিশনার রইচ উদ্দিন খান ফুলএভার বিডির বিষয়টি স্বীকার করেন। তিনি বলেন, কুরিয়ার ইউনিটে একটি প্রতিষ্ঠান মিথ্যা ঘোষণায় চালান খালাস করেছিল। পরে তদন্তে আরএফ লেভেলের পণ্য পাওয়া গেছে, যাতে সরকারের প্রায় ৭৬ লাখ টাকা রাজস্ব ফাঁকি হয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে এবং এর পরবর্তী চালানগুলো এখন অবজারভেশনে রাখা হয়েছে বলেও জানান তিনি।
ফুলএভার বিডির ঘটনা একা নয় বলে দাবি সূত্রগুলোর। তাদের অভিযোগ, একজন শ্রমিকের জাতীয় পরিচয়পত্র ব্যবহার করে মাত্র পাঁচ দিনে প্রায় ৪০টি বিল অব এন্ট্রির পণ্য খালাস করা হয়েছে। এগুলো ডেল্টা কার্গো মিডিয়ার নামে ছাড় করা হয়। অভিযোগ ওঠা বিল অব এন্ট্রির মধ্যে রয়েছে ১০৯৯৬৯৫, ১০৯৯৭৫৬, ১০৯৯৭৪৫, ১০৮৮৭৩০, ১০৮৮৭০২, ১০৮৮৭১২, ১০৮৪৬৪২, ১০৮৪৫৪৮, ১০৮৩৩৪৫, ১০৮৩৩৩৯, ১০৭৯৬৯২, ১০৮০৯৩৭, ১০৭৮৭১৮, ১০৮০৯৮২ ও ১০৭৯৪৭৮। এসব চালান খালাসে সাকিব আনাম খানের ভূমিকা নিয়েই এখন প্রশ্ন উঠেছে।
কাস্টম হাউসের অভ্যন্তরীণ সূত্রগুলোর দাবি, তিনি কুরিয়ারে যোগ দেওয়ার পর থেকে দুটি সিন্ডিকেট সক্রিয় হয়েছে। এরা বিভিন্ন সিঅ্যান্ডএফ প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্স ভাড়া নিয়ে তাঁর মাধ্যমে চালান বের করে নিচ্ছে। বন্ডেড ফেব্রিক্স থেকে শুরু করে বাণিজ্যিক পণ্য পর্যন্ত মিথ্যা ঘোষণায় কুরিয়ার দিয়ে ছাড় হওয়ার বিষয়টি কাস্টম হাউসে সবার জানা।
কুরিয়ারে অন্যের পরিচয়পত্র ব্যবহারের অভিযোগ অবশ্য নতুন নয়। এর আগে এক প্রতিষ্ঠান মালিকের নামে কুরিয়ারে নকল সিগারেটের ব্যান্ডরোল আসে। চালান আটকের পর পরিচয়পত্র দেখে কাস্টম হাউস ফাঁকির মামলা করে। পরে জানা যায়, ওই ব্যক্তি আসলে পণ্যটি আমদানিই করেননি; তাঁর পরিচয়পত্র অন্য কেউ ব্যবহার করেছে। এরপর তিনি নিজের নাম ব্যবহার করে অনিয়ম করার অভিযোগে থানায় মামলা করেন।
কুরিয়ারে আসার আগে অ্যাসেসমেন্ট গ্রুপে থাকার সময়ও সাকিবের বিরুদ্ধে অভিযোগ ছিল। সূত্রগুলো বলছে, সুবিধা না পেলে তিনি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের ফাইল আটকে রেখে হয়রানি করতেন।
এর আগে রাজশাহী ভ্যাট কমিশনারেটে কর্মরত থাকার সময় তাঁকে ঈশ্বরদী ইপিজেডে পদায়ন করা হয়েছিল। কিন্তু বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানকে হয়রানি করে সুবিধা নেওয়ার অভিযোগে দুই মাসের মাথায় তৎকালীন রাজশাহী ভ্যাট কমিশনার তাঁকে সরিয়ে দেন।
সর্বশেষ এসব অনিয়মের কারণে গত বৃহস্পতিবার সাকিব আনাম খানকে ঢাকা কাস্টম হাউসের অন্য একটি শাখায় বদলি করা হয়েছে।
অভিযোগের বিষয়ে সাকিব আনাম খানের বক্তব্য জানতে চাইলে তিনি ফুলএভার বিডিসহ কোনো প্রতিষ্ঠান থেকে সুবিধা নেওয়ার অভিযোগ অস্বীকার করেন। তাঁর দাবি, প্রতিষ্ঠানটি পণ্যের মূল্য কম ঘোষণা করেছিল, আর সে কারণেই শুল্ক ফাঁকির মামলা হয়েছে। তবে ৭৬ লাখ টাকার শুল্ক-কর প্রযোজ্য থাকা সত্ত্বেও কীভাবে তিনি মাত্র ৩৫ হাজার টাকা নির্ধারণ করে চালান ছাড়লেন, এই প্রশ্নের কোনো উত্তর তিনি দেননি; বিষয়টি এড়িয়ে যান।
নিজস্ব প্রতিবেদক 























