হাজার হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে গৃহীত মেগা প্রকল্পের পেছনে সরকারের মূল লক্ষ্য থাকে নগরবাসীকে উন্নত সেবা প্রদান ও টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করা। তবে সঠিক মাস্টারপ্ল্যান ও সমন্বয়ের অভাব থাকলে সেই বিশাল অবকাঠামো কীভাবে কেবল অর্থের অপচয়ে পরিণত হয়, তার জলজ্যান্ত দৃষ্টান্ত হয়ে দাঁড়িয়েছে ঢাকা ওয়াসার সাড়ে ৩ হাজার কোটি টাকার দাশেরকান্দি পয়ঃবর্জ্য শোধনাগার। দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম বৃহত্তম এই একক পয়োশোধনাগারটি চালুর মাত্র তিন বছরের মাথায় আবারও ১ হাজার ৪৪ কোটি ৯২ লাখ টাকার নতুন প্রকল্প ঝুলিয়ে দেওয়া হচ্ছে সরকারের কাঁধে। মূল শোধনাগার তৈরির সময় সংযোগ নেটওয়ার্ক বা ড্রেনেজ লাইনের বিষয়টি সঠিকভাবে পরিকল্পনায় না রাখার খেসারত হিসেবেই আবার হাজার কোটি টাকার এই বাড়তি বিনিয়োগের প্রস্তাব উঠেছে, যা ওয়াসার ভেতরের তথাকথিত ‘প্রকল্প বাণিজ্য’ ও দীর্ঘদিনের চরম অনিয়মকে পুনরায় সামনে নিয়ে এসেছে।
পরিকল্পনার মারাত্মক ভুলের কারণে ২০২৩ সালে চালু হওয়া প্রতিদিন ৬০ কোটি লিটার সক্ষমতার এই শোধনাগারটি শুষ্ক মৌসুমে ব্যবহার করা যাচ্ছে অর্ধেকেরও কম, যার পরিমাণ দৈনিক মাত্র ২৮ কোটি লিটার বা সক্ষমতার ৪৬ দশমিক ৭ শতাংশ। গুলশান, বনানী, বারিধারা, মহাখালী ও বাড্ডার মতো বিস্তীর্ণ ও জনবহুল এলাকার পয়োনিষ্কাশন ব্যবস্থার সাথে এই শোধনাগারটির কোনো সরাসরি সংযোগ পাইপলাইন তৈরি করা হয়নি। ফলে মূল অবকাঠামো দাঁড়িয়ে থাকলেও পয়োবর্জ্য শোধনাগার পর্যন্ত পৌঁছাতেই পারছে না। এমনকি প্রকল্প সচল রাখার তাগিদে বর্তমানে বাধ্য হয়ে হাতিরঝিল থেকে ময়লা পানি টেনে এনে পরিশোধন শেষে রামপুরা খালে ফেলা হচ্ছে। অথচ চীনের এক্সিম ব্যাংকের দেওয়া ২ হাজার ৩৬৬ কোটি টাকার ঋণের ভারী কিস্তি ২০ ২৭ সাল থেকেই পরিশোধ করা শুরু করতে হবে। আগের প্রকল্পের সুবিধা শতভাগ পাওয়ার আগেই শুধু সংযোগ লাইনের অভাব মেটাতে স্থানীয় সরকার বিভাগের মাধ্যমে পরিকল্পনা কমিশনে পাঠানো হয়েছে নতুন এক হাজার ৪৪ কোটি টাকার প্রকল্প, যার সিংহভাগ অর্থাৎ সাড়ে ৯ শত কোটি টাকাই খরচ হবে পাইপলাইন ও স্যুয়ারেজ লিফটিং স্টেশন নির্মাণে।
বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের সাম্প্রতিক প্রভাব মূল্যায়ন সমীক্ষায় উঠে এসেছে এই অপরিকল্পিত উদ্যোগের করুণ বাস্তব চিত্র। মতিঝিল, গেন্ডারিয়া ও রামপুরার সিংহভাগ মানুষ এখনো মারাত্মক দুর্গন্ধ ও দূষণের সুনির্দিষ্ট অভিযোগ করছেন। এছাড়া প্রকল্পটিতে ট্রাবলশুটিংয়ের জন্য মাত্রাতিরিক্ত বিদেশনির্ভরতা, বিদ্যুৎ সংকট, স্লাজ ব্যবস্থাপনার অভাব ও ঋণ পরিশোধের মতো বড় ধরনের ঝুঁকি বিরাজ করছে। বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠান ও বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের মতো বিশেষজ্ঞ সংস্থাগুলোর মতে, ভূপ্রকৃতি ও মূল লক্ষ্য বিবেচনা না করে খণ্ডিত নেটওয়ার্কের নামে একের পর এক ব্যয়বহুল প্রকল্প গ্রহণ মূলত এক ধরনের প্রকল্প বাণিজ্যে রূপ নিয়েছে, যা সায়েদাবাদ পানি শোধনাগার পর্যায়-৩ বা ঢাকা সেনিটেশন প্রকল্পের মতো অন্যান্য উদ্যোগেও দৃশ্যমান।
এই বিশাল ব্যর্থতা ও অপচয়ের পেছনে প্রশাসনিক নেতৃত্বের বিতর্ক ও দুর্নীতিকেও দায়ী করছেন সংশ্লিষ্টরা। বিদায়ী সরকারের প্রভাবশালীদের ছত্রছায়ায় থাকা এবং সাবেক বিতর্কিত ব্যবস্থাপনা পরিচালকের আস্থাভাজন হিসেবে পরিচিত মোস্তফা কামাল মজুমদার এবং মমতাজুর রহমানের মতো কর্মকর্তারা এখনো এসব গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প ও প্রশাসনিক পদে বহাল তবিয়তে নেতৃত্ব দিচ্ছেন। পিডি পদে দায়িত্ব পালন করা মোস্তফা কামাল মজুমদারের বিরুদ্ধে ইতিপূর্বে দুর্নীতি দমন কমিশনের তদন্ত প্রক্রিয়া শুরু হলেও দলীয় প্রভাবে তা ধামাচাপা পড়ে যাওয়ার অভিযোগ রয়েছে। এ বিষয়ে ঢাকা ওয়াসার বর্তমান ব্যবস্থাপনা পরিচালক এবং জনসংযোগ বিভাগে বারবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও দায়িত্বশীল কারও বক্তব্য পাওয়া সম্ভব হয়নি। সব মিলিয়ে সময়োপযোগী পরিকল্পনা ছাড়া মেগা প্রকল্প গ্রহণের এই সংস্কৃতি একদিকে যেমন সরকারের বিপুল অর্থ ড্রেনেই ভাসিয়ে দিচ্ছে, অন্যদিকে জনগণের প্রাপ্ত সেবাকেও রাখছে শূন্যের কোঠায়।
নিজস্ব প্রতিবেদক 




















