ঢাকা ০৩:০০ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২০ অক্টোবর ২০২৬, ৫ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম ::

কর্ণফুলী থানায় আওয়ামী লীগ নেতার গোপন বৈঠক, জাহাজ দখলের অভিযোগ

চট্টগ্রামের কর্ণফুলী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার (ওসি) কক্ষে আওয়ামী লীগ নেতার রহস্যজনক বৈঠক, নদীতে জাহাজ আটকে রেখে জিম্মি ও দখলের চাঞ্চল্যকর অভিযোগ এবং এসব বিষয়ে থানা পুলিশের রহস্যজনক নীরবতা নিয়ে এলাকায় তীব্র ক্ষোভ ও গুঞ্জনের সৃষ্টি হয়েছে।

 

ওসির কক্ষে আওয়ামী লীগ নেতার ‘গোপন বৈঠক’

অভিযোগ উঠেছে, কর্ণফুলী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) নূর আহমেদের কক্ষে সম্প্রতি এক গোপনীয় বৈঠকে অংশ নেন বিতর্কিত এই আওয়ামী লীগ নেতা। চট্টগ্রামজুড়ে আওয়ামী লীগ নেতাদের প্রকাশ্য তৎপরতা নিয়ে যখন নানামুখী রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট ও আইনি কড়াকড়ি দৃশ্যমান, ঠিক সেই সময়ে থানার সর্বোচ্চ কর্মকর্তার কক্ষে সাবেক ইউপি চেয়ারম্যানের অবস্থান ঘিরে এলাকায় তীব্র গুঞ্জনের সৃষ্টি হয়েছে। কেবল বৈঠকই নয়, এই সাক্ষাৎ এবং একটি জাহাজ দখলের ঘটনাকে কেন্দ্র করে বিশাল অঙ্কের অনৈতিক অর্থ লেনদেনের অভিযোগও ছড়িয়ে পড়েছে মুখে মুখে। অপরাধ দমন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী কর্তৃপক্ষের কার্যালয় কীভাবে এক বিতর্কিত নেতার যোগাযোগের কেন্দ্রে পরিণত হলো, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন সাধারণ মানুষ।

 

নদীতে নতুন আতঙ্ক: জাহাজ কেনাবেচার নামে দখলের অভিযোগ

অভিযোগের তির কেবল থানা বৈঠকেই সীমাবদ্ধ নয়; কর্ণফুলী নদীতে বাণিজ্যিক ও মাছ ধরার জাহাজ নিয়ন্ত্রণ নিয়েও উঠছে গুরুতর সব দাবি। স্থানীয়দের ভাষ্যমতে, মাছ ধরার জাহাজ কেনাবেচার চটকদার ব্যবসার অজুহাতে একটি সংঘবদ্ধ চক্র পরিচালনা করছেন মোহাম্মদ আলী। ব্যবসায়ীদের কাছে জাহাজ কেনাবেচার আলোচনা বা চুক্তি করার কথা বলে কৌশলে নদীর ঘাট ও নোঙরে থাকা বাণিজ্যিক জাহাজ আটকে রাখা হয়। পরবর্তীতে মূল মালিক ও সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীদের জিম্মি করে জাহাজের নিয়ন্ত্রণ ছিনিয়ে নেওয়া হয় বলে একাধিক ভুক্তভোগী দাবি করেছেন। এই জিম্মিদশার কারণে অনেক মূল ব্যবসায়ী ও বিনিয়োগকারী লাখ লাখ টাকার ক্ষতির মুখে পড়ছেন এবং নিরাপত্তার অভাবে চরম আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছেন।

 

মামলায় কারাবাসের পরও রাজনৈতিক ও সামাজিক সক্রিয়তা

২০২৪ সালের এপ্রিলে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সঙ্গে সম্পর্কিত একটি সহিংসতা ও নাশকতা মামলায় গ্রেপ্তার হয়ে কারাবরণ করেছিলেন মোহাম্মদ আলী। তবে জামিনে মুক্ত হওয়ার পর তিনি যেন পূর্বের চেয়েও বেশি বেপরোয়া ও সক্রিয় হয়ে উঠেছেন এলাকায়। আইনি প্রক্রিয়া ও বিচারাধীন মামলার মধ্য দিয়ে যাওয়ার পরও স্থানীয় রাজনীতি এবং অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে তাঁর প্রভাব বিস্তার নিয়ে অসন্তোষ তীব্র হচ্ছে। স্থানীয়দের মতে, অতীতের ক্ষমতার প্রভাবকে কাজে লাগিয়ে তিনি ফের নদীতে আধিপত্য বিস্তার ও প্রভাব খাটাইয়ের পথ বেছে নিয়েছেন।

 

ভুক্তভোগীদের ক্ষোভ ও পুলিশের ভূমিকা

জাহাজ দখল ও জিম্মি করার এ ঘটনায় ক্ষুব্ধ ও ক্ষতিগ্রস্ত একাধিক ব্যক্তি একাধিকবার কর্ণফুলী থানায় লিখিত ও মৌখিক অভিযোগ নিয়ে গিয়েছেন। তবে ভুক্তভোগীদের দাবি—অভিযোগ জমা দেওয়া সত্ত্বেও পুলিশ প্রশাসনের পক্ষ থেকে এখন পর্যন্ত কার্যকর কিংবা দৃশ্যমান কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। আইনি সহায়তা না পেয়ে ক্ষুব্ধ ও হতাশ হয়ে পড়েছেন অভিযোগকারীরা। আইন প্রয়োগকারী সংস্থার এই নীরবতা অপরাধীদের পার পাওয়ার সুযোগ করে দিচ্ছে বলে মনে করছেন স্থানীয় সচেতন মহল।

 

কর্তৃপক্ষ ও অভিযুক্তের বক্তব্য

উঠ ওঠা সমস্ত অভিযোগ ও থানার ভেতরে বৈঠকের বিষয়ে জানতে চাইলে কর্ণফুলী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) নূর আহমেদ এক বাক্যে বিষয়টি এড়িয়ে যান। তিনি দাবি করেন, এ ধরনের কোনো বৈঠক কিংবা অভিযোগের বিষয়ে তিনি কিছুই জানেন না।

অন্যদিকে, এসব চাঞ্চল্যকর অভিযোগ ও ওসির কক্ষে বৈঠকের বিষয়ে বক্তব্য জানতে অভিযুক্ত সাবেক ইউপি চেয়ারম্যান মোহাম্মদ আলীর সঙ্গে একাধিকবার মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাঁকে পাওয়া যায়নি। এমনকি খুদে বার্তা (এসএমএস) পাঠানো হলেও তিনি কোনো উত্তর দেননি।

পুলিশের অস্বীকার এবং অভিযুক্তের নীরবতার মধ্য দিয়েই কর্ণফুলীর নদীতীর ও প্রশাসনিক অঙ্গনে তৈরি হওয়া ধোঁয়াশা আরও ঘনীভূত হচ্ছে। দ্রুত নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত সত্য উন্মোচন ও নদীর নিরাপত্তায় প্রশাসন কড়া পদক্ষেপ নেবে—এমনটাই প্রত্যাশা স্থানীয় বাসিন্দা ও ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়ীদের।

Tag :

আপনার মতামত লিখুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল ও অন্যান্য তথ্য সঞ্চয় করে রাখুন

আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

হরমুজ প্রণালিতে মার্কিন ড্রোন ভূপাতিতের দাবি ইরানের

কর্ণফুলী থানায় আওয়ামী লীগ নেতার গোপন বৈঠক, জাহাজ দখলের অভিযোগ

আপডেট সময় ০১:৩৭:৫২ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২০ অক্টোবর ২০২৬

চট্টগ্রামের কর্ণফুলী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার (ওসি) কক্ষে আওয়ামী লীগ নেতার রহস্যজনক বৈঠক, নদীতে জাহাজ আটকে রেখে জিম্মি ও দখলের চাঞ্চল্যকর অভিযোগ এবং এসব বিষয়ে থানা পুলিশের রহস্যজনক নীরবতা নিয়ে এলাকায় তীব্র ক্ষোভ ও গুঞ্জনের সৃষ্টি হয়েছে।

 

ওসির কক্ষে আওয়ামী লীগ নেতার ‘গোপন বৈঠক’

অভিযোগ উঠেছে, কর্ণফুলী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) নূর আহমেদের কক্ষে সম্প্রতি এক গোপনীয় বৈঠকে অংশ নেন বিতর্কিত এই আওয়ামী লীগ নেতা। চট্টগ্রামজুড়ে আওয়ামী লীগ নেতাদের প্রকাশ্য তৎপরতা নিয়ে যখন নানামুখী রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট ও আইনি কড়াকড়ি দৃশ্যমান, ঠিক সেই সময়ে থানার সর্বোচ্চ কর্মকর্তার কক্ষে সাবেক ইউপি চেয়ারম্যানের অবস্থান ঘিরে এলাকায় তীব্র গুঞ্জনের সৃষ্টি হয়েছে। কেবল বৈঠকই নয়, এই সাক্ষাৎ এবং একটি জাহাজ দখলের ঘটনাকে কেন্দ্র করে বিশাল অঙ্কের অনৈতিক অর্থ লেনদেনের অভিযোগও ছড়িয়ে পড়েছে মুখে মুখে। অপরাধ দমন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী কর্তৃপক্ষের কার্যালয় কীভাবে এক বিতর্কিত নেতার যোগাযোগের কেন্দ্রে পরিণত হলো, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন সাধারণ মানুষ।

 

নদীতে নতুন আতঙ্ক: জাহাজ কেনাবেচার নামে দখলের অভিযোগ

অভিযোগের তির কেবল থানা বৈঠকেই সীমাবদ্ধ নয়; কর্ণফুলী নদীতে বাণিজ্যিক ও মাছ ধরার জাহাজ নিয়ন্ত্রণ নিয়েও উঠছে গুরুতর সব দাবি। স্থানীয়দের ভাষ্যমতে, মাছ ধরার জাহাজ কেনাবেচার চটকদার ব্যবসার অজুহাতে একটি সংঘবদ্ধ চক্র পরিচালনা করছেন মোহাম্মদ আলী। ব্যবসায়ীদের কাছে জাহাজ কেনাবেচার আলোচনা বা চুক্তি করার কথা বলে কৌশলে নদীর ঘাট ও নোঙরে থাকা বাণিজ্যিক জাহাজ আটকে রাখা হয়। পরবর্তীতে মূল মালিক ও সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীদের জিম্মি করে জাহাজের নিয়ন্ত্রণ ছিনিয়ে নেওয়া হয় বলে একাধিক ভুক্তভোগী দাবি করেছেন। এই জিম্মিদশার কারণে অনেক মূল ব্যবসায়ী ও বিনিয়োগকারী লাখ লাখ টাকার ক্ষতির মুখে পড়ছেন এবং নিরাপত্তার অভাবে চরম আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছেন।

 

মামলায় কারাবাসের পরও রাজনৈতিক ও সামাজিক সক্রিয়তা

২০২৪ সালের এপ্রিলে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সঙ্গে সম্পর্কিত একটি সহিংসতা ও নাশকতা মামলায় গ্রেপ্তার হয়ে কারাবরণ করেছিলেন মোহাম্মদ আলী। তবে জামিনে মুক্ত হওয়ার পর তিনি যেন পূর্বের চেয়েও বেশি বেপরোয়া ও সক্রিয় হয়ে উঠেছেন এলাকায়। আইনি প্রক্রিয়া ও বিচারাধীন মামলার মধ্য দিয়ে যাওয়ার পরও স্থানীয় রাজনীতি এবং অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে তাঁর প্রভাব বিস্তার নিয়ে অসন্তোষ তীব্র হচ্ছে। স্থানীয়দের মতে, অতীতের ক্ষমতার প্রভাবকে কাজে লাগিয়ে তিনি ফের নদীতে আধিপত্য বিস্তার ও প্রভাব খাটাইয়ের পথ বেছে নিয়েছেন।

 

ভুক্তভোগীদের ক্ষোভ ও পুলিশের ভূমিকা

জাহাজ দখল ও জিম্মি করার এ ঘটনায় ক্ষুব্ধ ও ক্ষতিগ্রস্ত একাধিক ব্যক্তি একাধিকবার কর্ণফুলী থানায় লিখিত ও মৌখিক অভিযোগ নিয়ে গিয়েছেন। তবে ভুক্তভোগীদের দাবি—অভিযোগ জমা দেওয়া সত্ত্বেও পুলিশ প্রশাসনের পক্ষ থেকে এখন পর্যন্ত কার্যকর কিংবা দৃশ্যমান কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। আইনি সহায়তা না পেয়ে ক্ষুব্ধ ও হতাশ হয়ে পড়েছেন অভিযোগকারীরা। আইন প্রয়োগকারী সংস্থার এই নীরবতা অপরাধীদের পার পাওয়ার সুযোগ করে দিচ্ছে বলে মনে করছেন স্থানীয় সচেতন মহল।

 

কর্তৃপক্ষ ও অভিযুক্তের বক্তব্য

উঠ ওঠা সমস্ত অভিযোগ ও থানার ভেতরে বৈঠকের বিষয়ে জানতে চাইলে কর্ণফুলী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) নূর আহমেদ এক বাক্যে বিষয়টি এড়িয়ে যান। তিনি দাবি করেন, এ ধরনের কোনো বৈঠক কিংবা অভিযোগের বিষয়ে তিনি কিছুই জানেন না।

অন্যদিকে, এসব চাঞ্চল্যকর অভিযোগ ও ওসির কক্ষে বৈঠকের বিষয়ে বক্তব্য জানতে অভিযুক্ত সাবেক ইউপি চেয়ারম্যান মোহাম্মদ আলীর সঙ্গে একাধিকবার মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাঁকে পাওয়া যায়নি। এমনকি খুদে বার্তা (এসএমএস) পাঠানো হলেও তিনি কোনো উত্তর দেননি।

পুলিশের অস্বীকার এবং অভিযুক্তের নীরবতার মধ্য দিয়েই কর্ণফুলীর নদীতীর ও প্রশাসনিক অঙ্গনে তৈরি হওয়া ধোঁয়াশা আরও ঘনীভূত হচ্ছে। দ্রুত নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত সত্য উন্মোচন ও নদীর নিরাপত্তায় প্রশাসন কড়া পদক্ষেপ নেবে—এমনটাই প্রত্যাশা স্থানীয় বাসিন্দা ও ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়ীদের।