ঢাকা ০২:৫৮ অপরাহ্ন, শনিবার, ০৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২১ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম ::
৮৮৪ কোটি টাকার রেল প্রকল্পে বড় প্যাকেজ, সীমিত দরদাতায় সিন্ডিকেটের শঙ্কা কুমিল্লায় টাকার বিনিময়ে ২৪ রোহিঙ্গাকে জন্মনিবন্ধন দেওয়ার অভিযোগ ইউপি চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে ৪৯ ব্যাংক হিসাবে লেনদেন প্রায় ৪ হাজার কোটি টাকা সিট-খাবার-মোবাইল সুবিধায় রেটকার্ডের অভিযোগ মুগদা মেডিকেল ঘিরে ডায়াগনস্টিকের ‘সিন্ডিকেট’! রোগী পাঠানোর নেপথ্যে কারা? পাবনা গণপূর্তে রাশেদ কবীরের বিরুদ্ধে বিস্ফোরক অভিযোগ পিডিবিএফে মাহমুদ হাসানকে ঘিরে অভিযোগের পাহাড় রেলওয়ের উন্নয়ন প্রকল্পে অনিয়মের ছড়াছড়ি, হাজার কোটি টাকার ক্ষতির অভিযোগ ৪২ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগে দুদকের অনুসন্ধান জিয়াউর রহমান ও খালেদা জিয়াকে নিয়ে লেখা বই শিশুদের অনুপ্রাণিত করবে: ডা. জুবাইদা রহমান
গাজীপুর জেলা কারাগারে টাকার রাজত্ব

সিট-খাবার-মোবাইল সুবিধায় রেটকার্ডের অভিযোগ

লোহার গরাদ আর উঁচু প্রাচীরের আড়ালে এক রুদ্ধশ্বাস ও নারকীয় বাস্তবতায় বিরাজ করছে গাজীপুর জেলা কারাগারে। যে প্রতিষ্ঠানটি মানুষের ভুল শুধরে আলোর পথ দেখানোর সংশোধনাকেন্দ্র হওয়ার কথা ছিল, সেখানে এখন নিবন্ধের রাজত্ব নয়, বরং অভিযোগ উঠছে এক গোপন ও সমান্তরাল অন্ধকার অর্থনীতির। বাইরে থেকে সবকিছু শান্ত ও সুরক্ষিত মনে হলেও ভেতরে পদে পদে বন্দিদের সঙ্গে চলছে চরম অমানবিক আচরণ, চিকিৎসাসেবা চব্বিশ ঘণ্টা অবহেলা, অর্থের বিনিময়ে বিশেষ সুবিধা দেওয়ার প্রকাশ্যে মহোৎসব এবং কায়িক আশঙ্কায় দামে পণ্য বিক্রি। কারাগার থেকে মুক্তি পাওয়া একাধিক ভুক্তভোগীর প্রত্যক্ষ বয়ানে পিঠটান ওঠার মতো চিত্র উঠে এসেছে; তাদের দাবি, কারাগারের অভ্যন্তরে যেন ‘যার ধন তার নয়, পেটে যার দই’ অবস্থা—অর্থাৎ প্রতিটি জরুরি ও সাধারণ সেবার বিপরীতে প্রকাশ্যে নির্ধারিত রয়েছে আলাদা অঙ্কের টাকার রেটকার্ড।

ভেতরে অসুস্থ বন্দিদের দিন কাটছে এক চরম দুঃসহ যন্ত্রণার মধ্য দিয়ে। তথ্য বলছে, অসুস্থ বন্দি দীর্ঘদিন ধরে মারাত্মক মানসিক অবসাদ, তীব্র শ্বাসকষ্টসহ বিভিন্ন জটিল রোগে কাতরালেও নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা ও চিকিৎসাসেবা থেকে পুরোপুরি বঞ্চিত হচ্ছেন। সাধারণ জ্বর-সর্দির কিছু মামুলি ওষুধ মাঝেমধ্যে মিললেও গুরুতর অসুস্থদের অতি প্রয়োজনীয় ওষুধ কারাগারের চিকিৎসালয়ে খুঁজে পাওয়া যায় না। চিকিৎসায় এই চরম অবহেলার কারণে অসুস্থ বন্দিদের শারীরিক দুর্ভোগ দিন দিন চরমে পৌঁছাচ্ছে, অথচ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দৃশ্যমান কোনো কার্যকর পদক্ষেপ বা কঠোর তদারকি নেই।

কারাগার থেকে সম্প্রতি মুক্তি পাওয়া একজন ভুক্তভোগী, নিরাপত্তার স্বার্থে যিনি ‘রহিম’ ছদ্মনাম ব্যবহার করেছেন, সরেজমিন বার্তাকে শোনান তাঁর সেই নারকীয় অভিজ্ঞতার কথা। কারাগারের প্রধান ফটক পার হয়ে ভেতরে প্রবেশের প্রথম দিন থেকেই তাঁর ওপর শুরু হয় মানসিক হেনস্তা ও নির্দয় আচরণ। রাতের বেলা হলরুমে পর্যাপ্ত খালি জায়গা থাকা সত্ত্বেও তাঁকে কোনো খাবার না দিয়ে ইচ্ছাকৃতভাবে দুর্গন্ধময় বাথরুমের ঠিক পাশে ঘুমাতে বাধ্য করা হয়। তীব্র কষ্ট সহ্য করতে না পেরে তিনি যখন দায়িত্বপ্রাপ্ত সেল ম্যানেজারকে ৫০০ টাকা ঘুষ হিসেবে প্রদান করেন, তখন মেলে কেবল এক রাতের জন্য একটি সিটে মাথা গোঁজার ঠাঁই। তবে বিপদের এখানেই শেষ নয়; পরবর্তীতে তাঁকে সাফ জানিয়ে দেওয়া হয় যে, স্থায়ীভাবে এই সিটে থাকতে হলে প্রতি মাসে ৩ হাজার টাকা নিয়মিত দিয়ে যেতে হবে। উপরন্তু সেল ম্যানেজার তাঁকে কঠোরভাবে নির্দেশ দেন—কারাগারের কোনো ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বা কারারক্ষী যদি এই টাকা লেনদেনের বিষয়ে জানতে চান, তবে সবকিছু বেমালুম অস্বীকার করতে হবে। এর অন্যথা হলে কিংবা মুখ খুললে তাকে কাশিমপুর কারাগারে পাঠিয়ে দেওয়ার এক ভয়ংকর হুমকি দিয়ে কার্যত মুখ বন্ধ রাখা হয়।

এখানে অনিয়মের জাল এতটাই বিস্তৃত যে স্বজনদের ভালোবাসাও পথবন্দি হয়ে পড়ে। অভিযোগ রয়েছে, বন্দিদের সঙ্গে দেখা করতে আসা নিরুপায় স্বজনদের কাছ থেকেও নানা ফন্দিফিকির ও ‘অগাধ জলের মাছ’ শিকারের মতো বিভিন্ন অজুহাতে ৫০০ টাকা পর্যন্ত হাতিয়ে নেওয়া হয়। সকাল থেকে মূল ফটকে সাক্ষাতের দায়িত্বে নিয়োজিত থাকা কিছু অসাধু কারারক্ষীর মাধ্যমে এই নিয়মিত অর্থ আদায়ের মহোৎসব চলে।

সবচেয়ে বিস্ময়কর ও উদ্বেগজনক চিত্র দেখা যায় মোবাইল ফোন ব্যবহারের ক্ষেত্রে। কারা নিয়মানুযায়ী সপ্তাহে একবার সীমিত সময়ের জন্য পরিবারের সঙ্গে কথা বলার বিধান থাকলেও, সূত্র জানায়, টাকার বিনিময়ে সেখানে ঘণ্টার পর ঘণ্টা ফোনে কথা বলার সুযোগ করে দেওয়া হয়। মাত্র পাঁচ মিনিট কথা বলার জন্য বন্দিদের গুনতে হয় ২০০ টাকা। এমনকি কারাগারের মূল গেটের ভেতরে বিশেষভাবে পরিবারের সঙ্গে নিরিবিলিতে কথা বলার ‘বিশেষ সুবিধা’ পেতে আড়াই হাজার (২,৫০০) টাকা পর্যন্ত হাতিয়ে নেওয়ার মতো গুরুতর অভিযোগ রয়েছে। ফলে কারাগারের রন্ধ্রে রন্ধ্রে যেন এক নীরব ও অযাচিত ‘টাকায় বাঘের চোখ মেলে’ এমন ব্যবস্থা প্রাতিষ্ঠানিক রূপ নিয়েছে।

খাবারের গুণগত মান নিয়েও উঠেছে পাহাড়সম ক্ষোভ ও বিক্রয় অভিযোগ। সাধারণ বন্দিদের জন্য বরাদ্দ খাবার অত্যন্ত নিম্নমানের ও মুখে তোলার অযোগ্য হলেও, প্রতি সপ্তাহে সেল ম্যানেজারকে ৭৫০ টাকা পৌঁছে দিলেই মেলে উন্নত ও বিশেষ খাবারের ব্যবস্থা। বাইরে থেকে স্বজনরা যখন বন্দি প্রিয়জনের জন্য টাকা পাঠান, সেখানেও চলে নির্লজ্জ কমিশন কাটার খেলা। ভুক্তভোগীদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, প্রতি এক হাজার টাকায় ২০০ টাকা পর্যন্ত কমিশন হিসেবে কেটে রাখা হয়। ধাপে ধাপে হাতবদলের পর একজন বন্দির হাতে যখন মূল এক হাজার টাকা পৌঁছায়, তখন তিনি পান মাত্র ৫০০ টাকা; আর বাকি ৫০০ টাকা মধ্যস্বত্বভোগীদের বিভিন্ন স্তরে হরি লুট হয়ে গায়েব-হাওয়া হয়ে যায়।

কারাগারের ভেতরের ক্যানটিনটি যেন অনিয়মের আরেকটি বড় আস্তানা। সেখানে সাধারণ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম রাখা হচ্ছে দ্বিগুণ-তিন গুণেরও বেশি। অভিযোগ অনুযায়ী, একটি ডিমের দাম রাখা হয় ৪০ টাকা, একটি পেঁয়াজ বিক্রি হয় ১৫০ টাকায় এবং মাত্র ১০টি কাঁচামরিচের জন্য বন্দিদের কাছ থেকে নেওয়া হচ্ছে ৫০ টাকা। সাধারণ বাজারদরের চেয়ে ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ পর্যন্ত চড়া ও অতিরিক্ত দামে পণ্য বিক্রি করা হলেও সংশ্লিষ্ট কোনো পক্ষেরই নেই সামান্যতম ভ্রূক্ষেপ বা কার্যকর নজরদারি।

এর চেয়েও ভয়ংকর তথ্য হলো, টাকার প্রভাব খাটিয়ে এবং নজরদারিকে ফাঁকি দিয়ে কারাগারের ভেতরে অনায়াসে প্রবেশ করছে সর্বনাশা মাদক। মাঝেমধ্যে কারারক্ষীদের হাতে সামান্য মাদক উদ্ধার বা জব্দ হওয়ার ঘটনা ঘটলেও পুরোপুরি এই অন্ধকার মাদক বাণিজ্য বন্ধ করা সম্ভব হয়নি, যার ফলে পুরো কারাগারের সামগ্রিক নিরাপত্তা ও শৃঙ্খলার ওপর মারাত্মক প্রশ্ন উঠেছে।

কারাগারের এই বেপরোয়া দুর্নীতি ও অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাওয়া হলে গাজীপুর জেলা কারাগারের জেলার নূর মোহাম্মদ সোহেল বলেন, “আমি নতুন এসেছি। এ ধরনের কোনো অভিযোগ থাকলে আমাকে জানান, আমি বিষয়টি দেখব।” অন্যদিকে, এই সামগ্রিক বিষয়ে বক্তব্য নেওয়ার জন্য কারা মহাপরিদর্শকের (আইজি প্রিজনস)-এর দপ্তরের তিনটি নম্বরে একাধিকবার ফোন করে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও অপর প্রান্ত থেকে কেউ ফোন রিসিভ করেননি।

গাজীপুর জেলা কারাগার ঘিরে একের পর এক উন্মোচিত হওয়া এসব অমানবিক ও দুর্নীতির অভিযোগের নিরপেক্ষ এবং সুষ্ঠু তদন্ত হওয়া এখন সময়ের দাবি। ভুক্তভোগী পরিবার, স্বজন এবং সচেতন মহলের মতে, যদি কারাগারের মতো একটি সংবেদনশীল রাষ্ট্রীয় স্থানে দুর্নীতি, অবিচার আর টাকার বিনিময়ে অনৈতিক সুবিধা পাওয়ার সংস্কৃতি জাঁকিয়ে বসে, তবে তা শুধু বন্দিদের মৌলিক মানবাধিকারকেই ধুলিসাৎ করে না, বরং দেশের সামগ্রিক বিচার ও কারা ব্যবস্থার ওপর সাধারণ মানুষের নিরাপত্তাকেই বড় ধরনের প্রশ্নের মুখে ঠেলে দেয়।

Tag :

আপনার মতামত লিখুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল ও অন্যান্য তথ্য সঞ্চয় করে রাখুন

আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

৮৮৪ কোটি টাকার রেল প্রকল্পে বড় প্যাকেজ, সীমিত দরদাতায় সিন্ডিকেটের শঙ্কা

গাজীপুর জেলা কারাগারে টাকার রাজত্ব

সিট-খাবার-মোবাইল সুবিধায় রেটকার্ডের অভিযোগ

আপডেট সময় ০২:১৬:৩৩ অপরাহ্ন, শনিবার, ৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬

লোহার গরাদ আর উঁচু প্রাচীরের আড়ালে এক রুদ্ধশ্বাস ও নারকীয় বাস্তবতায় বিরাজ করছে গাজীপুর জেলা কারাগারে। যে প্রতিষ্ঠানটি মানুষের ভুল শুধরে আলোর পথ দেখানোর সংশোধনাকেন্দ্র হওয়ার কথা ছিল, সেখানে এখন নিবন্ধের রাজত্ব নয়, বরং অভিযোগ উঠছে এক গোপন ও সমান্তরাল অন্ধকার অর্থনীতির। বাইরে থেকে সবকিছু শান্ত ও সুরক্ষিত মনে হলেও ভেতরে পদে পদে বন্দিদের সঙ্গে চলছে চরম অমানবিক আচরণ, চিকিৎসাসেবা চব্বিশ ঘণ্টা অবহেলা, অর্থের বিনিময়ে বিশেষ সুবিধা দেওয়ার প্রকাশ্যে মহোৎসব এবং কায়িক আশঙ্কায় দামে পণ্য বিক্রি। কারাগার থেকে মুক্তি পাওয়া একাধিক ভুক্তভোগীর প্রত্যক্ষ বয়ানে পিঠটান ওঠার মতো চিত্র উঠে এসেছে; তাদের দাবি, কারাগারের অভ্যন্তরে যেন ‘যার ধন তার নয়, পেটে যার দই’ অবস্থা—অর্থাৎ প্রতিটি জরুরি ও সাধারণ সেবার বিপরীতে প্রকাশ্যে নির্ধারিত রয়েছে আলাদা অঙ্কের টাকার রেটকার্ড।

ভেতরে অসুস্থ বন্দিদের দিন কাটছে এক চরম দুঃসহ যন্ত্রণার মধ্য দিয়ে। তথ্য বলছে, অসুস্থ বন্দি দীর্ঘদিন ধরে মারাত্মক মানসিক অবসাদ, তীব্র শ্বাসকষ্টসহ বিভিন্ন জটিল রোগে কাতরালেও নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা ও চিকিৎসাসেবা থেকে পুরোপুরি বঞ্চিত হচ্ছেন। সাধারণ জ্বর-সর্দির কিছু মামুলি ওষুধ মাঝেমধ্যে মিললেও গুরুতর অসুস্থদের অতি প্রয়োজনীয় ওষুধ কারাগারের চিকিৎসালয়ে খুঁজে পাওয়া যায় না। চিকিৎসায় এই চরম অবহেলার কারণে অসুস্থ বন্দিদের শারীরিক দুর্ভোগ দিন দিন চরমে পৌঁছাচ্ছে, অথচ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দৃশ্যমান কোনো কার্যকর পদক্ষেপ বা কঠোর তদারকি নেই।

কারাগার থেকে সম্প্রতি মুক্তি পাওয়া একজন ভুক্তভোগী, নিরাপত্তার স্বার্থে যিনি ‘রহিম’ ছদ্মনাম ব্যবহার করেছেন, সরেজমিন বার্তাকে শোনান তাঁর সেই নারকীয় অভিজ্ঞতার কথা। কারাগারের প্রধান ফটক পার হয়ে ভেতরে প্রবেশের প্রথম দিন থেকেই তাঁর ওপর শুরু হয় মানসিক হেনস্তা ও নির্দয় আচরণ। রাতের বেলা হলরুমে পর্যাপ্ত খালি জায়গা থাকা সত্ত্বেও তাঁকে কোনো খাবার না দিয়ে ইচ্ছাকৃতভাবে দুর্গন্ধময় বাথরুমের ঠিক পাশে ঘুমাতে বাধ্য করা হয়। তীব্র কষ্ট সহ্য করতে না পেরে তিনি যখন দায়িত্বপ্রাপ্ত সেল ম্যানেজারকে ৫০০ টাকা ঘুষ হিসেবে প্রদান করেন, তখন মেলে কেবল এক রাতের জন্য একটি সিটে মাথা গোঁজার ঠাঁই। তবে বিপদের এখানেই শেষ নয়; পরবর্তীতে তাঁকে সাফ জানিয়ে দেওয়া হয় যে, স্থায়ীভাবে এই সিটে থাকতে হলে প্রতি মাসে ৩ হাজার টাকা নিয়মিত দিয়ে যেতে হবে। উপরন্তু সেল ম্যানেজার তাঁকে কঠোরভাবে নির্দেশ দেন—কারাগারের কোনো ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বা কারারক্ষী যদি এই টাকা লেনদেনের বিষয়ে জানতে চান, তবে সবকিছু বেমালুম অস্বীকার করতে হবে। এর অন্যথা হলে কিংবা মুখ খুললে তাকে কাশিমপুর কারাগারে পাঠিয়ে দেওয়ার এক ভয়ংকর হুমকি দিয়ে কার্যত মুখ বন্ধ রাখা হয়।

এখানে অনিয়মের জাল এতটাই বিস্তৃত যে স্বজনদের ভালোবাসাও পথবন্দি হয়ে পড়ে। অভিযোগ রয়েছে, বন্দিদের সঙ্গে দেখা করতে আসা নিরুপায় স্বজনদের কাছ থেকেও নানা ফন্দিফিকির ও ‘অগাধ জলের মাছ’ শিকারের মতো বিভিন্ন অজুহাতে ৫০০ টাকা পর্যন্ত হাতিয়ে নেওয়া হয়। সকাল থেকে মূল ফটকে সাক্ষাতের দায়িত্বে নিয়োজিত থাকা কিছু অসাধু কারারক্ষীর মাধ্যমে এই নিয়মিত অর্থ আদায়ের মহোৎসব চলে।

সবচেয়ে বিস্ময়কর ও উদ্বেগজনক চিত্র দেখা যায় মোবাইল ফোন ব্যবহারের ক্ষেত্রে। কারা নিয়মানুযায়ী সপ্তাহে একবার সীমিত সময়ের জন্য পরিবারের সঙ্গে কথা বলার বিধান থাকলেও, সূত্র জানায়, টাকার বিনিময়ে সেখানে ঘণ্টার পর ঘণ্টা ফোনে কথা বলার সুযোগ করে দেওয়া হয়। মাত্র পাঁচ মিনিট কথা বলার জন্য বন্দিদের গুনতে হয় ২০০ টাকা। এমনকি কারাগারের মূল গেটের ভেতরে বিশেষভাবে পরিবারের সঙ্গে নিরিবিলিতে কথা বলার ‘বিশেষ সুবিধা’ পেতে আড়াই হাজার (২,৫০০) টাকা পর্যন্ত হাতিয়ে নেওয়ার মতো গুরুতর অভিযোগ রয়েছে। ফলে কারাগারের রন্ধ্রে রন্ধ্রে যেন এক নীরব ও অযাচিত ‘টাকায় বাঘের চোখ মেলে’ এমন ব্যবস্থা প্রাতিষ্ঠানিক রূপ নিয়েছে।

খাবারের গুণগত মান নিয়েও উঠেছে পাহাড়সম ক্ষোভ ও বিক্রয় অভিযোগ। সাধারণ বন্দিদের জন্য বরাদ্দ খাবার অত্যন্ত নিম্নমানের ও মুখে তোলার অযোগ্য হলেও, প্রতি সপ্তাহে সেল ম্যানেজারকে ৭৫০ টাকা পৌঁছে দিলেই মেলে উন্নত ও বিশেষ খাবারের ব্যবস্থা। বাইরে থেকে স্বজনরা যখন বন্দি প্রিয়জনের জন্য টাকা পাঠান, সেখানেও চলে নির্লজ্জ কমিশন কাটার খেলা। ভুক্তভোগীদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, প্রতি এক হাজার টাকায় ২০০ টাকা পর্যন্ত কমিশন হিসেবে কেটে রাখা হয়। ধাপে ধাপে হাতবদলের পর একজন বন্দির হাতে যখন মূল এক হাজার টাকা পৌঁছায়, তখন তিনি পান মাত্র ৫০০ টাকা; আর বাকি ৫০০ টাকা মধ্যস্বত্বভোগীদের বিভিন্ন স্তরে হরি লুট হয়ে গায়েব-হাওয়া হয়ে যায়।

কারাগারের ভেতরের ক্যানটিনটি যেন অনিয়মের আরেকটি বড় আস্তানা। সেখানে সাধারণ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম রাখা হচ্ছে দ্বিগুণ-তিন গুণেরও বেশি। অভিযোগ অনুযায়ী, একটি ডিমের দাম রাখা হয় ৪০ টাকা, একটি পেঁয়াজ বিক্রি হয় ১৫০ টাকায় এবং মাত্র ১০টি কাঁচামরিচের জন্য বন্দিদের কাছ থেকে নেওয়া হচ্ছে ৫০ টাকা। সাধারণ বাজারদরের চেয়ে ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ পর্যন্ত চড়া ও অতিরিক্ত দামে পণ্য বিক্রি করা হলেও সংশ্লিষ্ট কোনো পক্ষেরই নেই সামান্যতম ভ্রূক্ষেপ বা কার্যকর নজরদারি।

এর চেয়েও ভয়ংকর তথ্য হলো, টাকার প্রভাব খাটিয়ে এবং নজরদারিকে ফাঁকি দিয়ে কারাগারের ভেতরে অনায়াসে প্রবেশ করছে সর্বনাশা মাদক। মাঝেমধ্যে কারারক্ষীদের হাতে সামান্য মাদক উদ্ধার বা জব্দ হওয়ার ঘটনা ঘটলেও পুরোপুরি এই অন্ধকার মাদক বাণিজ্য বন্ধ করা সম্ভব হয়নি, যার ফলে পুরো কারাগারের সামগ্রিক নিরাপত্তা ও শৃঙ্খলার ওপর মারাত্মক প্রশ্ন উঠেছে।

কারাগারের এই বেপরোয়া দুর্নীতি ও অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাওয়া হলে গাজীপুর জেলা কারাগারের জেলার নূর মোহাম্মদ সোহেল বলেন, “আমি নতুন এসেছি। এ ধরনের কোনো অভিযোগ থাকলে আমাকে জানান, আমি বিষয়টি দেখব।” অন্যদিকে, এই সামগ্রিক বিষয়ে বক্তব্য নেওয়ার জন্য কারা মহাপরিদর্শকের (আইজি প্রিজনস)-এর দপ্তরের তিনটি নম্বরে একাধিকবার ফোন করে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও অপর প্রান্ত থেকে কেউ ফোন রিসিভ করেননি।

গাজীপুর জেলা কারাগার ঘিরে একের পর এক উন্মোচিত হওয়া এসব অমানবিক ও দুর্নীতির অভিযোগের নিরপেক্ষ এবং সুষ্ঠু তদন্ত হওয়া এখন সময়ের দাবি। ভুক্তভোগী পরিবার, স্বজন এবং সচেতন মহলের মতে, যদি কারাগারের মতো একটি সংবেদনশীল রাষ্ট্রীয় স্থানে দুর্নীতি, অবিচার আর টাকার বিনিময়ে অনৈতিক সুবিধা পাওয়ার সংস্কৃতি জাঁকিয়ে বসে, তবে তা শুধু বন্দিদের মৌলিক মানবাধিকারকেই ধুলিসাৎ করে না, বরং দেশের সামগ্রিক বিচার ও কারা ব্যবস্থার ওপর সাধারণ মানুষের নিরাপত্তাকেই বড় ধরনের প্রশ্নের মুখে ঠেলে দেয়।