ঢাকা ০৯:৩৫ অপরাহ্ন, শনিবার, ১৭ অক্টোবর ২০২৬, ২ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম ::
সওজের প্রকৌশলী শাহনুর রশিদকে ঘিরে দুর্নীতির অভিযোগ রাজপথে নতুন নাটক শুরু করেছে বিরোধী দল: রিজভী পানি উন্নয়ন বোর্ডের জমির দ্বন্দ্বে যুবদল নেতা খুন: পুলিশ সুপার অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগে সাবেক পিআইও ও স্ত্রীর বিরুদ্ধে মামলা ময়লার বিল থেকে বছরে ৩১৭ কোটি টাকা আদায়, সিটি করপোরেশন পায় ১২ কোটি-বাকি টাকা যায় কোথায়? সৌদিতে দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড আমাদের জন্য বড় শিক্ষা: শামা ওবায়েদ কালিয়াকৈরে ইবনে সিনার কারখানায় আগুন, ঘটনাস্থলে ফায়ার সার্ভিসের ৬ ইউনিট গুলশানের ‘জার্মান ক্লাবে’ অভিযানে ২৪৪ লিটার মদ-বিয়ার জব্দ নিয়োগপত্র-ওভারটাইমে অনিয়মের অভিযোগ, ফুলকলির বিরুদ্ধে শ্রম আইন লঙ্ঘনের মামলা নাটোরে গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকট ও দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে সরকারের পদক্ষেপ তুলে ধরে স্বেচ্ছাসেবক দলের লিফলেট বিতরণ

ময়লার বিল থেকে বছরে ৩১৭ কোটি টাকা আদায়, সিটি করপোরেশন পায় ১২ কোটি-বাকি টাকা যায় কোথায়?

রাজধানীর ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি) এলাকায় বাসাবাড়ি থেকে ময়লা সংগ্রহের জন্য বাসিন্দাদের কাছ থেকে মাসে ১৫০ থেকে ২৫০ টাকা পর্যন্ত আদায়ের অভিযোগ রয়েছে।

সিটি করপোরেশনের তথ্য অনুযায়ী, এ এলাকায় ফ্ল্যাটের সংখ্যা ১৭ লাখ ৬৩ হাজারের বেশি। প্রতিটি ফ্ল্যাট থেকে মাসে ১৫০ টাকা করে আদায় করা হলে বছরে অর্থের পরিমাণ দাঁড়ায় ৩১৭ কোটি টাকার বেশি। অথচ বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে এই সেবা পরিচালনার বিপরীতে সিটি করপোরেশন বছরে পায় প্রায় ১২ কোটি টাকা।

বাসাবাড়ি থেকে ময়লা সংগ্রহের নামে বিপুল অঙ্কের অর্থ আদায়ের সম্ভাবনা, নির্ধারিত ফির চেয়ে বেশি টাকা নেওয়ার অভিযোগ এবং অর্থের হিসাব নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। অন্যদিকে, ভবনমালিকদের কাছ থেকে হোল্ডিং ট্যাক্সের সঙ্গে পরিচ্ছন্নতা করও আদায় করে সিটি করপোরেশন।

এরপরও বাসিন্দাদের আলাদা করে ময়লার বিল দিতে হচ্ছে। এ ব্যবস্থায় অর্থ আদায়ের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।

তবে সব ফ্ল্যাট থেকে একই হারে অর্থ আদায় করা হয় কি না, তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি। একইভাবে, সম্ভাব্য মোট আদায়ের অর্থকে ঠিকাদারদের আয় বা মুনাফা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।

এ অর্থ থেকে কর্মীদের বেতন, যানবাহনসহ বিভিন্ন পরিচালন ব্যয় মেটাতে হয়।

ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের তথ্য অনুযায়ী, সংস্থাটির আওতায় মোট হোল্ডিং বা ভবনের সংখ্যা ২ লাখ ৯৩ হাজার ৮৮১। এসব ভবনে ফ্ল্যাট রয়েছে ১৭ লাখ ৬৩ হাজার ২৮৬টি।

প্রতিটি ফ্ল্যাট থেকে মাসে ১৫০ টাকা করে আদায় করা হলে মাসে মোট অর্থের পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় ২৬ কোটি ৪৫ লাখ টাকা। বছরে তা বেড়ে দাঁড়ায় প্রায় ৩১৭ কোটি ৪০ লাখ টাকায়।

অন্যদিকে, বাসাবাড়ি থেকে বর্জ্য সংগ্রহের দায়িত্ব বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কাছে দেওয়ার বিনিময়ে সিটি করপোরেশন বছরে প্রায় ১২ কোটি টাকা পায় বলে প্রাপ্ত হিসাব থেকে জানা গেছে। অর্থাৎ, বাসিন্দাদের কাছ থেকে সম্ভাব্য অর্থ আদায়ের পরিমাণ এবং সিটি করপোরেশনের প্রাপ্ত অর্থের মধ্যে বড় ব্যবধান রয়েছে।

রাজধানীতে বাসাবাড়ি থেকে ময়লা সংগ্রহের দায়িত্ব পালন করে প্রাইভেট কনজারভেন্সি সার্ভিস প্রোভাইডার (পিসিএসপি) নামে পরিচিত বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো। এসব প্রতিষ্ঠানের কর্মীরা বাসাবাড়ি থেকে বর্জ্য সংগ্রহ করে নির্ধারিত স্থানে রাখেন। পরে সিটি করপোরেশনের গাড়িতে সেগুলো অপসারণ করা হয়।

ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন সম্পত্তির বার্ষিক ভাড়ামূল্যের ওপর ১২ শতাংশ হারে হোল্ডিং ট্যাক্স আদায় করে। এর মধ্যে হোল্ডিং কর ৭ শতাংশ, কনজারভেন্সি বা পরিচ্ছন্নতা কর ২ শতাংশ এবং সড়কবাতি কর ৩ শতাংশ।

অর্থাৎ, ভবনমালিকদের কাছ থেকে আদায় করা করের একটি অংশ পরিচ্ছন্নতা সেবার জন্য নির্ধারিত। এরপরও বাসাবাড়ি থেকে ময়লা সংগ্রহের জন্য ভাড়াটিয়া ও বাসিন্দাদের আলাদা অর্থ দিতে হচ্ছে। এ অর্থ আদায়ের যৌক্তিকতা, নির্ধারিত ফির বাস্তব প্রয়োগ এবং আদায় করা অর্থের হিসাব নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।

সিটি করপোরেশনের সিটিজেন চার্টারেও আবর্জনা অপসারণকে নাগরিক সেবার অন্যতম দায়িত্ব হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

‘স্থানীয় সরকার (সিটি করপোরেশন) আইন, ২০০৯’-এর প্রথম ভাগের দ্বিতীয় অনুচ্ছেদের ১৫ নম্বর সংজ্ঞায় কনজারভেন্সি বলতে আবর্জনা অপসারণ ও হস্তান্তরকে বোঝানো হয়েছে। তবে বাসাবাড়ি থেকে ময়লা সংগ্রহের জন্য বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের অর্থ আদায়ের ব্যবস্থা, নির্ধারিত ফি এবং এর বাস্তব প্রয়োগ নিয়ে বিতর্ক রয়েছে।

বাসাবাড়ি থেকে ময়লা অপসারণের নামে আলাদা অর্থ আদায় বন্ধের দাবিতে আদালতের দ্বারস্থ হয়েছেন সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী সালাহ উদ্দিন রিগ্যান। এ বিষয়ে তিনি সিটি করপোরেশনে লিখিত চিঠি দেওয়ার পর হাইকোর্টে রিট করেন।

ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের ৭৫টি ওয়ার্ডে পিসিএসপি কার্যক্রম পরিচালনার জন্য ওয়ার্ডভিত্তিক ঠিকাদার রয়েছে। এর মধ্যে ১ নম্বর ওয়ার্ডের দায়িত্বে রয়েছে দ্য কন্টিনেন্টাল বিল্ডার্স।

প্রতিষ্ঠানটির দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, তাদের ২৯টি গাড়ি রয়েছে। ওয়ার্ডটিতে হোল্ডিংয়ের সংখ্যা প্রায় সাড়ে চার হাজার এবং ফ্ল্যাট প্রায় ১৪ হাজার।

প্রতি ফ্ল্যাট থেকে মাসে গড়ে ১৫০ টাকা করে আদায় করা হলে এ ওয়ার্ডে মাসে অর্থের পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় ২১ লাখ টাকা। বছরে তা হয় প্রায় ২ কোটি ৫২ লাখ টাকা। প্রতিষ্ঠানটির দাবি, ঠিকাদারি পেতে সিটি করপোরেশনকে দিতে হয়েছে ১৭ লাখ টাকা।

তবে এ হিসাব সম্ভাব্য মোট আদায়ের। প্রকৃত আদায়, কর্মীদের বেতন, যানবাহন রক্ষণাবেক্ষণসহ অন্যান্য পরিচালন ব্যয় এবং ঠিকাদারি চুক্তির শর্ত যাচাই না করে এ অর্থকে মুনাফা বলা যায় না।

অভিযোগ রয়েছে, সিটি করপোরেশনের নির্ধারিত ১০০ টাকার পরিবর্তে কোনো কোনো ঠিকাদার বাসা বা ফ্ল্যাট থেকে মাসে ১৫০ থেকে ২৫০ টাকা পর্যন্ত আদায় করছেন।

১ নম্বর ওয়ার্ডের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান কন্টিনেন্টাল বিল্ডার্সের পক্ষ থেকে নির্ধারিত ফির চেয়ে বেশি অর্থ নেওয়ার বিষয়টি স্বীকার করা হয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, ‘বাসিন্দারা স্বেচ্ছায় খুশি হয়ে বেশি টাকা দেন।’

তবে অতিরিক্ত অর্থ নেওয়ার ক্ষেত্রে বাসিন্দাদের সম্মতি রয়েছে কি না, নির্ধারিত ফির বাইরে অর্থ আদায়ের অনুমতি আছে কি না এবং এ বিষয়ে সিটি করপোরেশনের নির্দেশনা মানা হচ্ছে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।

ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের ৬৬ নম্বর ওয়ার্ডের পিসিএসপি ঠিকাদার মেসার্স মুন্সী ট্রেডার্সের রসিদেও ১০০ টাকার বেশি অর্থ আদায়ের তথ্য দেখা গেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রধান বর্জ্য ব্যবস্থাপক এয়ার কমডোর মো. মাহবুবুর রহমান তালুকদার বলেন, সিটি করপোরেশনের নিজস্ব সক্ষমতা না থাকলে বিধিমালা অনুযায়ী বেসরকারি প্রতিষ্ঠানকে বাসাবাড়ি থেকে ময়লা সংগ্রহের দায়িত্ব দেওয়া হয়।

তিনি বলেন, বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মীরা বাসাবাড়ি থেকে বর্জ্য সংগ্রহ করে নির্ধারিত স্থানে রাখেন। পরে সিটি করপোরেশনের গাড়ি সেখান থেকে বর্জ্য সরিয়ে নেয়।

ডিএসসিসির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মো. খয়বর রহমান বলেন, নাগরিকদের অভিযোগ জানানোর জন্য সিটি করপোরেশনের ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম রয়েছে। সেখানে অভিযোগ করা হলে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

বাসাবাড়ি থেকে ময়লা সংগ্রহের নামে অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের অভিযোগ দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) নজরেও এসেছে। অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে বিষয়টি অনুসন্ধান করছে সংস্থাটি। গত ১৬ সেপ্টেম্বর ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনে অভিযানও পরিচালনা করে দুদক।

দুদকের সহকারী পরিচালক রাজু আহমেদ বলেন, বাসাবাড়ি থেকে জিম্মি করে টাকা আদায় করা হয় এবং টাকা না দিলে ময়লা ফেলে রাখা হয়—এমন অভিযোগ পাওয়া গেছে।

তিনি বলেন, তাঁরা সিটি করপোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তার সঙ্গে যোগাযোগ করেছিলেন। প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা তাঁদের জানিয়েছেন, অভিযোগ জানাতে একটি ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম রয়েছে এবং সেখানে অভিযোগ করলে সমাধান পাওয়া যাবে।

বাসাবাড়ি থেকে ময়লা সংগ্রহের জন্য নির্ধারিত ফির চেয়ে বেশি অর্থ আদায়ের অভিযোগ, পরিচ্ছন্নতা করের পরও আলাদা বিল এবং ঠিকাদারি ব্যবস্থায় অর্থের প্রবাহ—সব মিলিয়ে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নিয়ে প্রশ্ন বাড়ছে।

নাগরিকদের কাছ থেকে আদায় করা অর্থের প্রকৃত পরিমাণ, ঠিকাদারদের আয়-ব্যয়ের হিসাব, নির্ধারিত ফির বাইরে অর্থ আদায়ের বৈধতা এবং অনিয়মের অভিযোগে নেওয়া ব্যবস্থার তথ্য প্রকাশ করা হলে এ খাতে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা সহজ হবে। একই সঙ্গে পরিচ্ছন্নতা করের বিনিময়ে নাগরিকেরা কী সেবা পাচ্ছেন, সেটিও স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন।

Tag :

আপনার মতামত লিখুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল ও অন্যান্য তথ্য সঞ্চয় করে রাখুন

আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

সওজের প্রকৌশলী শাহনুর রশিদকে ঘিরে দুর্নীতির অভিযোগ

ময়লার বিল থেকে বছরে ৩১৭ কোটি টাকা আদায়, সিটি করপোরেশন পায় ১২ কোটি-বাকি টাকা যায় কোথায়?

আপডেট সময় ০৮:৩৩:৫৯ অপরাহ্ন, শনিবার, ১৭ অক্টোবর ২০২৬

রাজধানীর ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি) এলাকায় বাসাবাড়ি থেকে ময়লা সংগ্রহের জন্য বাসিন্দাদের কাছ থেকে মাসে ১৫০ থেকে ২৫০ টাকা পর্যন্ত আদায়ের অভিযোগ রয়েছে।

সিটি করপোরেশনের তথ্য অনুযায়ী, এ এলাকায় ফ্ল্যাটের সংখ্যা ১৭ লাখ ৬৩ হাজারের বেশি। প্রতিটি ফ্ল্যাট থেকে মাসে ১৫০ টাকা করে আদায় করা হলে বছরে অর্থের পরিমাণ দাঁড়ায় ৩১৭ কোটি টাকার বেশি। অথচ বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে এই সেবা পরিচালনার বিপরীতে সিটি করপোরেশন বছরে পায় প্রায় ১২ কোটি টাকা।

বাসাবাড়ি থেকে ময়লা সংগ্রহের নামে বিপুল অঙ্কের অর্থ আদায়ের সম্ভাবনা, নির্ধারিত ফির চেয়ে বেশি টাকা নেওয়ার অভিযোগ এবং অর্থের হিসাব নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। অন্যদিকে, ভবনমালিকদের কাছ থেকে হোল্ডিং ট্যাক্সের সঙ্গে পরিচ্ছন্নতা করও আদায় করে সিটি করপোরেশন।

এরপরও বাসিন্দাদের আলাদা করে ময়লার বিল দিতে হচ্ছে। এ ব্যবস্থায় অর্থ আদায়ের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।

তবে সব ফ্ল্যাট থেকে একই হারে অর্থ আদায় করা হয় কি না, তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি। একইভাবে, সম্ভাব্য মোট আদায়ের অর্থকে ঠিকাদারদের আয় বা মুনাফা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।

এ অর্থ থেকে কর্মীদের বেতন, যানবাহনসহ বিভিন্ন পরিচালন ব্যয় মেটাতে হয়।

ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের তথ্য অনুযায়ী, সংস্থাটির আওতায় মোট হোল্ডিং বা ভবনের সংখ্যা ২ লাখ ৯৩ হাজার ৮৮১। এসব ভবনে ফ্ল্যাট রয়েছে ১৭ লাখ ৬৩ হাজার ২৮৬টি।

প্রতিটি ফ্ল্যাট থেকে মাসে ১৫০ টাকা করে আদায় করা হলে মাসে মোট অর্থের পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় ২৬ কোটি ৪৫ লাখ টাকা। বছরে তা বেড়ে দাঁড়ায় প্রায় ৩১৭ কোটি ৪০ লাখ টাকায়।

অন্যদিকে, বাসাবাড়ি থেকে বর্জ্য সংগ্রহের দায়িত্ব বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কাছে দেওয়ার বিনিময়ে সিটি করপোরেশন বছরে প্রায় ১২ কোটি টাকা পায় বলে প্রাপ্ত হিসাব থেকে জানা গেছে। অর্থাৎ, বাসিন্দাদের কাছ থেকে সম্ভাব্য অর্থ আদায়ের পরিমাণ এবং সিটি করপোরেশনের প্রাপ্ত অর্থের মধ্যে বড় ব্যবধান রয়েছে।

রাজধানীতে বাসাবাড়ি থেকে ময়লা সংগ্রহের দায়িত্ব পালন করে প্রাইভেট কনজারভেন্সি সার্ভিস প্রোভাইডার (পিসিএসপি) নামে পরিচিত বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো। এসব প্রতিষ্ঠানের কর্মীরা বাসাবাড়ি থেকে বর্জ্য সংগ্রহ করে নির্ধারিত স্থানে রাখেন। পরে সিটি করপোরেশনের গাড়িতে সেগুলো অপসারণ করা হয়।

ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন সম্পত্তির বার্ষিক ভাড়ামূল্যের ওপর ১২ শতাংশ হারে হোল্ডিং ট্যাক্স আদায় করে। এর মধ্যে হোল্ডিং কর ৭ শতাংশ, কনজারভেন্সি বা পরিচ্ছন্নতা কর ২ শতাংশ এবং সড়কবাতি কর ৩ শতাংশ।

অর্থাৎ, ভবনমালিকদের কাছ থেকে আদায় করা করের একটি অংশ পরিচ্ছন্নতা সেবার জন্য নির্ধারিত। এরপরও বাসাবাড়ি থেকে ময়লা সংগ্রহের জন্য ভাড়াটিয়া ও বাসিন্দাদের আলাদা অর্থ দিতে হচ্ছে। এ অর্থ আদায়ের যৌক্তিকতা, নির্ধারিত ফির বাস্তব প্রয়োগ এবং আদায় করা অর্থের হিসাব নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।

সিটি করপোরেশনের সিটিজেন চার্টারেও আবর্জনা অপসারণকে নাগরিক সেবার অন্যতম দায়িত্ব হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

‘স্থানীয় সরকার (সিটি করপোরেশন) আইন, ২০০৯’-এর প্রথম ভাগের দ্বিতীয় অনুচ্ছেদের ১৫ নম্বর সংজ্ঞায় কনজারভেন্সি বলতে আবর্জনা অপসারণ ও হস্তান্তরকে বোঝানো হয়েছে। তবে বাসাবাড়ি থেকে ময়লা সংগ্রহের জন্য বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের অর্থ আদায়ের ব্যবস্থা, নির্ধারিত ফি এবং এর বাস্তব প্রয়োগ নিয়ে বিতর্ক রয়েছে।

বাসাবাড়ি থেকে ময়লা অপসারণের নামে আলাদা অর্থ আদায় বন্ধের দাবিতে আদালতের দ্বারস্থ হয়েছেন সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী সালাহ উদ্দিন রিগ্যান। এ বিষয়ে তিনি সিটি করপোরেশনে লিখিত চিঠি দেওয়ার পর হাইকোর্টে রিট করেন।

ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের ৭৫টি ওয়ার্ডে পিসিএসপি কার্যক্রম পরিচালনার জন্য ওয়ার্ডভিত্তিক ঠিকাদার রয়েছে। এর মধ্যে ১ নম্বর ওয়ার্ডের দায়িত্বে রয়েছে দ্য কন্টিনেন্টাল বিল্ডার্স।

প্রতিষ্ঠানটির দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, তাদের ২৯টি গাড়ি রয়েছে। ওয়ার্ডটিতে হোল্ডিংয়ের সংখ্যা প্রায় সাড়ে চার হাজার এবং ফ্ল্যাট প্রায় ১৪ হাজার।

প্রতি ফ্ল্যাট থেকে মাসে গড়ে ১৫০ টাকা করে আদায় করা হলে এ ওয়ার্ডে মাসে অর্থের পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় ২১ লাখ টাকা। বছরে তা হয় প্রায় ২ কোটি ৫২ লাখ টাকা। প্রতিষ্ঠানটির দাবি, ঠিকাদারি পেতে সিটি করপোরেশনকে দিতে হয়েছে ১৭ লাখ টাকা।

তবে এ হিসাব সম্ভাব্য মোট আদায়ের। প্রকৃত আদায়, কর্মীদের বেতন, যানবাহন রক্ষণাবেক্ষণসহ অন্যান্য পরিচালন ব্যয় এবং ঠিকাদারি চুক্তির শর্ত যাচাই না করে এ অর্থকে মুনাফা বলা যায় না।

অভিযোগ রয়েছে, সিটি করপোরেশনের নির্ধারিত ১০০ টাকার পরিবর্তে কোনো কোনো ঠিকাদার বাসা বা ফ্ল্যাট থেকে মাসে ১৫০ থেকে ২৫০ টাকা পর্যন্ত আদায় করছেন।

১ নম্বর ওয়ার্ডের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান কন্টিনেন্টাল বিল্ডার্সের পক্ষ থেকে নির্ধারিত ফির চেয়ে বেশি অর্থ নেওয়ার বিষয়টি স্বীকার করা হয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, ‘বাসিন্দারা স্বেচ্ছায় খুশি হয়ে বেশি টাকা দেন।’

তবে অতিরিক্ত অর্থ নেওয়ার ক্ষেত্রে বাসিন্দাদের সম্মতি রয়েছে কি না, নির্ধারিত ফির বাইরে অর্থ আদায়ের অনুমতি আছে কি না এবং এ বিষয়ে সিটি করপোরেশনের নির্দেশনা মানা হচ্ছে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।

ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের ৬৬ নম্বর ওয়ার্ডের পিসিএসপি ঠিকাদার মেসার্স মুন্সী ট্রেডার্সের রসিদেও ১০০ টাকার বেশি অর্থ আদায়ের তথ্য দেখা গেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রধান বর্জ্য ব্যবস্থাপক এয়ার কমডোর মো. মাহবুবুর রহমান তালুকদার বলেন, সিটি করপোরেশনের নিজস্ব সক্ষমতা না থাকলে বিধিমালা অনুযায়ী বেসরকারি প্রতিষ্ঠানকে বাসাবাড়ি থেকে ময়লা সংগ্রহের দায়িত্ব দেওয়া হয়।

তিনি বলেন, বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মীরা বাসাবাড়ি থেকে বর্জ্য সংগ্রহ করে নির্ধারিত স্থানে রাখেন। পরে সিটি করপোরেশনের গাড়ি সেখান থেকে বর্জ্য সরিয়ে নেয়।

ডিএসসিসির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মো. খয়বর রহমান বলেন, নাগরিকদের অভিযোগ জানানোর জন্য সিটি করপোরেশনের ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম রয়েছে। সেখানে অভিযোগ করা হলে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

বাসাবাড়ি থেকে ময়লা সংগ্রহের নামে অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের অভিযোগ দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) নজরেও এসেছে। অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে বিষয়টি অনুসন্ধান করছে সংস্থাটি। গত ১৬ সেপ্টেম্বর ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনে অভিযানও পরিচালনা করে দুদক।

দুদকের সহকারী পরিচালক রাজু আহমেদ বলেন, বাসাবাড়ি থেকে জিম্মি করে টাকা আদায় করা হয় এবং টাকা না দিলে ময়লা ফেলে রাখা হয়—এমন অভিযোগ পাওয়া গেছে।

তিনি বলেন, তাঁরা সিটি করপোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তার সঙ্গে যোগাযোগ করেছিলেন। প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা তাঁদের জানিয়েছেন, অভিযোগ জানাতে একটি ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম রয়েছে এবং সেখানে অভিযোগ করলে সমাধান পাওয়া যাবে।

বাসাবাড়ি থেকে ময়লা সংগ্রহের জন্য নির্ধারিত ফির চেয়ে বেশি অর্থ আদায়ের অভিযোগ, পরিচ্ছন্নতা করের পরও আলাদা বিল এবং ঠিকাদারি ব্যবস্থায় অর্থের প্রবাহ—সব মিলিয়ে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নিয়ে প্রশ্ন বাড়ছে।

নাগরিকদের কাছ থেকে আদায় করা অর্থের প্রকৃত পরিমাণ, ঠিকাদারদের আয়-ব্যয়ের হিসাব, নির্ধারিত ফির বাইরে অর্থ আদায়ের বৈধতা এবং অনিয়মের অভিযোগে নেওয়া ব্যবস্থার তথ্য প্রকাশ করা হলে এ খাতে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা সহজ হবে। একই সঙ্গে পরিচ্ছন্নতা করের বিনিময়ে নাগরিকেরা কী সেবা পাচ্ছেন, সেটিও স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন।