সরকারি চাকরির নিয়োগ পরীক্ষার প্রশ্নফাঁসে গড়ে উঠেছে দেশজুড়ে এক বিশাল ও সংঘবদ্ধ সিন্ডিকেট। প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়, পরিবেশ অধিদপ্তর, খাদ্য মন্ত্রণালয়, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর), বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস), বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিল, বাংলাদেশ বিজ্ঞান ও শিল্প গবেষণা পরিষদ (বিসিএসআইআর) এবং মাইক্রোক্রেডিট রেগুলেটরি অথরিটির মতো গুরুত্বপূর্ণ সরকারি দপ্তরের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নিয়ে গঠিত এই চক্রটি দীর্ঘদিন ধরে প্রশ্ন সংগ্রহ, হাতবদল ও গোপন বুথে পরীক্ষার্থীদের মুখস্থ করানোর অবৈধ বাণিজ্য চালিয়ে আসছিল। শেষ সম্বলটুকু খরচ করে প্রার্থীরা যখন পরীক্ষার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন, ঠিক তখনই আগের রাতে গোপন আস্তানায় পৌঁছে যেত ফাঁস হওয়া প্রশ্ন। যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের সহকারী উপজেলা যুব উন্নয়ন কর্মকর্তা পদে নিয়োগ পরীক্ষার প্রশ্নফাঁসের সূত্র ধরে এসআরবির অভিযানে চক্রের চাঞ্চল্যকর তথ্য বেরিয়ে এসেছে।
মামলা ও আইনি পদক্ষেপ
যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের সহকারী উপজেলা যুব উন্নয়ন কর্মকর্তা পদে প্রশ্নফাঁসের এই ঘটনায় এরইমধ্যে রাজধানীর মতিঝিল থানায় একটি মামলা দায়ের করা হয়েছে। মামলার বাদী যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের উপপরিচালক আতিকুর রহমান। তিনি প্রবাসী সাংবাদিক আব্দুল্লাহ আল ইমরানের ফেসবুক পোস্টে প্রকাশিত প্রশ্নফাঁসের তথ্য ও প্রমাণগুলোকে মামলার ভিত্তি হিসেবে উল্লেখ করেছেন। এদিকে পুরো চক্রটিকে পাকড়াও করতে গত ১৪ থেকে ১৬ অক্টোবর পর্যন্ত রাজধানীর বিভিন্ন স্থানে সাঁড়াশি অভিযান চালায় এসআরবি। অভিযানে গ্রেপ্তারকৃত সাতজনের কাছ থেকে ১১৬টি ১০০ টাকার স্ট্যাম্প, চারটি ৫০ টাকার স্ট্যাম্প, এক সেট প্রশ্নপত্র, বিভিন্ন পরীক্ষার ১৯ পাতা প্রবেশপত্র, ২৫টি সার্টিফিকেট, ৪৯টি ব্যাংক চেক ও চেকের পাতা, আটটি মোবাইল ফোন, ছয়টি জাতীয় পরিচয়পত্র এবং নগদ চার হাজার টাকা জব্দ করা হয়।
১১টি সরকারি নিয়োগ পরীক্ষায় প্রশ্নফাঁসের থাবা
গ্রেপ্তারকৃতদের দেওয়া তথ্য, তাদের মোবাইল ফোন এবং হোয়াটসঅ্যাপের চ্যাট হিস্ট্রি পর্যালোচনা করে অন্তত ১১টি গুরুত্বপূর্ণ সরকারি নিয়োগ পরীক্ষার প্রশ্নফাঁসের প্রাথমিক তথ্য ও প্রমাণ মিলেছে। এসব পরীক্ষার মধ্যে রয়েছে উপজেলা সহকারী যুব উন্নয়ন কর্মকর্তা, হিসাব সহকারী, প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর, উপ খাদ্য পরিদর্শক, খাদ্য মন্ত্রণালয়, প্রাথমিক শিক্ষক নিয়োগ পরীক্ষা, বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিলের বিভিন্ন পদের নিয়োগ পরীক্ষা, অডিটর, কন্ট্রোলার জেনারেল ডিফেন্স ফাইন্যান্স (সিজিডিএফ), পরিবেশ অধিদপ্তর, নির্বাচন কমিশনের বিভিন্ন পদের নিয়োগ পরীক্ষা, মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ডের বিভিন্ন পদের নিয়োগ পরীক্ষা এবং রাজশাহী পোস্টাল অপারেটর ও মেইল অপারেটর নিয়োগ পরীক্ষা।
চক্রের শেকড় ও বহুস্তরীয় নেটওয়ার্ক
অনুসন্ধান সংশ্লিষ্ট তথ্য বলছে, এই প্রশ্নফাঁস চক্রের একেবারে কেন্দ্রে বা মূল সমন্বয়কের ভূমিকায় রয়েছেন বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর পরিসংখ্যান কর্মকর্তা সুজিত গোপ। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী তাকে এখনো গ্রেপ্তার করতে পারেনি, তবে তার গা ঢাকা দেওয়ার পেছনেও রয়েছে বিশেষ কারণ। সুজিত গোপের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ রেখে কাজ করতেন প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের অফিস সহকারী আসাদুল হাবিব, একটি ট্যাক্স ফার্মের কর্মচারী নূর মোহাম্মদ, জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের নিম্নমান সহকারী বা পেশকার জাহাঙ্গীর আলম এবং চক্রের সদস্য এস এম এমদাদুল রহমান।
প্রশ্ন ও তথ্য ছড়িয়ে পড়ার প্রাথমিক ধাপ পার হয়ে তা চলে যেত মফিজুল ইসলাম ওরফে রাফি ও হাসিনুর রহমান সুজন নামের দুজনের কাছে। সেখান থেকে প্রশ্ন পৌঁছাত পরিবেশ অধিদপ্তরের ডাটা এন্ট্রি অপারেটর মোহাম্মদ রুবেল ইসলামের হাতে। রুবেল ২০২০ সালের দিকে অনলাইন ফরম পূরণ ও প্রিন্টিংয়ের কাজ করতে গিয়ে এই চক্রের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েন।
এরপরের স্তরে কাজ করতেন বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিলের সহকারী পরিচালক (সংস্থাপন) সোহাগ ফকির। তার মাধ্যমে প্রশ্ন চলে যেত সিরাজগঞ্জের জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক ও ৩৬তম বিসিএসের কর্মকর্তা মো. হারুন অর রশিদের হাতে। হারুন ও সোহাগ দুজনেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ছিলেন এবং ছাত্রজীবন থেকেই তাদের মধ্যে ঘনিষ্ঠতা ছিল। এই সিন্ডিকেটের বাইরে আরও তিন কর্মকর্তা—বিসিএসআইআরের ডাটা এন্ট্রি অপারেটর মো. কাজল আহমেদ, মাইক্রোক্রেডিট রেগুলেটরি অথরিটির সহকারী পরিচালক মো. রাফিউল ইসলাম এবং ভারতখালী উচ্চ বিদ্যালয়ের সিনিয়র শিক্ষক হরি প্রসাদ রায় সক্রিয় ছিলেন। অনুসন্ধানে আরও জানা যায়, সোহাগ ফকির নুসরাত জাহান নামের এক পরীক্ষার্থীকে নিজের স্ত্রী পরিচয় দিয়ে রুবেলের কাছ থেকে যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের প্রশ্ন সংগ্রহ করেছিলেন।
গোপন বুথ ও উত্তর মুখস্থ করানোর অপকৌশল
এই বহুস্তরীয় নেটওয়ার্কের একেবারে শেষ ধাপে কাজ করত মাঠপর্যায়ের কর্মীরা। পরীক্ষার আগের রাতে চুক্তিভিত্তিক নির্দিষ্ট পরীক্ষার্থীদের রাজধানীর বিভিন্ন এলাকার গোপন বাসা বা বুথে একত্রিত করা হতো। সেখানে তাদের ফাঁস হওয়া প্রশ্ন ও উত্তর সরবরাহ করে ভালোভাবে মুখস্থ করানো হতো। মতিঝিল এলাকায় এম এস এমদাদুল রহমান নিজের গোপন বুথে যুব উন্নয়ন পরীক্ষার ১৫ জন পরীক্ষার্থীকে প্রশ্ন পড়িয়েছিলেন। অন্যদিকে মিরপুরের কালশী রোডের পাশের একটি গোপন বুথে পরীক্ষার্থীদের প্রশ্ন মুখস্থ করানোর দায়িত্ব পালন করতেন মো. রাফিউল ইসলাম। এভাবে পরীক্ষার হলে যাওয়ার আগেই পরীক্ষার্থীরা প্রশ্নের উত্তর জেনে যাওয়ার সুযোগ পেতেন।
বিশেষজ্ঞ মতামত ও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ
বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী নাদিম মাহমুদ বলেন, সরকারি নিয়োগ পরীক্ষার প্রশ্নফাঁস এবং অর্থের বিনিময়ে চাকরি পাইয়ে দেওয়ার অভিযোগ নিয়োগ ব্যবস্থার স্বচ্ছতা, নিরপেক্ষতা ও প্রতিযোগিতার সমতা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তৈরি করে। হাজারো চাকরিপ্রার্থী বৈধ পথে প্রস্তুতি নিয়ে অংশগ্রহণ করলেও মেধা ও যোগ্যতাভিত্তিক নিয়োগের মূল উদ্দেশ্য এর মাধ্যমে ব্যাহত হচ্ছে।
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, প্রশ্নফাঁসের বিষয়টি বর্তমানে একটি সিস্টেমে বা প্রাতিষ্ঠানিক রূপ লাভ করেছে। তিনি আরও বলেন, কেবল সামনের সারির কয়েকজন কর্মচারীকে গ্রেপ্তার করলেই এর সমাধান মিলবে না। মন্ত্রণালয় বা প্রশ্ন কর্তৃপক্ষের সরাসরি সংশ্লিষ্টতা ছাড়া এ ধরনের প্রশ্নফাঁস কোনোভাবেই সম্ভব নয়। সর্ষের মধ্যেই ভূত লুকিয়ে রয়েছে উল্লেখ করে তিনি এই অপরাধের পেছনে থাকা বৃহত্তর শক্তি, যোগসাজশকারী এবং সুরক্ষাকারীদের চিহ্নিত করে কঠোর জবাবদিহি নিশ্চিত করার দাবি জানান।
সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বক্তব্য
এসআরবি মিডিয়া সেন্টারে আয়োজিত এক প্রেস ব্রিফিংয়ে এসআরবি-৩-এর অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল ফায়েজুল আরেফীন জানান, গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে অভিযান চালিয়ে চক্রের মূল সাত সদস্যকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। হোয়াটসঅ্যাপে ভুয়া পরিচয় ব্যবহার করে প্রশ্নপত্র সংগ্রহ ও বিতরণের সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
এদিকে যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী মো. আমিনুল হক বলেন, প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনা সামনে আসার সঙ্গে সঙ্গেই গত ১০ অক্টোবরের নির্ধারিত পরীক্ষা বাতিল করে তদন্ত কমিটি গঠন করা হয় এবং পরবর্তীতে ১৬ অক্টোবর পরীক্ষাটি স্বচ্ছতার সঙ্গে আয়োজনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী কিংবা বাইরে থেকে যেই জড়িত থাক না কেন, তদন্তে প্রকৃত সত্য উদ্ঘাটন করে তাদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হবে, যাতে ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনার আর পুনরাবৃত্তি না ঘটে।
নিজস্ব প্রতিবেদক 






















