গাজীপুর মহানগরের রাজনীতিতে এক ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করেছেন আবদুল হালিম মোল্লা। গত বছর চাঁদাবাজিসহ নানা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের অভিযোগে বিএনপি থেকে তাকে বহিষ্কার করা হলেও চলতি বছরের জুলাইয়ে তার সেই বহিষ্কারাদেশ প্রত্যাহার করে নেওয়া হয়। দলীয় পদ ফিরে পাওয়ার পর তিনি আরও বেপরোয়া হয়ে ওঠেন এবং মোটর সাইকেলের বিশাল বহর নিয়ে একের পর এক ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে হামলা চালাতে শুরু করেন। স্থানীয় বাসিন্দাদের মুখে মুখে এখন একটাই আলোচনা—গাজীপুরের অন্ধকার জগতের ‘নতুন ডন’ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছেন এই নেতা।
ছয়টি গ্রেপ্তারি পরোয়ানা মাথায় নিয়ে পুলিশের খাতায় আবদুল হালিম মোল্লা এখনও ‘পলাতক’ হলেও তার বাস্তব চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন। প্রতিদিন সন্ধ্যার পর চান্দনা চৌরাস্তায় নিজের রাজনৈতিক কার্যালয় থেকে পুরো অপরাধ সাম্রাজ্য নিজেই তদারকি করেন তিনি। শুধু চাঁদাবাজির সঙ্গেই নয়, তার নাম জড়িয়ে রয়েছে ঝুট ব্যবসার একচেটিয়া দখল এবং ফুটপাত দখলের মতো নানা অপরাধে। এমনকি একজন ব্যবসায়ীকে অপহরণ ও নির্যাতনের ঘটনায় মামলা পর্যন্ত হয়েছে। এত কিছুর পরও রহস্যজনকভাবে পুলিশ তাকে ‘খুঁজে পাচ্ছে না’।
হালিম মোল্লার এই বেপরোয়া তাণ্ডবের সামনে পুলিশ প্রশাসনও যেন অনেকটাই নির্বাক। নাম প্রকাশ না করার শর্তে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কয়েকজন কর্মকর্তা জানান, তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার সাহস অনেকে পান না। অন্যদিকে, স্থানীয় বিএনপি নেতারাও বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পড়েছেন। তাদের মতে, হালিম মোল্লার অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের কারণে আজ সাধারণ মানুষের সামনে মুখ দেখানো দায় হয়ে পড়েছে।
এই ত্রাস সৃষ্টির পেছনে রয়েছে তার একটি বিশেষ বাহিনী, যার সদস্য তালিকায় কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের ক্যাডার থেকে শুরু করে হত্যা মামলার আসামিরাও স্থান পেয়েছে। অনুসন্ধানে জানা গেছে, চান্দনা চৌরাস্তা ও আশপাশের এলাকায় চাঁদাবাজি ও দখলদারি চালাতে অন্তত চারটি আলিশান অফিস গড়ে তুলেছেন হালিম। শহীদ একাডেমির পাশসহ বিভিন্ন জায়গায় অবস্থিত এসব কার্যালয়কে স্থানীয়রা মূলত ‘টর্চার সেল’ হিসেবেই চেনেন। অপরাধ ঢাকতে এসব কার্যালয়ের সামনে দলীয় ব্যানার টানানো হলেও ভেতরে চলে নানান অপকর্মের পরিকল্পনা।
এরই ধারাবাহিকতায় সম্প্রতি গাজীপুর মহানগরের ১৪ নম্বর ওয়ার্ডের ফুলউইন গার্মেন্টস লিমিটেডে হামলা চালায় হালিম বাহিনী। গত ১২ সেপ্টেম্বর ৫০-৬০ জনের একটি সশস্ত্র দল ২০-২৫টি মোটরসাইকেলে কারখানায় ঢুকে মোটা অঙ্কের চাঁদা দাবি করে এবং কাজ বন্ধের নির্দেশ দেয়। এই ঘটনার ভিডিও সিসি ক্যামেরার মনিটরে স্পষ্ট ধরা পড়লেও ভয়ে কারখানা কর্তৃপক্ষ আইনি পদক্ষেপে যেতে সাহস পায়নি। একই কায়দায় ভোগড়া বাইপাসের আরেকটি তৈরি পোশাক কারখানাতেও দফায় দফায় হানা দেয় তার অনুসারীরা।
হালিম বাহিনীর এই মহড়ায় নেতৃত্ব দেওয়ার তালিকায় রয়েছে কালা নাজমুল, নেওয়াজ মাহমুদ ও পিস্তল শাহজাহানের মতো বিতর্কিত মুখ, যাদের কেউ কেউ অতীতে স্বেচ্ছাসেবক লীগের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। কারখানার ঝুট ব্যবসার নিয়ন্ত্রণ নিতে লুইট্যাক্স, কলোটেক্সসহ সোয়েটার্স, ইকো ফ্যাব, টি অ্যান্ড জেড এবং আলিফ ক্যাজুয়ালসহ দেড় শতাধিক কারখানায় আধিপত্য বিস্তার করেছে এই চক্র। বাসন থানা ছাড়িয়ে গাছা ও টঙ্গী এলাকার শিল্পপ্রতিষ্ঠানেও এখন নিয়মিত হানা দিচ্ছে হালিম বাহিনী।
শুধু বড় কারখানা নয়, সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রাকেও দুর্বিষহ করে তুলেছে এই চক্র। চান্দনা চৌরাস্তার কাঁচাবাজার জবরদখল করে নিয়মিত চাঁদা আদায়ের পাশাপাশি কড্ডা বাজার দখলেরও পাঁয়তারা চলছে। এমনকি বাড়িঘর নির্মাণ, অটোরিকশার ব্যবসা এবং ময়লার বর্জ্য ব্যবস্থাপনায়ও ভাগ বসিয়েছে তারা। চৌরাস্তা কেন্দ্রীয় মসজিদ মাঠের ফুটপাত দখল করে গত দুই বছর ধরে চলছে রমরমা চাঁদাবাজি, যার প্রতিবাদ করার সাহস কারও নেই।
স্থানীয় রাজনৈতিক মহলেও হালিম মোল্লার ভয়ে নেমে এসেছে পিনপতন নীরবতা। বাসন থানা এবং মহানগর যুবদলের একাধিক শীর্ষ নেতা তাকে সরাসরি ‘শহরের নতুন ডন’ হিসেবে উল্লেখ করলেও প্রকাশ্যে কথা বলতে চাননি। কেবল স্থানীয় সংসদ সদস্যের জোরালো হস্তক্ষেপে এক ব্যবসায়ীকে তুলে নিয়ে গিয়ে নির্যাতনের ঘটনায় সম্প্রতি হালিম মোল্লার বিরুদ্ধে মামলা নিতে বাধ্য হয়েছে পুলিশ।
গোয়েন্দা ও পুলিশের গোপন প্রতিবেদনে তালিকাভুক্ত সন্ত্রাসী হিসেবে চিহ্নিত থাকার পরও অদৃশ্য রাজনৈতিক প্রভাবে তাকে আইনের আওতায় আনা সম্ভব হচ্ছে না। গাজীপুর মহানগর পুলিশের উত্তর বিভাগের এক কর্মকর্তার ভাষ্যমতে, হালিম মোল্লার ত্রাসে সাধারণ মানুষ মুখ বুজে সব সহ্য করছে, আর পুলিশও রাজনৈতিক হিসাব-নিকাশ ও প্রভাবের মুখে কিছুটা নমনীয় থাকতে বাধ্য হচ্ছে।
নিজস্ব প্রতিবেদক 





















