ঢাকা ০৪:৫৮ অপরাহ্ন, শনিবার, ২৯ অগাস্ট ২০২৬, ১৪ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম ::
পদ্মফুলের প্রলোভনে ৬ বছরের শিশুকে ধর্ষণের অভিযোগ, চাচার বিরুদ্ধে মামলা গণপূর্ত সচিবের পিও গাজী মোকছেদের বিরুদ্ধে ফ্ল্যাট-প্লট বাগানো ও তথ্য পাচারের অভিযোগ ‘দুর্নীতির মহাকবি’ নুরুন্নবী, ঘুষ ছাড়া মেলে না জয়েন্ট স্টকের নিবন্ধন! গৌরনদী টিটিসির অধ্যক্ষের বিরুদ্ধে দুর্নীতি-অনিয়মের অভিযোগ দুদকে অভিযোগের পর গাজীপুর থেকে প্রত্যাহার সহকারী কমিশনার আইয়ুব ব্রাহ্মণবাড়িয়া পাসপোর্ট অফিসে ‘চ্যানেল’ বাণিজ্য, দিনে ৪-৫ লাখ টাকা আদায়ের অভিযোগ বাঘারচর আলিম মাদ্রাসার শিক্ষক রকিবুজ্জামানের বিরুদ্ধে অপপ্রচারের প্রতিবাদে সংবাদ সম্মেলন গোয়াইনঘাটে ৫০০ টাকা মজুরির দাবিতে গুলনী চা বাগানে তৃতীয় দিনের কর্মবিরতি ও বিক্ষোভ বিএসইসির দুই কর্মকর্তাকে ঘিরে উঠেছে নানা প্রশ্ন পিডিবিএফ কর্মকর্তা মামুনুর রশিদকে ঘিরে নিয়োগ,পদোন্নতি ও আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ
তিন পাসপোর্টে ২৫ বিদেশযাত্রা

দুদকে অভিযোগের পর গাজীপুর থেকে প্রত্যাহার সহকারী কমিশনার আইয়ুব

সরকারি চাকরি করেন, অথচ ব্যক্তিগত পাসপোর্টে নিজের পেশা লিখেছেন ‘PRIVATE SERVICE’। একটি নয়, তাঁর নামে সচল আছে তিনটি পাসপোর্ট। আর এই তিন পাসপোর্ট ব্যবহার করে ২০১৮ থেকে ২০২৬ সালআট বছরে ছয়টি দেশে অন্তত ২৫ বার বিদেশ ভ্রমণ করেছেন কাস্টমস, এক্সাইজ ও ভ্যাট কমিশনারেট, গাজীপুরের সহকারী কমিশনার মো. আইয়ুব। এসব ভ্রমণের আগে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অনুমতি নেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ উঠেছে দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক)। অভিযোগে অর্থ পাচারের ইঙ্গিতও দেওয়া হয়েছে।
কাকতালীয়ভাবে হোক বা না হোক, অভিযোগ দাখিলের কয়েক দিনের মাথায়, গত ২৭ আগস্ট ২০২৬ তারিখে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) অধীন অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগ এক প্রজ্ঞাপনে মো. আইয়ুবকে তাঁর কর্মস্থল গাজীপুর থেকে প্রত্যাহার করে অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগ, অর্থ মন্ত্রণালয়ে ‘বিশেষ ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা’ হিসেবে সংযুক্ত করেছে।
তিন পাসপোর্টের রহস্য
অনুসন্ধানে পাওয়া নথি অনুযায়ী, মো. আইয়ুবের নামে ব্যবহৃত পাসপোর্টগুলো হলো—সবচেয়ে পুরোনো BP03795*, এরপর A033271* এবং সর্বশেষ ও বর্তমানে সচল A091834**। শেষোক্তটি ‘ORDINARY’ বা সাধারণ পাসপোর্ট হিসেবে ২০২৪ সালের ১৩ নভেম্বর ইস্যু হয়, যার মেয়াদ ২০৩৪ সালের ১১ নভেম্বর পর্যন্ত।
নথিতে সবচেয়ে দৃষ্টি কাড়ে পেশার ঘরটি—যেখানে স্পষ্ট লেখা ‘PRIVATE SERVICE’। অথচ একই নথিতে তাঁর ঠিকানা হিসেবে উল্লেখ আছে বনানীর সরকারি কাস্টমস কোয়ার্টার। প্রশ্ন উঠেছে—তিনি যদি বেসরকারি চাকরিতে থাকেন, তাহলে সরকারি বাসভবন কীভাবে ব্যবহার করছেন? আর সরকারি কর্মকর্তা হয়ে থাকলে পাসপোর্টে মিথ্যা পেশা উল্লেখের উদ্দেশ্য কী? এই সাংঘর্ষিক তথ্যের ব্যাখ্যা মেলেনি এখনো।
আট বছরে ২৫ বার বিদেশযাত্রা
অনুসন্ধানে পাওয়া ভ্রমণ-রেকর্ড বিশ্লেষণে দেখা যায়, তিনটি পাসপোর্ট মিলিয়ে মো. আইয়ুব সবচেয়ে বেশি গেছেন ভারতে—১২ বার। এরপর থাইল্যান্ডে ৭ বার, সংযুক্ত আরব আমিরাতে ২ বার, চীনে ২ বার এবং মালয়েশিয়া ও সিঙ্গাপুরে একবার করে।
ভ্রমণের ধরন লক্ষ করলে দেখা যায় একটি স্পষ্ট প্যাটার্ন:
BP03795 পাসপোর্টে (২০১৮ আগস্ট–২০২০ জানুয়ারি):** টানা সাতবার শুধু ভারত ভ্রমণ।
A033271 পাসপোর্টে (২০২২ এপ্রিল–২০২৪ সেপ্টেম্বর):** ভারত, থাইল্যান্ড, আরব আমিরাত ও মালয়েশিয়া মিলিয়ে ১০ বার ভ্রমণ।
A091834 পাসপোর্টে (২০২৪ ডিসেম্বর–২০২৬ জুন):** থাইল্যান্ড, চীন ও সিঙ্গাপুর মিলিয়ে আটবার ভ্রমণ।
লক্ষণীয় বিষয় হলো, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে থাইল্যান্ড ভ্রমণের পুনরাবৃত্তি বেড়েছে—২০২৩ সালের মার্চ থেকে ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত অন্তত পাঁচবার তিনি থাইল্যান্ড গেছেন। ঘন ঘন একই দেশে যাতায়াতের এই প্রবণতা এবং তার সঙ্গে সম্ভাব্য আর্থিক লেনদেনের সম্পর্ক অনুসন্ধানের দাবি জানিয়েছেন অভিযোগকারী।
ভ্রমণের পূর্ণ তালিকা

পাসপোর্ট নম্বর ভ্রমণের তারিখ ফ্লাইট নম্বর সংশ্লিষ্ট দেশ
BP03795** ০১ আগস্ট ২০১৮ A1229 ভারত
BP03795** ০৮ নভেম্বর ২০১৮ A1229 ভারত
BP03795** ১৫ মার্চ ২০১৯ RX0971 ভারত
BP03795** ০১ মে ২০১৯ RX0971 ভারত
BP03795** ২৮ জুন ২০১৯ BS201 ভারত
BP03795** ১৫ নভেম্বর ২০১৯ RX0971 ভারত
BP03795** ১৪ জানুয়ারি ২০২০ BS201 ভারত
A033271** ২৯ এপ্রিল ২০২২ EK583 সংযুক্তআরব আমিরাত
A033271** ১৮ আগস্ট ২০২২ BS201 ভারত
A033271** ০৬ অক্টোবর ২০২২ BS203 ভারত
A033271** ১৭ মার্চ ২০২৩ BS217 থাইল্যান্ড
A033271** ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২৩ EK587 সংযুক্তআরব আমিরাত
A033271** ০২ নভেম্বর ২০২৩ VQ721 ভারত
A033271** ০৫ জানুয়ারি ২০২৪ VQ721 ভারত
A033271** ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৪ BG388 থাইল্যান্ড
A033271** ১৩ জুন ২০২৪ MH197 মালয়েশিয়া
A033271** ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৪ 6E1106 ভারত
A091834** ১২ ডিসেম্বর ২০২৪ BS325 চীন
A091834** ০৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৫ BG388 থাইল্যান্ড
A091834** ০৩ জুলাই ২০২৫ BG388 থাইল্যান্ড
A091834** ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৫ MU2036 চীন
A091834** ১৬ ডিসেম্বর ২০২৫ BS217 থাইল্যান্ড
A091834** ১৭ মার্চ ২০২৬ SQ447 সিঙ্গাপুর
A091834** ২১ মে ২০২৬ BS217 থাইল্যান্ড
A091834** ১৮ জুন ২০২৬ BS217 থাইল্যান্ড
সরকারি চাকরিবিধি অনুযায়ী, কর্মরত অবস্থায় কোনো কর্মকর্তার ব্যক্তিগত বিদেশ ভ্রমণের ক্ষেত্রেও প্রয়োজন হয় বিভাগীয় অনুমতি, ছুটি এবং ক্ষেত্রবিশেষে সরকারি আদেশ। দুদকে দাখিল করা অভিযোগে দাবি করা হয়েছে, মো. আইয়ুব উল্লিখিত ২৫টি ভ্রমণের কোনোটির আগেই প্রয়োজনীয় বিভাগীয় অনুমতি নেননি।
বেনজীরের ছায়া?
আওয়ামী শাসনামলের সাবেক আইজিপি বেনজীর আহমেদের বিরুদ্ধে ওঠা বহুল আলোচিত সম্পদ ও পাসপোর্ট-সংক্রান্ত অভিযোগের সঙ্গে এই ঘটনার মিল খুঁজে পাচ্ছেন অভিযোগকারীরা। একাধিক পাসপোর্ট ব্যবহার, পেশা গোপন করা এবং ঘন ঘন বিদেশ ভ্রমণ—এই প্যাটার্ন সরকারি কর্মকর্তাদের মধ্যে সম্পদ ও অর্থ পাচারের একটি পরিচিত কৌশল হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে।
অভিযোগে বলা হয়েছে, সহকারী কমিশনার মো. আইয়ুব ব্যাপক দুর্নীতির মাধ্যমে বিপুল অর্থ অর্জন করেছেন এবং তার একটি অংশ বিদেশে পাচার করেছেন। তাঁর ঘন ঘন বিদেশ ভ্রমণ, একাধিক পাসপোর্ট ব্যবহার এবং পাসপোর্টে সরকারি পরিচয় গোপন রাখার সঙ্গে অর্থ পাচারের সম্ভাব্য যোগসূত্র খতিয়ে দেখার দাবি জানানো হয়েছে। অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ে তাঁর ব্যাংক হিসাব, আয়কর নথি, সম্পদ বিবরণী, আন্তর্জাতিক আর্থিক লেনদেন এবং বিদেশে সম্ভাব্য বিনিয়োগ বা সম্পদের তথ্য অনুসন্ধানের আওতায় আনার আহ্বান জানানো হয়েছে অভিযোগে।
গত ২৭ আগস্ট ২০২৬ তারিখে এনবিআরের অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগ থেকে জারি করা এক প্রজ্ঞাপনে (স্মারক নম্বর: ০৮.০০.০০০০.০০০.০৩৮.২৭.০০০১.১৯.১৯৩) জানানো হয়, মো. আইয়ুবকে কাস্টমস, এক্সাইজ ও ভ্যাট কমিশনারেট, গাজীপুর থেকে প্রত্যাহার করে অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগ, অর্থ মন্ত্রণালয়ে ‘বিশেষ ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা’ (ওএসডি-সদৃশ পদায়ন) হিসেবে সংযুক্ত করা হলো। আদেশে বলা হয়, ‘জনস্বার্থে জারিকৃত এ আদেশ অবিলম্বে কার্যকর হবে।’ আদেশটি রাষ্ট্রপতির আদেশক্রমে জারি করেন সিনিয়র সহকারী সচিব মিজানুর রহমত।
প্রজ্ঞাপনে বদলির সুনির্দিষ্ট কারণ উল্লেখ করা হয়নি। তবে নির্দিষ্ট কোনো পদে না রেখে সরাসরি মন্ত্রণালয়ে সংযুক্ত বা ওএসডি করে রাখা বাংলাদেশের প্রশাসনিক ব্যবস্থায় সচরাচর তদন্তাধীন বা বিতর্কিত কর্মকর্তাদের ক্ষেত্রে অনুসরণ করা একটি পরিচিত পদ্ধতি। দুদকে অভিযোগ দাখিল ও এই বদলির সময়ের মধ্যকার নৈকট্য স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন তুলেছে—যদিও দুটি ঘটনার মধ্যে সরাসরি কার্যকারণ সম্পর্ক এখনো নিশ্চিত করা যায়নি।
অভিযুক্তের বক্তব্য
অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে মো. আইয়ুবের ব্যক্তিগত মুঠোফোন নম্বরে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি কল রিসিভ করেননি। তাঁর বক্তব্য পাওয়া গেলে প্রতিবেদনে যুক্ত করা হবে।
এখন যা জানা প্রয়োজন
বদলির আদেশে উল্লিখিত কারণ কি সত্যিই দুদকের অভিযোগের সঙ্গে সম্পর্কিত, নাকি এটি রুটিন প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত—এ বিষয়ে এনবিআরের সুনির্দিষ্ট বক্তব্য প্রয়োজন।
দুদক অভিযোগটি আমলে নিয়ে অনুসন্ধান শুরু করেছে কি না।
মো. আইয়ুবের সম্পদ বিবরণী ও আয়কর নথির সঙ্গে তাঁর ব্যয়বহুল ভ্রমণ-ইতিহাসের সংগতি আছে কি না।
একাধিক পাসপোর্ট ইস্যুর প্রক্রিয়ায় পাসপোর্ট অধিদপ্তরের কোনো গাফিলতি বা যোগসাজশ ছিল কি না।
(দুর্নীতি দমন কমিশনে দাখিল করা অভিযোগ ও সরকারি নথির ভিত্তিতে প্রস্তুত। এই প্রতিবেদনে উল্লিখিত অভিযোগসমূহ এখনো তদন্তাধীন এবং প্রমাণিত নয়। মো. আইয়ুবের বক্তব্য পাওয়া গেলে তা যুক্ত করা হবে।)

Tag :

আপনার মতামত লিখুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল ও অন্যান্য তথ্য সঞ্চয় করে রাখুন

আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

পদ্মফুলের প্রলোভনে ৬ বছরের শিশুকে ধর্ষণের অভিযোগ, চাচার বিরুদ্ধে মামলা

তিন পাসপোর্টে ২৫ বিদেশযাত্রা

দুদকে অভিযোগের পর গাজীপুর থেকে প্রত্যাহার সহকারী কমিশনার আইয়ুব

আপডেট সময় ০৪:০২:৫৪ অপরাহ্ন, শনিবার, ২৯ অগাস্ট ২০২৬

সরকারি চাকরি করেন, অথচ ব্যক্তিগত পাসপোর্টে নিজের পেশা লিখেছেন ‘PRIVATE SERVICE’। একটি নয়, তাঁর নামে সচল আছে তিনটি পাসপোর্ট। আর এই তিন পাসপোর্ট ব্যবহার করে ২০১৮ থেকে ২০২৬ সালআট বছরে ছয়টি দেশে অন্তত ২৫ বার বিদেশ ভ্রমণ করেছেন কাস্টমস, এক্সাইজ ও ভ্যাট কমিশনারেট, গাজীপুরের সহকারী কমিশনার মো. আইয়ুব। এসব ভ্রমণের আগে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অনুমতি নেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ উঠেছে দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক)। অভিযোগে অর্থ পাচারের ইঙ্গিতও দেওয়া হয়েছে।
কাকতালীয়ভাবে হোক বা না হোক, অভিযোগ দাখিলের কয়েক দিনের মাথায়, গত ২৭ আগস্ট ২০২৬ তারিখে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) অধীন অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগ এক প্রজ্ঞাপনে মো. আইয়ুবকে তাঁর কর্মস্থল গাজীপুর থেকে প্রত্যাহার করে অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগ, অর্থ মন্ত্রণালয়ে ‘বিশেষ ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা’ হিসেবে সংযুক্ত করেছে।
তিন পাসপোর্টের রহস্য
অনুসন্ধানে পাওয়া নথি অনুযায়ী, মো. আইয়ুবের নামে ব্যবহৃত পাসপোর্টগুলো হলো—সবচেয়ে পুরোনো BP03795*, এরপর A033271* এবং সর্বশেষ ও বর্তমানে সচল A091834**। শেষোক্তটি ‘ORDINARY’ বা সাধারণ পাসপোর্ট হিসেবে ২০২৪ সালের ১৩ নভেম্বর ইস্যু হয়, যার মেয়াদ ২০৩৪ সালের ১১ নভেম্বর পর্যন্ত।
নথিতে সবচেয়ে দৃষ্টি কাড়ে পেশার ঘরটি—যেখানে স্পষ্ট লেখা ‘PRIVATE SERVICE’। অথচ একই নথিতে তাঁর ঠিকানা হিসেবে উল্লেখ আছে বনানীর সরকারি কাস্টমস কোয়ার্টার। প্রশ্ন উঠেছে—তিনি যদি বেসরকারি চাকরিতে থাকেন, তাহলে সরকারি বাসভবন কীভাবে ব্যবহার করছেন? আর সরকারি কর্মকর্তা হয়ে থাকলে পাসপোর্টে মিথ্যা পেশা উল্লেখের উদ্দেশ্য কী? এই সাংঘর্ষিক তথ্যের ব্যাখ্যা মেলেনি এখনো।
আট বছরে ২৫ বার বিদেশযাত্রা
অনুসন্ধানে পাওয়া ভ্রমণ-রেকর্ড বিশ্লেষণে দেখা যায়, তিনটি পাসপোর্ট মিলিয়ে মো. আইয়ুব সবচেয়ে বেশি গেছেন ভারতে—১২ বার। এরপর থাইল্যান্ডে ৭ বার, সংযুক্ত আরব আমিরাতে ২ বার, চীনে ২ বার এবং মালয়েশিয়া ও সিঙ্গাপুরে একবার করে।
ভ্রমণের ধরন লক্ষ করলে দেখা যায় একটি স্পষ্ট প্যাটার্ন:
BP03795 পাসপোর্টে (২০১৮ আগস্ট–২০২০ জানুয়ারি):** টানা সাতবার শুধু ভারত ভ্রমণ।
A033271 পাসপোর্টে (২০২২ এপ্রিল–২০২৪ সেপ্টেম্বর):** ভারত, থাইল্যান্ড, আরব আমিরাত ও মালয়েশিয়া মিলিয়ে ১০ বার ভ্রমণ।
A091834 পাসপোর্টে (২০২৪ ডিসেম্বর–২০২৬ জুন):** থাইল্যান্ড, চীন ও সিঙ্গাপুর মিলিয়ে আটবার ভ্রমণ।
লক্ষণীয় বিষয় হলো, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে থাইল্যান্ড ভ্রমণের পুনরাবৃত্তি বেড়েছে—২০২৩ সালের মার্চ থেকে ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত অন্তত পাঁচবার তিনি থাইল্যান্ড গেছেন। ঘন ঘন একই দেশে যাতায়াতের এই প্রবণতা এবং তার সঙ্গে সম্ভাব্য আর্থিক লেনদেনের সম্পর্ক অনুসন্ধানের দাবি জানিয়েছেন অভিযোগকারী।
ভ্রমণের পূর্ণ তালিকা

পাসপোর্ট নম্বর ভ্রমণের তারিখ ফ্লাইট নম্বর সংশ্লিষ্ট দেশ
BP03795** ০১ আগস্ট ২০১৮ A1229 ভারত
BP03795** ০৮ নভেম্বর ২০১৮ A1229 ভারত
BP03795** ১৫ মার্চ ২০১৯ RX0971 ভারত
BP03795** ০১ মে ২০১৯ RX0971 ভারত
BP03795** ২৮ জুন ২০১৯ BS201 ভারত
BP03795** ১৫ নভেম্বর ২০১৯ RX0971 ভারত
BP03795** ১৪ জানুয়ারি ২০২০ BS201 ভারত
A033271** ২৯ এপ্রিল ২০২২ EK583 সংযুক্তআরব আমিরাত
A033271** ১৮ আগস্ট ২০২২ BS201 ভারত
A033271** ০৬ অক্টোবর ২০২২ BS203 ভারত
A033271** ১৭ মার্চ ২০২৩ BS217 থাইল্যান্ড
A033271** ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২৩ EK587 সংযুক্তআরব আমিরাত
A033271** ০২ নভেম্বর ২০২৩ VQ721 ভারত
A033271** ০৫ জানুয়ারি ২০২৪ VQ721 ভারত
A033271** ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৪ BG388 থাইল্যান্ড
A033271** ১৩ জুন ২০২৪ MH197 মালয়েশিয়া
A033271** ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৪ 6E1106 ভারত
A091834** ১২ ডিসেম্বর ২০২৪ BS325 চীন
A091834** ০৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৫ BG388 থাইল্যান্ড
A091834** ০৩ জুলাই ২০২৫ BG388 থাইল্যান্ড
A091834** ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৫ MU2036 চীন
A091834** ১৬ ডিসেম্বর ২০২৫ BS217 থাইল্যান্ড
A091834** ১৭ মার্চ ২০২৬ SQ447 সিঙ্গাপুর
A091834** ২১ মে ২০২৬ BS217 থাইল্যান্ড
A091834** ১৮ জুন ২০২৬ BS217 থাইল্যান্ড
সরকারি চাকরিবিধি অনুযায়ী, কর্মরত অবস্থায় কোনো কর্মকর্তার ব্যক্তিগত বিদেশ ভ্রমণের ক্ষেত্রেও প্রয়োজন হয় বিভাগীয় অনুমতি, ছুটি এবং ক্ষেত্রবিশেষে সরকারি আদেশ। দুদকে দাখিল করা অভিযোগে দাবি করা হয়েছে, মো. আইয়ুব উল্লিখিত ২৫টি ভ্রমণের কোনোটির আগেই প্রয়োজনীয় বিভাগীয় অনুমতি নেননি।
বেনজীরের ছায়া?
আওয়ামী শাসনামলের সাবেক আইজিপি বেনজীর আহমেদের বিরুদ্ধে ওঠা বহুল আলোচিত সম্পদ ও পাসপোর্ট-সংক্রান্ত অভিযোগের সঙ্গে এই ঘটনার মিল খুঁজে পাচ্ছেন অভিযোগকারীরা। একাধিক পাসপোর্ট ব্যবহার, পেশা গোপন করা এবং ঘন ঘন বিদেশ ভ্রমণ—এই প্যাটার্ন সরকারি কর্মকর্তাদের মধ্যে সম্পদ ও অর্থ পাচারের একটি পরিচিত কৌশল হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে।
অভিযোগে বলা হয়েছে, সহকারী কমিশনার মো. আইয়ুব ব্যাপক দুর্নীতির মাধ্যমে বিপুল অর্থ অর্জন করেছেন এবং তার একটি অংশ বিদেশে পাচার করেছেন। তাঁর ঘন ঘন বিদেশ ভ্রমণ, একাধিক পাসপোর্ট ব্যবহার এবং পাসপোর্টে সরকারি পরিচয় গোপন রাখার সঙ্গে অর্থ পাচারের সম্ভাব্য যোগসূত্র খতিয়ে দেখার দাবি জানানো হয়েছে। অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ে তাঁর ব্যাংক হিসাব, আয়কর নথি, সম্পদ বিবরণী, আন্তর্জাতিক আর্থিক লেনদেন এবং বিদেশে সম্ভাব্য বিনিয়োগ বা সম্পদের তথ্য অনুসন্ধানের আওতায় আনার আহ্বান জানানো হয়েছে অভিযোগে।
গত ২৭ আগস্ট ২০২৬ তারিখে এনবিআরের অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগ থেকে জারি করা এক প্রজ্ঞাপনে (স্মারক নম্বর: ০৮.০০.০০০০.০০০.০৩৮.২৭.০০০১.১৯.১৯৩) জানানো হয়, মো. আইয়ুবকে কাস্টমস, এক্সাইজ ও ভ্যাট কমিশনারেট, গাজীপুর থেকে প্রত্যাহার করে অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগ, অর্থ মন্ত্রণালয়ে ‘বিশেষ ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা’ (ওএসডি-সদৃশ পদায়ন) হিসেবে সংযুক্ত করা হলো। আদেশে বলা হয়, ‘জনস্বার্থে জারিকৃত এ আদেশ অবিলম্বে কার্যকর হবে।’ আদেশটি রাষ্ট্রপতির আদেশক্রমে জারি করেন সিনিয়র সহকারী সচিব মিজানুর রহমত।
প্রজ্ঞাপনে বদলির সুনির্দিষ্ট কারণ উল্লেখ করা হয়নি। তবে নির্দিষ্ট কোনো পদে না রেখে সরাসরি মন্ত্রণালয়ে সংযুক্ত বা ওএসডি করে রাখা বাংলাদেশের প্রশাসনিক ব্যবস্থায় সচরাচর তদন্তাধীন বা বিতর্কিত কর্মকর্তাদের ক্ষেত্রে অনুসরণ করা একটি পরিচিত পদ্ধতি। দুদকে অভিযোগ দাখিল ও এই বদলির সময়ের মধ্যকার নৈকট্য স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন তুলেছে—যদিও দুটি ঘটনার মধ্যে সরাসরি কার্যকারণ সম্পর্ক এখনো নিশ্চিত করা যায়নি।
অভিযুক্তের বক্তব্য
অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে মো. আইয়ুবের ব্যক্তিগত মুঠোফোন নম্বরে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি কল রিসিভ করেননি। তাঁর বক্তব্য পাওয়া গেলে প্রতিবেদনে যুক্ত করা হবে।
এখন যা জানা প্রয়োজন
বদলির আদেশে উল্লিখিত কারণ কি সত্যিই দুদকের অভিযোগের সঙ্গে সম্পর্কিত, নাকি এটি রুটিন প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত—এ বিষয়ে এনবিআরের সুনির্দিষ্ট বক্তব্য প্রয়োজন।
দুদক অভিযোগটি আমলে নিয়ে অনুসন্ধান শুরু করেছে কি না।
মো. আইয়ুবের সম্পদ বিবরণী ও আয়কর নথির সঙ্গে তাঁর ব্যয়বহুল ভ্রমণ-ইতিহাসের সংগতি আছে কি না।
একাধিক পাসপোর্ট ইস্যুর প্রক্রিয়ায় পাসপোর্ট অধিদপ্তরের কোনো গাফিলতি বা যোগসাজশ ছিল কি না।
(দুর্নীতি দমন কমিশনে দাখিল করা অভিযোগ ও সরকারি নথির ভিত্তিতে প্রস্তুত। এই প্রতিবেদনে উল্লিখিত অভিযোগসমূহ এখনো তদন্তাধীন এবং প্রমাণিত নয়। মো. আইয়ুবের বক্তব্য পাওয়া গেলে তা যুক্ত করা হবে।)