ঢাকা ০২:৫৩ অপরাহ্ন, বুধবার, ২১ অক্টোবর ২০২৬, ৬ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম ::

রায়পুরে প্রবাসী দম্পতিকে জিম্মি করে মারধর ও অর্থ-স্বর্ণালংকার লুটের অভিযোগে কৃষকদল নেতা রিয়াদ হাসান আটক

লক্ষ্মীপুরের রায়পুরে প্রবাস ফেরত এক ব্যক্তি ও তাঁর স্ত্রীকে জিম্মি করে মারধর, শ্লীলতাহানি, স্বর্ণালংকার ও নগদ অর্থ লুটপাট এবং ব্ল্যাকমেইলিংয়ের উদ্দেশ্যে আপত্তিকর ভিডিও ধারণের সুনির্দিষ্ট অভিযোগে রিয়াদ হাসান নামে এক স্থানীয় রাজনৈতিক নেতাকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। মঙ্গলবার (২০ অক্টোবর) বিকেলে রায়পুর পৌর শহরের ব্যস্ততম বাজার এলাকা থেকে তাঁকে আটক করা হয়। রায়পুর থানা পুলিশ নিশ্চিত করেছে যে, গত ১৬ অক্টোবর সংঘটিত এই চাঞ্চল্যকর ঘটনায় দায়েরকৃত মামলার নিবিড় তদন্তে এবং ডিজিটাল সাক্ষ্যপ্রমাণে ওই নেতার সরাসরি সম্পৃক্ততার তথ্য মিলেছে। আটক রিয়াদ হাসান রায়পুর পৌর কৃষকদলের সভাপতি পদপ্রার্থী এবং রায়পুর সরকারি কলেজ ছাত্রদলের সাবেক যুগ্ম আহ্বায়কের দায়িত্ব পালন করেছেন।

থানা পুলিশ ও স্থানীয় প্রত্যক্ষদর্শী সূত্রে জানা যায়, গত ১৬ অক্টোবর (শুক্রবার) দুপুরে রায়পুর পৌরসভার ৭ নম্বর ওয়ার্ডের দেনায়েতপুর এলাকার ফারুক আহমেদের একটি বহুতল ভবনের নিচতলায় এই জিম্মি ও লুটের ঘটনা ঘটে। ঘটনা তদন্তে জানা গেছে, উক্ত ভবনের নিচতলার একটি ফ্ল্যাটে ভাড়া থাকেন প্রবাস ফেরত গোলাম কিবরিয়া সবুজের স্ত্রী মিলি আক্তারের বান্ধবী সাথী আক্তার। ঘটনার দিন সাথী আক্তারের মেয়ের জন্মদিনের পারিবারিক অনুষ্ঠানে আমন্ত্রিত হয়ে মিলি আক্তার ওই বাসায় যান। অনুষ্ঠান চলাকালে অভিযুক্ত সংঘবদ্ধ ব্ল্যাকমেইলার চক্রটি সুপরিকল্পিতভাবে ঘরের ভেতরে অতর্কিতে প্রবেশ করে। তারা ঘরের মালামাল তছনছ করে এবং সাথী আক্তারের ব্যবহৃত প্রায় এক ভরি দুই আনা ওজনের স্বর্ণালংকার ছিনিয়ে নেয়।

এজাহারের তথ্য অনুযায়ী, ব্ল্যাকমেইলারদের এমন নজিরবিহীন কর্মকাণ্ডে মিলি আক্তার বাধা দিলে তাঁকে বেধড়ক মারধর করে রক্তাক্ত জখম করা হয় এবং শ্লীলতাহানির চেষ্টা চালানো হয়। পরবর্তীতে চক্রটি মিলি আক্তারের মাকে ফোন করে তাঁর মেয়েকে অনৈতিক অবস্থায় এক যুবকের সঙ্গে আটকে রাখা হয়েছে বলে ভয়ভীতি দেখায় এবং মুক্তিপণ দাবি করে। খবর পেয়ে মিলির স্বামী প্রবাসী গোলাম কিবরিয়া সবুজ ঘটনাস্থলে ছুটে গেলে আসামিরা তাঁকেও মারধর করে জিম্মি করে ফেলে। এ সময় সবুজের পকেটে থাকা মানিব্যাগ থেকে নগদ ২৫ হাজার টাকা ও বিভিন্ন ব্যাংকের ক্রেডিট কার্ড ছিনিয়ে নেওয়া হয়। একপর্যায়ে বৈধ স্বামী-স্ত্রী হওয়া সত্ত্বেও তাঁদের মধ্যে অবৈধ সম্পর্ক রয়েছে—এমন ভিত্তিহীন অভিযোগ তুলে জোরপূর্বক একটি কক্ষে আটকে রেখে ব্ল্যাকমেইল করার উদ্দেশ্যে মোবাইলে ভিডিও ধারণ করে চক্রটি। দম্পতি তাঁদের বিয়ের কাবিননামা ও ছবি দেখালেও তা উপেক্ষা করে কোনো আইনি পদক্ষেপ না নেওয়ার জন্য প্রাণনাশের হুমকি দেওয়া হয়।

ঘটনার পরদিন (১৭ অক্টোবর) ভুক্তভোগী প্রবাসী গোলাম কিবরিয়া সবুজ বাদী হয়ে রায়পুর থানায় পাঁচজনের নাম উল্লেখসহ অজ্ঞাতনামা আরও ছয়জনকে আসামি করে একটি লিখিত এজাহার দায়ের করেন। মামলায় নাম উল্লেখ করা প্রধান আসামিরা হলেন—দেনায়েতপুর এলাকার মিজানুর রহমান সর্দার, পশ্চিম কেরোয়া এলাকার আবদুল্লাহ আল মামুন, দেনায়েতপুরের ইউছুফ আলী, কেরোয়ার মাছুম বিল্লাহ এবং মো. রহিম। মামলার দায়িত্বপ্রাপ্ত তদন্তকারী কর্মকর্তা ও রায়পুর থানার উপপরিদর্শক (এসআই) নুরুল ইসলাম জানান, “ঘটনার পর থেকে ছায়া তদন্তে স্থানীয় রিয়াদ হাসানের জড়িত থাকার প্রাথমিক সত্যতা মেলে। এরই ভিত্তিতে অভিযান চালিয়ে তাঁকে আটক করা হয়েছে। আটককৃত আসামিকে প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদ শেষে বুধবার আদালতে সোপর্দ করা হবে এবং অন্যান্য আসামিদের গ্রেপ্তারে অভিযান অব্যাহত রয়েছে।”

আইন প্রয়োগকারী সংস্থা ও স্থানীয় অপরাধ বিশ্লেষকদের মতে, দেশের বিভিন্ন স্থানে রাজনৈতিক পরিচয়কে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে একশ্রেণির অপরাধী চক্র নিরীহ প্রবাসী ও সাধারণ নাগরিকদের জিম্মি করে অর্থ আদায় এবং সামাজিক হেনস্তার জন্য ব্ল্যাকমেইলিং চক্র গড়ে তুলেছে। বিশেষ করে বহুতল ভবনে একা অবস্থানরত নারী বা প্রবাসীদের টার্গেট করে অনৈতিক সম্পর্কের কাল্পনিক অভিযোগ তুলে স্বর্ণালংকার লুট ও ভিডিও ধারণের এই অপসংস্কৃতি অত্যন্ত বিপজ্জনক রূপ ধারণ করেছে। পুলিশ প্রশাসন জানিয়েছে, রাজনৈতিক পরিচয় কিংবা পদমর্যাদা যা-ই থাক না কেন, প্রবাসীদের জিম্মি করে অর্থ আদায় ও নারীদের শ্লীলতাহানির সঙ্গে জড়িতদের কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না।

লক্ষ্মীপুরের রায়পুরে ঘটে যাওয়া এই নজিরবিহীন জিম্মি ও লুটের ঘটনায় চরম আতঙ্কিত হয়ে পড়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। ঘটনার পর আটক রাজনৈতিক নেতার সহযোগীদের দ্রুত গ্রেপ্তার, লুণ্ঠনকৃত স্বর্ণালংকার উদ্ধার এবং ভুক্তভোগী প্রবাসী দম্পতির নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছে রায়পুরের সুশীল সমাজ ও সাধারণ জনগণ। আদালত ও পুলিশের কঠোর আইনি ব্যবস্থার মাধ্যমে এই ব্ল্যাকমেইলিং সিন্ডিকেটের নির্মূল চান স্থানীয় সর্বস্তরের মানুষ।

Tag :

আপনার মতামত লিখুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল ও অন্যান্য তথ্য সঞ্চয় করে রাখুন

আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

রায়পুরে প্রবাসী দম্পতিকে জিম্মি করে মারধর ও অর্থ-স্বর্ণালংকার লুটের অভিযোগে কৃষকদল নেতা রিয়াদ হাসান আটক

আপডেট সময় ১১:৫৬:১২ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ২১ অক্টোবর ২০২৬

লক্ষ্মীপুরের রায়পুরে প্রবাস ফেরত এক ব্যক্তি ও তাঁর স্ত্রীকে জিম্মি করে মারধর, শ্লীলতাহানি, স্বর্ণালংকার ও নগদ অর্থ লুটপাট এবং ব্ল্যাকমেইলিংয়ের উদ্দেশ্যে আপত্তিকর ভিডিও ধারণের সুনির্দিষ্ট অভিযোগে রিয়াদ হাসান নামে এক স্থানীয় রাজনৈতিক নেতাকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। মঙ্গলবার (২০ অক্টোবর) বিকেলে রায়পুর পৌর শহরের ব্যস্ততম বাজার এলাকা থেকে তাঁকে আটক করা হয়। রায়পুর থানা পুলিশ নিশ্চিত করেছে যে, গত ১৬ অক্টোবর সংঘটিত এই চাঞ্চল্যকর ঘটনায় দায়েরকৃত মামলার নিবিড় তদন্তে এবং ডিজিটাল সাক্ষ্যপ্রমাণে ওই নেতার সরাসরি সম্পৃক্ততার তথ্য মিলেছে। আটক রিয়াদ হাসান রায়পুর পৌর কৃষকদলের সভাপতি পদপ্রার্থী এবং রায়পুর সরকারি কলেজ ছাত্রদলের সাবেক যুগ্ম আহ্বায়কের দায়িত্ব পালন করেছেন।

থানা পুলিশ ও স্থানীয় প্রত্যক্ষদর্শী সূত্রে জানা যায়, গত ১৬ অক্টোবর (শুক্রবার) দুপুরে রায়পুর পৌরসভার ৭ নম্বর ওয়ার্ডের দেনায়েতপুর এলাকার ফারুক আহমেদের একটি বহুতল ভবনের নিচতলায় এই জিম্মি ও লুটের ঘটনা ঘটে। ঘটনা তদন্তে জানা গেছে, উক্ত ভবনের নিচতলার একটি ফ্ল্যাটে ভাড়া থাকেন প্রবাস ফেরত গোলাম কিবরিয়া সবুজের স্ত্রী মিলি আক্তারের বান্ধবী সাথী আক্তার। ঘটনার দিন সাথী আক্তারের মেয়ের জন্মদিনের পারিবারিক অনুষ্ঠানে আমন্ত্রিত হয়ে মিলি আক্তার ওই বাসায় যান। অনুষ্ঠান চলাকালে অভিযুক্ত সংঘবদ্ধ ব্ল্যাকমেইলার চক্রটি সুপরিকল্পিতভাবে ঘরের ভেতরে অতর্কিতে প্রবেশ করে। তারা ঘরের মালামাল তছনছ করে এবং সাথী আক্তারের ব্যবহৃত প্রায় এক ভরি দুই আনা ওজনের স্বর্ণালংকার ছিনিয়ে নেয়।

এজাহারের তথ্য অনুযায়ী, ব্ল্যাকমেইলারদের এমন নজিরবিহীন কর্মকাণ্ডে মিলি আক্তার বাধা দিলে তাঁকে বেধড়ক মারধর করে রক্তাক্ত জখম করা হয় এবং শ্লীলতাহানির চেষ্টা চালানো হয়। পরবর্তীতে চক্রটি মিলি আক্তারের মাকে ফোন করে তাঁর মেয়েকে অনৈতিক অবস্থায় এক যুবকের সঙ্গে আটকে রাখা হয়েছে বলে ভয়ভীতি দেখায় এবং মুক্তিপণ দাবি করে। খবর পেয়ে মিলির স্বামী প্রবাসী গোলাম কিবরিয়া সবুজ ঘটনাস্থলে ছুটে গেলে আসামিরা তাঁকেও মারধর করে জিম্মি করে ফেলে। এ সময় সবুজের পকেটে থাকা মানিব্যাগ থেকে নগদ ২৫ হাজার টাকা ও বিভিন্ন ব্যাংকের ক্রেডিট কার্ড ছিনিয়ে নেওয়া হয়। একপর্যায়ে বৈধ স্বামী-স্ত্রী হওয়া সত্ত্বেও তাঁদের মধ্যে অবৈধ সম্পর্ক রয়েছে—এমন ভিত্তিহীন অভিযোগ তুলে জোরপূর্বক একটি কক্ষে আটকে রেখে ব্ল্যাকমেইল করার উদ্দেশ্যে মোবাইলে ভিডিও ধারণ করে চক্রটি। দম্পতি তাঁদের বিয়ের কাবিননামা ও ছবি দেখালেও তা উপেক্ষা করে কোনো আইনি পদক্ষেপ না নেওয়ার জন্য প্রাণনাশের হুমকি দেওয়া হয়।

ঘটনার পরদিন (১৭ অক্টোবর) ভুক্তভোগী প্রবাসী গোলাম কিবরিয়া সবুজ বাদী হয়ে রায়পুর থানায় পাঁচজনের নাম উল্লেখসহ অজ্ঞাতনামা আরও ছয়জনকে আসামি করে একটি লিখিত এজাহার দায়ের করেন। মামলায় নাম উল্লেখ করা প্রধান আসামিরা হলেন—দেনায়েতপুর এলাকার মিজানুর রহমান সর্দার, পশ্চিম কেরোয়া এলাকার আবদুল্লাহ আল মামুন, দেনায়েতপুরের ইউছুফ আলী, কেরোয়ার মাছুম বিল্লাহ এবং মো. রহিম। মামলার দায়িত্বপ্রাপ্ত তদন্তকারী কর্মকর্তা ও রায়পুর থানার উপপরিদর্শক (এসআই) নুরুল ইসলাম জানান, “ঘটনার পর থেকে ছায়া তদন্তে স্থানীয় রিয়াদ হাসানের জড়িত থাকার প্রাথমিক সত্যতা মেলে। এরই ভিত্তিতে অভিযান চালিয়ে তাঁকে আটক করা হয়েছে। আটককৃত আসামিকে প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদ শেষে বুধবার আদালতে সোপর্দ করা হবে এবং অন্যান্য আসামিদের গ্রেপ্তারে অভিযান অব্যাহত রয়েছে।”

আইন প্রয়োগকারী সংস্থা ও স্থানীয় অপরাধ বিশ্লেষকদের মতে, দেশের বিভিন্ন স্থানে রাজনৈতিক পরিচয়কে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে একশ্রেণির অপরাধী চক্র নিরীহ প্রবাসী ও সাধারণ নাগরিকদের জিম্মি করে অর্থ আদায় এবং সামাজিক হেনস্তার জন্য ব্ল্যাকমেইলিং চক্র গড়ে তুলেছে। বিশেষ করে বহুতল ভবনে একা অবস্থানরত নারী বা প্রবাসীদের টার্গেট করে অনৈতিক সম্পর্কের কাল্পনিক অভিযোগ তুলে স্বর্ণালংকার লুট ও ভিডিও ধারণের এই অপসংস্কৃতি অত্যন্ত বিপজ্জনক রূপ ধারণ করেছে। পুলিশ প্রশাসন জানিয়েছে, রাজনৈতিক পরিচয় কিংবা পদমর্যাদা যা-ই থাক না কেন, প্রবাসীদের জিম্মি করে অর্থ আদায় ও নারীদের শ্লীলতাহানির সঙ্গে জড়িতদের কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না।

লক্ষ্মীপুরের রায়পুরে ঘটে যাওয়া এই নজিরবিহীন জিম্মি ও লুটের ঘটনায় চরম আতঙ্কিত হয়ে পড়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। ঘটনার পর আটক রাজনৈতিক নেতার সহযোগীদের দ্রুত গ্রেপ্তার, লুণ্ঠনকৃত স্বর্ণালংকার উদ্ধার এবং ভুক্তভোগী প্রবাসী দম্পতির নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছে রায়পুরের সুশীল সমাজ ও সাধারণ জনগণ। আদালত ও পুলিশের কঠোর আইনি ব্যবস্থার মাধ্যমে এই ব্ল্যাকমেইলিং সিন্ডিকেটের নির্মূল চান স্থানীয় সর্বস্তরের মানুষ।