দেশের পুঁজিবাজারে বিভিন্ন অনিয়ম, কারসাজি ও আইন লঙ্ঘনের ঘটনায় কঠোর অবস্থান নিয়েছে পুনর্গঠিত বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)। বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানকে কমিশন থেকে মোট প্রায় ১ হাজার ৬০০ কোটি টাকা জরিমানা করা হয়েছে। এর মধ্যে একক এক আলোচিত চক্র—৩১তম বিসিএস (সমবায়) ক্যাডার কর্মকর্তা(সমবায় অধিদপ্তরের উপ নিবন্ধক) আবুল খায়ের হিরু, তার পরিবার ও সহযোগীদের ওপরই আরোপ করা হয়েছে ২০৮ কোটি ৩৫ লাখ টাকা, যা বিএসইসির মোট জরিমানার প্রায় ১৩ শতাংশ।
২০২৪ সালের ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর খন্দকার রাশেদ মাকসুদের নেতৃত্বে গঠিত নতুন কমিশন তদন্ত সাপেক্ষে এ নজিরবিহীন এনফোর্সমেন্ট অ্যাকশন নেয়।
সমবায় অধিদপ্তরের ডেপুটি রেজিস্ট্রার আবুল খায়ের হিরু ২০১৯ সালের আগে শেয়ারবাজারে পরিচিত মুখ ছিলেন না। তবে খুব অল্প সময়েই স্বজন ও সহযোগী প্রতিষ্ঠান নিয়ে একটি শক্তিশালী চক্র গড়ে তোলেন তিনি। কমিশন সূত্রে জানা যায়, নিজের বিও হিসাব থেকে স্ত্রী কাজী সাদিয়া হাসানের সঙ্গে যৌথ বিও হিসাবে শেয়ার কেনাবেচাসহ নিজেদের মধ্যেই সিরিজ লেনদেন (Wash Trading) করে কৃত্রিমভাবে বিভিন্ন কোম্পানির শেয়ারের দাম বাড়ানো হতো।
আইপিডিসি ফাইন্যান্স, ওয়ান ব্যাংক, ফরচুন শুজ, ঢাকা ইন্স্যুরেন্স, গ্রিন ডেল্টা ইন্স্যুরেন্স, এনআরবিসি ব্যাংক ও বিডিকম অনলাইনের মতো শীর্ষস্থানীয় কোম্পানির শেয়ারের অস্বাভাবিক দরবৃদ্ধি ঘটিয়ে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের ফাঁদে ফেলা হতো। পরবর্তীতে বিনিয়োগকারীরা আকৃষ্ট হলে বাড়তি দামে শেয়ার বিক্রি করে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিতো চক্রটি।
পরিবারের সদস্যদের জরিমানা: তদন্ত প্রতিবেদনে দেখা গেছে, হিরু ও তার পরিবারের সদস্যদের মোট জরিমানার পরিমাণ ১৫০ কোটি টাকারও বেশি-
কাজী সাদিয়া হাসান (স্ত্রী): ৪১ কোটি ৩২ লাখ টাকা
আবুল খায়ের হিরু (স্বয়ং): ৩৯ কোটি ৮৪ লাখ টাকা
আবুল কালাম মাতবর (বাবা): ৩৬ কোটি ৫৫ লাখ টাকা
কনিকা আফরোজ (বোন): ২৪ কোটি ৭৭ লাখ টাকা
অন্যান্য স্বজন: ভাই সাজেদ মাতবরকে ৩ কোটি ৮৮ লাখ, মোহাম্মদ বাসারকে ৩ কোটি ৪২ লাখ, শ্যালক কাজী ফরিদ হাসানকে ২ কোটি ৬১ লাখ, কাজী ফুয়াদ হাসানকে ৬১ লাখ এবং মা আলেয়া বেগমকে ১ লাখ টাকা জরিমানা করা হয়।
প্রতিষ্ঠানসমূহের ওপর দণ্ড: পরিবারের পাশাপাশি হিরু-সংশ্লিষ্ট ডজনখানিক প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নিয়েছে কমিশন-
ডিআইটি কো-অপারেটিভ: ২৯ কোটি ৮ লাখ টাকা
মোনার্ক হোল্ডিংস (ট্রেক): ২ কোটি ২৭ লাখ টাকা
মোনার্ক হোটেল অ্যান্ড রিসোর্ট: ২ কোটি ২৬ লাখ টাকা
মোনার্ক মার্ট (ই-কমার্স): ১৬ লাখ টাকা
অভিযোগ রয়েছে, বিএসইসির সাবেক চেয়ারম্যান শিবলী রুবাইয়াত-উল-ইসলামের মেয়াদে হিরু চক্রটি বিশেষ সুবিধা ভোগ করে। ২০২১ সালেই এসব কারসাজির তথ্য উদঘাটিত হলেও তৎকালীন কমিশন কোনো আইনগত ব্যবস্থা নেয়নি। ফলে বছরের পর বছর কোটি কোটি টাকার অবৈধ মুনাফা করে শাস্তির বাইরে থেকে যান হিরু। পরবর্তীতে নতুন কমিশন দায়িত্ব নেওয়ার পর তদন্ত নথির ভিত্তিতে এসব বড় অঙ্কের এনফোর্সমেন্ট আদেশ জারি করা হয়।
নিজস্ব প্রতিবেদক 


















