জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের শীর্ষ পর্যায় থেকে শুরু করে তৃণমূল পর্যায়ের কর্মকর্তাদের অধিকাংশই দুর্নীতিতে নিমজ্জিত—এমন অভিযোগ এখন হরহামেশাই শোনা যাচ্ছে লোকমুখে। মুখে সুশাসনের কথা বললেও আদতে তারা সকলেই নিজেদের আখের গোছাতেই ব্যস্ত। এর উজ্জ্বল উদাহরণ কাস্টমস ও ভ্যাট বিভাগের রাজস্ব কর্মকর্তা তুহিন চৌধুরী।
একটি আপাদমস্তক শিক্ষক পরিবারের সন্তান হওয়া সত্ত্বেও নীতি-নৈতিকতাকে বিসর্জন দিয়ে তুহিন চৌধুরী আজ নামে-বেনামে শত শত কোটি টাকার সম্পদের মালিক বনে গেছেন। একাধিক সূত্র থেকে প্রাপ্ত অভিযোগের ভিত্তিতে নেত্রকোনায় ছুটে যায় বিশেষ অনুসন্ধানী টিম। সরেজমিন পরিদর্শনকালে এফটি টিম তুহিন চৌধুরীর নামে কোটি টাকা মূল্যের ডুপ্লেক্স বাড়ি, গোয়েলা রোডে বিশ শতক জমিতে তিনটি ঘরসহ কোটি টাকা মূল্যের বাড়ি, গোয়েলা রোড থেকে দশ মাদ যাওয়ার পথে এক একর জমির ওপর একটি মাছের ঘের, বাড়ির পাশে আরেকটি ঘের, প্রায় ১৫/২০ একর জমির সন্ধান পেয়েছে, যার আনুমানিক বাজারমূল্য ২৫ থেকে ৩০ কোটি টাকা।
এছাড়া, রাজধানীর গুলশান ও এর আশপাশে একাধিক বিলাসবহুল ফ্ল্যাট রয়েছে তুহিন চৌধুরীর। সূত্রমতে, রাজধানীর গুলশানে যে ফ্ল্যাটে তিনি বসবাস করেন, তার আনুমানিক বাজারমূল্য ৯/১০ কোটি টাকা। তুহিন চৌধুরীর নামে-বেনামে কয়েক কোটি টাকার ব্যাংক ব্যালান্স, এফডিআর রয়েছে।
এখানেই শেষ নয়, নীতি-নৈতিকতার ধার না ধরে শিক্ষকতার ন্যায় মহান পেশাকে কলঙ্কিত করে তুহিন চৌধুরীর আশীর্বাদে তার পরিবারের ৫ জন সদস্যই হয়েছেন অঢেল সম্পদের মালিক। গ্রামের বাসিন্দারাও অবাক তাদের এই সম্পদ অর্জনে। প্রাথমিক আলাপচারিতায় তারা বলেন, বারোঘর গ্রামের প্রতিটি মৌজায় এই পরিবারের বিপুল পরিমাণ জমি রয়েছে। অধিকাংশ জমিই স্থানীয় দালালদের সঙ্গে যোগসাজশ করে উচ্চমূল্যে ক্রয় করা হয়েছে। একটি শিক্ষক পরিবারের সদস্যদের এত বিপুল সম্পদ আহরণের উৎস নিয়ে তারা সন্দিহান।
আনুমানিক ৩৯ হাজার টাকা বেতনে কর্মরত একজন সরকারি রাজস্ব কর্মকর্তা ১২ বছরে সর্বোচ্চ ৫০ লক্ষ টাকা আয় করতে পারেন। তুহিন চৌধুরী এই বিপুল পরিমাণ সম্পদের মালিক কোন জাদুর কাঠির সংস্পর্শে বনে গেলেন; এই প্রশ্নের উত্তর কে দেবে?
সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা পদে ১২ বছরের কর্মজীবনে দুর্নীতি-অনিয়মের মাধ্যমে আজ তিনি যে অঢেল সম্পদের মালিক হয়েছেন, তার দায় বিভিন্ন সময়ে তুহিন চৌধুরীর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা কখনোই এড়াতে পারেন না। একজন তুহিন চৌধুরীর আজকের এই অবস্থানে আসার নেপথ্যে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের প্রচ্ছন্ন সমর্থন ছিল।
বর্তমানে রংপুর ভ্যাট কমিশনারেটের অধীনে হিলি স্থল কাস্টমস স্টেশনে কর্মরত তুহিন চৌধুরীকে গত ১৬ জুলাই রংপুর ভ্যাট কমিশনারেটের কমিশনার মোহাম্মদ সফিউর রহমান স্বাক্ষরিত এক অফিস আদেশে বুড়িমারী স্থল কাস্টমস স্টেশনে বদলি করা হয়েছে।
কর্মস্থল পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে তার সম্পদও বৃদ্ধি হয়েছে লাগামহীনভাবে। যশোর, ঢাকা বন্ড কমিশনারেট, তামাবিল ও চট্টগ্রাম কাস্টমস—প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ কর্মস্থলকে ঘিরেই তাঁর বিরুদ্ধে আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ উত্থাপিত হয়েছে।
শিক্ষক পরিবার থেকে রাজস্ব কর্মকর্তা
নেত্রকোনা জেলার বারহাট্টা উপজেলার বারোঘর গ্রামে বাড়ি তুহিন চৌধুরীর। সম্প্রতি সরেজমিনে তুহিন চৌধুরীর গ্রামের বাড়ি পরিদর্শন করে একটি বিশেষ অনুসন্ধানী টিম। প্রাথমিক অনুসন্ধানে জানা গেছে, তার বাবা চন্দন চৌধুরী হাইস্কুলের প্রধান শিক্ষক ছিলেন। তিনি ২০০৪ সালে মারা যান। তুহিনের মায়ের নাম নিলিমা দেবনাথ। তিনি প্রাইমারি স্কুলের প্রধান শিক্ষক ছিলেন। তুহিন চৌধুরীরা ৩ ভাই ১ বোন। বড় ভাই তুষার চৌধুরী ও বড় বোন বাণী চৌধুরী। তারা দুজনই প্রাইমারি স্কুলের প্রধান শিক্ষক। মেজ ভাই শিশির চৌধুরী স্থানীয় সরকারি একটি কলেজের শিক্ষক। আর তুহিন কাস্টমস ও ভ্যাট বিভাগে কর্মরত।
গোটা পরিবার শিক্ষকতা পেশার সঙ্গে যুক্ত হলেও তুহিন পরিবারের সবার নামেই গ্রামে বিপুল সম্পদ করেছেন। প্রত্যেকের নামেই গ্রামে ১০-১৫ কোটি টাকার সম্পদ রয়েছে। বিভিন্ন ব্যাংক অ্যাকাউন্টে রয়েছে ডিপিএস এবং এফডিআর। গ্রামের বাসিন্দারাও অবাক তাদের এই সম্পদ অর্জনে। প্রাথমিক আলাপচারিতায় তারা বলেন, বারোঘর গ্রামের প্রতিটি মৌজায় এই পরিবারের বিপুল পরিমাণ জমি রয়েছে। অধিকাংশ জমিই স্থানীয় দালালদের সঙ্গে যোগসাজশ করে উচ্চমূল্যে ক্রয় করা হয়েছে। একটি শিক্ষক পরিবারের সদস্যদের এত বিপুল সম্পদ আহরণের উৎস নিয়ে তারা সন্দিহান বলেও মত প্রকাশ করেছেন এফটি টিমের কাছে।
২০১৪ সালে সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা হিসেবে চাকরিতে যোগ দেওয়ার পর মাত্র এক যুগের ব্যবধানে তুহিন চৌধুরী ও তার পরিবারের সদস্যদের নামে গড়ে ওঠা এই বিশাল সাম্রাজ্যের উৎস কী—এমন প্রশ্নই এখন সামনে এসেছে। এছাড়াও প্রশ্ন উঠেছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের চেয়ারম্যান আহসান হাবিবের নেতৃত্ব নিয়েও। কারণ কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সেলের (সিআইসি) মহাপরিচালক হওয়া সত্ত্বেও এমন বিতর্কিত একজন রাজস্ব কর্মকর্তার বিপুল সম্পদ আহরণের বিষয়ে তিনি কি অবগত ছিলেন না? এনবিআরের কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সেলের কাজ কি শুধু সাধারণ মানুষের বাড়তি সম্পদ নিয়েই অনুসন্ধান করা? তাদের সম্পদের অনুসন্ধান করবে কে? এমন প্রশ্ন এখন পাড়া-মহল্লার চায়ের দোকানের সামনে কান পাতলেই শোনা যাচ্ছে।
সাম্প্রতিক অনুসন্ধানে প্রাপ্ত তথ্যমতে, তুহিন চৌধুরীর বিরুদ্ধে বিভিন্ন কর্মস্থলে ঘুষ, মাসোহারা, ক্ষমতার অপব্যবহার এবং একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেটের মাধ্যমে অর্থ আদায়ের অভিযোগ পাওয়া গিয়েছে। এ নিয়ে বিস্তারিত আজকের প্রতিবেদনে তুলে ধরা হলো।
যশোরেই হাতেখড়ি মাসোহারার
২০১৪ সালে চাকরিতে যোগ দেওয়ার পর তুহিন চৌধুরীর প্রথম কর্মস্থল ছিল যশোর ভ্যাট কমিশনারেট। সেখানে প্রায় দুই বছর দায়িত্ব পালনকালে বিভিন্ন শিল্প ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান থেকে নিয়মিত মাসোহারা আদায়ের অভিযোগ উঠেছে।
স্থানীয় ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, বিভিন্ন প্রশাসনিক ও ভ্যাট-সংক্রান্ত অজুহাতে যশোরের নামকরা সব ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের ওপর চাপ সৃষ্টি করে এই অর্থ আদায় করা হতো।
বন্ড কমিশনারেটে ‘প্রভাব’ ও সম্পদ বৃদ্ধি
২০১৬ সালে তাঁর বদলি হয় তৎকালীন ঢাকা বন্ড কমিশনারেটে, যা পরবর্তীতে দক্ষিণ বন্ড কমিশনারেট নামে পরিচিত হয়। একাধিক সূত্র থেকে পাওয়া তথ্যে জানা গেছে, প্রায় ৪০ লাখ টাকা খরচ করে তিনি বন্ডে পদায়ন নেন। আর এই বন্ড থেকেই তিনি হয়ে ওঠেন কোটি কোটি টাকার মালিক।
বন্ড কমিশনারেটে দায়িত্ব পালনকালে বেপরোয়া হয়ে ওঠেন তুহিন চৌধুরী। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের ফাইল আটকে রাখা, ছাড়পত্র দিতে ঘুষ দাবি এবং ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে অর্থ আদায়ের অভিযোগ উঠেছিল তাঁর বিরুদ্ধে। এক পর্যায়ে কমিশনার তাঁকে ৬ মাসের জন্য সাময়িক বরখাস্তও করেন। সে সময় টাকা আর ক্ষমতার গরম দেখিয়ে তিনি কমিশনারকে দেখে নেওয়ার হুমকি দেন এবং বিষয়টি তখনকার কমিশনার জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের চেয়ারম্যানকে পর্যন্ত অবহিত করেন। কিন্তু এই বিষয়ে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের উদাসীনতা আর কালক্ষেপণ তুহিন চৌধুরীকে আরও আগ্রাসী করে তোলে। সাসপেন্ড থেকে ফিরে এসে তিনি বীরদর্পে ফাইল ধরে ধরে দুর্নীতি করেছেন।
তামাবিলে বেপরোয়া ঘুষ বাণিজ্য
পরবর্তী সময়ে সিলেটের তামাবিল শুল্ক স্টেশনে দায়িত্ব পালন করেন তুহিন। তামাবিলে থাকাকালীন তিনি এমন কোনো দুর্নীতি নেই, যা তিনি করেননি। ট্রাক ধরে ধরে ৫০ হাজার করে টাকা নিতেন। প্রতিদিন এই তামাবিল থেকে তিনি ১০ লাখ টাকা তখন আয় করতেন। এ সময়ে তিনি যুক্ত হয়ে যান মাদকের সঙ্গে। সিলেটের তামাবিলে পোস্টিং থাকার সময় বিজিবির হাতে মদ নিয়ে তিনি আটক হন। তখন এই কর্মকর্তাকে নিয়ে বিজিবি সংবাদ সম্মেলন করে, এমনকি অধিকাংশ জাতীয় গণমাধ্যমে তাঁর ছবিসহ প্রতিবেদনও প্রকাশিত হয়। এরপর জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে ম্যানেজ করে তিনি পার পেয়ে যান।
তুহিন চৌধুরী সিলেটে থাকাকালীন মদের ব্যবসাও করতেন। সিলেটের একাধিক সূত্র এফটি টিমকে বিষয়টি নিশ্চিত করেছে। অন্যদিকে সিলেটে ঘুষ ও দুর্নীতির মাধ্যমে আয় করা ৪০ লাখ টাকা তাঁর গ্রামের এক মুদি দোকানের ব্যবসায়ীর অ্যাকাউন্টে জমা করেছিলেন। পরবর্তীতে এটি জানাজানি হলে সেই মুদি দোকানদারকে তিনি ঘুষ দিয়ে মুখ বন্ধ করেন।
চট্টগ্রাম কাস্টমসে ‘সিন্ডিকেট’!
চট্টগ্রাম কাস্টমস হাউসে দায়িত্ব পালনকালে তুহিন চৌধুরীর বিরুদ্ধে একটি প্রভাবশালী সিন্ডিকেট পরিচালনার মাধ্যমে সাধারণ ব্যবসায়ীদের হয়রানির অভিযোগ ওঠে। এছাড়াও চট্টগ্রাম কাস্টমসে দায়িত্ব পালনকালে একটি বড় রাজস্ব ফাঁকির ঘটনায় তুহিন চৌধুরীর নাম সংবাদ প্রতিবেদনে উঠে আসে।
সূত্রমতে, ২০২৪ সালে একটি আমদানি চালানের শুল্কায়ন প্রক্রিয়ায় রাজস্ব কর্মকর্তা হিসেবে তুহিন চৌধুরী দায়িত্ব পালন করেছিলেন। পরে শুল্ক গোয়েন্দার পরীক্ষায় উক্ত চালানে ঘোষণাব২য় পর্বহির্ভূত পণ্য পাওয়া যায় এবং অতিরিক্ত শুল্ককর ও জরিমানাসহ কয়েক কোটি টাকা আদায়ের সুযোগ তৈরি হয়। তবে সেই ঘটনায় তুহিন চৌধুরীর বিরুদ্ধে ব্যক্তিগতভাবে অবৈধ অর্থ গ্রহণের অভিযোগ উঠলেও ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ এবারও কোনো বিভাগীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করেনি।
চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসে কাজ করা একাধিক সিএন্ডএফ ব্যবসায়ীর সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ২ বছর চট্টগ্রাম কাস্টমসে কর্মরত থাকাকালীন তুহিন চৌধুরী কমপক্ষে ৪০ কোটি টাকা অবৈধভাবে আয় করেন। তিনি পুরো চট্টগ্রাম কাস্টমস হাউসে একটি সিন্ডিকেট পরিচালনা করতেন। সেই সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ করত—কোন পণ্য কখন খালাস হবে, কোন ফাইল আগে নিষ্পত্তি হবে এবং কোন আমদানিকারকের ওপর চাপ সৃষ্টি করা হবে। এমনকি তুহিন চৌধুরী রাজস্ব বোর্ডের উচ্চ মহলে মোটা অঙ্কের টাকা ঘুষ দিয়ে নিজের পছন্দসই কর্মকর্তাদের পোস্টিং করাতেন এবং নিজেও কমিশনারের নাম ভাঙিয়ে পোর্টে পণ্য দেখার নামে পণ্য ধরে ধরে ঘুষ নিতেন।
দুই মাসে এস এ পরিবহনে কোটি টাকা প্রেরণ
চট্টগ্রাম কাস্টমসে কর্মরত থাকা অবস্থায় মাত্র দুই মাসে ৫৪ লক্ষাধিক টাকা ও মূল্যবান ইলেকট্রনিক সামগ্রীসহ কোটি টাকা এস এ পরিবহনে নিজ বাড়ি নেত্রকোনায় পাঠিয়েছেন। তুহিন চৌধুরীর এই অকল্পনীয় লেনদেন জনমনে চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করেছে। কাস্টমস-সংশ্লিষ্ট অনেকেই এই বিষয়কে অকল্পনীয় কাণ্ড হিসেবে অবহিত করেছেন। হতবাক হয়েছেন অনেকেই। নাম প্রকাশ না করার শর্তে কাস্টমসে কর্মরত অনেকেই বলেন, গত আওয়ামী ফ্যাসিস্ট সরকারের আমলে অর্থাৎ ৫ আগস্টের আগে তুহিন টাকার পাহাড় করেছেন শুনেছি। তবে এত টাকা কামিয়েছেন, তা ভাবিনি। ২ মাসে যদি কোটি টাকা বাড়িতে পাঠান, তাহলে দুই বছরে কত টাকা কামিয়েছেন, তা ভাববার বিষয়।
অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, ২০২৪ সালের ৩১ মে থেকে ৩০ জুলাই পর্যন্ত মাত্র দুই মাসের মধ্যে এস এ পরিবহনের মাধ্যমে ১৩টি চালানে মোট ৫৪ লক্ষ ৫০ হাজার টাকা তাঁর (তুহিনের) গ্রামের বাড়ি নেত্রকোনায় জনৈক রতন নামের এক ব্যক্তির কাছে পাঠানো হয়েছে। অপর এক চালানে শিশির চৌধুরীর নামে ৯ পদের প্রায় ৭ লক্ষ টাকা মূল্যের ইলেকট্রনিক মালামাল পাঠানো হয়েছে। জানা গেছে, জনৈক শিশির চৌধুরী তুহিন চৌধুরীর ভাই। শিশির চৌধুরী একটি বেসরকারি কলেজের প্রভাষক বলে সূত্র জানিয়েছে।
উল্লেখিত ১৩টি চালানের মধ্যে ১২টি চালানের প্রেরক একজন নির্দিষ্ট ব্যক্তি, যিনি তুহিন চৌধুরীর ঘনিষ্ঠজন বলে পরিচিত। অপর একটি চালান খোদ তুহিন চৌধুরীর নামে। এই চালানের ৫ লক্ষ টাকা পাঠানো হয় ঢাকায় আর আমিন নামক জনৈক ব্যক্তির কাছে। বাকি টাকা চট্টগ্রাম থেকে নেত্রকোনায় পাঠানো হয়েছে, যেখানেই তুহিন চৌধুরীর গ্রামের বাড়ি। নেত্রকোনার যে রতনের কাছে টাকা পাঠানো হয়েছে, চালানে উল্লেখিত মোবাইল নম্বরে ফোন করে জানতে চাইলে তিনি (রতন) বলেন, এইসব টাকা তুহিন স্যার পাঠিয়েছেন। আমি এস এ পরিবহন থেকে গ্রহণ করে যাকে দিতে বলেছেন, তাকে দিয়েছি। এক প্রশ্নের জবাবে রতন বলেন, তুহিন স্যার অনেক জায়গা-জমি ক্রয় ও বন্ধক নিয়েছেন।
নৈতিক স্খলন
রংপুর ভ্যাট কমিশনারেটের বিতর্কিত রাজস্ব কর্মকর্তা তুহিন চৌধুরীর ব্যক্তিগত জীবনও নানা স্ক্যান্ডালের সঙ্গে জড়িয়ে আছে। অভিযোগ রয়েছে, তুহিন চৌধুরী ২০১২ সালে প্রথম বিয়ে করেন। তবে পরবর্তীতে পুলিশের সাব-ইন্সপেক্টর (এসআই) পদে চাকরির আবেদনের উদ্দেশ্যে তিনি তাঁর বিয়ের তথ্য সম্পূর্ণ গোপন রাখেন।
পরবর্তীতে, প্রথম স্ত্রীর সঙ্গে সম্পর্ক বজায় থাকা অবস্থাতেই তিনি অন্য এক বিবাহিত নারীর সঙ্গে পরকীয়ায় জড়িয়ে পড়েন। এক পর্যায়ে প্রথম স্ত্রীকে প্রতারিত করে তিনি ওই নারীকে দ্বিতীয় বিয়ে করেন এবং তাঁকে নিয়েই বর্তমানে রাজধানীর গুলশানে ১০ কোটি টাকা দিয়ে কেনা আলিশান এক ফ্ল্যাটে বসবাস করছেন।
এসব বিষয়ে জানতে কাস্টমস ও ভ্যাট কর্মকর্তা তুহিনের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি এই প্রতিবেদককে বলেন, কাস্টমস ও ভ্যাটে কর্মরত অনেকেরই অবৈধ সম্পদ রয়েছে। কারও কম, কারও বেশি। এত সম্পদ কীভাবে করলেন—এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, সেটা কি আপনাকে বলতে হবে? এসব বিষয়ে দেখার জন্য দুদক আছে, সিআইসি আছে, আরও সংস্থা আছে। তারা দেখবে, আপনি দেখার কে? এই কথা বলে উত্তেজিত হয়ে তিনি ফোনটি কেটে দেন।
একটি শিক্ষক পরিবার থেকে উঠে আসা তুহিন চৌধুরীর বিরুদ্ধে নিজের ও পরিবারের সকল সদস্যদের নামে থাকা বিপুল জমি, বাড়ি, এফডিআর, ডিপিএসসহ বিভিন্ন সম্পদই মূলত প্রশ্ন তুলেছে—একটি শিক্ষক পরিবার এবং একজন সরকারি চাকরিজীবী সদস্যের বৈধ আয় দিয়ে নিজের ও পরিবারের নামে থাকা সম্পদের কতটুকু অর্জন সম্ভব?
নিজস্ব প্রতিবেদক 























