একবার বহিষ্কার ও পরবর্তীতে আকুতি-মিনতি জানিয়ে দলীয় পদ ফিরে পাওয়ার মাত্র তিন মাসের মাথায় পুনরায় অপরাধ ও সহিংস কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ার সুস্পষ্ট অভিযোগে নেত্রকোনা জেলার বারহাট্টা উপজেলা যুবদলের আহ্বায়ক মোজাম্মেল হক সোহেলকে পুনরায় বহিষ্কার করেছে কেন্দ্রীয় যুবদল। তাঁর প্রাথমিক সদস্যপদ বাতিলসহ সংগঠন থেকে চিরতরে বহিষ্কার করা হয়েছে। মঙ্গলবার (২০ অক্টোবর) রাতে জাতীয়তাবাদী যুবদলের কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক (দপ্তরের দায়িত্বে) মিনহাজুল ইসলাম ভূঁইয়ার সই করা এক জরুরি দাপ্তরিক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ শাস্তিমূলক সিদ্ধান্তের কথা জানানো হয়।
যুবদলের কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সভাপতি আবদুল মোনায়েম মুন্না ও সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ নূরুল ইসলাম নয়ন (এমপি)-এর সরাসরি নির্দেশে এই বহিষ্কারাদেশ তাৎক্ষণিকভাবে কার্যকর করা হয়েছে। কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির অপর যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক এজমল হোসেন পাইলট বিষয়টি নিশ্চিত করে জানান, শৃঙ্খলা ভঙ্গ ও আপত্তিকর সহিংস কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ততার প্রমাণ মেলায় এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। বিজ্ঞপ্তিতে যুবদলের সর্বস্তরের নেতা-কর্মীদের বহিষ্কৃত মোজাম্মেল হক সোহেলের সঙ্গে কোনো ধরনের সাংগঠনিক যোগাযোগ না রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে তাঁর ব্যক্তিগত বা সামাজিক অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের কোনো দায়দায়িত্ব দল নেবে না উল্লেখ করে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে তাঁর বিরুদ্ধে স্বাধীনভাবে প্রয়োজনীয় আইনি ব্যবস্থা গ্রহণের কঠোর নির্দেশ ও আহ্বান জানানো হয়েছে।
চাঞ্চল্যকর এই ঘটনার সূত্রে জানা গেছে, গত সোমবার রাতে নেত্রকোনা-২ (সদর-বারহাট্টা) আসনের সংসদ সদস্য ও জেলা বিএনপির সভাপতি ডা. আনোয়ারুল হক বারহাট্টা উপজেলা সদরের বিভিন্ন পূজামণ্ডপ পরিদর্শনে বের হন। এ সময় বিক্রমশ্রী গ্রামের অর্চনা রানী দাস নামে এক অসহায় বিধবা নারী এমপি মহোদয়ের পায়ে পড়ে হাউমাউ করে কেঁদে ওঠেন এবং উপজেলা যুবদলের আহ্বায়ক মোজাম্মেল হক সোহেলের বিরুদ্ধে শারীরিক নির্যাতন ও বেধড়ক মারধরের অভিযোগ তোলেন। স্থানীয় এক রাজনৈতিক নেতার সামনে বিধবা নারীর পা ধরে কান্নাকাটি ও নির্যাতনের অভিযোগ জানানোর দৃশ্যটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিমিষেই ছড়িয়ে পড়ে (ভাইরাল হয়)। এর পরপরই বিভিন্ন গণমাধ্যমে খবরটি গুরুত্বের সঙ্গে প্রকাশিত হলে কেন্দ্র থেকে দ্রুত হস্তক্ষেপ করা হয় এবং অভিযুক্ত যুবদল নেতাকে বহিষ্কারের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
ঘটনার অতীতে চোখ বোলালে জানা যায়, উপজেলার বিক্রমশ্রী গ্রামের তারা মিয়ার ছেলে মোজাম্মেল হক সোহেল একজন স্বভাবজাত বিতর্কিত ব্যক্তিত্ব। এর আগে চলতি ২০২৬ সালের ৪ জুলাই নিজের বৃদ্ধ বাবা-মাকে নিষ্ঠুরভাবে মারধরের গুরুতর অভিযোগে তাঁকে প্রথম দফায় দল থেকে বহিষ্কার করা হয়েছিল। পরবর্তীতে কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে নানা তদবিরের পাশাপাশি ক্যানসার আক্রান্ত অসুস্থ বাবাকে সঙ্গে নিয়ে গিয়ে সুপারিশ করিয়ে গত ৩০ জুলাই তাঁর বহিষ্কারাদেশ প্রত্যাহার করিয়ে আনা হয়েছিল। তবে বহিষ্কারাদেশ প্রত্যাহারের তিন মাস পার না হতেই আবারও প্রতিবেশীর ওপর সহিংসতার অভিযোগ উঠেছে তাঁর বিরুদ্ধে। তবে আত্মপক্ষ সমর্থন করে মোজাম্মেল হক সোহেল জানান, “আমি চরম রাজনৈতিক ষড়যন্ত্রের শিকার। পাওনা টাকা কেন্দ্র করে প্রতিবেশীর সঙ্গে বাকবিতণ্ডা হয়েছিল, কিন্তু প্রতিপক্ষ চক্র বিধবা নারীকে প্ররোচিত করে এমপির কাছে মিথ্যা তথ্য উপস্থাপন করিয়ে আমাকে ফাঁসিয়েছে।”
বাংলাদেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট ও সুশাসন ব্যবস্থার বিচারে তৃণমূল পর্যায়ে দলীয় ক্ষমতার দাপট দেখিয়ে সাধারণ ও সংখ্যালঘু পরিবারের সদস্যদের ওপর জুলুম চালানোর এই কালচার মারাত্মক হুমকি হিসেবে দেখা দিয়েছে। বিশেষ করে স্থানীয় নেতাকর্মীদের নৈতিক স্খলন, ক্ষমতার দাপট এবং অপরাধ করে বারবার পার পাওয়ার প্রবণতা রাজনৈতিক সংস্কৃতিকে কলুষিত করে। রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও সুশীল সমাজের মতে, ক্ষমার সুযোগ পাওয়ার পরও পুনরায় সহিংসতায় লিপ্ত হওয়া চরম রাজনৈতিক অপরাধ। তাই কেবল দল থেকে বহিষ্কারেই সীমাবদ্ধ না থেকে ভুক্তভোগী বিধবা নারীর নিরাপত্তায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর মাধ্যমে সঠিক তদন্ত সাপেক্ষে দ্রুত আইনি শাস্তি নিশ্চিত করা উচিত।
বারহাট্টায় বিধবা নারীর ওপর নির্যাতন এবং এর পরিপ্রেক্ষিতে যুবদল নেতার দ্বিতীয়বারের মতো দলীয় বহিষ্কারের ঘটনাটি পুরো নেত্রকোনা জেলার রাজনৈতিক অঙ্গনে গভীর সাড়া ফেলেছে। কেন্দ্রীয় যুবদলের এই জিরো টলারেন্স নীতিকে সাধুবাদ জানিয়েছে স্থানীয় সর্বস্তরের জনগণ। পুলিশ প্রশাসন এবং বিজ্ঞ আদালতের মাধ্যমে অভিযুক্তের বিরুদ্ধে আইনি প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত হবে এবং ভুক্তভোগী পরিবার ন্যায়বিচার পাবে—এমনটাই প্রত্যাশা স্থানীয় সচেতন মানুষের।
নিজস্ব প্রতিবেদক 





















