বিমা খাতের শৃঙ্খলার স্থানে যখন অনিয়মই নিয়ম হয়ে দাঁড়ায়, তখন আস্থার সংকট চরম আকার ধারণ করে। প্রগ্রেসিভ লাইফ ইন্স্যুরেন্স লিমিটেডের মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) মুহাম্মদ সাইদুল আমিনের নিয়োগকে কেন্দ্র করে ঠিক এমনই চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে। ভুয়া ও প্রশ্নবিদ্ধ শিক্ষাসনদ ব্যবহার করে এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থার একশ্রেণির প্রভাবশালী কর্মকর্তার আশ্রয়ে তিনি বহাল তবিয়তে পদ আঁকড়ে আছেন। শুধু তা-ই নয়, এই পদ হাসিল করতে বিমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের (আইডিআরএ) সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে মোটা অঙ্কের অনৈতিক আর্থিক লেনদেনের গুরুতর অভিযোগও রয়েছে।
অনুসন্ধানে দেখা যায়, সাইদুল আমিন আইডিআরএ-তে যে শিক্ষাসনদ জমা দিয়েছেন, তার একটি বেসরকারি “দি ইউনিভার্সিটি অব কুমিল্লা”র। তাঁর জমা দেওয়া ব্যাচেলর অব বিজনেস অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (বিবিএ) সনদ অনুযায়ী, তিনি মার্কেটিং বিভাগ থেকে ২০০১ সালে ৩.৪৮ সিজিপিএ নিয়ে উত্তীর্ণ হন এবং সনদটি ইস্যু করা হয় ২০০২ সালের ২৩ জানুয়ারি। সনদে তাঁর রেজিস্ট্রেশন নম্বর ৯৮১৯ ও সিরিয়াল নম্বর ৯৮ উল্লেখ থাকলেও রোল নম্বরের (৯৮১৯১৯) জায়গাটি ছিল অস্পষ্ট।
পরবর্তীকালে একই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তিনি ২০০২ সালে মার্কেটিং বিভাগেই ৩.৬৩ সিজিপিএ পেয়ে মাস্টার্স অব বিজনেস অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (এমবিএ) সম্পন্ন করেন বলে দাবি করেন, যার সনদ ইস্যু করা হয় ২০০৪ সালের ২৩ জানুয়ারি। দুটি সনদেরই ইস্যুর তারিখ ও সময়ক্রম নিয়ে চরম বিভ্রান্তি ও প্রশ্ন রয়েছে।
বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) তথ্য বিশ্লেষণ করে জানা যায়, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আইন লঙ্ঘন, প্রশাসনিক অব্যবস্থাপনা, আর্থিক অস্বচ্ছতা ও মানহীন শিক্ষার কারণে ২০০৬ সালেই ‘দি ইউনিভার্সিটি অব কুমিল্লা’র শিক্ষা কার্যক্রম বন্ধ ঘোষণা করে সরকার। পরবর্তীকালে বন্ধ আদেশের বিরুদ্ধে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ হাইকোর্টে রিট মামলা (নং-১৬৭১/২০১৪) করলেও নানা জটিলতার কারণে ইউজিসির চূড়ান্ত অনুমতি পায়নি প্রতিষ্ঠানটি। ফলে এর কার্যক্রম এখনো স্থগিত রয়েছে।
এ বিষয়ে ইউজিসির বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় শাখার পরিচালক মো. ওমর ফারুক স্পষ্টভাবে জানান, “দি ইউনিভার্সিটি অব কুমিল্লা”র কোনো বৈধ অনুমোদনই নেই। ফলে এই প্রতিষ্ঠান থেকে প্রাপ্ত সনদপত্র সম্পূর্ণ অবৈধ ও ভুয়া। আইনত এমন সনদ ব্যবহার করে চাকরি করার কোনো সুযোগ নেই।
জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে একই সেশনে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর!
সাইদুল আমিনের শিক্ষাগত যোগ্যতার জালিয়াতি শুধু একটি প্রতিষ্ঠানেই সীমাবদ্ধ নয়। এর আগে মার্কেন্টাইল ইসলামী লাইফ ইন্স্যুরেন্সে যোগদানের আগে দাখিল করা জীবনবৃত্তান্তে তিনি জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে তৎকালীন সরকারি জগন্নাথ কলেজ থেকে রসায়ন বিভাগে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর শেষ করেছেন বলে উল্লেখ করেন।
নথি বিশ্লেষণে দেখা যায়, ১৯৯৪-৯৫ সেশনে তিনি রসায়ন বিভাগ থেকে দ্বিতীয় শ্রেণিতে স্নাতক শেষ করেন, যার পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয় ১৯৯৭ সালে এবং সনদ ইস্যু হয় ২০০০ সালের ৪ জানুয়ারি। তবে বিস্ময়কর তথ্য হলো, একই সেশনে (১৯৯৪-৯৫) তিনি একই বিষয়ে স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেছেন বলে সনদে দেখিয়েছেন! ওই সনদে পরীক্ষা দেওয়ার বছর ১৯৯৮ এবং পাসের সন ২০০১ দেখালেও নথিটির একাধিক স্থানে ঘষামাজার স্পষ্ট চিহ্ন রয়েছে।
শিক্ষাবিদ ও বিমা খাতের বিশেষজ্ঞরা বলছেন, একই সেশনে একজন শিক্ষার্থীর অনার্স ও মাস্টার্স উভয় কোর্সে ভর্তি হওয়া বা ডিগ্রি লাভ করা শিক্ষানীতির সম্পূর্ণ পরিপন্থী ও অসম্ভব। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যাংকিং অ্যান্ড ইন্স্যুরেন্স বিভাগের চেয়ারম্যান ড. শহিদুল ইসলাম জাহীদ এবং জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের দায়িত্বশীল কর্মকর্তারাও এটিকে স্পষ্ট অনিয়ম ও সনদ জালিয়াতি হিসেবে চিহ্নিত করেছেন।
নিয়ন্ত্রক সংস্থার নীরবতা ও আর্থিক লেনদেনের অভিযোগ
জালিয়াতির স্পষ্ট প্রমাণ থাকা সত্ত্বেও ২০২৩ সালের ২৩ নভেম্বর প্রগ্রেসিভ লাইফ ইন্স্যুরেন্সে যোগ দেন সাইদুল আমিন। পরবর্তীতে প্রগ্রেসিভ লাইফ কর্তৃপক্ষের আবেদনের প্রেক্ষিতে ২০২৪ সালের মার্চে তাঁর সিইও পদের অনুমোদন দেয় আইডিআরএ।
অভিযোগ রয়েছে, সিইও পদের অনুমোদন নিশ্চিত করতে আইডিআরএ-র কয়েকজন কর্মকর্তাকে প্রায় ৪০ লাখ টাকা ঘুষ দেওয়া হয়েছিল। তৎকালীন অনিয়মের বিষয়ে অর্থ মন্ত্রণালয় ও প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে লিখিত অভিযোগ পাঠানো হলেও আইডিআরএ-র এক প্রভাবশালী কর্মকর্তার ছায়াতলে পার পেয়ে যান সাইদুল আমিন।
এর আগে ফারইস্ট ইসলামী লাইফ ও মার্কেন্টাইল লাইফ ইন্স্যুরেন্সে কর্মরত থাকাকালেও তাঁর বিরুদ্ধে শিক্ষাসনদ জালিয়াতি ও প্রশাসনিক ব্যর্থতার চরম অভিযোগ ওঠে। ২০২৩ সালের ১১ জুন আইডিআরএ-র তৎকালীন পরিচালক (উপসচিব) মোহা. আব্দুল মজিদ স্বাক্ষরিত চিঠির মাধ্যমে ফারইস্ট ইসলামী লাইফ থেকে সাইদুল আমিনের মূল সনদ ও কাগজপত্র তলব করা হলেও পরবর্তীতে রহস্যজনক কারণে সেই তদন্ত ফাইলচাপা পড়ে যায়।
ধুঁকছে প্রগ্রেসিভ লাইফ, চরম সংকটে গ্রাহক
পূর্ববর্তী কর্মস্থলগুলোতে অনিয়ম ও লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে ব্যর্থতার ধারাবাহিকতা সাইদুল আমিন বজায় রেখেছেন প্রগ্রেসিভ লাইফেও। ভুয়া সনদে নিয়োগ পাওয়া সিইওর অধীনে চতুর্থ প্রজন্মের এই বিমা প্রতিষ্ঠানটি ব্যবসায়িকভাবে ঘুরে দাঁড়াতে তো পারেইনি, বরং চরম অব্যবস্থাপনা ও অনিয়মের কবলে পড়েছে।
বর্তমানে অনিয়ম ও চরম আর্থিক বিশৃঙ্খলার কারণে প্রগ্রেসিভ লাইফ সাধারণ গ্রাহকদের কোটি কোটি টাকার বিমা দাবি পরিশোধ করতে ব্যর্থ হচ্ছে। ভুক্তভোগী গ্রাহকরা দিনের পর দিন ঘুরেও নিজেদের জমানো টাকা ফেরত পাচ্ছেন না। বিমা খাতের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে এমন দুর্নীতিগ্রস্ত কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে দ্রুত কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন এ খাতের সংশ্লিষ্ট সচেতন মহল।
আইডিআরএ-র জনসংযোগ কর্মকর্তা সাদিক আল আরমান জানান, এ বিষয়ে সুনির্দিষ্ট কোনো প্রাতিষ্ঠানিক অভিযোগ পাওয়া গেলে তদন্ত সাপেক্ষে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
নিজস্ব প্রতিবেদক 























