সরকারি নিয়োগ পরীক্ষার প্রশ্নফাঁস ও কোটি টাকার অবৈধ বাণিজ্যের মূল কারিগর বা মূল হোতা হলেন বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর পরিসংখ্যান কর্মকর্তা সুজিত গোপ। একের পর এক সরকারি নিয়োগ পরীক্ষায় বেকার তরুণ-তরুণীদের স্বপ্নের সুযোগ ভেস্তে দিয়ে গড়ে তোলা এই বিশাল প্রশ্নফাঁস সিন্ডিকেটের কেন্দ্রে রয়েছেন তিনি। পুরো অপকর্মের মূল সমন্বয়কের ভূমিকা পালন করতেন এই সুজিত গোপ। অনুসন্ধানে অন্তত ১১টি সরকারি নিয়োগ পরীক্ষার প্রশ্নফাঁসে সুজিত গোপ ও তার সহযোগীদের গঠিত বহুমাত্রিক নেটওয়ার্কের সরাসরি সংশ্লিষ্টতার প্রমাণ মিলেছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে গ্রেপ্তার এড়াতে সুজিত গোপ বর্তমানে গা ঢাকা দিয়ে থাকলেও তাকে গ্রেপ্তার করা গেলে এই চক্রের পেছনের অন্য কোনো উচ্চপর্যায়ের মদদদাতা রয়েছে কি না, সে সম্পর্কিত বিস্তারিত তথ্য বেরিয়ে আসবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
সুজিত গোপের সঙ্গে সক্রিয় সহযোগীরা
অনুসন্ধান ও তদন্ত সূত্রে জানা যায়, পরিসংখ্যান কর্মকর্তা সুজিত গোপের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ রেখে এই নেটওয়ার্ককে গতিশীল রাখতেন একাধিক স্তরের সহযোগীরা। সুজিত গোপের কাছ থেকে প্রাপ্ত প্রশ্ন ও তথ্য ছড়িয়ে দেওয়ার প্রাথমিক ধাপে সরাসরি কাজ করতেন প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের অফিস সহকারী আসাদুল হাবিব, একটি ট্যাক্স ফার্মের কর্মচারী নূর মোহাম্মদ, জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের নিম্নমান সহকারী বা পেশকার জাহাঙ্গীর আলম এবং চক্রের অন্যতম সদস্য এস এম এমদাদুল রহমান। এর মধ্যে মতিঝিল এলাকায় সিট পড়া পরীক্ষার্থীদের গোপন বুথে বসিয়ে প্রশ্নের উত্তর মুখস্থ করানোর কাজটি সরাসরি পরিচালনা করতেন এস এম এমদাদুল রহমান।
পরবর্তী স্তর ও মাঠপর্যায়ের সহযোগী নেটওয়ার্ক
প্রথম ধাপে সুজিত গোপ ও তার মূল সহযোগীদের কাছ থেকে প্রশ্ন ও উত্তর চলে যেত চক্রের পরবর্তী স্তরের সহযোগীদের হাতে। এই ধাপে প্রশ্ন পৌঁছে যেত মফিজুল ইসলাম ওরফে রাফি ও হাসিনুর রহমান সুজনের কাছে। তাদের কাছ থেকে প্রশ্ন যেত পরিবেশ অধিদপ্তরের ডাটা এন্ট্রি অপারেটর মোহাম্মদ রুবেল ইসলামের কাছে। এরপর রুবেল ইসলামের কাছ থেকে প্রশ্ন সংগ্রহ করতেন বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিলের সহকারী পরিচালক (সংস্থাপন) সোহাগ ফকির।
সোহাগ ফকিরের সঙ্গে সিন্ডিকেট গড়ে প্রশ্ন ছড়াতেন সিরাজগঞ্জের জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক ও ৩৬তম বিসিএস কর্মকর্তা মো. হারুন অর রশিদ। এই স্তরে আরও সক্রিয় ছিলেন বিসিএসআইআরের ডাটা এন্ট্রি অপারেটর মো. কাজল আহমেদ, মাইক্রোক্রেডিট রেগুলেটরি অথরিটির সহকারী পরিচালক মো. রাফিউল ইসলাম এবং ভারতখালী উচ্চ বিদ্যালয়ের সিনিয়র শিক্ষক হরি প্রসাদ রায়। এর মধ্যে মিরপুরের কালশী রোডের গোপন বুথে পরীক্ষার্থীদের প্রশ্ন মুখস্থ করানোর দায়িত্বে ছিলেন মো. রাফিউল ইসলাম।
ঘটনা ও তদন্তের অগ্রগতি
যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের সহকারী উপজেলা যুব উন্নয়ন কর্মকর্তা পদে নিয়োগ পরীক্ষার প্রশ্নফাঁস নিয়ে মামলা দায়েরের পর অনুসন্ধানে সুজিত গোপ কেন্দ্রিক এই বিশাল চক্রটির খবর উন্মোচিত হয়। স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন (এসআরবি) অভিযান চালিয়ে ইতোমধ্যে রুবেল ইসলাম, মফিজুল ইসলাম, হাসিনুর রহমান সুজন, এস এম এমদাদুল রহমান, আসাদুল ইসলাম, নূর মোহাম্মদ এবং জাহাঙ্গীর আলমকে গ্রেপ্তার করেছে।
চক্রের প্রধান মূল হোতা সুজিত গোপকে গ্রেপ্তারে বর্তমানে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযান অব্যাহত রয়েছে। তাকে গ্রেপ্তার করা সম্ভব হলে এই পুরো নেটওয়ার্কের অন্ধকার জগত নিয়ে আরও স্পষ্ট তথ্য পাওয়া যাবে বলে আশা করছেন তদন্ত সংশ্লিষ্টরা।
নিজস্ব প্রতিবেদক 























