একসময় শিক্ষকের পায়ের শব্দে শ্রেণিকক্ষ নীরব হয়ে যেত, আর তাঁর একটি বকুনি ছাত্রের মনে গভীর ছাপ ফেলত। আজ সময় বদলেছে, বদলেছে শিক্ষার পরিবেশ, শিক্ষক-শিক্ষার্থীর সম্পর্ক এবং শিক্ষকদের ভূমিকা। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এই পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে কি শিক্ষার আদর্শও বদলে যাচ্ছে?
আগেকার দিনের শিক্ষক ও বর্তমান সময়ের শিক্ষকদের মধ্যে পার্থক্য শুধু সময়ের নয়; পার্থক্য রয়েছে শিক্ষাদানের পদ্ধতি, দায়িত্ববোধ, শৃঙ্খলা ও সামাজিক ভূমিকার ক্ষেত্রেও।
আগেকার দিনের অনেক শিক্ষক সীমিত বেতন, সাধারণ জীবনযাপন আর নানা প্রতিকূলতার মধ্যেও শিক্ষকতাকে মহান ব্রত হিসেবে দেখতেন। শিক্ষার্থীদের ভালো ফলাফলের পাশাপাশি তাঁদের চরিত্র গঠন, নৈতিকতা ও মানবিকতার ওপর গুরুত্ব দিতেন। অনেক শিক্ষক দুর্বল শিক্ষার্থীদের বিনা পারিশ্রমিকে অতিরিক্ত সময় দিতেন, অভাবী শিক্ষার্থীদের বই-খাতা কিনে দিতেন। তাঁদের কাছে শিক্ষার্থীর সাফল্য ছিল ব্যক্তিগত আনন্দের বিষয়।
বর্তমান সময়ে শিক্ষার সুযোগ বেড়েছে, প্রযুক্তির ব্যবহার বেড়েছে, পাঠদানের পদ্ধতি হয়েছে আধুনিক। অনেক শিক্ষক প্রযুক্তি ব্যবহার করে কঠিন বিষয় সহজভাবে বোঝান, শিক্ষার্থীদের সৃজনশীলতা বাড়ান এবং নতুন জ্ঞানের সঙ্গে পরিচিত করেন। তবে কিছু ক্ষেত্রে শিক্ষাদান পেশার অতিরিক্ত বাণিজ্যিকীকরণ, প্রাইভেট টিউশননির্ভরতা এবং পরীক্ষার ফলাফলকেন্দ্রিক মানসিকতার কারণে শিক্ষার বৃহত্তর উদ্দেশ্য আড়ালে পড়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
আগে অনেক শিক্ষার্থী শিক্ষকের শাসনকে নিজের ভুল সংশোধনের সুযোগ হিসেবে দেখত। বর্তমানে শিক্ষার্থীদের অধিকার ও মানসিক সুস্থতা সম্পর্কে সচেতনতা বেড়েছে, যা একটি ইতিবাচক পরিবর্তন। তবে কোথাও কোথাও পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও ধৈর্যের অভাব দেখা যায়। মনে রাখতে হবে, শাসন মানে অপমান নয়, আর সম্মান মানে অন্যায়ের সামনে নীরব থাকা নয়।
রাজনীতির ক্ষেত্রেও সময়ের সঙ্গে পরিবর্তন এসেছে। আগেকার দিনের শিক্ষকেরা রাজনৈতিক সচেতনতা রাখলেও অনেক ক্ষেত্রে তাঁদের সামাজিক পরিচয়ের কেন্দ্রে ছিল শিক্ষকতা ও ব্যক্তিগত আদর্শ। বর্তমান সময়ে কিছু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষকদের দলীয় রাজনীতি, ক্ষমতার প্রভাব এবং পদ-পদবি নিয়ে বিতর্ক দেখা যায়। রাজনৈতিক পরিচয় যখন যোগ্যতা, ন্যায়বিচার কিংবা শিক্ষার্থীদের প্রতি সমান আচরণের ওপর প্রভাব ফেলে, তখন শিক্ষকতার মর্যাদা প্রশ্নের মুখে পড়ে। তবে রাজনৈতিক মতাদর্শ থাকা আর সেই মতাদর্শের কারণে শিক্ষকের দায়িত্ব পালনে পক্ষপাত করা এক বিষয় নয়।
আগে শিক্ষকেরা অনেক সময় শিক্ষার্থীদের পরিবারের খোঁজখবর নিতেন, অভিভাবকদের সঙ্গে ব্যক্তিগত সম্পর্ক গড়ে তুলতেন এবং শিক্ষার্থীদের আচরণগত সমস্যা সমাধানে ভূমিকা রাখতেন। বর্তমানে শিক্ষার্থীসংখ্যা, প্রশাসনিক কাজ ও পাঠ্যক্রমের চাপের কারণে অনেক শিক্ষকের পক্ষে প্রত্যেক শিক্ষার্থীর প্রতি আলাদাভাবে নজর দেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। তবু আন্তরিক যোগাযোগ ও যত্নের গুরুত্ব আজও কমেনি।
আগেকার দিনের শিক্ষকেরা সম্মান পেতেন মূলত তাঁদের জ্ঞান, সততা, ত্যাগ ও ব্যক্তিত্বের কারণে। বর্তমানে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের যুগে একজন শিক্ষকের আচরণ দ্রুত সবার সামনে চলে আসে। এতে যেমন অনুচিত আচরণের সমালোচনা করা সহজ হয়েছে, তেমনি শিক্ষককে অযথা অপমান বা অসম্মান করার ঝুঁকিও তৈরি হয়েছে। তাই শিক্ষকের যেমন দায়িত্বশীল আচরণ প্রয়োজন, তেমনি শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদেরও সংযম ও শ্রদ্ধাবোধ বজায় রাখা জরুরি।
সবচেয়ে বড় কথা, আগেকার দিনের সব শিক্ষক আদর্শবান ছিলেন না, আবার বর্তমান সময়ের সব শিক্ষকও আদর্শচ্যুত নন। দুই সময়েই ভালো ও মন্দের উপস্থিতি ছিল এবং আছে। পার্থক্যটা বুঝতে হলে সময়ের পাশাপাশি সামাজিক বাস্তবতা, শিক্ষাব্যবস্থা ও ব্যক্তিগত মূল্যবোধকেও বিবেচনা করতে হবে।
শিক্ষকতার প্রকৃত সাফল্য শুধু কতজন শিক্ষার্থী পরীক্ষায় ভালো ফল করল, তা দিয়ে মাপা যায় না; বরং কতজন শিক্ষার্থী সৎ, বিবেকবান ও মানবিক মানুষ হয়ে উঠল, সেটিই তার বড় মাপকাঠি।
সময় বদলাক, প্রযুক্তি বদলাক, শিক্ষার পদ্ধতি আধুনিক হোক—কিন্তু শিক্ষক ও শিক্ষার্থীর সম্পর্কের ভিত্তি যেন থাকে জ্ঞান, ন্যায়, শ্রদ্ধা ও মানবিকতা। কারণ একজন আদর্শ শিক্ষক শুধু পাঠ্যবই শেষ করেন না, তিনি মানুষের ভেতরে ভবিষ্যৎ গড়ার আলো জ্বালিয়ে দেন।
মোঃ আরিফুল ইসলাম মুরাদ সিনিয়র স্টাফ রিপোর্টার 























