ঢাকার মেট্রোরেলের নতুন লাইন-১ ও ৫-এর নির্মাণ ব্যয় প্রাথমিক প্রাক্কলনের তুলনায় দ্বিগুণেরও বেশি হবে। সরকারের সাত সদস্যের স্বাধীন বিশেষজ্ঞ কমিটির অর্থনৈতিক বিশ্লেষণে এমন চিত্র উঠে এসেছে। কারণ হিসেবে কমিটি ডলারের মূল্যবৃদ্ধি, মূল্যস্ফীতি, করের হার বৃদ্ধিসহ নকশায় পরিবর্তনের কথা তুলে ধরেছে। মেট্রোরেলের এই নতুন রুটটি বিমানবন্দর-নতুন বাজার ও হেমায়েতপুর হয়ে ভাটারায় শেষ হয়েছে। এদিকে ঢাকা মাস ট্রানজিট কোম্পানি লিমিটেডের (ডিএমটিসিএল) সংশোধিত প্রস্তাবে ব্যয় আরও বেশি ধরা হয়েছে।
মে মাসে গঠিত স্বাধীন বিশেষজ্ঞ কমিটির প্রধান শামীম জেড বসুনিয়া জানান, পাঁচ থেকে সাত বছর আগে প্রকল্পের মূল উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব (ডিপিপি) তৈরির সময়ের তুলনায় বর্তমানে নির্মাণসামগ্রী ও অন্যান্য ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। কমিটি অর্থনৈতিক বিশ্লেষণে ৫ শতাংশ মূল্যস্ফীতির হার বিবেচনায় নিয়েছে। একই সঙ্গে টাকার বিপরীতে মার্কিন ডলারের মূল্য প্রায় ২০ শতাংশ বেড়েছে এবং করের হারও বৃদ্ধি পেয়েছে।
বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) সাবেক অধ্যাপক ও ইউনিভার্সিটি অব এশিয়া প্যাসিফিকের সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের ইমেরিটাস অধ্যাপক বসুনিয়া বলেন, বর্তমান ও প্রস্তাবিত নকশার ভিত্তিতে কমিটি অর্থনৈতিক সম্ভাব্যতা যাচাই করেছে। এটি কোনো প্রকৌশলগত সমীক্ষা ছিল না। সেই বিশ্লেষণে প্রকল্পের ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যাওয়ার বিষয়টি উঠে এসেছে। এ ছাড়া কয়েকটি স্টেশনের নকশাতেও বড় পরিবর্তন আনা হয়েছে।
কমিটির প্রাক্কলন অনুযায়ী, ৩১ কিলোমিটার দীর্ঘ এমআরটি লাইন-১-এর নির্মাণ ব্যয় ৫২ হাজার ৫৬১ কোটি টাকা থেকে বেড়ে প্রায় ১ লাখ ১০ হাজার কোটি টাকা হতে পারে। আর এমআরটি লাইন-৫-এর ব্যয় ৪১ হাজার ২৩৮ কোটি টাকা থেকে বেড়ে ৮৮ হাজার থেকে ৯০ হাজার কোটি টাকায় দাঁড়াতে পারে।
বসুনিয়ার দাবি, তাদের অর্থনৈতিক বিশ্লেষণ যথাযথ। বাংলাদেশে মেট্রোরেল নির্মাণের ব্যয় ভারতসহ অন্যান্য দেশের তুলনায় বেশি হওয়ার কারণ হিসেবে তিনি বলেন, ভারতীয় প্রকল্পগুলোতে ডিজেল, লোহা, সিমেন্ট ও পাথরের মতো অনেক নির্মাণসামগ্রী দেশীয়ভাবে পাওয়া যায়। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এসব পণ্যের বড় অংশই আমদানি করতে হয়। ফলে ভারতের সঙ্গে সরাসরি ব্যয়ের তুলনা করা যৌক্তিক নয়।
চলতি মাসের শুরুতে স্বাধীন বিশেষজ্ঞ কমিটি সরকারের কাছে তাদের প্রতিবেদন জমা দিয়েছে।
ডিএমটিসিএলের সংশোধিত প্রস্তাবে ব্যয় আরও বেশি
স্বাধীন বিশেষজ্ঞ কমিটির হিসাবের চেয়েও বেশি ব্যয় ধরে মেট্রোরেল লাইন-১ ও ৫-এর জন্য সংশোধিত প্রস্তাব তৈরি করেছে ডিএমটিসিএল। প্রতিষ্ঠানটি প্রস্তাবটি সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগে পাঠানোর পর গত সপ্তাহে তা পরিকল্পনা কমিশনে পাঠানো হয়েছে।
সংশোধিত প্রস্তাবে এমআরটি লাইন-১-এর মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ১ লাখ ২০ হাজার ৭৯৪ কোটি টাকা। এর মধ্যে জাপানের অর্থায়ন থাকবে ৮৫ হাজার ৫৩৫ কোটি টাকা। মূল প্রস্তাবে এই প্রকল্পের মোট ব্যয় ছিল ৫২ হাজার ৫৬১ কোটি টাকা এবং জাপানের ঋণের পরিমাণ ছিল ৩৯ হাজার ৪৫০ কোটি টাকা।
প্রকল্পটির মূল বাস্তবায়নকাল ছিল সেপ্টেম্বর ২০১৯ থেকে ডিসেম্বর ২০২৬ পর্যন্ত। সংশোধিত প্রস্তাবে তা বাড়িয়ে ২০৩৫ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত করার কথা বলা হয়েছে।
অন্যদিকে, এমআরটি লাইন-৫-এর সংশোধিত ব্যয় ধরা হয়েছে ৯৩ হাজার ১৯০ কোটি টাকা। এর মধ্যে জাপানি অর্থায়নের পরিমাণ ৬৮ হাজার ৯৩১ কোটি টাকা। মূল প্রস্তাবে প্রকল্পটির ব্যয় ছিল ৪১ হাজার ২৩৮ কোটি টাকা এবং জাপানের ঋণ ছিল ২৯ হাজার ১১৭ কোটি টাকা।
লাইন-৫ প্রকল্পের মূল মেয়াদ ছিল জুলাই ২০১৯ থেকে ডিসেম্বর ২০২৮ পর্যন্ত। সংশোধিত প্রস্তাবে বাস্তবায়নকাল বাড়িয়ে ২০৩৪ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত করা হয়েছে।
প্রস্তাব মূল্যায়ন কমিটির সভায় ব্যয়ের বিষয়টি যাচাই-বাছাইয়ের পর ডিএমটিসিএলের সংশোধিত প্রস্তাবের পরবর্তী কার্যক্রম শুরু হবে।
দরপত্র জমা দেওয়ার পর বিভিন্ন প্যাকেজের ব্যয় অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যাওয়ায় অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে মেট্রোরেল লাইন-১ ও ৫-এর বাস্তবায়ন কার্যত থমকে যায়। ব্যয় কমানোর লক্ষ্যে সে সময় অর্থ উপদেষ্টা, পরিকল্পনা উপদেষ্টাসহ সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জাপান সরকারের সঙ্গে একাধিক বৈঠক করেন।
তৎকালীন অর্থ উপদেষ্টা সালেহউদ্দিন আহমেদ ব্যয় কমানোর বিষয়ে আলোচনার জন্য জাপান সফরও করেন। তবে জাপানের কাছ থেকে ইতিবাচক সাড়া না পাওয়ায় প্রকল্প দুটির কাজ কার্যত স্থবির হয়ে পড়ে।
বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তা ও সংশ্লিষ্ট বিভাগগুলোর সঙ্গে বৈঠক করেন। প্রকল্প দুটির কাজ পুনরায় শুরুর লক্ষ্যে যতটা সম্ভব ব্যয় কমিয়ে জাপানের সঙ্গে আলোচনা করার নির্দেশ দেন তিনি।
স্বাধীন বিশেষজ্ঞ কমিটির প্রধান শামীম জেড বসুনিয়া বলেন, ঢাকার পরিবহন ব্যবস্থা উন্নত করতে চাইলে সরকারকে দ্রুত প্রকল্প দুটির কাজ শুরু করা উচিত। কারণ বর্তমানে জাপান যে সুদের হার দিচ্ছে, ভবিষ্যতে তা নাও পাওয়া যেতে পারে।
জাপান এই প্রকল্পগুলোর জন্য শূন্য দশমিক ৯ শতাংশ সুদের হার প্রস্তাব করেছে। বসুনিয়া জানান, গত কয়েক বছরে জাপান বিশ্বজুড়ে সুদের হার বাড়ালেও মেট্রোরেল প্রকল্প দুটির জন্য এই হার অপরিবর্তিত রেখেছে।
তিনি বলেন, প্রকল্পগুলো বাতিল করে নতুন কোনো উন্নয়ন সহযোগীর অর্থায়নে নতুন করে শুরু করা হলে এত কম সুদে ঋণ পাওয়ার সুযোগ নাও থাকতে পারে।
ইতিমধ্যে ব্যয় হয়েছে ৮ হাজার কোটি টাকার বেশি
গত বছরের জুন পর্যন্ত এমআরটি লাইন-১ প্রকল্পে ৩ হাজার ১৭৬ কোটি টাকা এবং এমআরটি লাইন-৫ প্রকল্পে ৫ হাজার ১১ কোটি টাকা ব্যয় হয়েছে। অর্থাৎ, দুই প্রকল্পে ইতিমধ্যে মোট ৮ হাজার ১৮৭ কোটি টাকা ব্যয় হয়েছে।
নিজস্ব প্রতিবেদক 




















