শরীয়তপুরের জাজিরা উপজেলার বিকেনগর ইউনিয়নে জেলেদের জন্য বরাদ্দ সরকারি চাল বিতরণে অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। জনপ্রতি ২৫ কেজির বিপরীতে ২৩ থেকে ২৪ কেজি চাল দেওয়া হচ্ছিল এবং চালে পোকা থাকায় অনেক জেলে তা নিতে অস্বীকৃতি জানান। বুধবার (১৪ অক্টোবর) দুপুরে ইউনিয়ন পরিষদে সরেজমিনে এসব দেখা যায়। অনিয়মের বিষয়ে প্রশ্ন করলে ইউপি চেয়ারম্যান এসকান্দার আলী ভূঁইয়া প্রথমে অভিযোগ অস্বীকার করেন, পরে সাংবাদিকদের উদ্দেশে শাসানোর ভঙ্গিতে কথা বলেন বলে অভিযোগ উঠেছে। জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক বলেছেন, তদন্ত সাপেক্ষে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
বিকেনগর ইউনিয়ন পরিষদে গিয়ে দেখা যায়, কার্ডধারী জেলেদের মধ্যে চাল বিতরণ চলছে। সরকারি বরাদ্দ অনুযায়ী প্রত্যেকের ২৫ কেজি করে চাল পাওয়ার কথা থাকলেও ওজনে ১ থেকে ২ কেজি কম দেওয়া হচ্ছিল। পাশাপাশি চালে পোকা ও আবর্জনা দেখে উপস্থিত অনেক জেলে ক্ষোভ প্রকাশ করেন এবং চাল নিতে অস্বীকৃতি জানান। এদিন ইউনিয়নের ৮০ জন জেলের মধ্যে চাল বিতরণ করা হচ্ছিল।
বিতরণকাজে নিয়োজিত কয়েকজন শ্রমিক নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, চেয়ারম্যানের নির্দেশেই ওজনে কম দেওয়া হচ্ছে। এ দাবি অন্য কোনো সূত্রে যাচাই করা যায়নি। বিতরণ কখন শুরু হয়েছিল, কতজন জেলে চাল নিয়েছেন এবং কতজন ফিরিয়ে দিয়েছেন, সে তথ্য পাওয়া যায়নি।
ভুক্তভোগী জেলেরা অভিযোগ করে বলেন, সরকার ২৫ কেজি ভালো মানের চাল পাঠিয়েছে, কিন্তু সেখানে গিয়ে তাঁরা পোকাযুক্ত ও ওজনে কম চাল পেয়েছেন। তাঁদের ভাষ্য, অভাবের দিনে সরকারি সহায়তা নিতে এসেও তাঁরা প্রতারিত হচ্ছেন। জেলেদের নাম প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়নি।
অনিয়মের বিষয়ে জানতে চাইলে ইউপি চেয়ারম্যান এসকান্দার আলী ভূঁইয়া প্রথমে অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, কোনো অনিয়ম হচ্ছে না এবং নিয়ম মেনেই বিতরণ করা হচ্ছে। তবে ওজন কম ও নিম্নমানের বিষয়ে আরও প্রশ্ন করা হলে তিনি উত্তেজিত হয়ে পড়েন। সাংবাদিকদের উদ্দেশে তিনি বলেন, ‘তোমরা বহুত বাইড়া গেছো। একটু কমাইয়া বাইড়ো।’ চালে পোকা ও ওজন কমের নির্দিষ্ট অভিযোগের বিষয়ে তাঁর ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি।
তদারকির দায়িত্বে থাকা ট্যাগ অফিসার ও উপজেলা উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা আজহারুল ইসলামকে বিতরণের সময় ইউনিয়ন পরিষদে পাওয়া যায়নি। যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, ‘আমি যতক্ষণ ছিলাম, কোনো চাল কম দেওয়া হয়নি। কৃষি অফিসে মিটিং থাকায় আমি আগেই চলে এসেছি। পরে কম দিয়ে থাকতে পারে, সেটা আমার জানা নেই।’
জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক কর্মকর্তা মো. হুমায়ুন কবির বলেন, বিষয়টি তাঁদের জানা নেই। তবে সরকারি চালে এমন অনিয়ম বা নিম্নমানের পণ্য দেওয়ার সুযোগ নেই। তিনি জানান, তদন্ত সাপেক্ষে দ্রুত প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
খসড়া অনুযায়ী, এ চাল সরকারি বরাদ্দের আওতায় কার্ডধারী জেলেদের জন্য দেওয়া হচ্ছে এবং প্রত্যেকের প্রাপ্য ২৫ কেজি। সরকারি সহায়তা বিতরণে সাধারণত তদারকির জন্য একজন ট্যাগ অফিসার নিয়োজিত থাকেন। এ ক্ষেত্রে সেই দায়িত্বে ছিলেন আজহারুল ইসলাম। তবে ইউনিয়নটির জন্য মোট কত চাল বরাদ্দ হয়েছিল, কোন গুদাম থেকে তা এসেছে, কোন কর্মসূচির আওতায় এই সহায়তা দেওয়া হচ্ছে এবং এর আগে এই ইউনিয়নে এমন অভিযোগ উঠেছিল কি না, সে বিষয়ে তথ্য পাওয়া যায়নি। ওজনে কম দেওয়ার পরিমাণ কত কেজি দাঁড়ায় বা এর আর্থিক মূল্য কত, সে হিসাবও নেই। প্রতি জেলে ১ থেকে ২ কেজি কম পেয়ে থাকলে ৮০ জনের ক্ষেত্রে মোট ঘাটতি ৮০ থেকে ১৬০ কেজি হতে পারে। এটি খসড়ার তথ্যের ভিত্তিতে করা সরল হিসাব, যাচাইকৃত পরিমাপ নয়।
অভিযোগ প্রমাণিত হলে সরকারি ত্রাণ বিতরণে স্বচ্ছতা ও তদারকির ঘাটতি নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে। জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক তদন্তের কথা বললেও তদন্ত কমিটি গঠন বা সময়সীমার কোনো ঘোষণা এখনো আসেনি। সাংবাদিকদের প্রতি চেয়ারম্যানের আচরণ নিয়ে কোনো কর্তৃপক্ষ বা সাংবাদিক সংগঠনের প্রতিক্রিয়াও পাওয়া যায়নি। বর্তমানে অভিযোগগুলো তদন্তাধীন হওয়ার অপেক্ষায় এবং জেলেদের একটি অংশ নিম্নমানের চাল গ্রহণ না করে ফিরে গেছেন বলে জানা যায়।
নিজস্ব প্রতিবেদক 





















