দেশের বনভূমির উচ্ছেদ, জীববৈচিত্র্য ধ্বংস এবং পরিবেশগত ভারসাম্য নষ্ট করার নেপথ্যে বন অধিদপ্তরের অভ্যন্তরে জেঁকে বসা এক বিশাল দুর্নীতি সিন্ডিকেটের চাঞ্চল্যকর তথ্য উন্মোচিত হয়েছে। বন ও বনজ সম্পদের প্রধান রক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করার কথা থাকলেও বন অধিদপ্তরের ঢাকা সামাজিক বনাঞ্চলের বন সংরক্ষক হোসাইন মুহাম্মদ নিশাদের বিরুদ্ধে ক্ষমতার অপব্যবহার, চাঁদাবাজি, নিয়োগ ও বদলি বাণিজ্য এবং ঘুষের বিনিময়ে অবৈধ সুবিধা প্রদানের মতো একাধিক গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। দীর্ঘ ২৩ বছরের কর্মজীবনে রাজনৈতিক ক্ষমতার ভোল পাল্টে এবং উচ্চপর্যায়ের প্রভাবশালী মন্ত্রীদের ছত্রছায়ায় থেকে শত শত কোটি টাকার অবৈধ সম্পদ গড়ার এই ঘটনায় বন প্রশাসন ও সচেতন মহলে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।
অনুসন্ধানে জানা যায়, ২০০৩ সালে ২২তম বিসিএস (বন) ক্যাডারে সহকারী বন সংরক্ষক হিসেবে চাকরিতে যোগদান করেন হোসাইন নিশাদ। কর্মজীবনের একটি দীর্ঘ সময় সংস্থাপন শাখায় দায়িত্ব পালনকালে তিনি দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের নিয়োগ, বদলি ও পদায়ন প্রক্রিয়া একচ্ছত্রভাবে নিয়ন্ত্রণ করতেন। অভিযোগ রয়েছে, সাবেক পরিবেশমন্ত্রী হাসান মাহমুদ ও বন উপমন্ত্রী হাবিবুন নাহারের ঘনিষ্ঠ সান্নিধ্য এবং রাজনৈতিক প্রভাবকে কাজে লাগিয়ে তিনি ২৩ বছরের চাকরিজীবনে একবারের জন্যও রাজধানীর বাইরে বদলি হননি। বন বিভাগের গুরুত্বপূর্ণ রেঞ্জ, চেকপোস্ট ও লাইসেন্স প্রক্রিয়ায় তাঁর এই বেপরোয়া সিন্ডিকেটের কারণে সহকর্মীরা আড়ালে-আবডালে তাঁকে ‘রাক্ষস’ নামে সম্বোধন করতেন। তাঁর অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের ব্যাপ্তি এতটাই বিস্তৃত যে, নিরপেক্ষ ও স্বাধীন তদন্ত হলে বন বিভাগের ভেতরের আরও অনেক অজানা কেলেঙ্কারি বেরিয়ে আসবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
হোসাইন নিশাদের দুর্নীতির সবচেয়ে বড় কেন্দ্রস্থল ছিল ঢাকা সামাজিক বনাঞ্চলের সোনারগাঁও চেকপোস্ট। প্রতিদিন এই চেকপোস্ট দিয়ে ৩ হাজার ৫০০ থেকে ৪ হাজার গাছবোঝাই ট্রাক যাতায়াত করত, যার প্রতিটিতে ১০ থেকে ১২ হাজার টাকা পর্যন্ত চাঁদা আদায় করা হতো। এই চেকপোস্টের স্টেশন অফিসার পদটি একপ্রকার নিলামের মাধ্যমে বার্ষিক ৫০ লাখ টাকায় লিজ দেওয়া হতো বলে অভিযোগ রয়েছে। এর পাশাপাশি ছয়জন সহকারী স্টেশন অফিসার এবং ফরেস্ট গার্ড পদগুলোর পোস্টিংয়ের জন্যও লাখ লাখ টাকার উৎকোচ লেনদেন হতো। একই সঙ্গে কাঠের ডিপো, করাতকল, ইটভাটা এবং বন্যপ্রাণী আমদানির জন্য প্রয়োজনীয় ‘নো অবজেকশন সার্টিফিকেট’ (এনওসি) প্রদানে প্রতিটি সনদে দেড় লাখ টাকা পর্যন্ত ঘুষ গ্রহণের সুনির্দিষ্ট তথ্য মিলেছে। প্রতি মাসে শত শত এনওসি ইস্যুর মাধ্যমে এই খাতটি তাঁর অন্যতম প্রধান আয়ের উৎসে পরিণত হয়েছিল।
নিয়োগ ও বদলি বাণিজ্যের ক্ষেত্রে সংস্থাপন শাখাকে দুর্নীতির আখড়ায় পরিণত করার গুরুতর অভিযোগ রয়েছে নিশাদের বিরুদ্ধে। রেঞ্জ অফিসারদের বদলিতে ১০ থেকে ২০ লাখ এবং বন প্রহরীদের ক্ষেত্রে ৫ থেকে ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত ঘুষ আদায় করা হতো। ২০২০ সালের নভেম্বর মাসে নিয়োগ বিধিমালায় বিতর্কিত পরিবর্তন এনে সরাসরি ফরেস্ট রেঞ্জ অফিসার পদে ছাত্রলীগের প্রায় ১২০ জন নেতাকর্মীকে নিয়োগ দেওয়ার পেছনেও এই সিন্ডিকেটের প্রত্যক্ষ মদদ ছিল বলে অভিযোগ উঠেছে। এ ছাড়া আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে কর্মী নিয়োগ এবং গাজীপুর, টাঙ্গাইল, ময়মনসিংহ ও সিলেট বিভাগে দায়িত্ব পালনকালে সীমানা নির্ধারণে অনিয়মের মাধ্যমে প্রায় সাড়ে ৮ হাজার হেক্টর বনভূমি জবরদখল ও শিল্পপ্রতিষ্ঠানের কাছে হস্তান্তরে সহায়তা করার অভিযোগ রয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে।
বন বিভাগের অভ্যন্তরে ক্ষমতার অপব্যবহারের মাধ্যমে অর্জিত এই অবৈধ অর্থ দেশীয় গণ্ডি পেরিয়ে বিদেশে পাচার করা হয়েছে বলে জোরালো গুঞ্জন রয়েছে। নিশাদের নিজ ও ঘনিষ্ঠদের নামে দেশের বিভিন্ন স্থানে একাধিক স্থাবর সম্পত্তি ছাড়াও কানাডায় বিলাসবহুল বাড়ি এবং আমেরিকায় বিপুল সম্পত্তি ক্রয়ের চাঞ্চল্যকর তথ্য পাওয়া গেছে। এই বিশাল দুর্নীতির সাম্রাজ্য গড়ার পেছনে সাবেক পরিবেশমন্ত্রী ড. হাসান মাহমুদ এবং সাবেক উপমন্ত্রী হাবিবুন নাহারের প্রত্যক্ষ রাজনৈতিক আশীর্বাদ কাজ করেছে। প্রভাবশালী মহলের সুদৃঢ় সুরক্ষার কারণেই অতীতে তাঁর বিরুদ্ধে উত্থাপিত কোনো দুর্নীতির অভিযোগেরই কার্যকর বিভাগীয় তদন্ত বা আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা সম্ভব হয়নি বলে জানা গেছে।
অভিযুক্ত বন সংরক্ষক হোসাইন মুহাম্মদ নিশাদের বিরুদ্ধে উত্থাপিত এই সমস্ত গুরুতর অভিযোগের বিষয়ে বস্তুনিষ্ঠ বক্তব্য জানার জন্য একাধিকবার মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাঁকে পাওয়া যায়নি। একইভাবে প্রধান বন সংরক্ষক আমিন হোসাইন চৌধুরীর সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাঁর তরফ থেকেও কোনো সাড়া মেলেনি। পরিবেশবাদীরা মনে করছেন, বন অধিদপ্তরের মতো একটি গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানে এই ধরনের দুর্নীতি ও বনভূমি গ্রাসের ঘটনা দেশের পরিবেশগত নিরাপত্তা ও টেকসই উন্নয়নের অন্তরায়। অবিলম্বে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) ও পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের যৌথ উদ্যোগে হোসাইন নিশাদের জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদের নিরপেক্ষ তদন্ত এবং দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা জরুরি।
নিজস্ব প্রতিবেদক 





















