ঢাকা ০২:৫৭ অপরাহ্ন, শনিবার, ২৯ অগাস্ট ২০২৬, ১৪ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম ::
ব্রাহ্মণবাড়িয়া পাসপোর্ট অফিসে ‘চ্যানেল’ বাণিজ্য, দিনে ৪-৫ লাখ টাকা আদায়ের অভিযোগ বাঘারচর আলিম মাদ্রাসার শিক্ষক রকিবুজ্জামানের বিরুদ্ধে অপপ্রচারের প্রতিবাদে সংবাদ সম্মেলন গোয়াইনঘাটে ৫০০ টাকা মজুরির দাবিতে গুলনী চা বাগানে তৃতীয় দিনের কর্মবিরতি ও বিক্ষোভ বিএসইসির দুই কর্মকর্তাকে ঘিরে উঠেছে নানা প্রশ্ন পিডিবিএফ কর্মকর্তা মামুনুর রশিদকে ঘিরে নিয়োগ,পদোন্নতি ও আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ ১২ দিনেই বদলে গেল সিদ্ধান্ত, দুর্নীতির ‘প্রমাণ’ থেকে ‘ক্লিন চিট’ নির্বাহী প্রকৌশলী তবিবুরের স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে কাজ না করেও দুই মাসের বেতন পান আরেকজন, বঞ্চিত পুরোনো ১৩ কর্মী বরিশাল গণপূর্তে টেন্ডার সিন্ডিকেটের দাপট, নিয়ন্ত্রণে প্রকৌশলী ফয়সাল রেলের ১,২৯৮ কোটি টাকার প্রকল্পে অসংগতির পাহাড় অবৈধ ব্যবসায় গণপূর্তের পাঁচ প্রকৌশলী এখন ‘মিনি শিল্পপতি

পিডিবিএফ কর্মকর্তা মামুনুর রশিদকে ঘিরে নিয়োগ,পদোন্নতি ও আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ

পল্লী দারিদ্র্য বিমোচন ফাউন্ডেশনের (পিডিবিএফ) কর্মকর্তা মামুনুর রশিদকে ঘিরে চাকরিতে প্রবেশ, পদোন্নতি, নিয়োগ প্রক্রিয়া, প্রকল্প বাস্তবায়ন এবং আর্থিক অনিয়মের একাধিক অভিযোগ সামনে এসেছে। সংশ্লিষ্ট নথি, নিরীক্ষা আপত্তি, তদন্ত প্রতিবেদনের দাবি এবং বিভিন্ন পর্যায়ের অভিযোগ বিশ্লেষণ করলে তাঁর কর্মজীবনের বিভিন্ন পর্যায়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও প্রশাসনিক প্রভাব বিস্তার নিয়ে প্রশ্ন উঠছে।
অভিযোগের শুরুই চাকরিতে প্রবেশের সময়কার যোগ্যতা নিয়ে। অভিযোগকারীদের দাবি, মামুনুর রশিদ চাকরির জন্য আবেদন করার সময় তাঁর বয়স ছিল ৩১ বছর ২৪ দিন। অথচ সংশ্লিষ্ট নিয়োগে সর্বোচ্চ বয়সসীমা ৩০ বছর ছিল বলে দাবি করা হয়েছে। একই সঙ্গে তাঁর আবেদনপত্রে অভিজ্ঞতার উল্লেখ থাকলেও সেই অভিজ্ঞতার পক্ষে সনদ কিংবা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের ছাড়পত্র সংযুক্ত ছিল না বলেও অভিযোগ রয়েছে। ফলে প্রশ্ন উঠেছে, নির্ধারিত বয়সসীমা অতিক্রম করার পর কীভাবে তাঁর আবেদন গ্রহণ ও নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়েছিল এবং নিয়োগ কর্তৃপক্ষ তখন কোন বিধি বা সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে তাঁকে যোগ্য বিবেচনা করেছিল।
মামুনুর রশিদের বিরুদ্ধে সবচেয়ে গুরুতর অভিযোগগুলোর একটি বাগেরহাট সদর কার্যালয়ে ৪ কোটি ১৩ লাখ টাকা আত্মসাতের ঘটনা। অভিযোগে বলা হয়েছে, তিনি পিরোজপুর অঞ্চলে সহকারী পরিচালক (মনিটরিং) হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে বাগেরহাট সদর কার্যালয়ে এই বিপুল পরিমাণ অর্থ আত্মসাতের ঘটনা ঘটে। অভিযোগকারীদের দাবি, পিডিবিএফের অভ্যন্তরীণ নিরীক্ষা প্রতিবেদনে ঘটনাটি উল্লেখ রয়েছে। যদি নিরীক্ষা প্রতিবেদনে সত্যিই এ ধরনের তথ্য ও দায়-দায়িত্বের সংশ্লিষ্টতা উল্লেখ থাকে, তাহলে ওই অর্থের উৎস, আত্মসাতের পদ্ধতি, দায়ী ব্যক্তিদের ভূমিকা এবং অর্থ উদ্ধারে গৃহীত পদক্ষেপ—এসব বিষয়ই এখন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
আরও গুরুতর প্রশ্ন উঠেছে তদন্ত কমিটির ভূমিকা নিয়ে। অভিযোগকারীদের দাবি, বাগেরহাটের অর্থ আত্মসাতের ঘটনায় মামুনুর রশিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও তাঁকে তদন্ত কমিটির সদস্য করা হয়। অর্থাৎ যে ঘটনায় তাঁর ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে, সেই ঘটনাই তদন্তের প্রক্রিয়ায় তিনি অংশ নিয়েছেন—এমন দাবি সত্য হলে এটি তদন্তের নিরপেক্ষতা নিয়ে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন তৈরি করে। তদন্ত কমিটিতে তাঁর অন্তর্ভুক্তির প্রশাসনিক আদেশ, কমিটির সদস্যদের দায়িত্ব, তদন্ত প্রতিবেদনের সুপারিশ এবং পরবর্তী ব্যবস্থা গ্রহণের নথি প্রকাশ করা হলে এ বিষয়ে প্রকৃত চিত্র স্পষ্ট হতে পারে।
অভিযোগে বলা হয়েছে, বাগেরহাটের ওই ঘটনায় পাঁচজন কর্মকর্তা-কর্মচারীর বিরুদ্ধে চাকরিচ্যুতিসহ ব্যবস্থা নেওয়া হলেও মামুনুর রশিদ চাকরিতে বহাল ছিলেন এবং পরবর্তীতে ধারাবাহিকভাবে পদোন্নতি পেয়েছেন। একই ঘটনায় একাধিক ব্যক্তির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হলেও অন্য কারও বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নেওয়ার কারণ কী—সেটিও অনুসন্ধানের দাবি রাখে। সংশ্লিষ্ট তদন্ত প্রতিবেদনে কার কার বিরুদ্ধে কী ধরনের দায় নির্ধারণ করা হয়েছিল, তা পর্যালোচনা না করলে অভিযোগের পূর্ণতা বোঝা সম্ভব নয়।
মামুনুর রশিদের পদোন্নতি নিয়েও রয়েছে গুরুতর অভিযোগ। অভিযোগকারীদের দাবি, তাঁর বার্ষিক কর্মদক্ষতা মূল্যায়নের নম্বর পরিবর্তন বা ঘষামাজার মাধ্যমে বাড়ানো হয়েছিল। পাশাপাশি তৎকালীন রাজনৈতিক ও শ্রমিক সংগঠনের প্রভাবশালী ব্যক্তিদের সঙ্গে যোগসাজশ করে পদোন্নতি নিশ্চিত করার অভিযোগও করা হয়েছে। এ বিষয়ে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় বিভাগ তদন্ত করে পদোন্নতি বাতিলসহ সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করেছিল বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।
আরও দাবি করা হয়েছে, পিডিবিএফের তৎকালীন অতিরিক্ত পরিচালক (মানবসম্পদ উন্নয়ন) মহিউদ্দিন আহমেদ পান্নু পদোন্নতি প্রক্রিয়ায় দুর্নীতি ও অনিয়মের বিষয়টি উল্লেখ করে কর্তৃপক্ষের কাছে লিখিত বক্তব্য দিয়েছিলেন। এ ধরনের লিখিত বক্তব্য বাস্তবে দেওয়া হয়ে থাকলে সেটির পূর্ণাঙ্গ অনুলিপি, তদন্তের পরবর্তী সিদ্ধান্ত এবং সুপারিশ বাস্তবায়িত হয়েছিল কি না—এসব নথিই মামুনুর রশিদের পদোন্নতি বিতর্কের গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ হতে পারে।
তাঁর বিরুদ্ধে আরেকটি অভিযোগ উঠেছে পিডিবিএফের ‘কার্যক্রম সম্প্রসারণ প্রকল্প ২য় পর্যায়’কে ঘিরে। অভিযোগকারীদের দাবি, মামুনুর রশিদ ওই প্রকল্পের উপ-প্রকল্প পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে প্রকল্পের বিপুল অর্থ আত্মসাৎ করেছেন।
নিয়োগ প্রক্রিয়াতেও তাঁর প্রভাব নিয়ে বড় ধরনের অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগকারীদের দাবি, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের পদোন্নতি ও নিয়োগ কমিটির সদস্য না হয়েও তিনি প্রভাব খাটিয়ে ওই কমিটিতে অন্তর্ভুক্ত হন এবং বিতর্কিত বা অযোগ্য ব্যক্তিদের পদোন্নতি দেওয়ার ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখেন। সবচেয়ে বড় অভিযোগ, তাঁর প্রভাবাধীন সময়ে ১ হাজার ৬৬৫ জনকে নিয়োগ দেওয়ার পাশাপাশি আরও ২ হাজার ২০০ জনের একটি বিশাল অপেক্ষমাণ তালিকা তৈরি করা হয়। পরে মাঠপর্যায়ে তাঁর বিশ্বস্ত ব্যক্তিদের মাধ্যমে নিয়োগপ্রার্থীদের সঙ্গে যোগাযোগ করে দর-কষাকষির অভিযোগও করা হয়েছে।
এই অভিযোগের আর্থিক দিকটিও বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। ওই নিয়োগ প্রক্রিয়ায় প্রায় ২২ কোটি টাকা ব্যয় দেখানো হয়েছিল বলে অভিযোগে উল্লেখ রয়েছে। ১ হাজার ৬৬৫ জনের নিয়োগের বিপরীতে এত বড় অঙ্কের ব্যয়ের যৌক্তিকতা কী ছিল, কোন কোন খাতে এই অর্থ ব্যয় হয়েছে, নিয়োগ-সংক্রান্ত বিজ্ঞাপন, পরীক্ষা, মূল্যায়ন, প্রশাসনিক ব্যয় ও অন্যান্য খাতে কত টাকা বরাদ্দ ছিল—এসব তথ্য নিরীক্ষা করলে অভিযোগের প্রকৃত ভিত্তি বেরিয়ে আসতে পারে।
অভিযোগের আরেকটি অংশ পিডিবিএফের প্রশাসন শাখার উপপরিচালক ফজিলাতুন্নেসাকে ঘিরে। লেখায় দাবি করা হয়েছে, তাঁর শিক্ষাগত যোগ্যতা নিয়ে আপত্তি ওঠার পর বৈদেশিক সাহায্যপুষ্ট প্রকল্প অডিট অধিদপ্তর তাঁর নিয়োগ বাতিল, অর্থ আদায় এবং চাকরিচ্যুতির সুপারিশ করেছিল। একই সঙ্গে সংশ্লিষ্ট নিয়োগদাতাদের বিরুদ্ধেও শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশনা ছিল বলে দাবি করা হয়েছে। সরকারি হিসাব সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির বৈঠকেও সংশ্লিষ্ট নিরীক্ষা আপত্তি নিয়ে আলোচনা ও ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল বলে অভিযোগে উল্লেখ রয়েছে।
কিন্তু এসব অভিযোগের পরও ফজিলাতুন্নেসা কীভাবে চাকরিতে বহাল থাকলেন এবং পরবর্তীতে উপপরিচালক পদে পদোন্নতি পেলেন—এ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন অভিযোগকারীরা। তাঁদের দাবি, মামুনুর রশিদের প্রভাবেই তাঁর পদোন্নতি হয়। এমনকি উৎকোচের বিনিময়ে পদোন্নতি দেওয়ার অভিযোগও করা হয়েছে।
সব অভিযোগকে একত্রে বিবেচনা করলে মূল প্রশ্নটি দাঁড়ায়—একজন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে চাকরিতে প্রবেশের যোগ্যতা, আর্থিক অনিয়ম, তদন্ত প্রক্রিয়ায় স্বার্থের সংঘাত, পদোন্নতিতে অনিয়ম, প্রকল্পের অর্থ ব্যবস্থাপনা এবং নিয়োগ প্রক্রিয়ায় প্রভাব বিস্তারের মতো এতগুলো অভিযোগ থাকলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কী কী তদন্ত করেছে এবং সেই তদন্তের ফলাফল কী?
আরও একটি প্রশ্ন হলো, কোনো অভিযোগের ভিত্তিতে যদি তদন্ত হয়ে থাকে, তাহলে সেই তদন্তের সুপারিশ বাস্তবায়ন করা হয়েছে কি না। যদি হয়ে থাকে, কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে; আর যদি না হয়ে থাকে, তার কারণ কী। একইভাবে অভ্যন্তরীণ নিরীক্ষা, মন্ত্রণালয়ের তদন্ত, সরকারি হিসাব সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির পর্যবেক্ষণ এবং পিডিবিএফের নিজস্ব প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত—এই চারটি স্তরের নথি পাশাপাশি পর্যালোচনা করলেই মামুনুর রশিদের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের প্রকৃত চিত্র বেরিয়ে আসতে পারে।
এদিকে পিডিবিএফের মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের একটি অংশ মামুনুর রশিদ ও ফজিলাতুন্নেসার বিরুদ্ধে কঠোর প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে। তাঁদের অভিযোগের সুষ্ঠু নিষ্পত্তির জন্য স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি উঠেছে।

Tag :

আপনার মতামত লিখুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল ও অন্যান্য তথ্য সঞ্চয় করে রাখুন

আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

ব্রাহ্মণবাড়িয়া পাসপোর্ট অফিসে ‘চ্যানেল’ বাণিজ্য, দিনে ৪-৫ লাখ টাকা আদায়ের অভিযোগ

পিডিবিএফ কর্মকর্তা মামুনুর রশিদকে ঘিরে নিয়োগ,পদোন্নতি ও আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ

আপডেট সময় ০২:০৭:৪৯ অপরাহ্ন, শনিবার, ২৯ অগাস্ট ২০২৬

পল্লী দারিদ্র্য বিমোচন ফাউন্ডেশনের (পিডিবিএফ) কর্মকর্তা মামুনুর রশিদকে ঘিরে চাকরিতে প্রবেশ, পদোন্নতি, নিয়োগ প্রক্রিয়া, প্রকল্প বাস্তবায়ন এবং আর্থিক অনিয়মের একাধিক অভিযোগ সামনে এসেছে। সংশ্লিষ্ট নথি, নিরীক্ষা আপত্তি, তদন্ত প্রতিবেদনের দাবি এবং বিভিন্ন পর্যায়ের অভিযোগ বিশ্লেষণ করলে তাঁর কর্মজীবনের বিভিন্ন পর্যায়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও প্রশাসনিক প্রভাব বিস্তার নিয়ে প্রশ্ন উঠছে।
অভিযোগের শুরুই চাকরিতে প্রবেশের সময়কার যোগ্যতা নিয়ে। অভিযোগকারীদের দাবি, মামুনুর রশিদ চাকরির জন্য আবেদন করার সময় তাঁর বয়স ছিল ৩১ বছর ২৪ দিন। অথচ সংশ্লিষ্ট নিয়োগে সর্বোচ্চ বয়সসীমা ৩০ বছর ছিল বলে দাবি করা হয়েছে। একই সঙ্গে তাঁর আবেদনপত্রে অভিজ্ঞতার উল্লেখ থাকলেও সেই অভিজ্ঞতার পক্ষে সনদ কিংবা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের ছাড়পত্র সংযুক্ত ছিল না বলেও অভিযোগ রয়েছে। ফলে প্রশ্ন উঠেছে, নির্ধারিত বয়সসীমা অতিক্রম করার পর কীভাবে তাঁর আবেদন গ্রহণ ও নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়েছিল এবং নিয়োগ কর্তৃপক্ষ তখন কোন বিধি বা সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে তাঁকে যোগ্য বিবেচনা করেছিল।
মামুনুর রশিদের বিরুদ্ধে সবচেয়ে গুরুতর অভিযোগগুলোর একটি বাগেরহাট সদর কার্যালয়ে ৪ কোটি ১৩ লাখ টাকা আত্মসাতের ঘটনা। অভিযোগে বলা হয়েছে, তিনি পিরোজপুর অঞ্চলে সহকারী পরিচালক (মনিটরিং) হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে বাগেরহাট সদর কার্যালয়ে এই বিপুল পরিমাণ অর্থ আত্মসাতের ঘটনা ঘটে। অভিযোগকারীদের দাবি, পিডিবিএফের অভ্যন্তরীণ নিরীক্ষা প্রতিবেদনে ঘটনাটি উল্লেখ রয়েছে। যদি নিরীক্ষা প্রতিবেদনে সত্যিই এ ধরনের তথ্য ও দায়-দায়িত্বের সংশ্লিষ্টতা উল্লেখ থাকে, তাহলে ওই অর্থের উৎস, আত্মসাতের পদ্ধতি, দায়ী ব্যক্তিদের ভূমিকা এবং অর্থ উদ্ধারে গৃহীত পদক্ষেপ—এসব বিষয়ই এখন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
আরও গুরুতর প্রশ্ন উঠেছে তদন্ত কমিটির ভূমিকা নিয়ে। অভিযোগকারীদের দাবি, বাগেরহাটের অর্থ আত্মসাতের ঘটনায় মামুনুর রশিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও তাঁকে তদন্ত কমিটির সদস্য করা হয়। অর্থাৎ যে ঘটনায় তাঁর ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে, সেই ঘটনাই তদন্তের প্রক্রিয়ায় তিনি অংশ নিয়েছেন—এমন দাবি সত্য হলে এটি তদন্তের নিরপেক্ষতা নিয়ে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন তৈরি করে। তদন্ত কমিটিতে তাঁর অন্তর্ভুক্তির প্রশাসনিক আদেশ, কমিটির সদস্যদের দায়িত্ব, তদন্ত প্রতিবেদনের সুপারিশ এবং পরবর্তী ব্যবস্থা গ্রহণের নথি প্রকাশ করা হলে এ বিষয়ে প্রকৃত চিত্র স্পষ্ট হতে পারে।
অভিযোগে বলা হয়েছে, বাগেরহাটের ওই ঘটনায় পাঁচজন কর্মকর্তা-কর্মচারীর বিরুদ্ধে চাকরিচ্যুতিসহ ব্যবস্থা নেওয়া হলেও মামুনুর রশিদ চাকরিতে বহাল ছিলেন এবং পরবর্তীতে ধারাবাহিকভাবে পদোন্নতি পেয়েছেন। একই ঘটনায় একাধিক ব্যক্তির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হলেও অন্য কারও বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নেওয়ার কারণ কী—সেটিও অনুসন্ধানের দাবি রাখে। সংশ্লিষ্ট তদন্ত প্রতিবেদনে কার কার বিরুদ্ধে কী ধরনের দায় নির্ধারণ করা হয়েছিল, তা পর্যালোচনা না করলে অভিযোগের পূর্ণতা বোঝা সম্ভব নয়।
মামুনুর রশিদের পদোন্নতি নিয়েও রয়েছে গুরুতর অভিযোগ। অভিযোগকারীদের দাবি, তাঁর বার্ষিক কর্মদক্ষতা মূল্যায়নের নম্বর পরিবর্তন বা ঘষামাজার মাধ্যমে বাড়ানো হয়েছিল। পাশাপাশি তৎকালীন রাজনৈতিক ও শ্রমিক সংগঠনের প্রভাবশালী ব্যক্তিদের সঙ্গে যোগসাজশ করে পদোন্নতি নিশ্চিত করার অভিযোগও করা হয়েছে। এ বিষয়ে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় বিভাগ তদন্ত করে পদোন্নতি বাতিলসহ সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করেছিল বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।
আরও দাবি করা হয়েছে, পিডিবিএফের তৎকালীন অতিরিক্ত পরিচালক (মানবসম্পদ উন্নয়ন) মহিউদ্দিন আহমেদ পান্নু পদোন্নতি প্রক্রিয়ায় দুর্নীতি ও অনিয়মের বিষয়টি উল্লেখ করে কর্তৃপক্ষের কাছে লিখিত বক্তব্য দিয়েছিলেন। এ ধরনের লিখিত বক্তব্য বাস্তবে দেওয়া হয়ে থাকলে সেটির পূর্ণাঙ্গ অনুলিপি, তদন্তের পরবর্তী সিদ্ধান্ত এবং সুপারিশ বাস্তবায়িত হয়েছিল কি না—এসব নথিই মামুনুর রশিদের পদোন্নতি বিতর্কের গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ হতে পারে।
তাঁর বিরুদ্ধে আরেকটি অভিযোগ উঠেছে পিডিবিএফের ‘কার্যক্রম সম্প্রসারণ প্রকল্প ২য় পর্যায়’কে ঘিরে। অভিযোগকারীদের দাবি, মামুনুর রশিদ ওই প্রকল্পের উপ-প্রকল্প পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে প্রকল্পের বিপুল অর্থ আত্মসাৎ করেছেন।
নিয়োগ প্রক্রিয়াতেও তাঁর প্রভাব নিয়ে বড় ধরনের অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগকারীদের দাবি, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের পদোন্নতি ও নিয়োগ কমিটির সদস্য না হয়েও তিনি প্রভাব খাটিয়ে ওই কমিটিতে অন্তর্ভুক্ত হন এবং বিতর্কিত বা অযোগ্য ব্যক্তিদের পদোন্নতি দেওয়ার ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখেন। সবচেয়ে বড় অভিযোগ, তাঁর প্রভাবাধীন সময়ে ১ হাজার ৬৬৫ জনকে নিয়োগ দেওয়ার পাশাপাশি আরও ২ হাজার ২০০ জনের একটি বিশাল অপেক্ষমাণ তালিকা তৈরি করা হয়। পরে মাঠপর্যায়ে তাঁর বিশ্বস্ত ব্যক্তিদের মাধ্যমে নিয়োগপ্রার্থীদের সঙ্গে যোগাযোগ করে দর-কষাকষির অভিযোগও করা হয়েছে।
এই অভিযোগের আর্থিক দিকটিও বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। ওই নিয়োগ প্রক্রিয়ায় প্রায় ২২ কোটি টাকা ব্যয় দেখানো হয়েছিল বলে অভিযোগে উল্লেখ রয়েছে। ১ হাজার ৬৬৫ জনের নিয়োগের বিপরীতে এত বড় অঙ্কের ব্যয়ের যৌক্তিকতা কী ছিল, কোন কোন খাতে এই অর্থ ব্যয় হয়েছে, নিয়োগ-সংক্রান্ত বিজ্ঞাপন, পরীক্ষা, মূল্যায়ন, প্রশাসনিক ব্যয় ও অন্যান্য খাতে কত টাকা বরাদ্দ ছিল—এসব তথ্য নিরীক্ষা করলে অভিযোগের প্রকৃত ভিত্তি বেরিয়ে আসতে পারে।
অভিযোগের আরেকটি অংশ পিডিবিএফের প্রশাসন শাখার উপপরিচালক ফজিলাতুন্নেসাকে ঘিরে। লেখায় দাবি করা হয়েছে, তাঁর শিক্ষাগত যোগ্যতা নিয়ে আপত্তি ওঠার পর বৈদেশিক সাহায্যপুষ্ট প্রকল্প অডিট অধিদপ্তর তাঁর নিয়োগ বাতিল, অর্থ আদায় এবং চাকরিচ্যুতির সুপারিশ করেছিল। একই সঙ্গে সংশ্লিষ্ট নিয়োগদাতাদের বিরুদ্ধেও শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশনা ছিল বলে দাবি করা হয়েছে। সরকারি হিসাব সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির বৈঠকেও সংশ্লিষ্ট নিরীক্ষা আপত্তি নিয়ে আলোচনা ও ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল বলে অভিযোগে উল্লেখ রয়েছে।
কিন্তু এসব অভিযোগের পরও ফজিলাতুন্নেসা কীভাবে চাকরিতে বহাল থাকলেন এবং পরবর্তীতে উপপরিচালক পদে পদোন্নতি পেলেন—এ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন অভিযোগকারীরা। তাঁদের দাবি, মামুনুর রশিদের প্রভাবেই তাঁর পদোন্নতি হয়। এমনকি উৎকোচের বিনিময়ে পদোন্নতি দেওয়ার অভিযোগও করা হয়েছে।
সব অভিযোগকে একত্রে বিবেচনা করলে মূল প্রশ্নটি দাঁড়ায়—একজন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে চাকরিতে প্রবেশের যোগ্যতা, আর্থিক অনিয়ম, তদন্ত প্রক্রিয়ায় স্বার্থের সংঘাত, পদোন্নতিতে অনিয়ম, প্রকল্পের অর্থ ব্যবস্থাপনা এবং নিয়োগ প্রক্রিয়ায় প্রভাব বিস্তারের মতো এতগুলো অভিযোগ থাকলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কী কী তদন্ত করেছে এবং সেই তদন্তের ফলাফল কী?
আরও একটি প্রশ্ন হলো, কোনো অভিযোগের ভিত্তিতে যদি তদন্ত হয়ে থাকে, তাহলে সেই তদন্তের সুপারিশ বাস্তবায়ন করা হয়েছে কি না। যদি হয়ে থাকে, কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে; আর যদি না হয়ে থাকে, তার কারণ কী। একইভাবে অভ্যন্তরীণ নিরীক্ষা, মন্ত্রণালয়ের তদন্ত, সরকারি হিসাব সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির পর্যবেক্ষণ এবং পিডিবিএফের নিজস্ব প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত—এই চারটি স্তরের নথি পাশাপাশি পর্যালোচনা করলেই মামুনুর রশিদের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের প্রকৃত চিত্র বেরিয়ে আসতে পারে।
এদিকে পিডিবিএফের মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের একটি অংশ মামুনুর রশিদ ও ফজিলাতুন্নেসার বিরুদ্ধে কঠোর প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে। তাঁদের অভিযোগের সুষ্ঠু নিষ্পত্তির জন্য স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি উঠেছে।