ঢাকা ০৪:০৪ অপরাহ্ন, শনিবার, ০৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২১ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম ::
বদলে গেলেন বিআইডব্লিউটিএর আরিফ উদ্দিন ফেনীতে ১১ দলীয় ঐক্যের মিছিলে ককটেল নিক্ষেপ চট্টগ্রাম গণপূর্ত ই/এম বিভাগ-২-এর প্রকৌশলী মহিবুলকে ঘিরে কোটি কোটি টাকার দুর্নীতির গুরুতর অভিযোগ পীরগাছা সোনালী ব্যাংক ম্যানেজার মনিরুজ্জামানের বিরুদ্ধে দম্ভ ও হয়রানির অভিযোগ প্রকৌশলী আনিছুর রহমানকে ঘিরে গুরুতর অভিযোগ ৮৮৪ কোটি টাকার রেল প্রকল্পে বড় প্যাকেজ, সীমিত দরদাতায় সিন্ডিকেটের শঙ্কা কুমিল্লায় টাকার বিনিময়ে ২৪ রোহিঙ্গাকে জন্মনিবন্ধন দেওয়ার অভিযোগ ইউপি চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে ৪৯ ব্যাংক হিসাবে লেনদেন প্রায় ৪ হাজার কোটি টাকা সিট-খাবার-মোবাইল সুবিধায় রেটকার্ডের অভিযোগ মুগদা মেডিকেল ঘিরে ডায়াগনস্টিকের ‘সিন্ডিকেট’! রোগী পাঠানোর নেপথ্যে কারা?
চসিকে কমিশন ছাড়া ফাইল নড়ে না

প্রকৌশলী আনিছুর রহমানকে ঘিরে গুরুতর অভিযোগ

নাগরিক সেবা নিশ্চিত করতে চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের (চসিক) মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন যখন দিনরাত নগরের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে ছুটে চলছেন, ঠিক তখনই সংস্থাটির কতিপয় কর্মকর্তার অতি-লোভ ও অনৈতিক চর্চায় ধূলিসাৎ হতে বসেছে সব প্রয়াস।

বিশেষ করে চসিকের প্রধান প্রকৌশলী মো. আনিছুর রহমানের বিরুদ্ধে উঠেছে কোটি কোটি টাকার কমিশন বাণিজ্যের এক অভিযোগ।

চসিকের উন্নয়ন কার্যক্রম ও প্রশাসনিক কাজের সঙ্গে যুক্ত একাধিক বিশ্বস্ত সূত্রের দাবি, সিটি কর্পোরেশনের যে কোনো কাজের টেন্ডার ও বিল নিষ্পত্তির প্রক্রিয়ায় প্রধান প্রকৌশলীকে দিতে হয় ৩ থেকে ৫ শতাংশ পর্যন্ত কমিশন।

এমনকি সরকারি খাত থেকে কর্তন করা ভ্যাট ও ট্যাক্সের টাকা থেকেও রেহাই নেই, সেখানেও দিতে হয় নির্দিষ্ট অঙ্কের কমিশন। অর্থ না মিললে ফাইল আটকে থাকে দিনের পর দিন।

ফলে নিরুপায় হয়ে ঠিকাদাররা বিল তোলার স্বার্থে নিম্নমানের সামগ্রী ব্যবহার ও কাজে ফাঁকি দিতে বাধ্য হন। পরিণতিতে অল্প দিনেই নষ্ট হয়ে যায় নির্মিত সড়ক ও অবকাঠামো, আর বারবার পুনর্নির্মাণের চক্করে সরকারি অর্থের বিপুল অপচয় ঘটে।

বর্তমানে প্রায় ৩০০ কোটি টাকার দেনার দায়ে জর্জরিত চসিক যখন তীব্র অর্থসংকটে দাপ্তরিক ও মেরামত কাজ চালাতে হিমশিম খাচ্ছে, তখনো থামেনি এই অনৈতিক লেনদেন।

তথ্যমতে, বর্তমানে চসিকে চারটি বড় প্রকল্প চলমান রয়েছে। এরমধ্যে এয়ারপোর্ট রোডসহ বিভিন্ন সড়ক উন্নয়ন ও প্রশস্তকরণ প্রকল্প (ব্যয় ২৪৯১ কোটি টাকা)। অবকাঠামো উন্নয়ন ও কুলগাঁও বাস টার্মিনাল নির্মাণ প্রকল্প (১২৩০ কোটি টাকা)। বারইপাড়া খাল খনন প্রকল্প (১৩০০ কোটি টাকা), এবং সেবক নিবাস নির্মাণ প্রকল্প যার ব্যয় (৩০৯ কোটি টাকা)।

সব মিলিয়ে এসব বড় প্রকল্পে বছরে প্রায় ৬০০ থেকে ৭০০ কোটি টাকার উন্নয়ন কাজ হয়। এছাড়া চসিকের নিজস্ব রাজস্ব খাত থেকে বছরে আরও প্রায় ১০০ কোটি টাকার মেরামত কাজ সম্পাদন করা হয়।

অভিযোগ রয়েছে, রাজস্ব খাতের থোক বরাদ্দের ক্ষেত্রে প্রাক্কলন (এস্টিমেট) তৈরির সময় ১ শতাংশ এবং চূড়ান্ত বিল প্রস্তুতকালে আরও ১ শতাংশ-মোট ২ শতাংশ হারে কমিশন আদায় করেন প্রধান প্রকৌশলী।

এর বাইরে বড় প্রকল্পগুলোর ফাইল ছাড়তে নেওয়া ৩ থেকে ৫ শতাংশ কমিশন হিসেব করলে শুধু এই একটি টেবিল থেকেই বছরে আনুমানিক ২০ থেকে ২৫ কোটি টাকা পকেটে যায় বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি।

এই প্রক্রিয়ার সঙ্গে প্রকল্প পরিচালক (পিডি), তত্ত্বাবধায়ক ও নির্বাহী প্রকৌশলীদের একাংশও জড়িয়ে পড়েছেন বলেও সূত্রের দাবি।

কমিশন বাণিজ্যের এই চক্রের কারণে চসিকের কাজের গুণগত মান মারাত্মক ঝুঁকির মুখে পড়েছে।

ঠিকাদারদের বক্তব্য অনুযায়ী, চসিকে কাজ পাওয়ার পর থেকে বিল তুলে নেওয়া পর্যন্ত ধাপে ধাপে আনুপাতিক হারে অর্থ ঢালতে হয়।

উন্মুক্তভাবে মুখ খুললে ভবিষ্যতে ব্যবসা বন্ধ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কায় কেউ প্রকাশ্যে নাম প্রকাশ করতে সাহস পান না।

তবে নাম প্রকাশ না করার শর্তে কয়েকজন ঠিকাদার জানান, ঘুষের এই অর্থ তুলতে গিয়ে তাদের মূল কাজের গুণগত মান বজায় রাখা সম্ভব হয় না।

অভিযোগের বিষয়ে জানতে চসিকের প্রধান প্রকৌশলী মো. আনিছুর রহমানের দপ্তরে একাধিকবার গিয়েও তাকে পাওয়া যায়নি। চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের নিজস্ব ওয়েভসাইটে থাকা মোবাইল ও টিএন্ডটি নাম্বারে একাধিকবার চেষ্টা করা হলেও নাম্বারগুলো সঠিক নয় বলে জানা যায়। পরবর্তীতে তার সাথে যোগাযোগ ও বক্তব্য পাওয়া গেলে প্রতিবেদনে তা সংযুক্ত করা হবে।

অন্যদিকে, সংস্থাটির অভ্যন্তরীণ প্রশাসনিক তদারকি নিয়ে জানতে চাইলে চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের সচিব ও ভারপ্রাপ্ত প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মো. আশরাফুল আমিন গণমাধ্যমকে জানান, বিষয়ের বিস্তারিত তার জানা নেই।

তবে লিখিত ও সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পেলে তদন্ত সাপেক্ষে প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক ও আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

চট্টগ্রাম নগরের টেকসই অবকাঠামো ও জনগণের করের টাকার সুষ্ঠু ব্যবহার নিশ্চিত করতে এই কমিশন বাণিজ্য বন্ধ করা এখন সময়ের দাবি।

সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, নাগরিক সেবাকে দুর্নীতিমুক্ত রাখতে চসিকের এই আর্থিক অনিয়মের দ্রুত ও নিরপেক্ষ তদন্ত জরুরি।

Tag :

আপনার মতামত লিখুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল ও অন্যান্য তথ্য সঞ্চয় করে রাখুন

আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

বদলে গেলেন বিআইডব্লিউটিএর আরিফ উদ্দিন

চসিকে কমিশন ছাড়া ফাইল নড়ে না

প্রকৌশলী আনিছুর রহমানকে ঘিরে গুরুতর অভিযোগ

আপডেট সময় ০৩:২৬:২৬ অপরাহ্ন, শনিবার, ৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬

নাগরিক সেবা নিশ্চিত করতে চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের (চসিক) মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন যখন দিনরাত নগরের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে ছুটে চলছেন, ঠিক তখনই সংস্থাটির কতিপয় কর্মকর্তার অতি-লোভ ও অনৈতিক চর্চায় ধূলিসাৎ হতে বসেছে সব প্রয়াস।

বিশেষ করে চসিকের প্রধান প্রকৌশলী মো. আনিছুর রহমানের বিরুদ্ধে উঠেছে কোটি কোটি টাকার কমিশন বাণিজ্যের এক অভিযোগ।

চসিকের উন্নয়ন কার্যক্রম ও প্রশাসনিক কাজের সঙ্গে যুক্ত একাধিক বিশ্বস্ত সূত্রের দাবি, সিটি কর্পোরেশনের যে কোনো কাজের টেন্ডার ও বিল নিষ্পত্তির প্রক্রিয়ায় প্রধান প্রকৌশলীকে দিতে হয় ৩ থেকে ৫ শতাংশ পর্যন্ত কমিশন।

এমনকি সরকারি খাত থেকে কর্তন করা ভ্যাট ও ট্যাক্সের টাকা থেকেও রেহাই নেই, সেখানেও দিতে হয় নির্দিষ্ট অঙ্কের কমিশন। অর্থ না মিললে ফাইল আটকে থাকে দিনের পর দিন।

ফলে নিরুপায় হয়ে ঠিকাদাররা বিল তোলার স্বার্থে নিম্নমানের সামগ্রী ব্যবহার ও কাজে ফাঁকি দিতে বাধ্য হন। পরিণতিতে অল্প দিনেই নষ্ট হয়ে যায় নির্মিত সড়ক ও অবকাঠামো, আর বারবার পুনর্নির্মাণের চক্করে সরকারি অর্থের বিপুল অপচয় ঘটে।

বর্তমানে প্রায় ৩০০ কোটি টাকার দেনার দায়ে জর্জরিত চসিক যখন তীব্র অর্থসংকটে দাপ্তরিক ও মেরামত কাজ চালাতে হিমশিম খাচ্ছে, তখনো থামেনি এই অনৈতিক লেনদেন।

তথ্যমতে, বর্তমানে চসিকে চারটি বড় প্রকল্প চলমান রয়েছে। এরমধ্যে এয়ারপোর্ট রোডসহ বিভিন্ন সড়ক উন্নয়ন ও প্রশস্তকরণ প্রকল্প (ব্যয় ২৪৯১ কোটি টাকা)। অবকাঠামো উন্নয়ন ও কুলগাঁও বাস টার্মিনাল নির্মাণ প্রকল্প (১২৩০ কোটি টাকা)। বারইপাড়া খাল খনন প্রকল্প (১৩০০ কোটি টাকা), এবং সেবক নিবাস নির্মাণ প্রকল্প যার ব্যয় (৩০৯ কোটি টাকা)।

সব মিলিয়ে এসব বড় প্রকল্পে বছরে প্রায় ৬০০ থেকে ৭০০ কোটি টাকার উন্নয়ন কাজ হয়। এছাড়া চসিকের নিজস্ব রাজস্ব খাত থেকে বছরে আরও প্রায় ১০০ কোটি টাকার মেরামত কাজ সম্পাদন করা হয়।

অভিযোগ রয়েছে, রাজস্ব খাতের থোক বরাদ্দের ক্ষেত্রে প্রাক্কলন (এস্টিমেট) তৈরির সময় ১ শতাংশ এবং চূড়ান্ত বিল প্রস্তুতকালে আরও ১ শতাংশ-মোট ২ শতাংশ হারে কমিশন আদায় করেন প্রধান প্রকৌশলী।

এর বাইরে বড় প্রকল্পগুলোর ফাইল ছাড়তে নেওয়া ৩ থেকে ৫ শতাংশ কমিশন হিসেব করলে শুধু এই একটি টেবিল থেকেই বছরে আনুমানিক ২০ থেকে ২৫ কোটি টাকা পকেটে যায় বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি।

এই প্রক্রিয়ার সঙ্গে প্রকল্প পরিচালক (পিডি), তত্ত্বাবধায়ক ও নির্বাহী প্রকৌশলীদের একাংশও জড়িয়ে পড়েছেন বলেও সূত্রের দাবি।

কমিশন বাণিজ্যের এই চক্রের কারণে চসিকের কাজের গুণগত মান মারাত্মক ঝুঁকির মুখে পড়েছে।

ঠিকাদারদের বক্তব্য অনুযায়ী, চসিকে কাজ পাওয়ার পর থেকে বিল তুলে নেওয়া পর্যন্ত ধাপে ধাপে আনুপাতিক হারে অর্থ ঢালতে হয়।

উন্মুক্তভাবে মুখ খুললে ভবিষ্যতে ব্যবসা বন্ধ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কায় কেউ প্রকাশ্যে নাম প্রকাশ করতে সাহস পান না।

তবে নাম প্রকাশ না করার শর্তে কয়েকজন ঠিকাদার জানান, ঘুষের এই অর্থ তুলতে গিয়ে তাদের মূল কাজের গুণগত মান বজায় রাখা সম্ভব হয় না।

অভিযোগের বিষয়ে জানতে চসিকের প্রধান প্রকৌশলী মো. আনিছুর রহমানের দপ্তরে একাধিকবার গিয়েও তাকে পাওয়া যায়নি। চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের নিজস্ব ওয়েভসাইটে থাকা মোবাইল ও টিএন্ডটি নাম্বারে একাধিকবার চেষ্টা করা হলেও নাম্বারগুলো সঠিক নয় বলে জানা যায়। পরবর্তীতে তার সাথে যোগাযোগ ও বক্তব্য পাওয়া গেলে প্রতিবেদনে তা সংযুক্ত করা হবে।

অন্যদিকে, সংস্থাটির অভ্যন্তরীণ প্রশাসনিক তদারকি নিয়ে জানতে চাইলে চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের সচিব ও ভারপ্রাপ্ত প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মো. আশরাফুল আমিন গণমাধ্যমকে জানান, বিষয়ের বিস্তারিত তার জানা নেই।

তবে লিখিত ও সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পেলে তদন্ত সাপেক্ষে প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক ও আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

চট্টগ্রাম নগরের টেকসই অবকাঠামো ও জনগণের করের টাকার সুষ্ঠু ব্যবহার নিশ্চিত করতে এই কমিশন বাণিজ্য বন্ধ করা এখন সময়ের দাবি।

সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, নাগরিক সেবাকে দুর্নীতিমুক্ত রাখতে চসিকের এই আর্থিক অনিয়মের দ্রুত ও নিরপেক্ষ তদন্ত জরুরি।